ইনতেজার

সংখ্যা:

 

আজকের সন্ধাটা বোধহয় তাড়াতাড়ি নামছে। চারদিক কেমন অন্ধকার হয়ে এসেছে। বৃষ্টি হবে নাকি? হতেও তো পারে। প্রকৃতির চাবি তো আমার কাছে নেই, বলি কীভাবে। কাজ অনেক বাকি। কোনটা রেখে কোনটা করি। ঘরের ভেতর ফোনটা বেজে উঠল। মনে হয় উনি ফোন করেছেন। কাপড় হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলাম। অনেকটা দৌড়ের মতো করে। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ক্লান্ত একটা স্বর ভেসে আসল—‘কী করছো নাজ? এখনো বাইরে দাঁড়িয়ে আছ নিশ্চয়!’

আমি খানিকক্ষন চুপ থেকে অভিমান-মেশানো গলায় বললাম—‘বাইরে থাকব না তো কী করব। ক’টা বাজে দেখেছেন?’

‘রাগ করো না, প্লিজ! ট্রেন মিস হয়েছে। আসতে রাত হবে বোধহয়। তুমি ঘরে যাও। বৃষ্টি আসতে পারে দরজা-জানালা ঠিক করে লাগিয়ে দিয়ো।’

‘তাড়াতাড়ি আসুন, আমার একলা ভয় লাগছে।’

‘কেন? দিলরুবা কি বাড়ি চলে গেছে?’

‘মাদরাসা বন্ধ হলে আপনার ছোটোবোন কোনো সময় থাকে? আর আপনি আসবেন বলে তাকে যেতে বাধাও দিইনি।’

‘আচ্ছা, চিন্তা করো না। আমি যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করছি। আর সমস্যা হলে আমাকে কল দেবে কিন্তু! এখন রাখি। ফি আমানিল্লাহ।’

আমি ফোন হাতে নিয়ে বসে রইলাম। আকাশটা আরও কালো হয়ে এলো। ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে ঝড়ো বাতাস। বেগ ধীরে ধীরে বাড়ছে। দরজা বন্ধ করে ঘরে আসতেই বিদ্যুৎ চলে গেল। সেই সঙ্গে নামল ঝুম বৃষ্টি। মুষলধার বৃষ্টির ফোঁটা টিনের চালে পড়ে মোহনীয় এক সুর সৃষ্টি করছে। অন্ধকারেই বসে রইলাম। কী কারণে ভয়টা কেটে গেল। এখন খুব আনন্দ বোধ করছি। কতদিন পর বৃষ্টির এই আওয়াজ শুনলাম। ১০ বছর তো হবেই। ছোটোবেলা গ্রামের বাড়ি গেলে শোনা হতো।

এখন তিনি থাকলে কাল-পাত্র ভুলে জীবনানন্দের ‘শীতরাত’ কবিতা থেকে এই লাইনটা আওড়াতেন—

‘এসব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে

বাহিরে শিশির ঝরছে; কিংবা হলুদ পাতা, কিংবা পেঁচার গান।’

যদি তাঁকে বলতাম—‘এই বৃষ্টিরাতে আপনি শীত পেলেন কোথায়?’ উত্তরে বলতেন—‘আসলে কবিতাটা বর্ষায় রচনা হওয়ার কথা ছিল, কবি ভুলে শীতে চলে গেছেন।’

আগের বারও এমনই বলেছেন। সত্যি! কাছের মানুষের ছলনাগুলোও ভালো লাগে।

 

দুই

আমাদের বিয়ের প্রায় ১১ মাস হলো। মানে একবছরও হয়নি। কিন্তু, আমার কী কারণে মনে হয় আমরা অনেক আগে থেকেই পরিচিত ছিলাম। না-হয় এতো অল্প সময়ে কেউ কারও আপন হতে পারে? দৈনিক তিন-চার বার ফোন না দিলে আমার ঘুমই আসে না। তিনিও প্রতি সপ্তাহে বাড়ি আসেন।

ঢাকার একটি মাদরাসায় পার্টটাইম শিক্ষকতা করেন আর একটি মাসিক সাহিত্য ম্যাগাজিনের সহ-সম্পাদক। বিয়েটা হয় খুবই অস্বাভাবিকভাবে। সমাজে সাধারণত যা ঘটে না। শুক্রবারদিন দুপুরে পাত্রপক্ষ দেখতে আসে আমাকে। মহিলাদের দেখা হওয়ার পর আমাকে রুমে একা রেখে তারা চলে যায়। লোকটা নাকি আমার সাথে একান্তে কিছু বলবে। আমার ভয়ে গলা শুকিয়ে এসেছিল। অচেনা কোনো ছেলের সামনে এই প্রথম, তাও আবার সাজুগুজু করে। কী বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা!

এসেই গম্ভীর গলায় সালাম দিলেন। আমি অস্ফুট স্বরে উত্তর দিলাম। অনেকক্ষণ চুপ-চাপ। নীরবতা ভেঙে তিনিই কথা শুরু করলেন—‘কেমন আছেন নাজনীন?’

আমি চমকালাম না। মেয়ে দেখতে এসেছে। নাম জানা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁর জিজ্ঞাসার কোনো জবাব দিলাম না। নাকি দিতে পারলাম না? চুপ করে রইলাম।

তিনিই আবার কথা শুরু করলেন—‘আপনি বোধহয় ভাবছেন আপনার নাম জানলাম কী করে? এর উত্তরটা আপনার মনমতো নাও হতে পারে। এ বাড়ির কারও কাছ থেকে জানিনি। বুলবুল সারওয়ারের ‘ঝিলাম নদীর দেশ’ পড়ে কৈশোরেই নিয়ত করেছিলাম বিয়ে করতে হলে নাজনীন নামের কোন মেয়েকেই করবো। কাল মামাকে জিজ্ঞেস করলাম মেয়ের নাম কী? তিনি বললেন নাজনীন। আমি তো চমকে গেলাম। কীভাবে মিলে গেল! ব্যাপারটা কাকতালীয় ভাবতে পারেন!’

তাঁর এই কিম্ভুতকিমাকার ফিরিস্তি শুনে বেশ অদ্ভুত লাগল, আবার বেশ মজাও পাচ্ছিলাম। কিন্তু আমি কোনো কথা বলছি না, নাকি বলতে পারছি না? নিচের দিকে মুখ করে বসে আছি।

তিনি খানিক বিরতি দিয়ে আবার কথা শুরু করলেন—‘যাইহোক, আসল কথায় ফিরি। আমার চেহারা-সুরত নিয়ে কোনো খুঁত থাকলে বলতে পারেন, বা অন্য কিছু জানার থাকলে।’

আমি কিছুই বলতে পারলাম না। সেই আগের মতোই নিশ্চুপ বসে আছি। তবে এবার ঘামতে লাগলাম। গলা শুকিয়ে এসেছে।’

তিনি এবার হেসে বললেন, ‘বুঝেছি, চুপ থাকা সম্মতির লক্ষণ। হা হা হা। আর আমার পছন্দের কোনো লাইন-ঘাট নাই। আপনার চেহারা-সুরত আমার খুব পছন্দ হয়েছে। তাছাড়া… আপনার নামটাই আমাকে বেশি টেনেছে।’

তারপর কিস্যা অতি মুখতাসার। রুম থেকে বের হয়েই তিনি বললেন—‘আজই বিয়ে হবে। কাজি আনা হোক।’

কেউ তাঁর কথার দ্বিমত করতে পারল না। ঘরের একমাত্র ছেলে। অনেকে পাগল ভাবতে লাগল। বেটা বলে কী!  প্রথম দেখাতেই বিয়ে। তক্ষণে আমি তাঁর মধ্যে মজে গেছি। কতটা ভালোবাসলে এত তাড়াতাড়ি অচেনা কাউকে আপন করে নিতে পারা যায়!

 

তিন

খটখট… খটখট…

দরজায় কয়েকবার আওয়াজ হওয়ার পর আমার ঘুম ভাঙল। বিরক্তি নিয়ে বলতে যাবো ‘কে?’, অম্নি মনে হলো, আরে, রাতে না তাঁর আসার কথা! বৃষ্টির শীতলতায় একটু সময়ের জন্য কাঁথার নিচে গিয়েছিলাম। কখন যে ঘুমে চোখ জুড়িয়ে এলো টেরই পাইনি। তড়িঘড়ি করে কোনোমতে কাপড় ঠিক-ঠাক করে দরজা খুললাম।

বাইরে কাউকে দেখতে পেলাম না। এম্নিতেই অন্ধকার রাত। তার উপর বৃষ্টি এসে আঁধারটাকে আরও গাঢ় করে রেখেছে। কেমন যেন ভয় লাগছে। আমি গলা খাকারি দিয়ে বললাম—‘বাইরে কেউ আছেন?’

কয়েক বার বললাম। কোনো প্রতিউত্তর এলো না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। সত্যিই কি দরজায় শব্দ হয়েছিল? নাকি স্বপ্নে দেখেছি? কিছুই বুঝতে পারছি না। সব গুলিয়ে যাচ্ছে। এক গ্লাস পানি পান করা দরকার।

ঘড়ি দেখে আমি জমে গেলাম। রাত বারোটা বিশ বাজে। এত্ত রাত কবে হলো! এখনও তিনি আসেননি। আমার ভয় বাড়ছে। বুক ধড়ফড় করছে। কখনো তো এমন হয় না। কিছু হয়ে গেলো নাকি আবার…! ধুর কীসব ভাবছি! হয়তো বৃষ্টির কারণে রাস্তায় কোনো সমস্যা হয়েছে। তাই বলে কি ফোনটাও বন্ধ থাকবে?

ফোনে আরও কয়েকবার চেষ্টা করলাম। ফলাফল ব্যর্থ।

আকাশে মনে হয় আবার মেঘ জমেছে। গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজে যেন সব ভেঙে ফেলবে। ঝুমঝুম করে আবার নেমে এলো বৃষ্টি। টিনের চালে অদ্ভুত এক নাচন সৃষ্টি করেছে। এসবে আমার মন টানছে না। চোখ দিয়ে পানি ঝরছে।

সেই থেকে শুরু আমার ইনতেজার।

 

পরিশিষ্ট

কাহিনির সমাপ্তি এখানেই। বাকিটা বলতে গেলে নিজেন ব্যক্তিগত গীত বলা হবে। যা আপনাদের না-শোনাই উত্তম। বৃষ্টি-বিধৌত শ্রাবণ রাতের পর থকে আজ আট বছর। এখনও মাঝে মাঝে মাঝরাতে দরজায় কারাঘাত শুনি। কিন্তু কেউ আসে না। আমাকে একাকী ফেলে তিনি চলে গেছেন সেই আট বছর আগে। একটি বারের জন্যও এসে বলেন না—‘দেখো নাজ! আমি চলে এসেছি। তোমাকে ছেড়ে থাকা যায়, বলো?’

তাঁর গুম হওয়ার ছ’মাস পর্যন্ত আমি পাগলের মতো ছিলাম। কিছুই বুঝতাম না। শুধু মনে হতো সারাক্ষণ বুঝি বৃষ্টি হচ্ছে। এই বুঝি দরজায় করাঘাত হলো।

অনেক খোঁজাখুঁজি হলো। থানায় ডায়েরি হলো। কিন্তু কিছুই হলো না। কিছুদিন পর বুঝলাম আমি মা হতে চলেছি। তাঁর শেষ নিদর্শন হিসেবে আল্লাহ আমাকে জননী বানাচ্ছেন। একটি সন্তান পাচ্ছি।

***

আহমাদ দুনিয়ায় আসার পর পরিবার থেকে বিয়ের ব্যাপারে অনেক জোরাজুরি করা হলো। বয়স মাত্র বিশ। অনেক ভালো জায়গা থেকেও প্রস্তাব এলো। আমি সব নাকচ করে দিলাম। বিয়ে জীবনে একবার হয়, বারবার নয়।

আজ আবার বৃষ্টি হচ্ছে। মুষলধারে। আহমাদ আমার গলা জড়িয়ে শুয়ে আছে। ওর দিকে তাকিয়ে আমি কষ্টকে চেপে রাখি। পিতার স্নেহ ছাড়া বড় হচ্ছে ছেলেটি।

খট… খট…

দরজায় কয়েকবার আঘাত হলো। আমি ধড়ফড় করে খাট থেকে নামলাম। হাতটা কাঁপছে। মাথাটা ঘুরছে চরকির মতো। এই বুঝি পড়ে যাবো। দরজায় কোনোমতে হাত রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম।

আট বছরের ইনতেজার কি আজ শেষ হয়ে এসেছে? আমি কি আবার আমার সুখ ফিরে পাবো?

দরজা খুলে তাকাই। বাইরে তখনো বৃষ্টি। অন্ধকার চারিদিক। আকাশের গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ। যেন সব ভেঙে ফেলবে। অন্ধকারে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে—আল্লাহ, আমার ইনতেজার আর কবে ফুরোবে…?

 

ফেব্রুয়ারি ২০২০

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১