২৬-৯-২০১৭
প্রায় তিন চার-দিন হলো রোজনামচায় কিছু লিখি না। আজকে যাইহোক একটু লিখতে বসেছি তাও আবার নিদারুণ আঘাতের বেদনায়। আজকের ঘটনাটি আমাদের ক্লাসের একজনকে নিয়ে। নামটা প্রকাশ করতে চাই না, বলার সুবিধার্থে ধরে নিলাম তার নাম ফাহিম। সে আমার থেকে বয়সে অনেক ছোট। সব সময় ভাই ভাই বলে ডাকত। সামনে পড়লেই সালাম-কালাম করত। নিদারুণ আঘাতটা পেয়েছি এই ছোটভাইয়ের ন্যাক্কারজনক একটা ঘটনা থেকে।
ক্লাস চলছে। প্রথম ঘন্টা প্রায় শেষের দিকে। মৌলভি স্যারের ক্লাস। ঈদুল আজহার বন্ধ দেবে আজ স্কুল। আমরা কীভাবে বন্ধটা কাটাবো, বন্ধের মাঝে কীভাবে পড়ালেখা করব, বার্ষিক পরীক্ষায় রেজাল্ট কীভাবে ভালো করব তা নিয়ে মৌলভি স্যার কথা বলছেন। এমন সময় স্যার ফাহিমের হাতের দিকে চেয়ে কথা বলা বন্ধ করে দিলেন এবং তাকে দাড়াতে বললেন।
স্যার বললেন, ‘তোমার হাতে এটা কী?’
ফাহিম বলল, ‘স্যার, একটা কাগজ।’
স্যার রাগের স্বরে বললেন, ‘কাগজটা আমার কাছে দাও।’ কিন্তু ফাহিম কিছুতেই দিতে চাচ্ছে না। অনেকক্ষণ জোরাজুরি করার পর স্যারের হাতে গেল কাগজটা। স্যার কাগজটা পড়লেন। একটি মেয়েকে লেখা প্রেমপত্র এটা। স্যার ফাহিমকে কিছু না বলে সরাসরি সহকারী প্রধান শিক্ষককে ডেকে আনলেন। তারপর তিনি হেডস্যারের কাছে নিয়ে গেলেন। স্যার তার হাতের লেখা যাচাই-বাছাই করে দেখলেন।
লেখাটা আসলে তার হাতেরই। অন্য ক্লাসের এক মেয়েকে লিখেছে। ওই মেয়েটা আবার স্কুলের অভিভাবক-সদস্যের মেয়ে। মেয়েটার কোনো অপরাধ নেই। ফাহিম রীতিমতো মেয়েটাকে বিরক্ত করে। ফাহিমক মেয়ে ভাই বলে ডাকে তারপরও…।
স্যার ফাহিমের মা-বাবাকে খবর দিয়ে আনলেন। ফাহিমের মা একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আর বাবা কলেজের অধ্যাপক। স্যার সব কথা বের করে ফেললেন ফাহিমের কাছ থেকে। বিবরণটা হলো—ফাহিমের সাথে মেয়েটার কোনো সম্পর্ক নেই। ফাহিমই প্রতিদিন তাকে বিরক্ত করে। আচ্ছা যাই হোক, ফাহিমের বাবা-মা আসার পর স্যার তাদেরকে সরাসরি বলে দিলেন—‘আপনার ছেলেকে নিয়ে যান। আমাদের স্কুলে আর রাখা হবে না।’
স্যার উনাদেরকে সব লেখা পড়ে শোনালেন এবং তার মায়ের কাছে দিলেন পড়ে শোনানোর জন্য। সাথে সাথে স্যার তাাদেরকে কিছু কড়া কথাও বলে দিলেন। যেগুলো শুনে আমি দুঃখ পেলাম মানব বিবেকের স্পষ্ট বিচারে। দোষ করেছে ছেলে, বাবা-মা কেন তার ফল ভোগ করবেন? একমাত্র নৈতিক শিক্ষার কারণে। আপনারা দুজনেই শিক্ষিত কিন্তু আপনার ছেলেটাকে নৈতিকতা শেখাতে পারলেন না। ফাহিমের বাব-মা স্যারের কথার জবাবে একটা কথাও বললেন না। বিচারে এক পর্যায়ে সবাই উঠে চলে যাচ্ছেন। স্যারের এককথা, আমরা আপনার সন্তানকে রাখতে পারব না। নিয়ে যান।
ফাহিমের বাবা-মা স্যারের কাছে অনুরোধ জানানোর পরও কোনো লাভ হলো না। একসময় বাধ্য হয়ে ফাহিমকে নিয়ে চলে যাচ্ছেন তার বাবা। আমরাও যাচ্ছি তার পিছে পিছে। স্যারকে অনুরোধ করে তাকে ক্ষমা করানো যায় কি না। এমন সময় আবদুল হক সাহেবের সাথে দেখা। আমার অতি পরিচিত একজন ব্যক্তি। তিনি স্কুলপরিচালনা কমিটির সভাপতি। তাঁর কথায় হয় না এমন কোনো কাজ আমি দেখিনি। তাই ভাবলাম তিনি হয়তো কিছু করতে পারবেন। তাই তাঁকে সব খুলে বললাম।
তিনি বললেন, ‘এক কাজ করো, আমি অফিসে গিয়ে বসি, তারপর তোমরা কয়েকজন মিলে আসো।’
আমরা সকলে গিয়ে হাজির হলাম অফিসে। স্যারের কাছে বললাম, ‘ওকে ক্ষমা করে দিন। আর কোনোদিন করবে না।’ স্যার বললেন, ‘কিসের ক্ষমা? ওর কোনো ক্ষমা নাই। ওর স্বভাবের কারণে ওর বাবা-মা অপমানিত হয়েছেন তারপরও ওর চোখে একফোঁটা পানিও আসেনি। বেয়াদবি করে উল্টো আরও মুখের ওপরে কথা বলেছে, ওর কোনো ক্ষমা নাই। যাও, তোমরা যাও।’
অবশেষে আবদুল হক সাহেব বললেন, ‘এবারের মতো ক্ষমা করে দিন, বাকি জীবনে আর করবে না।’ হেডস্যার তাঁর কথার জবাবে বললেন, ‘আপনি ভুলেও ওকে ক্ষমা করার জন্য অনুরোধ করবেন না। দেখবেন একদিন আপনি নিজেই আমাকে এসে বলবেন, আপনার মেয়ে অথবা ভাতিজিকে কেউ বিরক্ত করেছে আমি তার বিচার করিনি। না, না, না এই বিষয়ে ক্ষমার অনুরোধ জানিয়ে আমাকে লজ্জা দেবেন। তাছাড়া বরং এমন একটা ছেলে অথবা মেয়েকে নিয়ে আসেন, যে গরিব, টাকার কারণে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে না, স্কুলে পড়ার সামর্থ্য নেই, তখন দেখবেন আমি আপনার কোনো অনুরোধই ফিরিয়ে দেব না। আমি সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে তাকে সাহায্য করব। কিন্তু এই অন্যায়কে ক্ষমা করার জন্য আমাকে অনুরোধ করবেন না দয়া করে।’
স্যারের কথায় সকলে চুপ। সবাই মাথা নিচু করে চলে আসলাম। ফাহিমকে তার শাস্তিস্বরূপ স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হলো।
পুনশ্চ : রোজনামচার এই লেখাটি আমার স্মৃতির কলসিতে রয়ে যাবে আজীবন। মহান আল্লাহ তায়ালা ওইদিন সত্যবাদী, ন্যায়নিষ্ঠ আর সততার উচ্চতায় সমাসীন এক স্যারকে আমার মনে জায়গা করে দিয়েছিলেন। আমাদের সৌভাগ্য যে, তাঁকে আমরা হেডস্যার হিসেবে পেয়েছিলাম। যাঁকে হৃদয়ের গভীর থেকে সর্বদা জানাই শ্রদ্ধা আর সম্মান। যাঁর নৈতিকতার শিক্ষায় হৃদয়ের অপবিত্র ধুলাবালি সরাতে চেষ্টা করি এখনও, প্রতিনিয়ত।
কটিয়াদি, কিশোরগঞ্জ
ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

