আগে যেমন শুধু কাব্যই ছিল সাহিত্যের বাহন; কিন্তু মানুষ তার ভাব ও ভাবনাগুলো আরও ছড়িয়ে দিতে চায়, গল্প বলতে চায় বিস্তৃত পরিসরে, উপন্যাসের জন্ম ভাবপ্রকাশের এই তাড়না থেকেই। এরপর থেকে অবিরাম লেখা হয়ে চলেছে উপন্যাস। যেখানে উঠে এসেছে লেখকের সমসাময়িক পরিস্থিতির কথা, তা হোক ব্যক্তিক, সামাজিক, জাতীয় বা বৈশ্বিক। দূরদ্রষ্টা কেউ আবার ভবিষ্যতও দেখেছেন তার উপন্যাসে সমকালীন চোখ দিয়ে। উপন্যাস তাই হয়ে উঠেছে চলমান সাংবাদিকতা; যার লেখক হলেন সময়ের সাংবাদিক, বিশ্বকে যিনি দেখেন অবাধে নিজের চোখে, উপলব্ধি করেন এবং প্রচার করেন নিজের মতাদর্শ। বলাবাহুল্য, এই কাজটা যিনি গভীরভাবে করতে পারেন, তাঁর উপন্যাস ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক হয়ে ওঠে এবং শুধু রচয়িতার ভাষার নয়, বরং পুরো বিশ্বের সম্পদ হয়ে যায়। সুজান আবুলহাওয়া রচিত ‘মর্নিংস ইন জেনিন’উপন্যাসটিও এমনি একটি বৈশ্বিক উপন্যাস।
কোনো উপন্যাস, কখন তাকে আমরা সফল রচনা বলি? যার কাহিনিতে থাকে রোমাঞ্চ? পাঠককে যা ধরে রেখে পৌঁছে দেয় তার শেষ শব্দটির কাছে? নাকি এমন, যার কাহিনিতে তেমন রোমাঞ্চ নেই, কেবলই জীবনের হয়ে বলে চলা, জীবন যেমন সবসময় নয় রোমাঞ্চকর, বরং এর বড় একটি অংশজুড়ে থাকে সহজ ও স্বাভাবিকতা এবং মাঝেমাঝে হঠাৎ ও আকস্মিকতা; এমনও উপন্যাস হতেই পারে। সমারসেট মম যেমন বলেছেন—‘প্রত্যেকেই অন্তত একটি উপন্যাস লেখার সামর্থ রাখেন, তাঁর নিজের জীবন নিয়ে উপন্যাস।’সত্য এই যে, সফল উপন্যাস হতে জমজমাট কাহিনির প্রয়োজনীয়তা খুবই সীমিত।
আমার দেখা ‘সুপ্রভাত ফিলিস্তিন’ও (মর্নিংস ইন জেনিন) এমনই একটি উপন্যাস। এর চরিত্রগুলোতে নায়কোচিত কেউ নেই ঠিক; এবং নেই কাহিনির জমজমাট বিন্যাস, চরিত্র ও সময়ের লুকোচুরি; কিন্তু আছে আমাদেরই মতো রক্ত-মাংসের গড়া মানুষেরা, যারা এমনই জীবন্ত যে, তাদের স্রেফ গল্পের ‘চরিত্র’ বললে আর মানায় না; তারা সবাই, একসাথে, দাঁড়িয়ে গেছে একটি সময় ও পরিস্থিতির ভেতরে; উপন্যাসটির কাহিনি ও তার বর্ণনাভঙ্গিও এমন যে, তা পাঠ করতে করতে পাঠকও একসময় নিজেই গিয়ে দাঁড়ান উপন্যাসটির সময় ও পরিস্থিতির ভেতরে; উপলব্ধি করেন রচয়িতারই মতো করে; কারণ তিনি তখন নিজের নন, সম্পূর্ণই উপন্যাসটির হয়ে যান।
কেন এমন হয়? আমার মতে এর কারণ হলো লেখিকার অভিনব বর্ণনাশৈলী। উপন্যাসটির কাহিনি তিনি বলিয়েছেন চরিত্রগুলোরই জবানে এবং প্রয়োজনে সরেও এসেছেন এই মূল ধারা থেকে। উত্তম পুরুষের এই বলে চলা পাঠককে আন্দোলিত করে; যেখানে নামপুরুষ, যার ব্যথা ও আবেগ পাঠককে তেমন করে নাড়িয়ে দেয় না; কারণ, পাঠককে তা শুনতে হয়ে লেখকের মুখ থেকে।
এই সেদিন লেখক মাসরুর আরেফিন-এর মুখে তাঁর উপন্যাসের মূল্যায়ন শুনছিলাম। তিনি বলছিলেন উপন্যাস লেখার প্রকরণ ভেঙে যাওয়ার কথা। কোথায় এসে যেন উপন্যাসগুলো এখন এমন হয়ে উঠেছে, পড়ে মনে হয় আত্মজীবনী, প্রবন্ধ কিংবা ইতিহাসের বই। এবং এটিই আধুনিক সাহিত্যে উপন্যাসের সবচেয়ে প্রচলিত প্রকরণ। কারণ, দেখা যায়, এ ধরনের উপন্যাসে ঐতিহাসিক সত্যতা বিশ্বাসযোগ্যভাবে এঁকে দেওয়া যায়।‘সুপ্রভাত ফিলিস্তিন’ পড়ে মনে হয়েছে, এটি এই ধরনের উপন্যাসের আদর্শ উদাহরণ। লেখিকা শুরুতেই স্বীকারোক্তি টেনেছেন—‘এই বইয়ের সব চরিত্র কাল্পনিক। তবে ফিলিস্তিন এবং এই বইয়ে বর্ণিত ঘটনাগুলো, ইতিহাস ও উল্লিখিত ব্যক্তিত্ব—এসব কিছু বাস্তব’। এদিকে এটিও সত্যযে, চরিত্রগুলো কাল্পনিক হলেও এগুলো প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে লেখিকারই পরিচিত বহু ফিলিস্তিনির। এই ধারণার সত্যতা পাই, যখন তিনি তাঁর উপন্যাসের অঙ্কুরোদ্গম সম্পর্কে বলেন, ‘২০০১ সালে ডক্টর হানান আশরাওয়ি আমার একটি লেখা পড়ে আমাকে ইমেইল করেন। লেখাটি ছিল কুদসে কাটানো আমার শৈশব নিয়ে। তিনি লেখাটি পড়ে বলেন, মনে হচ্ছে তুমি উচ্চমার্গের একটি আত্মজীবনী লিখতে পারবে।’
প্রকৃতই উপন্যাসটি শুধুই আত্মজীবনী, লেখিকার, বরং প্রতিটি ফিলিস্তিনির এবং সময়েরও;যার পাতাজুড়ে ছাপিয়ে উঠেছে কয়েকটি প্রজন্মের দীর্ঘশ্বাস। এই যে দীর্ঘ সময়ের কয়েকটি প্রজন্মের ইতিহাস, সময় ও চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রেখে বলে চলা, এখানেও দেখেছি উপন্যাসটির সার্থকতা।
অনুবাদ হিসেবে ‘সুপ্রভাত ফিলিস্তিন’ বেশ সহজ ও সুখপাঠ্য হয়েছে; যদিও কিছু জায়গায় থেকে গেছে অনুবাদের ছাপ এবং মূলানুগ অনুবাদে এমনটা হওয়া স্বাভাবিকই মনে হয়। অনুবাদক চাইলেই সামান্য সময় ব্যয়ে সেগুলো মুছে দিতে পারেন। চাইলে কাজ করতে পারেন ক্রিয়াপদের কালরূপ নিয়েও; যা বাংলাভাষার অন্যতম শক্তি ও সৌন্দর্য। ইংরেজি ক্রিয়াপদের সাধারণ অতীতের তরজমা বাংলায় ‘আসল’ এবং‘আসে’ উভয়টাই হতে পারে। কিন্তু ‘আমি তাকিয়ে থাকলাম’ এবং ‘আমি তাকিয়ে থাকি’ একই অর্থ প্রকাশ করলেও দ্বিতীয়টি বিশেষ একটি আবহ ধারণে সক্ষম; প্রথমটিকে যার তুলনায় রিক্তই মনে হয়। সুখের কথা হলো, অনুবাদক বিশেষভাবে দ্বিতীয়টিকে অর্থাৎ নিত্যবৃত্ত বর্তমানকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। ফলে আবেগঘন মুহূর্তগুলো চিত্রিত হয়েছে দারুণভাবে। উদাহরণত, পাঠক উপন্যাসটির ‘অন্তহীন শুরু’ এবং ‘ইউসুফ, ফিলিস্তিনের পথে’ শিরোনামের রচনাটুকু পড়ে দেখতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে ক্রিয়াপদের কালরূপের অস্থির ওঠানামা লক্ষ্য করেছি; তবে বর্ণনার সাবলীলতা ধরে রাখবার কৃতিত্ব সমস্তই অনুবাদকের; যখন এই কাজটিই মূলানুগ অনুবাদের সবচেয়ে জটিল কাজ।
বলা হয়ে থাকে, এমন কোনো অনুচ্ছেদ নেই, যা সমালোচনাযোগ্য নয়। সে সূত্রে বলা যায়, এখনও প্রচুর সম্পাদনার সুযোগ রয়েছে বইটিকে বাংলা অনুবাদ-সাহিত্যের অনন্য সংযোজন হিসেবে প্রস্তুত করতে। আশা করি অনুবাদক এর গুরুত্ব অনুধাবনে সক্ষম হবেন।
অনেকেই আছেন, যাঁরা গৎবাঁধা ইতিহাস পড়ে যেতে চান না, তবে ইতিহাস-আশ্রিত কোনো উপন্যাস পেলে সাগ্রহে হাতে নেন; যদিও সকল ঐতিহাসিক উপন্যাসের ইতিহাস সঠিক নয়, কিন্তু এই উপন্যাসের লেখিকা এই নিশ্চয়তাও যখন দিচ্ছেন, তখন সে সকল পাঠক নিশ্চিন্তে বইটি হাতে নিতে পারেন, যার প্রতিটি পাতায় রয়েছে ইতিহাস ও উপন্যাসের এক মিশেল অনুভব।
আগস্ট 2019

