বড় হয়ে পুঁথি-পাঠক হবো—এরকম একটা স্বপ্ন লালন করেছি বহুদিন। স্বপ্নটা একদমই অল্প বয়সে ভেতরে গেঁথে বসে; যখন কিনা বাংলা হরফ চেনা শুরু করেছি মাত্র। বানান করে পত্রিকার শিরোনাম পড়ে ফেলার মতো সাংঘাতিক আনন্দের বিষয়টি আবিষ্কার করে ফেলার পর আমার ছোট্ট জীবনের লক্ষ্য স্থির করে বসি যে, আমি বিখ্যাত পুঁথি-পাঠক নিয়াজুদ্দির মতো হবো। লোকে আমাকে খুব চিনবে, চায়ের মজলিশে, ধানের খোলায়, আর মাহিলা নদীর ঘাটে আমার নাম বলে প্রশংসায় ভাসিয়ে দেবে। যেমনটি হয় মৃত নিয়াজুদ্দির ক্ষেত্রে। আহা! লোকে কী তাজিম করে তাঁর নাম মুখে নেয়, তাঁর ভারী গলার খুব তারিফ করে। কেউ কেউ তার নাম শুনে কাঁদেও বটে। বেচারা আর দুনিয়াতে নেই, আর তারাও পুঁথি শোনার মতো মহা-আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিশুমনে আমি ভাবি, পুঁথি শুনতে না পারার কষ্ট তাহলে বড়ই নিদারুণ।
সেই বিখ্যাত পুঁথিপাঠক নিয়াজুদ্দিন ছিলেন আমার দাদা। আমি দুনিয়ায় আসার আগেই বুড়ো দুনিয়া ছেড়ে পালিয়ে যায়। কিছুটা বড় হয়ে যখন হাটে-ঘাটে যেতে শুরু করি, লোকজন আমাকে জিজ্ঞেস করত—‘তুমি কার ছেলে? তোমার দাদার নাম কী?’ গ্রামের লোকজন এমনই, প্রথম দেখায় কখনোই তারা আপনার নাম-ঠিকানা জিজ্ঞেস করবে না। জিজ্ঞেস করবে বাপ-দাদার নাম। আখেরে ঠিকানা। যখন দাদার নাম বলতাম, চোখ বড় বড় করে লোকজন বলতেন, ‘দাদার মতো কালো বর্ণের হয়েছ ঠিক, তবে দাদার মতো সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী হতে পারবা কি না কে জানে!’ তারপর শুরু হতো দাদাকে নিয়ে তাঁদের স্মৃতি রোমন্থন—কে কবে তাঁর কণ্ঠে ‘গাজী কালু চম্পাবতী’ শুনেছে, কে তাঁর মজলিশে ‘বিষাদ সিন্ধু’ শুনেছে ইত্যাদি আলাপে।
অগ্রহায়ণ মাসের ধান কাটা শেষে অথবা যখন গ্রামের কৃষক-মজুরদের আর কিছুই করার থাকত না তখন তাদের রুটিনে পুঁথি শোনা ছিল বিশেষ এক কর্ম। দিনের আলো নিভে গেলেই কুপি জ্বালিয়ে শুরু হতো পুঁথি-পাঠ। সন্ধ্যার পর প্রায় প্রতিটি অবস্থাসম্পন্ন বাড়ির উঠানে বা দহলিজে কুপি-বাতি আর হারিকেন জ্বালিয়ে বসত পুঁথিপাঠের আসর। হালকা জলখাবারের সাথে অধিক রাত পর্যন্ত চলত এ আসর। পাঠকের জন্য থাকত বিশেষ ধরনের ধুমপানের ব্যবস্থা—হুক্কা বা ওক্কা। গড়গড় করে হুক্কা টেনে শুরু করতেন ইউসুফ-জুলেখার জীবনী কিংবা কারবালার করুণ কাহিনি। লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদ, সয়ফুলমুলক বদিউজ্জামাল ও গুল বকাওলীর মতো কাহিনি পড়তেন তিনি; আমির হামজা, হাতেম তাই, সোহরাব-রুস্তম ইত্যাদি ছিল তাঁর প্রিয়।
তবে সবচে বেশি পড়তেন গাজী-কালু আর চম্পাবতীর পুঁথি। পুঁথিটি মুখস্থ থাকায় তাঁর কপিটি তিনি আমার ফুফুকে দিয়েছেলেন। যা এখনো আমাদের বাড়িতে বিদ্যমান আছে।
পুঁথিপাঠ-শ্রোতারা এতো তন্ময় হয়ে শুনতেন যে প্রতিটি বাক্য তাঁদের আবেগ-অনুভূতিকে নাড়া দিত। যেন পুরো আসরটি একটিই মাত্র মন-ধ্যান দিয়ে পরিচালিত। পাঠকের কণ্ঠের ওঠানামার সাথে বদলে যেত শ্রোতাদের চেহারা। এই তাঁরা প্রফুল্ল এই বিষাদাচ্ছন্ন। কখনো কখনো কাহিনির ক্লাইমেক্সে নারী শ্রোতারা হু হু করে করে কান্নায় মাটিতে লুটিয়ে পড়তেন। এসব আসরে রাজত্ব করে বেড়াতেন আমার দাদা নিয়াজুদ্দি সরদার।
দাদার খাতিরে লোকজন মাঝে মাঝে আমাকে লজেন্সও খাওয়াত। সমীহ করত। দোয়া দিত। পুঁথি-পাঠকের নাতি হিসেবে আমার সে কি গর্ব। বেজায় আফসোস, উপযুক্ত গুরু আর যথেষ্ট পরিমাণের পুঁথি সংগ্রহ করতে না পারার দুঃখে আর বিখ্যাত পুঁথি-পাঠক হতে পারলাম না। আশপাশের গ্রামগুলোতে আমার দাদা নিয়াজুদ্দিই বিখ্যাত হয়ে রইলেন। তাঁর পৌত্র আর বিখ্যাত হতে পারল না।
যদিও এসব বকওয়াস একান্তই ব্যক্তিগত, তবে এ হতে কিছুটা হলেও অনুমেয় যে, আর্থ-সামাজিকভাবে প্রান্তিক মুসলমানদের কাছে পুঁথি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ সময়ে এসে পুঁথি নিয়ে বাজারে ঢের কথা চলছে। কেউ তার শান-শওকত নিয়ে কথা বলছেন কেউ-বা নিন্দাবাক্যে হেয় করার চেষ্টা করছেন। পুঁথিকে ‘বটতলার সাহিত্য’ হিসেবে কলকাতার শ্রীমান সাহিত্যিকরা অনেক আগেই অচ্ছুৎ করে রেখেছেন। তাঁদের কাছে ইহা নিতান্তই মুসলমানি সাহিত্য। বাজারে তা মূল্যায়নের যোগ্য নহে। অপরদিকে হরপ্রাসাদ-শাস্ত্রী থেকে নিয়ে দীনেশচন্দ্র সেন, আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ থেকে নিয়ে আহমদ শরীফ; তারা সকলেই পুঁথি উদ্ধার আর তার মূল্যায়নে ব্রতী হয়েছিলেন পুরোটা জীবন খরচ করে। হুমায়ুন আজাদ আর আহমদ ছফা অবশ্য পুঁথি সাহিত্যকে দেখেছেন বাঙালি মুসলমানের পশ্চাদপদতার কারণ হিসেবে। পুঁথির অসংগতি, কুসংস্কারাচ্ছন্নতা ও তার নেতিবাচকতা নিয়ে আহমদ ছফা তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাঙালি মুসলমানের মন’-এ দীর্ঘ আলাপ তুলেছেন। অনেকটা নেতিবাচকতা থাকলেও গঠনমূলক কথাও আছে বেশ। পুঁথি নিয়ে আলাপ তুলতে গেলে বইটিকে প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় রাখতে হয়।
এসব আলাপ আপাতত মূলতবি রেখে পুঁথির পরিচয় আর শান-শওকত নিয়ে কিছু বলা যাক। অবশ্যই অন্যের দোহাই দিয়ে বলব। পুঁথির শাব্দিক অর্থ পুস্তিকা বা বই। যে বই হস্তলিখিত তা-ই পুঁথি। সরল অর্থে পাণ্ডুলিপিকে পুঁথি বলা যেতে পারে। তবে এখন আমরা পুঁথি বলতে বুঝি বিশেষ কিছু। সাহিত্য-সমালোচক শান্তনু কায়সারের জবানীতে—‘পুঁথি যে অর্থে পুস্তক বা পুস্তিকা সে অর্থে এখানে আমরা তার ব্যবহার করছি না। বাংলা সাহিত্যের এক বিশেষ ধরনের সাহিত্যের কথাই এখানে বলা হচ্ছে। আরবি-ফার্সি-হিন্দির মিশ্রণে রচিত সাহিত্য, ভারতচন্দ্রের ভাষায় যা ‘যাবনী মিশাল’ তা-ই পুঁথি সাহিত্য। এক সময় বাংলার ঘরে ঘরে পুঁথি পাঠের চল ছিল। জামাইয়ের পুঁথি পাঠ ছিল শ্যালিকাদের অন্যতম প্রধান আনন্দ ও বিনোদন। কিন্তু তাতে ‘জ্ঞানে’র কথাও থাকত। থাকত যুদ্ধবিগ্রহ ও প্রণয়ের কথা।’
কী থাকতো এসব পুঁথিতে? বিখ্যাত পুঁথির প্রায় সবক’টির বিষয়ই ছিল—প্রেম, যুদ্ধ আর ধর্মীয় কথা। এসবে মিশে থাকত অতীতের গৌরব, ক্ল্যাসিকাল প্রেমকাহিনি আর অনন্ত বিষাদের কথা। ঘুরে ফিরে ইউসুফ-জুলেখা, লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদের প্রেম কাহিনি। উহুদ ও কারবালার নির্মমতার কথা। ইরান-তুরানের বীর-বাদশাদের কথাও থাকত।
পুঁথির শুরুটা মধ্যযুগে, অর্থাৎ ১২০০ শতকের পরে। যখন আরব-ইরানি-তুরানিরা আমাদের দেশে আসতে শুরু করে তখন তাদের লোক-কাহিনিকে ঘিরেই আমাদের অঞ্চলে পুঁথি সাহিত্যের মূল স্রোতটা শুরু হয়। তবে ১৭৬০ থেকে ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে বাংলা, হিন্দি, আরবি, ফার্সি ভাষা মিশ্রিতধরনের সাহিত্য যা ছন্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা হতো তাই বিদ্যমান পুঁথির জনপ্রিয় ধারা। এ সময়ের পুঁথি নিয়ে জয়নুল আবেদিনের মন্তব্যটা উল্লেখ্য—‘১৭৫৭ সালে প্রহসনমূলক যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতন ঘটে। এই পতনের মধ্য দিয়ে মুসলিম সমাজের উপর শুরু হয় মহাবিপর্যয়। ইংরেজ কোম্পানি আমলে বাংলার মুসলমানেরা পরাজিত জাতি হিসেবে পীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হয়। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চাকরি, রাজনীতি—সব দিক থেকে ছিটকে পড়ে মুসলিম সম্প্রদায়। তারা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেনি। তা না করে ইংরেজের সবকিছু বর্জনের মাধ্যমে নিজের তৈরি খোলসে নিজেই প্রবেশ করেছিল। এ অবস্থায় কবি বা শায়েররা ইসলামের অতীত-গৌরব, শৌর্যবীর্য, মহত্ত্ব ও ঐশ্বর্যের কাহিনি নিয়ে আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষার মিশ্রণে রচনা করেন পুঁথিসাহিত্য। ওই সময় মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও পুঁথি অন্ধকারে নিমজ্জিত জাতির মনে যথেষ্ট আশ্বাস, আনন্দ ও সান্ত্বনা দিয়েছিল। শ্বাসরুদ্ধকর ১০০ বছরে মুসলিম শায়েরদের রচিত পুঁথিসম্ভার সাহিত্যের অধ্যায় থেকে বাদ দিলে বাকির খাতায় শূন্য যোগ করতে হবে।’
সাধারণত দুই ধরনের পুঁথি পাওয়া যেত, প্রথম প্রকার হলো আরবি-ফার্সি থেকে অনুবাদ। যেমন, সোহরাব-রোস্তম, লাইলি-মজনু কিংবা শিরি-ফরহাদ ইত্যাদি।
আর দ্বিতীয প্রকার ছিল, লোককাহিনির অনুকূলে বাঙালিদের দ্বারা রচিত বীরত্বগাঁথা। যেমন, গাজী-কালু-চম্পাবতীর পুঁথি। এসব ছিল নিজস্ব সৃষ্টি। তবে অনেক ক্ষেত্রেই হিন্দু বা বৌদ্ধ লোককাহিনির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। ফলে এসবে অনেক অসঙ্গতিও পরিলক্ষিত হতো। কেননা তারা এসব লিখত হিন্দু মিথকে বিপরীতে রেখে। আহমদ ছফা বিষয়টির সমালোচনা করে বলেন, ‘হিন্দু সমাজের বীরেরা যদি পাতাল বিজয় করে বহাল তবিয়তে ফিরে আসতে পারেন, আমির হামজা দৈত্যের দেশে গমন করে তাদের শায়েস্তা করে আসতে পারবেন না কেন? হিন্দুদের দেবতা শ্রীকৃষ্ণ যদি বৃন্দাবনে ষোলশত গোপীবালা নিয়ে লীলা করতে পারেন, মুহম্মদ হানিফার কি এতোই দুর্বল হাওয়া উচিত যে মাত্র একটা ব্রাহ্মণ-কন্যাকে সামলাতে পারবেন না?’ আহমদ ছফা তাঁর লেখায় বলতে চেয়েছেন—মুসলমানরা তাঁদের গৌরবগাঁথা লিখতে গিয়ে অনেক হিন্দু চরিত্র বা ঘটনাকেও আরব ভূ-খণ্ডে পৌঁছে দিয়েছেন। যা নিতান্তই অসচেতনতা।
যেহেতু এসব পুঁথির অধিকাংশই লেখা হতো অল্পশিক্ষিত কিংবা ইতিহাসের জ্ঞান না-জানা মানুষদের হাতে ফলে কিছুটা অসংগতি থেকেই যেত। পুঁথির বিখ্যাত দুটি বাক্য এখনো প্রচলিত আছে অসংগতির উদাহারণ হিসেবে। ক. লাখে লাখে সৈন্য মরে কাতারে কাতার/শুমার করিয়া দেখি, পঞ্চাশ হাজার। খ. ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল।
অধিকাংশ পুঁথিরই একটা ঐতিহাসিক ভিত্তি ছিল। যা থেকে ডালপালা গজিয়ে, সরস অত্যুক্তির সাথে তা আখ্যান হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করত।
প্রথমদিকে পুঁথি ছিল হাতের লেখা এবং হাতেই কপি করা হতো। ছাপাখানা আসার অনেক পরে পুঁথিসাহিত্য ছাপার অক্ষরে আসে। কাজেই, এসব লেখা হতো বাংলা হরফে, কখনো আরবিতে আবার কখনো ফার্সি খতে।
সিলেটি নাগরি ভাষা ও হরফে প্রচুর পরিমাণে পুঁথি লেখা হয়েছে। এসব পুঁথিতে মুসলমানদের যুদ্ধ-বিজয়, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের জীবনী, কারবালার শহীদদের কথা বর্ণিত হয়েছে। নাগরী লিপির সবচেয়ে জনপ্রিয় পুঁথি-কেতাব ‘হালতুন্নবী’। মুন্সী সাদেক আলী প্রণীত এ পুঁথিটি ১৮৬০ সালে মুদ্রিত হয়। এটির প্রকাশক ছিলেন নাগরী লিপির পথিকৃৎ প্রকাশক মুন্সী আবদুল করিম। ‘হালতুন্নবী’ নামের বিখ্যাত পুঁথিটি অতি সম্প্রতি অনূদিত ও মুদ্রিত হয়েছে আধুনিক অবয়বে।
বাংলাসাহিত্যের ইতিহাসকে পুঁথি ছাড়া কল্পনা করা অসম্ভব। কেবল বাংলা সাহিত্য না, বাঙালিদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাথেও পুঁথির সম্পর্ক ওতপ্রোতোভাবে জড়িত। এখনো পুঁথি নিয়ে অনেক কিছুই অজানা, বহু পুঁথি অনাবিষ্কৃত। বিলুপ্ত এ লোক-সাহিত্যের ধারাটিকে নিয়ে কাজ করার জন্য পুঁথি সাধক আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদের মতো আরও অনেককেই এগিয়ে আসা দরকার।
লেখক : তরুণ কথাসাহিত্যিক ও গল্পকার
সেপ্টেম্বর 2019

