আমার বই পড়া

সংখ্যা:

প্রতিদিন সকালে আমি নিয়ম করে বই পড়ি। সপ্তাহে পাঁচদিন কাতারে আমার সরকারি কর্মদিবস শুরু হয় ভোর ছয়টায়। আমি হাজির হই পৌনে ছয়টায়। এরপর সামনে চা পরিবেশিত হয়, চায়ে চুমুক দেওয়ার আগে কম্পিউটারে বই পড়তে শুরু করি। খুব সকালে চায়ের কাপে চুমুক আর সামনে থাকা ডেস্কটপ মনিটরের বেশ বড় স্ক্রিনে বাংলা বই পড়া—এই দুয়ে মিলে যে আনন্দ অনুভূত হয়, তা শুক্র ও শনিবারের ঘুমে ডোবা সকালের চেয়েও বেশি আনন্দময়।

আমাদের সরকারি কম্পিউটারে সব ধরনের সংযোগ বন্ধ করা থাকে। পেনড্রাইভ, সিডি, ইন্টারনেট—নিরাপত্তার খাতিরে সব অচল করা। তারপরও একদিন এক ‘টেকনিশিয়ান’কে পেয়ে হাতে পায়ে ধরে আমার একগাদা পিডিএফ ফাইল কম্পিউটারে স্থানান্তর করিয়ে নিয়েছিলাম, তখন থেকে প্রতিদিন সকালে এই শ শ পিডিএফ থেকে আমার বই পড়ার আনন্দময় সকালের শুরু।

আমি কী পড়ি? এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় কিংবা অল্প কথায় দেওয়া সহজ নয়, সম্ভব নয়, উচিতও নয়। তবে বাংলাভাষায় সাধারণ ধারার অন্তত দুজন লেখকের বই আমি পড়ে বারবার বিমোহিত ও আনন্দিত হই। সৈয়দ মুজতবা আলী এবং হুমায়ুন আহমেদ। অন্য কোনো লেখকের লেখা পড়ে আমি এমন গভীর আনন্দে আপ্লুত হইনি। প্রতিদিন সকালে তাই এ দুজনের সঙ্গে আমার সকাল শুরু হয় এই সময়ে। মাঝে মাঝে আরব লেখকদের লেখাও পড়ি, তবে সেগুলো বলবার ইচ্ছা আপাতত নেই। বাংলাভাষায় বেশ কয়েকজন লেখক আছেন, যাদের সবগুলো বই আমি পড়েছি। কিন্তু বড়াই করে তাদের নামও বলার মতো ইচ্ছা নেই।

আরও প্রায় এক দশক আগে, আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে যে বইটি পড়েছিলাম, সেটি ছিল সংগ্রামী সাধকদের ইতিহাস। ভারতের প্রখ্যাত পন্ডিত সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদভির লেখা ‘তারিখে দাওয়াত ও আযিমত’ বইয়ের অনুবাদ ছিল সেটি। কয়েক খন্ডে প্রকাশিত এই বইটি আমার খুব প্রিয় ছিল। আমি একাধিকবার তা পড়েছি, চেনাজানা প্রিয়জনদেরকে পড়তে বলেছি এবং এখনও বলি।

এরও আগে আমার ভালো লেগেছিল ‘আলোর মিছিল’ নামে প্রকাশিত একটি বই। এটি ছিল আব্দুর রহমান রাফাত পাশার ‘ছুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবাহ’ বইয়ের অনুবাদ। তবে আলোর মিছিলের প্রথম দু খন্ড যেভাবে আমাকে মুগ্ধ করেছিল, পরের খন্ডগুলো সেরকম আর ভালো লাগেনি।

কৈশোর ও তারুণ্যের যে বয়সে আমার আশেপাশের অন্যরা যখন খেলাধুলা, প্রেম-ভালোবাসা কিংবা তৃতীয় কোনো নেশায় বিভোর, আমি তখন ডুবে ছিলাম বইয়ের রাজ্যে। আমার ফেলে আসা দিনগুলোয় এটি এক পরম অর্জন। ভারত-পাকিস্তানের সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদভি, মুফতি তকি উসমানি থেকে শুরু করে বাংলার কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ, শামসুল হক ফরিদপুরীসহ ইসলামি এবং সাধারণ ধারার প্রচুর লেখকের বই আমি প্রায় সবটুকু পড়েছি। আমার জানাশোনার জগতকে সমৃদ্ধ করতে এই লেখকদের প্রতি আমার তাই কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। সে সময় ইন্টারনেট-ফেসবুকের এই নেশাকর ছড়াছড়ি ছিল না, সেজন্য আমি মহান দয়াময়ের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। থাকলে এই এত এত বই আমার পড়া হতো কি-না, বলা যায় না।

বই পড়ার নিমগ্নতা দেখেছি, এমন দুজনের কথা আমার মনে পড়ে। একজন আমার সহপাঠী ও বন্ধু জাবের, সম্বোধনের ভাষায় ‘জাবের ভাই’। এখন সে সুদূর জাপানে। আমাকে উপহার হিসেবে দেওয়া তাঁর বইগুলো আমাকে বইপড়ার জগতে অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছে, এই ঋণ স্বীকারে লজ্জা নেই, বরং গৌরব অনুভব করি। শৈশব থেকে তাকে দেখেছি বইয়ের পাতায় ডুবে থাকতে। মাসুদ রানা থেকে শুরু করে কত রকমের বই যে তাঁর পড়া, সেটা বলে শেষ করা যাবে না।

আরেকজন ব্যক্তিত্ব হলেন মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ.। বইয়ের এমন মনোযোগী ও নিবেদিতপ্রাণ পাঠক আমি এই জীবনে আর দেখবো বলে মনে হয় না। তাঁর দিবস ও রজনী ছিল বই নিয়ে। ঘরে বাইরে বই ছিল তাঁর একমাত্র নিত্যসঙ্গী। চেয়ার-টেবিলে বা গাড়ির আসনে, বই হাতে তাঁর নিমগ্নতার সেই মধুর ছবি এখনো আমার চোখে চোখে ভাসে।

বই পড়ার জন্য আমি অনেককে উৎসাহ দিয়েছি। বই কিনে উপহার হিসেবে দিয়েছি, নিজের পক্ষ থেকে ধারও দিয়েছি, চেয়েছি বইয়ের মাদকতায় আটকে দিতে। কিন্তু কখনো সফল হয়েছি, কখনো ব্যর্থ। খুব সম্প্রতি যাদের কথা এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে, তাদের মধ্যে রানা উল্লেখযোগ্য। এখন সে নিয়মিত বই পড়ে, তাঁর মুখে নানা বইয়ের গল্প শুনতে আমারও ভালো লাগে।

আমার বন্ধুদের মধ্যে শাকিল এককালে বেশ বই পড়ত, এখন আগের মতো পড়ে কি-না, তা নিয়ে আমি সন্দিহান। তবুও প্রতিবার দেশে গেলে শাকিলের বাসা থেকে দুয়েকটি বই আমি নিয়ে কাতারে চলে আসি। ফলে সেগুলো ফেরত দেওয়ার সুযোগ আর হয়ে ওঠে না। পরেরবার দেশে গিয়ে আমি খুঁজে দেখি, আমার নিয়ে আসা বইগুলোর খালি জায়গায় সে নতুন কোনো বই কিনে রেখেছে কি-না। কখনো পাই, কখনো না।

গত দু বছরে মাস্টার্সের পড়ালেখা থাকায় প্রচুর একাডেমিক বই পড়তে হয়েছে। এসবের মধ্যে নানা ধর্মের ধর্মতত্ত্ব ছিল প্রধান বিষয়। এই ধর্মতত্ত্বের বই খুঁজতে গিয়ে চোখে পড়েছে আরও অনেক অনেক বিষয়ের চমৎকার বই। সেগুলোর কিছু কিছু তখনই পড়েছি, বাকিগুলো এখন পড়ছি। আবার নবপ্রকাশের জন্য বই বাছাই করতে গিয়েও অনেক বই পড়তে হয়, এটিও আমার জন্য আনন্দদায়ক। কারণে-অকারণে কিংবা সময়ে-অসময়ে বই নিয়ে কেটে যাক আমার এই জীবন, এতে আমার হারানোর কিছু নেই। একজন মানুষের জীবনে বই পড়তে পারার চেয়ে বড় প্রাপ্তি ও প্রশান্তি আর কী হতে পারে!

লেখাটি শেষ করার আগে অতীতকালে মনীষীদের বই পড়া ও বই নিয়ে তাদের অভিজ্ঞতার কিছু কথা তুলে ধরছি। ইবনে শিহাব জুহরি ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম। বইপত্রের প্রতি তার আসক্তি ছিল প্রবাদতুল্য। সারাক্ষণ বই পড়ায় ডুবে থাকতেন তিনি। মাঝেমধ্যে ভুলে যেতেন সংসার-দুনিয়ার কথা। তার স্ত্রী প্রায়ই বলতেন, আল্লাহর কসম, এই বইপত্র আমার কাছে তিন সতীনের চেয়েও অসহনীয়।

ইবনে জাওজি নিজের সম্পর্কে লিখেছেন, আমি এ পর্যন্ত প্রায় বিশ হাজার বই পড়ে শেষ করেছি, কিন্তু আমি এখনও নতুন নতুন বইয়ের সন্ধানে অস্থির হয়ে থাকি। নিজেকে আমি এখনও ছাত্র মনে করি। আমি যখন এমন কোনো নতুন বই দেখি, যা আমি আগে দেখিনি, মনে হয় আমি অমূল্য রত্নভান্ডার পেয়েছি।

ইমাম ইবনে তাইমিয়ার নাম জানে না, এমন জ্ঞানী মানুষ হয়তো হাতেগোনা। তার বাবা যখন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে শৌচাগারে যেতেন, তখন তার ছেলে কিংবা নাতিদের কাউকে ডেকে বলতেন, তুমি অমুক বইটির পাতা থেকে জোরে জোরে পড়ো, আমি শৌচাগারে বসে শুনছি।

কেউ একজন হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারককে এসে বললো, আপনি এত দীর্ঘ সময় বাড়িতে একা একা বসে থেকে কী করেন? তার চেয়ে বরং আমাদের সঙ্গে বসুন, সময় দিন। ইবনে মুবারক বললেন, কোথায় একা! আমি তো রাসুল সা. এবং তাঁর সম্মানিত সাহাবিগণের সঙ্গে সময় কাটাই। আর তোমরা তো এখানে বসে বসে মানুষের গিবত বলে বলে সময় পার করো।’ তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, আমার ঘরে যে হাদিসের বইপত্র আছে, আমি সেসব অধ্যয়নে ডুবে থাকি। যেহেতু এগুলো হাদিসের অধ্যয়ন, আমি তখন নিজেকে নবী সা. এবং সাহাবিদের সান্নিধ্যে মনে করি।

হাসান আললুলুই নিজের প্রসঙ্গে বলেছেন, গত চল্লিশ বছর ধরে আমি যখন ঘুমিয়েছি কিংবা ঘুম থেকে জেগে উঠেছি, আমার বুকে তখনও বই রাখা ছিল। আমি পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যেতাম, ঘুম ভেঙে গেলে আবার পড়া শুরু করতাম। বই হাতে নেই অথচ আমি ঘুমিয়ে পড়েছি—গত চল্লিশ বছরে এমন ঘটেনি আমার বেলায়।

প্রসিদ্ধ আলেম ফিরোজাবাদী তার জীবনে বইপত্র কেনার জন্য যে অর্থ ব্যয় করেছিলেন, তার পরিমাণ ছিল পঞ্চাশ হাজার মিসকাল স্বর্ণমুদ্রা। তিনি যেখানে যেতেন, সঙ্গে বইয়ের সুবিশাল স্তুপ নিয়ে যেতেন।

 

আগস্ট 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১