ভারতের দীর্ঘকালব্যাপী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সময়ে সময়ে নানা রকমের প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তুলেছে কাশ্মীরি মুসলমানেরা। ৪৭-এর পর থেকে ভারতীয় দখলদারির মুকাবেলায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে তারা মুখ্য হিসেবে বিবেচনা করে এর প্রতি গুরুত্বারোপ করলেও দীর্ঘ দিন এ পন্থায় সংগ্রাম অব্যাহত রেখে ভারতীয় চক্রান্ত ও নাটকীয়তার কাছে তাদের হার মানতে হয়েছে। স্বায়ত্তশাসনের বিধান থাকলেও পাতানো ও ব্যাপক কারচুপিমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে দিল্লি বারবার জম্মু-কাশ্মীরের সর্বময় ক্ষমতা নিজেদের আজ্ঞাবহ লোকদের হাতেই রেখেছে। তাই ইসরায়েলি আগ্রাসনের মুকাবেলায় ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ আন্দোলন ‘ইন্তিফাদা’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কাশ্মীরের জনগণ ১৯৮৯ সালে ব্যাপকভাবে প্রতিরোধ আন্দোলনে নামে।
আর এ প্রতিরোধেই তাদেরকে সময়ে সময়ে অসংখ্য প্রাণ ও রক্ত বিসর্জন দিতে হয়েছে। নির্মমভাবে ধর্ষিতা হতে হয়েছে কাশ্মীরী নারীদের।
১৯৯০ সালের ১৯ জানুয়ারি কাশ্মীরিদের ইন্তেফাদা দমানোর লক্ষ্যে চরম মুসলিম-বিদ্বেষী জগমোহনকে কাশ্মীরের নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয় দিল্লি। জগমোহন তাঁর নিয়োগের দিন রাতেই কাশ্মীরে জঙ্গি-বিরোধী অভিযানের নামে সামরিক বাহিনী দিয়ে সাঁড়াশি তল্লাশি চালান। এতে গ্রেপ্তার করা হয় প্রায় ৩০০ কাশ্মীরিকে। ফলে পরদিন দিনের বেলায় জগমোহনকে যখন গভর্নরের শপথবাক্য পাঠ করানো হচ্ছিল, নিরস্ত্র কাশ্মীরিরা কারফিউ অমান্য করে প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভকারীরা যখন ঝিলাম নদীর উপরে অবস্থিত গাওয়াকাদাল ব্রিজের উপর দিয়ে যাচ্ছিলেন, ভারতীয় প্যারামিলিটারি বাহিনী ব্রিজের উভয় পারে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালায়। বেশিরভাগ বিক্ষোভকারী গুলির আঘাতে শাহাদাতবরণ করেন, কেউ কেউ গুলি থেকে বাঁচতে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডুবে শহিদ হন। এই ঘটনায় ১০০-এর উপর কাশ্মীরি শাহাদাতবরণ করেন।
প্রতিরোধ সংগ্রামে ভারতীয় বাহিনীদের হাতে এমন আরও কত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কাশ্মীরিরা, তার হিসেব হয়তো কারও কাছেই নেই। কুখ্যাত কয়েকটি নির্মমতার ঘটনা নিম্নে তুলে ধরা হলো।
যাকুরা ও টেংপোরা হত্যাকান্ড : বিক্ষোভকারীরা কাশ্মীরের স্বাধীনতা প্রশ্নে জাতিসংঘের রেজুলেশন অনুযায়ী গণভোটের আয়োজনের দাবিতে ১৯৯০-এর পহেলা মার্চ যাকুরা শ্রীনগরের ক্রসিং ও টেংপোরা বাইপাস রোডে জমায়েত হলে ভারতীয় হানাদার বাহিনী তাদের উপর গুলি চালায়। এতে ৩৩ জন নিহত ও ৪৭ জন আহত হন।
কুনান পুশপুরা গণধর্ষণ : ১৯৯১-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে ভারতীয় হানাদার বাহিনী কাশ্মীরের কুপওয়ারা জেলার কুনান পুশপুরা গ্রামে তল্লাশি চালায়। গ্রামের পুরুষদের এক জায়গায় জড়ো করে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘরে ঘরে ঢুকে মহিলাদের গণধর্ষণ করে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, ১০০-এর উপর মহিলা সেদিন নির্মম ধর্ষণ-যজ্ঞের শিকার হন।
লাল চৌক অগ্নিকাণ্ড : জনগণ কর্তৃক বিএসএফের কিছু পরিত্যক্ত দালান জ্বালিয়ে দেওয়ার প্রতিশোধ স্বরূপ বিএসএফ শ্রীনগরের লাল চৌকে জনবসতিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। মানুষ পালাতে যাওয়ার সময় বিএসএফ গুলি চালায়। ফলে ১২৫ জন নিরীহ মানুষ নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন।
বিজবেহারা হত্যাকাণ্ড : ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক হযরতবাল মসজিদ অবরোধের প্রতিবাদে ১৯৯৩-এর ২২ অক্টোবর বিজবেহারাতে আয়োজিত বিক্ষোভে বিএসএফের ৭৪ নং ব্যাটেলিয়ন গুলি চালায়। এতে ৫১ জন নিহত এবং ২০০ জন আহত হন।
সোপুর হত্যাকান্ড : কাশ্মীরের বারোমোল্লা জেলার সোপুর থানায় বিএসএফ ও জম্মু-কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্টের যোদ্ধাদের মধ্যে গোলাগুলির সময় বিএসএফ আশেপাশে বিভিন্ন ভবনে আগুন ধরিয়ে, যানবাহনে হামলা চালিয়ে এবং নিরস্ত্র মানুষের উপর গুলি চালিয়ে প্রায় ৫৫ জন নিরস্ত্র কাশ্মীরিকে হত্যা করে।
বান্দীপোড়া হত্যাকান্ড : ১৯৯৩ সালের ২৭ অক্টোবরে বান্দীপোড়ায় কালো দিবস পালন করার সময় গুলি করে ১৯জন কাশ্মীরিকে শহিদ করা হয়।
২০০৪ থেকে ২০০৭ সাল—এই সময়টায় নানা প্রতিবন্ধকতায় কাশ্মীরিদের প্রতিরোধ-সংগ্রাম খানিকটা ঝিমিয়ে পড়লেও ২০০৮ সালে আবার তা পূর্ণ উদ্যমে জেগে ওঠে। কাশ্মীরের প্রায় একশত একর জমি অমরনাথ তীর্থস্থান বোর্ডকে (যেটি কাশ্মীরে অমরনাথ তীর্থস্থানের দেখভালের জন্য নিয়োজিত ছিল) দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কাশ্মীরি মুসলিমরা ব্যাপারটিকে জম্মু-কাশ্মীরের বাইরে থেকে হিন্দু এনে কাশ্মীরের মধ্যে হিন্দু জনবসতি গড়ে ইসরায়েলি কায়দায় কাশ্মীরের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ডেমোগ্রাফি পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখতে থাকে এবং এর প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এ উপলক্ষে কাশ্মীরের সবচেয়ে বড় জনসভায় প্রায় ৫ লাখ মানুষ জড়ো হয়, যা কাশ্মীরের ইতিহাসে ছিল সর্ববৃহৎ জনসমাবেশ। এ সময় বিভিন্ন জায়গায় ভারতীয় হানাদার বাহিনীর হাতে ৬০ জন কাশ্মীরি গুলিবিদ্ধ হন।
২০১০ সালে ভারতীয় হানাদার বাহিনী বারোমোল্লা জেলার নাদিহাল গ্রাম থেকে তিনজন যুবককে উঠিয়ে নিয়ে যায় এবং পরে সাজানো অ্যানকাউন্টারে হত্যা করে। পরে এ তিনজনকে পাকিস্তান থেকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। এ হত্যাকাণ্ড কাশ্মীরে আবারও গণবিক্ষোভের সূচনা করে। এবারের গণবিক্ষোভে প্রায় ১২০ জন কাশ্মীরি বিক্ষোভকারীকে হত্যা করে ভারতীয় হানাদার বাহিনী।
২০১৬ সালে কাশ্মীরের তরুণ মুক্তিযোদ্ধা হিজবুল মুজাহিদীন কমান্ডার বুরহান ওয়ানি তাঁর দুজন সঙ্গীসহ ত্রালে ভারতীয় হানাদার বাহিনীর হাতে গোলাগুলি বিনিময়ের সময় শাহাদাত বরণ করেন। বুরহান ওয়ানি তাঁর তারুণ্য, সাহস এবং বীরত্বের জন্য শাহাদাতের আগেই কাশ্মীরের ঘরে ঘরে উচ্চারিত একটি নাম হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর শাহাদাত কাশ্মীরে নজিরবিহীন বিক্ষোভ উস্কে দেয়। শুধুমাত্র তাঁর জানাযাতেই কাশ্মীরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ২ লক্ষ লোকের সমাগম ঘটে।
২০১৬-এর শেষের দিকে শুরু হওয়া গণজাগরণ ও বিক্ষোভ ছিল কাশ্মীরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণজাগরণ এবং এর উপর ভারতীয় হানাদার বাহিনীর চালানো দমন-নিপীড়নও ছিল নজিরবিহীন। ১০০-এরও বেশি বিক্ষোভকারী নিরাপত্তাবাহিনীর হাতে শহিদ হন আর আহত হন ১৫ হাজারেরও বেশি। এই গণজাগরণের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, বিক্ষোভ দমনে হানাদার বাহিনী পেলেট বন্দুক ব্যবহার করে। পেলেট গান হচ্ছে শটগানের মতই, যা থেকে গুচ্ছাকারে ধাতব শার্পনেল নিক্ষেপ করা হয়। হাজার হাজার বিক্ষোভকারী পেলেটবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত হয়েছেন, যাদের অনেককেই পরবর্তী সময়ে স্থায়ী চেহারা বিকৃতি এবং অন্ধত্ব বরণ করে নিতে হয়েছে।
কিন্তু এত কিছুর পরও কাশ্মীরিদের প্রতিরোধ-সংগ্রাম থেমে নেই। বরং দিনদিন তাঁরা আরও গোছালো, আরও পরিপক্ক হয়ে উঠছেন ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। একসময় আদর্শিক মতানৈক্য এসব সংগ্রামীর মধ্যে বিভেদ ছড়িয়ে দিলেও বর্তমানে সেটা আর নেই। তরুণ প্রজন্মের সংগ্রামী যাঁরাই এ পথ বেছে নিচ্ছেন, ইসলামকে নিজেদের অনুপ্রেরণায় জায়গায় রাখছেন, এবং মতাদর্শ হিসেবে ইসলামকে অবলম্বন করে লড়ে যাচ্ছেন ইতিহাসের অসম এক লড়াই। যে লড়াই থেকে অনেক কিছুই শেখার আছে আজকের পৃথিবীর।
জানুয়ারি 2020

