একদল নক্ষত্রের খোঁজে

সংখ্যা:

 

ধরুন, আপনি কোনোভাবে এ দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে গেলেন। মন্ত্রী হওয়ার পর আপনার দৃঢ় প্রত্যয়—যে কোনোভাবে হোক আপনি রাষ্ট্রীয় সকল দপ্তর থেকে দুর্নীতি দূর করবেন। তাহলে প্রথমে আপনাকে মন্ত্রণালয়ের সকল সচিব থেকে পিয়ন পর্যন্ত সবাইকে নৈতিকভাবে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। এরপর আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিটি সদস্য, দেশের প্রতিটি থানা, আইন প্রয়োগকারী অন্যান্য সংস্থা, যেমন মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, সড়ক-নৌ-রেল বিভাগ, উপজেলার প্রতিটি সরকারি দপ্তর, স্থানীয় সরকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিটি সরকারি দপ্তর থেকে তুলনামূলক দুর্নীতি দূর করতে হবে।

কিন্তু সেটা নিশ্চিত করা কি সম্ভব? স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখলে সম্ভব না। কারণ দুর্নীতি, অনৈতিকতা এবং অসদুপায় আমাদের সমাজে একটা ‘সিস্টেমে’ পরিণত হয়েছে, একটা আবশ্যিক অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। আপনি যদি এই সিস্টেম শুদ্ধ করতে চান তাহলে অনৈতিক আচরণের পুরো সিস্টেমটাই ভেঙে ফেলতে হবে। নইলে আপনি দেখবেন, সচিবগণ ঠিকই শতভাগ নৈতিকতার সঙ্গে তাদের সরকারি আদেশ প্রণয়ন করছেন, কিন্তু জেলা বা উপজেলাভিত্তিক সরকারি অফিসে গিয়ে সে আদেশ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। কারণ, হতে পারে সেখানকার অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী আগে থেকেই দুর্নীতিতে আকণ্ঠ ডুবে আছে। পুলিশের হেডকোয়ার্টার থেকে দুর্নীতিগ্রস্ত লোকদের গ্রেফতারের আদেশ গেল, কিন্তু দেশব্যাপী শত শত থানার পুলিশ সদস্যরা সে আদেশ অনুযায়ী কাজ করল না, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লোকজন মাদক নির্মূলের নামে তাদের কাজে গাফলতি করল, ইউনিয়ন পর্যায়ের সরকারি কর্মচারীগণ জনগণের জন্য বরাদ্দ অর্থ বা সম্পদ লোপাট করে নিল। সুতরাং ফলাফল কিন্তু সেই শূন্য। কারণ, সরকার এবং জনগণ—সবার মাঝে দুর্নীতি এবং অনৈতিকতা একটা শক্ত সিস্টেমে রূপলাভ করেছে। এক শত, এক হাজার, এক লাখ মানুষকে যদি শুদ্ধ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তবু কিন্তু এই সিস্টেম ভাঙবে না; আপনাকে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রত্যেক সদস্যের মনে নৈতিকতার প্রয়োজনীয়তা জাগ্রত করতে হবে।

অনৈতিকতার এই আবশ্যিক সিস্টেমটা দেখতে কেমন, তার একটা উদাহরণ দেখুন। ধরুন, স্নাতক পাশ একজন চাকরিপ্রত্যাশী যুবক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য নিয়োগ পরীক্ষা দিলেন। পরীক্ষা দেয়ার পর তার প্রথম কাজ কী হয় জানেন? সে এই পদে চাকরি নিশ্চিত করতে একজন ‘দালালের’ খোঁজ করতে থাকে, যে টাকার বিনিময়ে তাকে চাকরির নিশ্চয়তা দেবে। এই টাকার পরিমাণ তিন থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। বেশিও হতে পারে। বর্তমানে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের বাজারমূল্য কেমন চলছে সে ব্যাপারে আমার ধারণা নেই।

যা হোক, এটা সারাদেশের চিত্র এবং সকল সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। দু-একটা চাকরি টাকার বিনিময় ছাড়া হতে পারে কিন্তু সমাজ বাস্তবতা হলো, উপরমহলে টাকা বা ঘুষ ছাড়া সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা কেউ করে না। এই যে ‘কেউ আশা করে না’, এটাই হলো সিস্টেম; যেটা সমাজে স্বতঃসিদ্ধভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সমাজে যেটা স্বাভাবিক প্রচলন হয়ে যায় সেটা তখন একটা সিস্টেমে রূপলাভ করে। এ কারণে এখন সদ্য সরকারি চাকুরিপ্রাপ্ত কেউ এসে যদি আপনাকে বলে, তিনি ঘুষ বা দালাল ছাড়া চাকরিতে নিয়োগ পেয়েছেন তাহলে আপনি তার কথা বিশ্বাস করবেন না। ভাববেন, তিনি নিশ্চয় মিথ্যাকথা বলছেন। এই যে আপনার অবিশ্বাস, এটা এজন্য হয়েছে যে সমাজে ঘুষ এবং দালালের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, এটা একটা আবশ্যিক সিস্টেমে পরিণত হয়ে গেছে। এই সিস্টেমের ব্যাত্যয় হলে আপনার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, আপনি সেই সত্যকে অবিশ্বাস করছেন। এটাই অবধারিত সিস্টেম। বছরের পর বছর ধরে চলতে চলতে আমাদের সমাজে এই অনৈতিকতা ও দুর্নীতি একটা স্বাভাবিক সিস্টেমে পরিণত হয়েছে। ফলে এটাকে ভাঙা সুকঠিন এক বাস্তবতা।

এখানে আমি মাত্র এক ধরনের অনৈতিকতার উদাহরণ দিলাম। কিন্তু অনৈতিকতার এমন আরও শত শত পন্থা রয়েছে যেগুলোর মাধ্যমে আমাদের দেশে দুর্নীতি হচ্ছে, অস্বীকারের উপায় নেই।

দুর্নীতি পৃথিবীর সব দেশেই হয়। কিন্তু দেশভেদে সেটার মাত্রার কম-বেশ আছে। আমাদের দেশের মতো সেটা যখন সমাজের স্বাভাবিক সিস্টেমে পরিণত হয়ে যায় তখন সেটাকে সুস্থ দেশ বলা যায় না। তখন দেশ নিয়ে আপনাকে চিন্তা করতে হবে, দুশ্চিন্তা করতে হবে। আপনার হাত কেটে গেলে আপনি জলদি ডাক্তারের কাছে গিয়ে ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ করে প্রয়োজনীয় ওষুধ সেবনে ব্রতী হন। দেশটা যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকে, তখন কেন আপনার টনক নড়ে না? শরীরের রোগ নিয়ে আপনি এত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, দেশের রোগ নিয়েও আপনাকে চিন্তিত হতে হবে। আপনার আমার কি উচিত নয় দেশের এই রোগ সারানোর নিরাময়ে উদ্যোগী হওয়ার?

সেটা কীভাবে সম্ভব? আসুন, আমরা দেশের রোগ নিরাময়ের সম্ভাব্য দাওয়াই নিয়ে খানিক আলাপ করি।

প্রথমে আপনাকে রোগটা নির্ণয় করতে হবে—কেন মানুষ দুর্নীতি করছে বা অনৈতিকার সঙ্গে জড়িত? আমরা যদি দেখি তাহলে খুব সহজেই বুঝতে পারব, মানুষের মাঝে আসলে নৈতিকতার কোনো দায় নেই। যারা দুর্নীতি করে থাকেন, অসদুপায় অবলম্বন করেন, অনৈতিকভাবে মানুষের হক নষ্ট করছেন যারা—তাদের ভেতরে না আছে মনুষ্যত্ববোধ, দেশপ্রেম আর না আছে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ভয়। একজন সত্যিকারের মনুষ্যত্বসম্পন্ন মানুষ কখনোই আরেকজনের হকের টাকা অন্যায়ভাবে ভোগ করতে পারেন না। একজন দেশপ্রেমিক মানুষ কোনোভাবেই দেশের সাধারণ জনগণের হকের টাকা মেরে নিজে সম্পদের কুমির হতে পারেন না। পরকালে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ভয় যার আছে তিনি কোনোদিনই অপরের সম্পদ গ্রাস করতে পারেন না।

সুতরাং প্রথম কাজ হলো, মানুষের মনে নৈতিকতাবোধ জাগ্রত করা। কিন্তু এটা যত সহজেই বলা যাচ্ছে বাস্তবায়ন তত সহজ নয়। আপনি আজকে চাইলে আজকেই সারা বাংলাদেশের মানুষের মনে নৈতিকতার প্রয়োজনীয়তা জাগ্রত করতে পারবেন না। একদিনের ওয়াজে সবাই সুফি-দরবেশ হয়ে যাবে না। এটা একটা শক্ত সিস্টেমে পরিণত হয়েছে। সমাজের কোটি কোটি মানুষ এই সিস্টেমের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত হয়ে গেছে। বাজারের মাছবিক্রেতা মাছে ফরমালিন মেশাচ্ছেন, আবার মন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের টাকার অর্ধেক লোপাট করে দিচ্ছেন। কৃষক ভালো বেগুন বলে পোকা বেগুন বিক্রি করছেন, আবার উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা ভুয়া বরাদ্দ দেখিয়ে পকেটে পুরছেন লাখ লাখ টাকা। পুরো সমাজ অনৈতিকতার ছড়ানো জালে বন্দী। ক্ষুদ্র থেকে শুরু করে আজদাহা আকারের দুর্নীতিতে আমরা সবাই জড়িয়ে গেছি।

এই সিস্টেম যেমন শক্তভাবে আমাদের সমাজে গেঁথে গেছে, যত গভীরে এর শিকড় প্রোথিত হয়েছে, ঠিক তত কঠিনভাবে এর চিকিৎসা করতে হবে; এর চিকিৎসাও তত দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল হবে। এক দিনেই বা এক বছরে আপনি এটাকে নির্মূল করতে পারবেন না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ প্রচেষ্টা এবং সঠিক লক্ষ্য।

নৈতিকতার প্রধান দুটি মাধ্যম হলো পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আপনার ছেলেকে নৈতিকভাবে শতভাগ খাঁটি বানাতে চান, অথচ আপনি নিজেই মিথ্যাকথা বলেন কিংবা রাষ্ট্রীয় কর প্রদান করেন না অথবা ময়লা ডাস্টবিনে না ফেলে রাস্তার পাশে ফেলেন; তাহলে আপনার সন্তান কোনোদিন নৈতিকতার মানদণ্ড বিচার করতে পারবে না। পরিবার আমাদের সবার প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র। একজন গোয়ালিনীর সন্তান যদি তার মাকে দেখে যে তার মা দুধে পানি মিশিয়ে বিক্রি করছে, ওই সন্তান পরিবার থেকে দুর্নীতির সবক নিয়ে নিল। দোকানদারের ছেলে যদি দেখে তার বাবা মিনিকেট চাল বলে ইরি ধানের চাল বিক্রি করছে, ধরে নিতে পারেন এই ছেলে বড় হলে নৈতিকতার তোয়াক্কা করবে না। ভাই যদি বোনকে দেখে সে মোবাইলে হামেশা মিথ্যাকথা বলছে, ওই ভাই কখনো সত্যবাদী হবে না। এ কারণে পরিবারের প্রত্যেক সদস্য একজন অপরজনের শিক্ষক হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকেন। মা-বাবা যদি সন্তানকে মিথ্যা বলার জন্য কখনো শাস্তি না দেন, অন্যায় আচরণের কারণে শাসন না করেন তাহলে সে কখনো মনুষ্যত্ববোধ শিখবে না। তাকে যদি পরিবার থেকে ধর্মের প্রতি অনুরাগী না করা হয় সে কখনোই নৈতিকতার গুরুত্ব শিখবে না।

সবচে জরুরি কাজটা হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। বাংলাদেশের কোনো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-মাদরাসা নিশ্চয়তা দেয় না যে তাদের শিক্ষার্থীরা নৈতিকভাবে খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজের মতো দৃঢ়পদ হবে। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কেবল কেতাবি বিদ্যা শেখানোর দিকে যতটা আগ্রহী, নৈতিক ও চারিত্রিক উৎকর্ষে উদ্ভাসিত মানুষ তৈরিতে ততটা আগ্রহী নয়। অথচ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিজন শিক্ষক তাদের শিক্ষার্থীদের সামনে একেকজন মহামানব, তারা তাদের জীবনের আইডল হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন। এখন এই শিক্ষকগণই যদি ছোট-বড় নানা অনৈতিকতার সঙ্গে জড়িত থাকেন কিংবা চারিত্রিকভাবে ত্রুটিগ্রস্ত হন, তাহলে সারা জীবন আপনি দেশপ্রেম আর ধর্মের বাণী শুনিয়েও মন্ত্রী থেকে শুরু করে পিয়নকে দুর্নীতিমুক্ত করতে পারবেন না।

সেটা না হলে আপনি দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করবেন কীভাবে? যে ছেলেটা পাঁচ-দশ লাখ টাকা অনৈতিক ঘুষ দিয়ে পুলিশের চাকরিতে নিয়োগ পেল, তার কাছ থেকে কীভাবে আপনি ঈমানদারিত্বের সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের আশা করতে পারেন? কিন্তু একজন শিক্ষক যদি তাকে শিক্ষাকালীন বলে দিতেন, কখনো ঘুষ যেমন দেবে না তেমনি অনৈতিকভাবে কারো সম্পদ হস্তগত করবে না, সেই তৃতীয় শ্রেণি থেকে প্রত্যেকজন শিক্ষার্থীকে যদি নৈতিকতার প্রতি কঠোর শিক্ষা দেয়া হয় তাহলে এই শিক্ষার্থী নৈতিকভাবে অনেকটাই বিপদমুক্ত থাকবে বলে আশা করা যায়।

বিদ্যালয় মানুষ গড়ার কারখানা। এখান থেকেই নির্ধারিত হয় একজন ছাত্র কীভাবে তার পরবর্তী জীবন পরিচালনা করবে। একজন শিক্ষক হলেন সেই কারখানার নিপুণ কারিগর। তিনি একজন কুমোরের মতো, নিজ হাতে মাটির কলস যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে সেটার অবয়ব নির্মাণ করতে পারেন। একজন ছাত্র ঠিক সেই মাটির কলসের মতো, এই কারিগরের হাতে তার ভাগ্য নির্মিত হচ্ছে। এ বিষয়টি একজন শিক্ষককে বুঝতে হবে। একজন শিক্ষক যদি নিজেকে কেবল পাঠ্যপুস্তক পড়ানোর মেশিন মনে করে থাকেন তাহলে বুঝতে হবে, ওই শিক্ষকের শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতায় ঘাটতি রয়ে গেছে। বড় বড় ডিগ্রি বা ভালো ফলাফলের জন্যই কেবল বিদ্যালয় নির্মাণ করা হয়নি, শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্যই হলো সেখান থেকে প্রত্যেকজন ছাত্র মনুষ্যত্ববোধসম্পন্ন সত্যিকারের মানুষ হিসেবে বের হয়ে আসবে। পাঠ্যপুস্তকের চেয়ে নৈতিক শিক্ষা আমাদের সমাজের জন্য অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।

কিন্তু সেটা কি আমাদের দেশে হচ্ছে? স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ ছাত্রদের যেভাবে এ-প্লাস অর্জনের জন্য গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, সত্যবাদিতা কিংবা নৈতিকতার জন্য কি সেভাবে প্রয়াস করেন? সবচে দুঃখের বিষয় হলো, মাদরাসার মতো ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেও দিনকে দিন নৈতিকতার শিক্ষা দূরে সরে যাচ্ছে। অথচ ইসলাম ধর্মের মূল ভিত্তিই হলো নৈতিকতা, কেতাবি বিদ্যা সেখানে মুখ্য নয়।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, এখন আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও সঠিকভাবে শিক্ষার্থীদের মাঝে নৈতিকতা শিক্ষা দিতে পারছে না। তাহলে আমরা এখন কী করব? একেবারেই হতাশ হয়ে যাব রাষ্ট্রের ভবিষ্যত বিষয়ে? কিন্তু এত সহজে হাল ছেড়ে দেয়া আমাদের জন্য উচিত হবে না। একজন মুমিন তার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আশাবাদী। আল্লাহ নিজেই বলেছেন, ‘তোমরা আমার রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ সুতরাং আমাদের হতাশ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

এমতাবস্থায় আমরা বিকল্প একটা চিন্তা করতে পারি। যেহেতু সারা দেশের সকল প্রকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একযোগে নৈতিকতার শিক্ষাদান সম্ভব নয়, নানা কারণেই। তাহলে আমাদের উচিত, আমরা নিজেরা যেসকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত আছি, নিজেরা যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান করি, সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কঠোরভাবে নৈতিকতার দিকে নজর দেয়া। সার্বিকভাবে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব থাকা প্রয়োজন যেখানকার শীক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও চরিত্র নিয়ে বাজি ধরা যাবে। সেখানে পাঠ্যপুস্তকের চেয়ে অধিক গুরুত্ব দেয়া হবে সত্যবাদিতা, সৎউপার্জন, অল্পেতুষ্টি, পরোপকার, সাহসিকতা, দেশপ্রেম, শৃংখলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠতা, ধর্মীয় সম্মান রক্ষা, সচ্চরিত্র, নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন, ব্যবহারিক জ্ঞান, পরমত সহিষ্ণুতা এবং সকল সুকুমারবৃত্তি।

ক্যাডেট কলেজগুলোতে যেমন শৃংখলা ও নিয়মানুবর্তিতার প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়ে একেকজন ক্যাডেটকে সুশৃংখল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা হয়, তেমনি এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেও নৈতিকতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পাঠদান করা হবে। এখানকার একজন শিক্ষার্থী যখন রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা বা কর্মচারী হিসেবে যোগ দেবে তখন সেখানে তার চারিত্রিক দৃঢ়তা আর সবার জন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করবে। এসব প্রতিষ্ঠানের একজন ছাত্র যখন সমাজে বাস করবে, তার সচ্চরিত্র হাজার জনকে প্রভাবিত করবে। এখানকার একেকজন শিক্ষার্থী সমাজের একেকজন উমর, আলি, উমর ইবনে আবদুল আজিজ হয়ে বিকশিত হবে। একজনকে দুর্নীতি করতে দেখে দশজন যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হতে পারে তাহলে একজনকে দেখে দশজন কেন সচ্চরিত্রবান হবে না? জমাট অন্ধকারে দশজন যদি হারিয়ে যেতে পারে, একজনের হৃদয়ের আলো কেন দশজনকে আলোকিত করবে না? যেখানে অন্ধকার, আলোর প্রয়োজন সেখানেই সবচে বেশি।

নৈতিকতা এমন একটা জরুরি বিষয়, যার সঙ্গে রাষ্ট্র থেকে শুরু করে আমাদের পরিবার ও ব্যক্তিজীবন সমানভাবে জড়িত ও প্রভাবিত। এ কারণে আমাদের পরিবার থেকে নৈতিকতার শিক্ষা শুরু করতে হবে। তেমনিভাবে যে বিষয়ে আলোকপাত করা হলো, আমাদের কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নৈতিকতার প্রশ্নে এমন কঠোর হওয়া প্রয়োজন যাতে তারা সমাজে প্রভাব বিস্তার লাভ করতে পারে এবং সমাজকে প্রভাবিত করতে পারে। দেশের জন্য এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা একেকজন নক্ষত্রের মতো যেন হতে পারে। নৈতিকতার ভিত তাদের হৃদয়ে এমনভাবে প্রোথিত করতে হবে যাতে তারা সমাজের জন্য উদাহরণ হতে পারে। সমাজের যে স্তরেই তারা থাকুক না কেন, হোক সে সচিবালয়ের কর্মকর্তা, মসজিদের ইমাম বা মাদরাসার শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বা উপজেলা কর্মকর্তা, সাধারণ ব্যবসায়ী বা পুলিশের এসআই—প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা যেন উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জাজ্বল্যমান হতে পারে। এভাবে শত শত নক্ষত্র যখন একে একে জ্বলে উঠবে তখন অন্ধকার যত গাঢ়ই হোক, তা বিদূরিত হবেই।

 

জানুয়ারি 2020

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১