বাস্তব জীবনের গল্প আর কাল্পনিক গল্প কখনো এক হয় না। কাল্পনিক গল্প গড়ে ওঠে হয়তো প্রেম-ভালোবাসার ওপর ভিত্তি করে অথবা কোনো রহস্যকে কেন্দ্র করে কিংবা বিশেষ কোনো চরিত্রকে ঘিরে। আর বাস্তব জীবনের গল্পে যেমন প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসার ছোঁয়া থাকে তেমনি থাকে জীবনের উত্থান-পতন, জয়-পরাজয়, হাসি-কান্না, দুঃখ-বেদনা ও ভাঙা-গড়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা। সবচেয়ে বড়কথা, বাস্তব জীবনের গল্প রচিত হয় জীবনের কঠিন বাস্তবতার আলোকে, যা মানুষকে বাস্তব জীবনে চলতে সাহায্য করে এবং সেটা তার জীবনের জন্য হয় প্রদীপ্ত মশাল। আর এজন্যই বাস্তব জীবনের গল্প সবসময়ই আমাকে বেশি টানে। আমাকে সাহস যোগায়, প্রাণিত করে। বাস্তব জীবনের গল্পসমৃদ্ধ যেসব বই আমাকে আলো দিয়েছে, মুগ্ধ করেছে, সাহস যুগিয়েছে সেগুলোর অন্যতম হলো উভয় বাংলার শ্রেষ্ঠ কবি আল মাহমুদের আত্মজীবনীগ্রন্থ ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’। আমার খুব প্রিয় এই বই ৷
বইটিতে লেখক দক্ষ শিল্পীর মতো তাঁর জীবনের স্মৃতিগুলোর চিত্রাংকন করেছেন অত্যন্ত সুচারুরূপে৷ মায়া-মমতা, প্রেম-ভালোবাসা মিশিয়ে। জীবনের ঘটনাগুলোকে সাজিয়েছন গল্পাকারে, সুখপাঠ্য করে। বাস্তব জীবনের চিত্রও যে এতো চমৎকারভাবে সুখপাঠ্য করে তুলে ধরা যায়, এই বই না পড়লে সেটা আমি বুঝতামই না।
লেখক তাঁর পূর্বপুরুষদের আলোচনা টেনে গ্রন্থের সূচনা করেছেন। এরপর একে একে বলে গেছেন তাঁর শৈশবজীবনের আনন্দময় গল্পগুচ্ছ। দাদির কোলে মাথা রেখে আকাশ দেখার গল্প। কৈশোরের শুরুতেই বোন হারানোর বেদনাদায়ক স্মৃতি। আরও বলেছেন, কায়দা-রেহেল হাতে প্রথম মক্তব পড়ার রোমাঞ্চকর অনুভূতিগুলো।
এইভাবে কৈশোর পেরিয়ে যৌবন এবং এর মাঝে ঘটা হাজারও ঘটনা বলে গেছেন সরলভাবে। স্কুলজীবনের সূচনাকথা। বই পড়ার অদম্য নেশার বর্ণনা এবং সর্বশেষে কবিতা লেখার শুরুর কথা এবং কবি হয়ে ওঠার গল্প।
কবি আল মাহমুদ আমার প্রিয় লেখকদের অন্যতম। তাঁর নাম ও লেখা—দুটোই আমাকে সমানভাবে টানে। যদিও তাঁর খুব বেশি লেখা পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি তবুও যা পড়েছি তা-ই আমাকে মায়ার অদৃশ্য এক দড়িত বেঁধে রেখেছে। তাঁর লেখা আমাকে মুগ্ধ করে, আলোর মশাল হয়ে পথ দেখায়। তাই আমি আমার প্রিয় এই লেখকের প্রতি এবং তাঁর লেখার প্রতি অনিঃশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
প্রিয় লেখক কবি আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইল গ্রামের মোল্লাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মীর আবদুর রব ও মাতা রওশন আরা মীর-এর বড় সন্তান তিনি। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় কিশোরগল্প ‘তিতাস চরের ছেলে’ দিয়ে তাঁর লেখালেখির সূচনা ৷
কর্মজীবনে তিনি দৈনিক মিল্লাত, কাফেলা ও ইত্তেফাকে দীর্ঘকাল সাংবাদিকতা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছেন। স্বাধীনতার পর গণকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে সাহসী ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রকাশনা বিভাগে নিযুক্ত হন এবং ১৯৯৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন।
প্রিয় লেখক কবি আল মাহমুদ ছিলেন আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি। কবিতা ছাড়াও তিনি গল্প-উপন্যাস ও প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনাতেও স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। তবে কবিতার ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব বলয় সমগ্র বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটেই গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, লোক লোকান্তর, সোনালী কাবিন, কালের কলস, উড়াল কাব্য ইত্যাদি। আর গল্পগ্রন্থের মধ্যে সৌরভের কাছে পরাজিত, গন্ধবণিক, ময়ূরীর মুখ ইত্যাদি। আর উপন্যাসের মধ্যে ডাহুকী, কবি ও কোলাহল, উপমহাদেশ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
আমার পরম প্রিয় এই লেখক ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, শুক্রবারে তাঁর অগণিত ভক্তকে শোক-সাগরে ভাসিয়ে পরলোক গমন করেন। বড় সাধ ছিল প্রিয় লেখক, প্রিয় কবির সঙ্গে সাক্ষাত করব। সে-সাধ সাধ-ই রয়ে গেল! তাই ব্যথাতুর এই হৃদয়ে সান্ত্বনা দানের জন্য প্রিয় কবির দু’লাইন কবিতা উদ্ধৃত করতে চাই—
‘কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রিশেষে শুভ শুক্রবাওে
মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাগিদ
অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে
ভালো মন্দ যা ঘটুক মেনে নেব এ আমার ঈদ’
আল্লাহ তাআলা প্রিয় লেখককে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন।
শিক্ষার্থী, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

