লেখাপড়ার নামে ঘর ছাড়ি অতি অল্প বয়সে—কৈশোরে। সেই যে ঘর-ছাড়া হই এখনো আর ঘরে ফেরা হয়ে ওঠে না। হোস্টেল, লজিং আর মেসে-মেসে কেটে যাচ্ছে জীবন। এই পরিযায়ী জীবনের বিস্তৃত একটা সময় কেটেছে লজিংবাড়িতে। কাজেই লজিংবাড়ির প্রতি এক অমোঘ টান অনুভব করি। যেন এ আমার দ্বিতীয় ঠিকানা।
সিলেটে। তখন মিজান জামাতে পড়ি। হোস্টেলের করুণ দিনরাত্রি। ঘুম থেকে উঠেই ভয়ংকর জীবনের যুদ্ধটা শুরু হয়। গণরুম; গাদাগাদি করে রাত কাটানো, ফজরের আগেই জেগে ওঠা। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে অপকৃতস্থ হয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা। গোসলে সিরিয়াল, ভাতের প্লেট নিয়ে খাবারের লাইন। এভাবেই আলু-ডালে তিন বেলা যায়।
তখন মনে খুব সাধ জাগে—আহা, ভাগ্যবানদের মতো যদি আমার একটা লজিংয়ের ব্যবস্থা হতো! মনে-প্রাণে দোয়া করি—আল্লাহ একটা লজিং মিলিয়ে দাও। লজিং মানেই একটু ভালো খানাপিনা। আরামে রাত্রিযাপন। খেলাধুলা আর ঘোরা-ফেরার সুযোগ।
কিন্তু আমার উসতাদরা কিছুতেই আমাকে হোস্টেলের বাইরে দিতে রাজি নন। আমার এখনও নাকি লজিং খাওয়ার বয়স হয়নি। তাছাড়া যারা ছাত্র হিসেবে কিছুটা ভালো তাদের বোর্ডিং বা হোস্টেলে থাকাই নিয়ম। হোস্টেলে থাকা ছাড়া পরীক্ষায় সিরিয়াল পাওয়া সম্ভব না। জীবনে প্রথমবার ভালো ছাত্র হওয়ার বিড়ম্বনার সাধ পেলাম। ভালো ছাত্র হলে জীবনে বিপদ আছে!
উসতাদের হাতে-পায়ে ধরে লজিংয়ের দাবিটা আদায় করলাম। বড় ছাত্রদের মাধ্যমে—মাশাল্লাহ, লজিংও একটা পাওয়া গেল। এক লন্ডনি বাড়িতে। বিশাল বাড়ি; রাজপ্রাসাদের মতো। বাড়ি দেখে আমার দারুণ পছন্দ হলো। আমাকে বড় এক কক্ষ দেয়া হলো থাকতে। খানাপিনাও ভালো। স্বপ্ন বুঝি সত্যি হলো।
এই বিশাল পাঁচ-ছয় বিঘা আয়তনের বাড়িতে সর্বসাকুল্যে ৫ জন লোকের বসবাস। গৃহপ্রধান ষাটোর্ধ মহিলা, যাঁকে আমি দাদি ডাকা শুরু করেছি। তাঁর কলেজগামী এক যুবতী মেয়ে। পুত্রবধু আর ক্লাস ওয়ানে পড়ুয়া নাতনি। বাকিরা সবাই লন্ডনে, বছরে একবার বাড়ি আসে। বাড়ির একমাত্র পুরুষ-সদস্য আমি।
বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে সামাজিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারগুলো যেসব কারণে তাদের বাড়িতে মাদরাসাছাত্রদের লজিং রাখতো তার মধ্যে আমি বিশেষ কয়েকটি কারণ খুঁজে বের করেছি। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো-
ক. সন্তানাদিকে পড়াশোনা করানোর জন্য।
খ. ঘরের বাজার সদাই করানোর উদ্দেশ্যে।
গ. প্রবাসী-পুরুষশূন্য বাড়িতে একজন পুরুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে।
ঘ. পারিবারিক ঐতিহ্য ও সামাজিক মর্যাদা হাসিলের লক্ষ্যে।
ঙ. দীনের খেদমত, বিশেষত আলেমদের সাহায্য-সহযোগিতার মহৎ উদ্দেশ্যে।
তো আমাকে লজিং রাখার ব্যাপারে তাদেরও কিছু উদ্দেশ্য ছিল। আমার কাজ ছিল বিকেলে বাজার-সদাই করা আর সন্ধ্যার পর পিচ্চিটাকে পড়ানো। আর তৃতীয় আরেকটি কাজ ছিল, পরোক্ষভাবে। বাড়ির গৌরব ধরে রাখা।
বাজার করার কাজটি আমি খুব আনন্দের সাথে করতাম। কারণ, খরচের টাকার সাথে বৃদ্ধা দাদি আমাকে আরও কিছু খুচরো টাকা দিতেন। বাজারে গিয়ে মজা (পছন্দের যে কোনো খাবার) খাওয়ার জন্য। তা ছাড়া বাজার করতে গিয়ে অনেকের সাথেই আমার পরিচয় ঘটতো, ব্যবসায়ী আর খুচরো বিক্রেতাদের সাথে পরিচিত হতাম। নিজের মধ্যে একটা প্রাপ্তবয়স্ক ভাব আসতো।
তবে বিপত্তি ঘটতো পিচ্চি মেয়েটাকে পড়াতে গিয়ে, পড়তে বসলেই ও ঘুমিয়ে পড়তো। ঘুমিয়ে পড়তাম আমিও। পড়ায় বসার আধা ঘন্টা পরে দাদি এসে দেখতেন আমরা শিক্ষক-শিক্ষার্থী দু-জনই বেঘোরে ঘুমোচ্ছি। ঘুম থেকে টেনে তুলে চা-বিস্কিট খাইয়ে যেতেন। দশ মিনিট পরে আবার ঘুম। বাধ্য হয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী দুজন-ই দাঁড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করতাম।
একবার বেশ মজার ঘটনা ঘটলো। আমার খোঁজ-খবর নিতে এক উসতাদ বিনা নোটিশে হাজির হলেন লজিংয়ে। এসে দেখেন আমি আর আমার ছাত্রী দুজনই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমোচ্ছি। আমাদের এ হাল দেখে হুজুরের সে কী হাসি! দেয়াল কাঁপানো ঠা ঠা হাসিতে বেশ ভয় পেয়েছিলাম। মনে হলে এখন নিজেও হাসি।
লন্ডনিরা বাড়ি আসলো। আমার জন্য অনেক চকলেট আর কলম নিয়ে এসেছিল। তারা বাড়ি এলে ঈদ ঈদ মনে হতো। তারা যাওয়ার সময় আমাকে একটা সাইকেল কিনে দিয়ে গিয়েছিল—জীবনে আর কিছুতে এতো আনন্দ পাইনি আামি। এভাবে কখন যে এ পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছিলাম—বুঝতেই পারিনি। বছর-তিন কাটানোর পর হুট করে; না বলে, না কয়ে দাদি মারা গেলেন। খুব কষ্ট পেলাম।
পরে পরিবারের বাকি সদস্যরা লন্ডন চলে যাওয়ায় আমার জীবনের প্রথম লজিংবাসের ইতি ঘটে। আমার নিজের বাবা-মা ও পরিবারের পর তাদের কাছেই আমি সবচেয়ে বেশি আদর-স্নেহ আর মমতা পেয়েছি। কিছু ঋণ থেকে যায় অপরিশোধ্য। যা পরিশোধ করার ক্ষমতা একমাত্র মহান রবের হাতে। প্রভু, ঋণটা পরিশোধ করে দিয়ো, তাঁদের মঙ্গল করো।
ফেব্রুয়ারি ২০২০

