ভালোবাসার অন্য রঙ

সংখ্যা:

 

‘আচ্ছা আপু, একটা মানুষকে কি একই সাথে ঘৃণা করা এবং ভালোবাসা যায়?’

মেয়েটার প্রশ্ন শুনে আমি অবাক হলাম। মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এতোটুকুন একটা প্রাণ, কাকে এমন ঘৃণা করে?’

বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘জানো আপু, আমি আমার আব্বুকে খুব ভালোবাসতে চাই। পারি না।’

ছাদের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ওর কথা শুনে সোজা হয়ে ওর দিকে তাকালাম। মাথা নিচু করে পায়ের বুড়ো আঙুল মেঝেতে ঘষছে। আমি তাকিয়েই রইলাম ওর দিকে। শুনেছি সুন্দরী মেয়েরা অকারণেও হাসে। সদ্য কৈশোরে পা দেয়া এই মেয়েটা অতিমাত্রায় সুন্দরী। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে সে খুব একটা হাসে না। হাসলেও ঠোঁট দুটো সামান্য প্রসারিত করে আবার মিলিয়ে ফেলে।

আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে তেমনিভাবেই একটু হাসল। কী যেন আছে হাসিটার মধ্যে। আমি সামান্য ভ্রু কুঁচকালাম। ও আবার বলতে শুরু করল, ‘শুধু টাকা ঢাললেই বাবা হওয়া যায় না, জানো? টাকায় সব হয়-কথাটা মিথ্যে। সুখ হয় না। স্নেহ পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় খোঁচানো কথা—মাসে মাসে কত খরচ করি তোমাদের পেছনে, সে তোমরা কী বুঝবে? বিশ্বাস করো আপু, একমাত্র মেয়ে হিসেবে আমি কোনোদিন কোনো কিছুর আবদার করিনি। শুধু চেয়েছি আব্বুর একটু স্নেহ, একটু ভালোবাসা। আমার মনে পড়ে না আব্বু কখনো আমাকে আদর করে নাম ধরে ডেকেছে কি না! আমি এতো নামি স্কুলে পড়তে চাইনি, এসির নিচে থাকতে চাইনি, শুধু আব্বুকে কাছে পেতে চেয়েছি।’

একনাগাড়ে অনেকগুলো কথা বলে একটু বিরতি নিলো মেয়েটি। আমি কিছু বললাম না। আমি জানি এখন ও মন হালকা না হওয়া পর্যন্ত কথা বলবে। হলোও তাই। আবার বলতে শুরু করলো, ‘দামি দামি ড্রেসে কি আব্বুর ভালোবাসা থাকে আপু? থাকে ঔদ্ধত্য—দেখেছো তোমাকে কত ভালো রেখেছি। এমন কৃত্রিম ভালো থাকা আমি চাইনি। আব্বু মাসের পর মাস বাসায় আসে না, কেবল কাড়ি কাড়ি টাকা পাঠায়। শেষ কবে ভালো আছি কি-না জিজ্ঞেস করেছে কে জানে! অথচ তোমাকেই দেখো! তোমাদের আব্বু প্রতি সপ্তাহে সপ্তাহে বাড়িতে আসে, তবু তোমরা চারবোনই ফোনে, ভিডিও কলে কত কথা বলো। আনন্দে থৈ থৈ করো!’

এই পর্যন্ত বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে। ওর শেষের কথায় আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল। তখন আমরা ঢাকায় থাকতাম। আব্বু ব্যবসায়ী হওয়া সত্ত্বেও শত ব্যস্ততার মাঝেও আমরা তাঁকে প্রতিদিনই কাছে পেতাম। তবে শুক্রবারে একটু বেশি পেতাম। শুক্রবারগুলোতে আব্বু বেশ বেলা করে ঘুম থেকে উঠতেন। আব্বুকে গঠানোর দায়িত্ব আঞ্জাম দিতাম আমরা চারবোন।

আমার তখন সবে ন’বছর বয়স। বাকি তিনজন আরও ছোট ছোট। এক শুক্রবার সকালে চারজন চারবার আব্বুকে ডেকে দিয়ে গেছি, তবু আব্বু ওঠে না। ঘুম ভেঙে গেছে, তবু চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল। সবচেয়ে ছোট বোনটা ছিল চার বছরের। ও আব্বুর পিঠে উঠে বসল। আর বলতে লাগল, ‘আম্মু রান্নাঘরে রুটি বানাচ্ছে, আমরা আব্বুকে রুটি বানাবো।’ যেই ভাবা সেই কাজ! রুটির খামিরের মতো আব্বুর হাত আর পিঠ মলতে শুরু করলো। সাথে আমি আর আমার সেজো বোন।

মেজো বোন মাহবুবার বয়স তখন ছয় কি সাত! ও হুট করে আম্মুর রুটি ছ্যাঁকার খুন্তি এনে আব্বুর বাহুতে লাগিয়ে দিয়ে বলে বসল, ‘মাসনুনা, তুই রুটি বানা, আমি ছ্যাঁকছি।’ আব্বু যন্ত্রণায় আঃ শব্দ করে উঠে বসে গেলেন। মাহবুবা প্রথমে বুঝতে পারেনি, আব্বুকে উঠে বসতে দেখেও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকল।

এদিকে আব্বুর শব্দ শুনে দাদু পাশের রুম থেকে এসে দেখেন, আব্বু হাসছে। মাহবুবার হাতে খুন্তি দেখে দাদু ঘটনা আঁচ করতে পারলেন। আব্বুকে বললেন, ‘এদেরকে তুমি আদর করে করে মাথায় তুলেছ। কোথায় ধমক দেবে, তা না করে হাসছো!’

আব্বু হেসে বললেন, ‘আম্মা, ও তো বুঝতে পারেনি। বুঝলে কি এখানে দাঁড়িয়ে থাকত? সামান্য এটার জন্য আমি ধমকালে তো ওরা আমার কাছে আসতেই ভয় পাবে।’ দাদু আর কিছু বললেন না। কিন্তু আমি সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম, বাবারা এমনই হন। নিজের যন্ত্রণার চেয়ে সন্তানের চিন্তাই তাঁদের কাছে প্রাধান্য পায়।

চুপচাপ দাঁড়িয়ে ঘটনাটা কল্পনা করছিলাম। পাশে যে কেউ আছে ভুলেই গিয়েছিলাম। সম্বিৎ ফিরে পেতেই মেয়েটার দিকে তাকালাম। জিজ্ঞেস করল, ‘কী ভাবছো?’ বললাম, ‘তুমি বড্ড অভিমানী। পাগলী মেয়ে, সবাই কি একরকম হয়? একেকজন ভালোবাসার প্রকাশ একেকরকমে করেন। তোমার আব্বুও তোমাকে ভীষণ ভালোবাসে।’

‘আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছ?

‘না রে পাগলী! এটাই সত্যি। দিনশেষে সব বাবাই তাঁর সন্তানকে ভালোবাসেন। তাঁদের সমস্ত কিছু সন্তানের জন্যই। সন্তানের ভালো থাকাই তাঁদের একমাত্র প্রার্থনা।’

‘কিন্তু আমি তো ভালো নেই আপু।’

‘তুমি কতোটা ভালো আছো, তুমি জানো না। কখনো বাবার দিক থেকে ভেবে দেখেছ, তিনি কী চান? কখনো বাবা বাসায় আসলে হাসিমুখে দরজা খুলে বাবা বলে জড়িয়ে ধরেছো? জানো, আমরা রোজ রোজ আব্বুকে দেখতে পেতাম। তবু প্রতিদিন আব্বু কলিং বেল দিলেই ছুটে যেতাম কে কার আগে দরজা খুলতে পারে…। এখনো বৃহস্পতিবার রাতে জেগে থাকি আব্বুর ফেরার অপেক্ষায়।’

‘তোমার আব্বু তো অনেক রাতে ফেরে।’

‘বৃহস্পতিবারে শুধু আব্বুর অপেক্ষায় ঘুমাই না। এই যে জেগে থাকি, এই ব্যাপারটাই আব্বুকে সুখের একটা অনুভূতি এনে দেয়। আব্বুর চোখে মুখে আমি আনন্দের ঝিলিক দেখতে পাই।’

‘কিন্তু আমার আব্বু তো মাস পেরোনোর আগে বাসায়ই আসে না।’

‘এইবার আসলে তুমি এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেবে। হাসিমুখে সালাম জানাবে। তোমার বাবা খুশি না হয়ে পারবেনই না।’

‘এটা তো সাময়িক।’

‘তাহলে স্থায়ী করে নেবে। নিজে কুশল জিজ্ঞেস করবে। বাবার কী লাগবে, কী চাইছে সব নিজ হাতে করে দেবে। ঠিকঠিক দেখো, বাবার মনে জায়গা করে নেবে। এরপর থেকে দেখবে বাবাও তোমাকে সময় দিচ্ছে। তোমার কাজ, তোমার শ্রদ্ধাবোধ তাঁকে অবশ্যই স্পর্শ করবে। তখন দেখবে তোমার অভিযোগের সুযোগই থাকবে না।’

আমি কখনো এভাবে চিন্তাই করিনি যে, আমারও কিছু করার থাকতে পারে। আসলেই, আমিই তো কখনো নিজ থেকে আব্বুর সাথে সহজ হইনি। তুমি ধরিয়ে না দিলে হয়তো বুঝতেই পারতাম না। হ্যাঁ, আব্বু সত্যিই আমাকে ভালোবাসেন। আমিই বুঝতে পারিনি।’

‘এই তো বুঝে গেলে।’

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে দেখে তাড়া দিলাম, ‘চলো! ঘরে চলো।’

‘এক মিনিট দাঁড়াও।’ বলেই মেয়েটা আমাকে জড়িয়ে ধরলো। ত্রিশ সেকেণ্ড পরে সরে দাঁড়িয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিলো। এই হাসি আর সাথে সাথেই মিইয়ে গেল না। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে লক্ষ করলাম, মেয়েটার হাসি খুব সুন্দর। এমন মুক্তোঝরা হাসির বর্ণনায়ই বোধহয় বলা হয়েছিল— ‘ইয়াফতাররু আন লুঅ্লুইন আন রাতবিন ওয়া আন বারদিন।’

 

বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী

 

এপ্রিল 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১