মক্কা নগরে প্রভাব শেতাঙ্গদের। কালো বর্ণের স্বাধীন মানুষ এখানে দেখা যায় না। হাবশি কালোরা শুধু তাদের দাস হতে পারে। এ ছাড়া তাদের অন্য কোনো অধিকার নেই।
হাবশা থেকে লুট করে আনা এই দাসরা বেশ শক্ত-সমর্থ। অনেক কাজ করানো যায়। সহ্য-ক্ষমতা বেশি। কালো হওয়ায় অনেকে এদের কিনতে চায় না। তাই কম দামে পাওয়া যায়।
মক্কার কুরাইশ নেতা উমাইয়া বিন খালফের বাড়িতে ছিল এমনই একজন দাস। জন্ম মক্কায়, হাবশি মায়ের গর্ভে। নাম বেলাল ইবনে রাবাহ। কুচকুচে কালো বর্ণের দেহ তাঁর। হাবশিদের মতোই লম্বা গড়ন। চওড়া কাঁধ।
তবে গায়ের রঙ কালো হলে কী হবে? তাঁর ভেতরটা জুড়ে ছিল আলো। সে আলো ধারণ করতে অক্ষম হয়েছিল মক্কার বহু শ্বেতাঙ্গ আর ধনী লোক।
সেসময়ে হেরা পর্বত হয়ে সে আলো এসেছিল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কাছে। ধ্যান করতে থাকা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কাছে একদিন এসেছিলেন জিবরাইল। ইকরা শব্দের মাধ্যমে সে আলোর প্রজ্বলন ঘটেছিল এই পৃথিবীর বুকে। মক্কার সামান্য কিছু মানুষ সে আলো লাভে ধন্য হয়েছিলেন। বেলাল ইবনে রাবাহ তাঁদের একজন।
একজন হাবশি ক্রীতদাস। তাঁর জীবনে কোনো স্বপ্ন নেই। কোনো আশা নেই। মনিবের জন্য খেটে খেটে জীবন ব্যয় করা তাঁর কাজ। এমন জীবনে থেকে বেলাল ¯পর্শ পেলেন সে আলোর।
বেলালের আলোর ¯পর্শে আসার গল্পটিও চমৎকার। কোনো একদিন ছাগল চরাতে চরাতে বেলাল চলে গিয়েছিলেন হেরা পাহাড়ের পাদদেশে। হেরায় তখন ধ্যান করতেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম।
একদিনের ঘটনা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম গিয়েছিলেন হেরায়। সাথে আবু বকর। দুজনেরই বেশ খিদে পেল। এমন সময় হেরা উপত্যকায় দেখা গেল মেষ চরাচ্ছে এক রাখাল। তাকে ডাকলেন নবিজি।
‘কিছু কি আছে তোমার কাছে?’
‘তেমন কিছু নেই। তবে আমার নিজের জন্য রাখা বকরি থেকে আপনি দুধ নিতে পারেন।’ বেলালের অকপট উত্তর।
‘ঠিক আছে। তাই নিয়ে এসো।’
বেলাল একটি বকরি নিয়ে এলেন। বকরিটির দুধ তাঁর প্রতিদিনের খাবার। ওলানে সামান্য দুধ। একজন মানুষের হয়তো কোনোভাবে হয়ে যায়। সেখানে তিনজন মানুষের কথা ভাবাই যায় না।
কিন্তু কী এক আশ্চর্য মুগ্ধতায় বেলাল মোহাবিষ্ট হলেন। ভাবলেন না নিজের খাবারের কথা। পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মানুষের সান্নিধ্য, এই হেরা গুহা, যেখানে জিবরিল অবতীর্ণ হন আল্লাহর বাণী নিয়ে। এই পবিত্র সান্নিধ্য বদলে দিল তাঁকে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি নিজ হাতে বকরি দোহন করলেন। বেলালের সাথে-থাকা পাত্র কানায় কানায় ভরে উঠল। তৃপ্তি ভরে পান করলেন তিনি। এরপর আবার দোহন করলেন। পাত্র ভরে উঠল। এবার আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু পান করলেন। এরপর আবার দোহন করলেন রাসুল। এবারে বেলালের পালা। তিনিও পান করলেন পেট ভরে।
তিনজনের ভরপেট দুধ পানের পর বকরির ওলান আগের চেয়ে আরও ভারী হয়ে উঠল। এই অলৌকিক ঘটনা দেখে হতবাক হলেন মেষরাখাল হাবশি বেলাল। বিস্মিত নয়নে চেয়ে রইলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের দিকে।
স্নেহভরা দৃষ্টিতে বেলালের দিকে তাকালেন রাসুল। সমাজের চোখে বেলাল একজন ক্রীতদাস মাত্র। কালো বর্ণের হওয়ায় নীচু চোখে দেখে তাঁকে সবাই। মনিবের জন্য খেটে খাওয়া ছাড়া তাঁর আর কোনো কাজ নেই।
দয়ায় ভরে উঠল রাসুলের মন। সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। আহা, এই মানুষটা সমাজের চোখে যাই হোক না কেন, সেও তো আল্লাহর বান্দা। আল্লাহর কাছে তো সে আর সবার মতোই। কালো বলে কিংবা ক্রীতদাস বলে মহান আল্লাহর কাছে সে তো অসম্মানিত নয়।
তিনি যে সত্যের বাণী নিয়ে এসেছেন তা তো এই ক্রীতদাসের জন্যও। এই মানুষটাও তো ঈমান এনে জাহান্নাম থেকে বাঁচতে পারে। রাসুল তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি ইসলাম গ্রহণের আগ্রহ আছে?
রাসুলের মুজিজা দেখে মুগ্ধ হয়ে থাকা বেলাল উত্তর দিতে আর দেরি করলেন না। ‘জি’ বলে সম্মতি জানালেন। এবং বলে কালেমা পড়ে নিলেন। সেদিন থেকে নিম্ন শ্রেণির হাবশি গোলাম হয়ে গেলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষদের একজন। সেদিন থেকে শুরু হয়েছিল তাঁর শুদ্ধ থেকে শুদ্ধতর হওয়ার যাত্রা।
তারপর বেলাল হয়ে গেলেন ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’। তাঁর ওপর সন্তুষ্ট মহান আল্লাহ। কালো বলে কেউ তাঁকে আর নীচু চোখে দেখতে পারেনি কোনোদিন।
দুই
ঈমান আনার পর কটা দিন তীব্র অত্যাচার সইতে হয়েছিল তাঁকে। উত্তপ্ত বালুর ওপর পাথর চাপা দিয়ে রাখা হতো। আর বলিষ্ঠ কণ্ঠে তিনি বলে যেতেন ‘আহাদ… আহাদ…’।
বেলালকে পাপিষ্ঠ উমাইয়ার কাছ থেকে কিনে নিয়ে মুক্ত করে দিলেন আবু বকর। তারপর থেকে বেলাল হলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিত্য সহচরদের একজন। ইসলাম গ্রহণের পর কিছুদিন নিয়মিত যেতেন হেরা গুহায় রাসুলের কাছে। মেষ চরতে দিয়ে ঈমান শিখতেন তাঁর সান্নিধ্যে বসে। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে মুক্ত করে দেয়ার পর রাসুলের সঙ্গ ছেড়ে কখনো কোথাও যাননি বেলাল।
কোনো অসহায় মানুষ যখন আসত রাসুলের কাছে আর তাঁকে দেবার মতো কিছুই থাকত না রাসুল তখন বেলালকে ডাকতেন। বেলাল কারও কাছ থেকে ধার করে এনে দিতেন। রাসুলের সাথে থেকে সব কটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন বেলাল। বদরের যুদ্ধে তাঁর উৎসাহে মারা পড়ে উমাইয়া ইবনে খালফ।
কণ্ঠে তাঁর ছিল মোহনীয় জাদু। রাসুল তাঁকে বানালেন ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আবাস কিংবা প্রবাস—সবখানে প্রতি ওয়াক্তে আজানের ধ্বনি উচ্চারিত হতো বেলালের কণ্ঠে।
একজন হাবশি কৃষ্ণ বর্ণের ক্রীতদাসকে এতোটা সম্মান দিয়েছিলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে সম্বোধন করেছিলেন সাইয়েদ বলে। বলেছিলেন, আবু বকর আমাদের সাইয়েদ। তিনি মুক্ত করেছেন আমাদের সাইয়েদকে।
বেলালকে ভালোবেসেছিলেন আল্লাহও। একদিন রাসুল স্বপ্নে দেখলেন বেলাল তাঁর উটের রশি টেনে নিয়ে ছুটছেন জান্নাতের দিকে। রাসুলের আগে আগে বেলালের খড়মের শব্দ। রাসুল অবাক হলেন। কী এমন গুণ বেলালের যে এমন সম্মানে সে বরিত হয়েছে আল্লাহর দরবারে! বেলালকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন—‘কী এমন আমল করো তুমি? জান্নাতে আমি আমার আগে তোমার জুতার শব্দ শুনতে পেয়েছি।’
‘তেমন কিছু না, হে আল্লাহর রাসুল। সারাদিন আমি অজুর সাথে থাকি। হয়তো এই আমল আল্লাহ পছন্দ করেছেন।’ বেলালের নির্মোহ জবাব।
মক্কা বিজয়ের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বেলালকে আদেশ করেন কাবার ওপরে উঠে আজান দেওয়ার জন্য। কাবার উঁচু দেয়াল বেয়ে প্রথমে উঠতে পারছিলেন না তিনি। রাসুল তাঁর উম্মতের দুজন সর্ব শ্রেষ্ঠ সাহাবিকে আদেশ করলেন বেলালকে কাঁধে করে কাবার ছাদে উঠিয়ে দেবার জন্য। মক্কার এক হাবশি ক্রীতদাসের এতো বড় সম্মান মেনে নিতে পারেনি অন্ধকারে ডুবে থাকা কুরাইশ কাফিরদের কেউ কেউ। এই দৃশ্য দেখে কাফিরদের একজন বলে ওঠে—‘এই কালো কাক ছাড়া মুহাম্মদ কি আর কাউকে মুয়াজ্জিন বানাতে পারেনি?’ সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী আবু সুফিয়ান কিছু বলতে চেয়েও বললেন না। যদি অহীর মাধ্যমে রাসুল জেনে যান, এই ভয়ে
আল্লাহ তাআলা রাসুলকে ঠিকই জানিয়ে দিলেন। রাসুল তাঁদের ডেকে জানিয়ে দিলেন ইসলামের মূলনীতি, দীন আর তাকওয়া ছাড়া অন্য কিছুতে কেউ শ্রেষ্ঠ হতে পারে না।
তিন
আজকের পৃথিবী নেলসন ম্যান্ডেলার কথা জানে। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘদিনের সংগ্রামের জন্য শ্রদ্ধাভরে তাঁকে স্মরণ করে। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক মনে করা হয় তাঁকে। অথচ এই সংগ্রাম শুরু করেছিলেন আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে একজন মানুষ।
সাদা-কালোর এই সঙ্ঘাত কিংবা কালোদের বিরুদ্ধে সাদাদের এই প্রভুসুলভ মনোভাব মানুষের মধ্যে চলমান বহুদিন ধরে। তবে সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে ঠিক এভাবে একজন হাবশি ক্রীতদাস মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠা অন্ধকার বিশ্বাসে কাঁচি চালিয়ে নিজ গুণে হয়ে উঠেছিলেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষদের একজন। সেই শ্রেষ্ঠ হয়ে ওঠায় বাতিঘরের মতো পথ দেখিয়েছিলেন আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম।
পৃথিবীতে চলে আসা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাস দেখলে আমাদের অবাক হতে হয়। পশ্চিমের পৃথিবী—যারা নিজেদের উদার এবং মানবিক বলে দাবি করে তারাই সবচেয়ে অমানবিক এ ক্ষেত্রে।
খুব বেশিদিন না, মাত্র নব্বই বছর আগের আমেরিকায়ই একটি দল গড়ে উঠেছিল কৃষ্ণাঙ্গদের নিধন করার জন্য। এর আগে দাসপ্রথা এবং কালোদের বিরুদ্ধে বৈষম্য দূর করার জন্য আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ সংগ্রামের কথা বলতে গেলে লেখা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে।
ইউরোপ পিছিয়ে নেই বর্ণবাদের ক্ষেত্রে। বলা হয়, এশীয়দের মধ্যে বর্ণবাদ ঢুকিয়ে দিয়েছে এই ইউরোপীয়ানরাই। তাদের কাছ থেকে শিখেই উপমহাদেশের শ্যামবর্ণের মানুষ এখন সাদা-কালোর পার্থক্য করে।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদের ইতিহাস অনেক করুণ। নেলসন ম্যান্ডেলার দীর্ঘ সংগ্রামের পরও বর্ণবাদ যায়নি সেখান থেকে। পথে-ঘাটে এখনো কটূক্তি শুনতে হয় কালোদের। শ্বেতাঙ্গরা একটি শহর এখনো রেখে দিয়েছে নিজেদের নামে। ওরনিয়া নামের এই শহরে প্রবেশ নিষেধ যে-কোনো কালো মানুষের।
একবিংশ শতাব্দীর এই পৃথিবীকে মনে করা হয় ইতিহাসের সবচেয়ে স্বাধীন এবং মানবিক। যেখানে মানুষের স্বাধীনতা আছে। কোনো সংঘাত কিংবা কাউকে হেয় করার সুযোগ নেই। অথচ এখনো তার মধ্যে টিকে আছে বর্ণবাদ নামের অমানবিকতা। এখন হয়তো-বা রাষ্ট্রীয় বা সাংগঠনিকভাবে বর্ণবাদ বিলুপ্ত। তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বর্ণবাদের শিকার হয় অসংখ্য মানুষ।
বর্ণবাদের ইতিহাসে পুরো পৃথিবী যেখানে লজ্জায় মাথা নিচু করে সেখানে মুসলিম হিসেবে সগৌরবে আমরা বলতে পারি, ইসলামে বর্ণবাদের কোনো স্থান ছিল না কখনো। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, কোনো মুসলিম সমাজ বা জনপদে কালো বলে হেয় করা হয়নি কাউকে। হাবশি বেলালকে সম্মানিত করার মাধ্যমে ইসলাম যে আদর্শের বীজ বুনে দিয়েছে মুসলমানদের মধ্যে সে আদর্শ টিকে আছে এখনো।
‘কোনো হাবশি ক্রীতদাসকে যদি নেতা বানিয়েও দেয়া হয় আর সে কুরআন অনুযায়ী শাসন করে তবে তোমরা তাকে মেনে নাও।’
একথা স্বীকার করেছেন পশ্চিমের অনেক বিজ্ঞানী। একজন ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছেন, ইসলামের মহাসাফল্যের একটি যে তারা বর্ণ-বৈষম্য সম্পূর্ণ বিলোপ করতে পেরেছিল। ইসলামি যুগে নানা দেশের নানা বর্ণের মানুষ মিলে-মিশে একাকার হয়ে যায়। জাতিগত পার্থক্য তাদের মধ্যে কোনো বিভেদ সৃষ্টি করেনি।
জাত বা বর্ণ মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হতে পারে না। শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি একমাত্র তাকওয়া। এই মূলনীতি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম।
বিদায় হজের ভাষণে তাই বলেছিলেন, কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের বা শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কিংবা আরবের ওপর অনারব অথবা অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। জাতি বা বর্ণে বর্ণে বিদ্বেষের বিরুদ্ধে এক অনুপম আদর্শের বাণী উচ্চারণ করে গেছেন তিনি। শুধু বলেই গেছেন তা নয়, নিজের অনুসারীদের মধ্যে রেখে গেছেন এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ফেব্রুয়ারি ২০২০

