বুকের ভেতর একটা ধুকপুকানি, একটা চিনচিনে ব্যথা সব সময় থাকে। ফেব্রুয়ারি এলে কেন যেন এর মাত্রাটা বেড়ে যায়। এমনটা কেন হয়—তা হয়তো বুঝিয়ে বলতে পারবো না।
একজন বাংলা ভাষাভাষী ও সাহিত্যের পাঠকের এমন ব্যথা থাকতে পারে। কেননা, তার হৃদয় গহীনে পঞ্চাশটি বাংলা বর্ণমালার এক অকৃত্রিম ভালোবাসা জেগে আছে। সে ভালোবাসায় হয়তো এ ব্যথার উৎস। একজন একনিষ্ঠ পাঠক ও সাহিত্য-সচেতন ব্যক্তির এ ব্যথা চিরজীবনই অর্ধাঙ্গিনীর মতো থাকে। কারণ, এ ব্যথা পালতে হয়। সময়-সাধনা দিয়ে পুষতে হয়। নইলে এ ভালোবাসা থাকে না। থাকতে পারে না। এ ব্যথার বিরহে প্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া যায় না।
২.
খুব সচেতন একটি প্রশ্ন, আমরা বাঙালিরা পাঠক বেশি নাকি লেখক? লেখক হলে মৌলিক কজন? ওই যে ঢাকা শহরের কবিদের ব্যাপারে জনশ্রুতি আছে, কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি, তেমন?
পাঠক হলে কয়টা মৌলিক বই বেচা-বিক্রি হয়? আমরা কজন মানুষ পাবো, যিনি সত্যিকার পড়াশোনা করে আপন জীবন নিরীক্ষণ করেন?
সেদিন কেউ একজন একটি ছবি দেখিয়ে বললেন—‘জানেন, এরা কোন দেশের লোক?’ আমি বললাম—‘কেন কী হয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘দেখেছেন, ট্রাম গাড়িতে দাঁড়িয়ে বসে যাচ্ছে; কিন্তু একজনও এমন নেই যার হাতে পুস্তক নেই আর তিনি তা নিবিষ্ট করে পাঠ করছে না!’ আমি ভাবনায় পড়ে গেলাম, আসলেই আমরা পড়াশোনাটা করি কী?
চাই ধর্মীয়, চাই জাগতিক—আমাদের মাঝে এমন কজন পাবো যিনি যেকোনো বিষয়ে সঠিক ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে পড়াশোনা ও গভীর অধ্যয়ন না করে কোনো কিছু গ্রহণ বা বর্জন করেন না?
আমার এ প্রশ্নের জবাব নেই। এর জবাবে আরও প্রশ্ন আরও জবাব। কিন্তু নেই সঠিক সমাধান। হয়তো এটাও ফেব্রুয়ারির ব্যথার একটা উৎস।
৩.
কোনো উন্নত ও মার্জিত জাতিসত্তা বিনির্মাণে ভাষা-সাহিত্যের প্রভাব অত্যন্ত প্রকট। খুব গভীর। যেন প্রায় শেকড়। যুগে যুগে বিভিন্ন ভাষার বিবর্তন ও সমৃদ্ধির ইতিহাস ঘাঁটলে বিষয়টি যে কারও কাছে পরিস্কার হয়ে যাবে। কোনো জাতির মেধাবী কলমসৈনিকের কলমে যে স্বপ্ন, যে ছবি, যে ভাবনা, যে প্রত্যাশার স্ফূরণ ঘটে, যে কল্পনার বর্ণিল ছবি নির্মিত হবে, সে জাতির মানসজগতে তা অনায়াসেই প্রবিষ্ট হয়ে যায়। পাঠককূল অবচেতনভাবেই লেখকের বাতানো পথ ধরেই কল্পনার শক্তি ও পূর্বের লব্ধ বুদ্ধি দিয়ে গন্তব্যে হাজির হন। সে পথেই আপন জগতের ভাবনার প্রাসাদ গড়েন। অতঃপর কুঁড়েঘর ইত্যাদি বাকি সব সে জগতের রঙতুলির আঁকে সাজান। সুতরাং লেখকদের কর্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। তাঁকে কলম পরিচালনা করতে হবে সত্য-সুন্দরের পথে সুষ্ঠু জাতিসত্তার বিনির্মাণের দায় থেকে। আমার ফেব্রুয়ারির ব্যথার উৎস এটাও যে, ইতিহাসের আজকের মোড়ে এমন কজন প্রতিশ্রুতিশীল প্রত্যয়ী লেখক পেয়েছি? কজন পাবে আমাদের বাংলা সাহিত্য?
৪.
কলম চালনার যোগ্যতা যাঁদের আছে তাঁদের কেউ কেউ প্রথমদিনেই বই লিখতে চান। ইতিহাসের খাতায় নিজের নামখানা ছাপিয়ে রাখতে চান। ভাষার সংসারে নিজের ভাবনাগুলো অনুবাদ করে দিতে চান।
কিন্তু একটি প্রশ্ন থাকে। এই প্রবণতা ভালো না খারাপ সে তর্ক এড়িয়ে, মার্জিত ও গ্রহণযোগ্য স্তরের যোগ্যতা অর্জনের পর এ উত্থানটি হলে কেমন হয়?্ আত্মবিকাশের আগে আত্মপ্রকাশের পথ কতটুকু যৌক্তিক? কদিনের সবুরের পর মেওয়া নিলে লাভ কার বেশি? অপরিপক্ব সময়ে অসংলগ্ন পদক্ষেপ নেওয়া কতখানি সঙ্গত?
ফেব্রুয়ারি ব্যথা-সমৃদ্ধি করে এ উৎস থেকেও।
৫.
এভাবে ব্যথার অনেক উৎস এবং একাধিক প্রকল্প খুঁজে পাবো। প্রশ্নের পিঠে চড়ে আরও অনেক জিজ্ঞাসা হয়তো দাঁড়িয়েও যাবে। কিন্তু কেন যেন বদলায় না আমাদের স্বভাব, পাল্টে না আমাদের অসঙ্গতির ধারা। হয়তো কিছু রাত আছে ভোর হয় না। কিছু প্রাত আছে আলো দেয় না।
ফেব্রুয়ারি ২০২০

