শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড কী? মানুষের মনের ভালোলাগাটাই হয়তো একটা বস্তুর শ্রেষ্ঠ হবার মানদণ্ড। আমার চোখে একটা তুচ্ছ বস্তু অন্যজনের চোখে শ্রেষ্ঠত্বের আসন দখল করতেই পারে। প্রাণীকুলের বিচারে মানুষ শ্রেষ্ঠ হলেও পশু-পাখিদের শ্রেষ্ঠত্বকে অস্বীকার করা যায় না। তুচ্ছ বলে কোনো বস্তু শ্রেষ্ঠ হতে পারবে না, কথাটা আমার কাছে সম্পূর্ণ ভুল মনে হয়। অন্যভাবে বলা যায়, মানুষের চিন্তাধারা এবং রুচির ওপর শ্রেষ্ঠ হওয়া না-হওয়ার বিষয়টা নির্ভর করে।
ঝিঙেফুল এবং কাজী নজরুল
আমার বয়স যখন তেরো—ক্যালেন্ডারের পাতাজুড়ে তখন দু’হাজার বারোর শোরগোল। সন্ধ্যা পোহালো, এলো রাত। একটু পর চারদিকে বইবে উতালপাতাল ঝড়ের তাণ্ডবলীলা। এ তাণ্ডব সম্বন্ধে আমরা তখনো অজ্ঞাত। ফাহিম আমার সহপাঠি। আমাদের লজিং পাশাপাশি। একই হোস্টেলে থাকতাম বিধায় আমাদের চলাফেরাও একসাথে। ফাহিমের লেখার হাত দুর্দান্ত। বইপোকা। সারাক্ষণ বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকত।
আমরা লজিংয়ে পৌঁছুলাম। আমার হাতে ফাহিমের দেয়া কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যগ্রন্থ ‘ঝিঙেফুল’। জীবনের প্রথম পাঠ। বইটার প্রতি অদ্ভুত রকমের আগ্রহ ছিল, আছে। সকাল থেকে বইটার সাথে সখ্য হওয়ায় ক্লাসে বসেই পড়ে ফেলি টানা আঠারো পৃষ্ঠা। বইটি পাঠ করে আমি যেভাবে শিহরিত হয়েছিলাম, সে অনুভবটি আমার মনে এখনো তাজা হয়ে আছে। কয়েক পৃষ্ঠা পড়েই বোধ করেছিলাম, আকাশ, বাতাস, পাখপাখালি, তরুলতা আর চরাচরের একটি অংশ আমিও। মনের মধ্যে অদ্ভুতরকমের ছন্দ কাজ করছিল। আমার এবং সাহিত্যের প্রথম যোগসূত্র কাজীর এই ‘ঝিঙেফুল’। সেদিন লজিংয়ে বসেও বইটা খানিক পড়লাম। খাবার এলো। ভাতের প্রথম লুকমা মুখে দিতেই টের পাই আকাশে গুড়ুম গুড়ুম বজ্রধ্বনি। আতঙ্কেবুকটা কেঁপে ওঠে। আকাশে তিলমাত্র সাদা মেঘের জায়গা অবশিষ্ট নেই। কালো মেঘে ঘোমটা দেয়া আকাশ। এই বুঝি আছড়ে পড়বে তুমুল বৃষ্টি নিয়ে।
লজিং থেকে আমাদের হোস্টেল আরও ২০ মিনিটের দূরত্ব। গাছ-গাছড়ায় ঘেরা পাহাড়ি পথঘাট। নীরব, নিস্তব্ধ একলা একা রাত। চাঁদ নেই, তারা নেই। কারও কোনো সাড়া নেই। আশপাশে একটা পোঁকার নড়াচড়া পর্যন্ত আমাদের কানে বাজল না। ফাহিমের খাবার শেষ হলে আমরা বেরিয়ে পড়ি হোস্টেলের উদ্দেশে। বাইরে প্রবল দমকা বাতাস, সামনে এগোবার ফুরসত নেই। যতোই ঝড় আসুক ‘বইটা ভিজতে দেয়া যায় না’। বগলে চেপে ধরি বইটা। বাতাসের গতি বেড়েই চলে। সাথে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। পাঞ্জাবি-পাজামা ভিজে একেবারে জবুথবু।
দৌড়াচ্ছি তো দৌড়াচ্ছি। রাস্তার পাশে হঠাৎ খড়কুটোর চালঅলা একটা ঘর চোখে পড়ে। কাঁচামাটির বেড়া। ঘরটির দরজা খোলা দেখে বারান্দায় উঠলাম। ঘরের মালিক নিঃসঙ্কোচে আমাদের আশ্রয় দিলেন। চৌকিতে বসালেন। ঘরটির চাল বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরছে। গায়ে চ্যাপচ্যাপা পানির ছিটা লাগছে। ঝড়ের তাণ্ডবে মনে হচ্ছে পাশের কোটার গোয়ালের গরুগুলো বেদিক হয়ে ছুটে এইমাত্র অদৃশ্য হয়ে যাবে। সাঁই সাঁই আওয়াজ। গাছের ডালপালার মড়াৎ মড়াৎ শব্দ। অনেকগুলো গাছ শিকড়সুদ্ধ উঠে মাটিতে গা এলিয়ে দিলো। সচকিত শংকায়, মৃদুমৃদু কম্পনে তোলপাড় এ ধ্বংসের স্তুপ বেড়েই চলছে। বৃষ্টিতে বইয়ের অবস্থা আশঙ্কাজনক। পাঞ্জাবির মুড়ি দিয়ে মুছে আবার বগলে রাখি।
ধীরে ধীরে প্রকৃতির ডানা ঝাপটানো স্তব্ধ হয়। ঝড় থামে, বাতাসও থামে। আকাশ কিছুটা ফর্সা হয়। চাঁদের দেখা মেলে। আমরা সাহস জমিয়ে এগোই। ১০ মিনিটের মাথায় হোস্টেলে পৌঁছোই। রুমে ঢুকে কিছুটা হালকা বোধ হলেও বৃষ্টিতে ভিজে বইয়ের লেখাগুলো ঝাপসা হয়ে পড়াতে, কিছুটা বিষণ্নতা কাজ করছিল মনে। মনটা অসম্ভবরকমের দুর্বল হয়ে পড়ে। জীবনের প্রথম পাওয়া প্রিয় মানুষের উপহার। প্রিয় বই। যা হোক, স্মৃতিচারণ করতে করতে অতঃপর দু’হাজার চৌদ্দ সালের শেষদিকে এক বসায় পুরোটা পড়ে ফেললাম। আজও আমার মনে পড়ে সেই দিনটি, ঝিঙেফুল এবং কাজী নজরুল, তোমাকে।
শাহাদুজ্জামানের কালো হরফ
আকাশের দিকেহা করে তাকিয়ে বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকতাম ছোটবেলা; একফোঁটা বৃষ্টি যেন পড়ে মুখে। কদাচিৎ ফোঁটা দুয়েক বৃষ্টি পড়তো যখন টুপ কওে, আনকোরা উত্তেজনায় ঢেঁকুর উঠতমনের করিডোরে। অদ্ভুতরকম একটা অনুভূতি আগলে ধরতো হৃদয়ের পাচিল। লুফে নিতে ব্যস্ত থাকতাম তখন বৃষ্টির ফোঁটাগুলো। মন যেন এক পাতানো কচুপাতা, ধরি ধরি করে জমিয়ে রেখেছি জলফোঁটার স্মৃতিময়তা, মনের বেতারে। বাদল দিনে রোদ যেন-বা হঠাৎ উঁকি মারে—এ কেমন অনুভূতি? প্রচণ্ড তৃষ্ণায় একজগ পানি ঢক ঢক করে গিলে খাবার তৃপ্তি এ অনুভূতির কাছে এক সমুদ্র পানি খাবে যেন।
হ্যাঁ, শাহাদুজ্জামানের কালো হরফগুলোই শৈশবের সে বৃষ্টি আমার। ওই ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির পানি, তার একেকটি শব্দ। অপেক্ষায় যার হা করে তাকিয়ে থাকতে হয়। গল্পের মহাকাশ এ শাহাদুজ্জামান; যাঁর থেকে ঝরুক-না মাত্র এক ফোঁটা বৃষ্টি, বিশালতা এক সমুদ্র সমান তো। অসীমতা সীমাহীন। দীর্ঘতর এক বাক্যসমান অর্থদায়ক একেকটি শব্দ তাঁর। শব্দানুরাগী এক মনীষা তিনি। শব্দের গলায় তাবিজ গাঁথার নিখুঁত মুন্সিয়ানা জানেন। অনুভবের মধ্যবর্তী চুম্বকটা তাঁর চিরচেনা, হাতের মুয়া যেন; যেখানে স্বয়ং আকর্ষণ তিনি। আছে অবাকপ্রসূত দৃষ্টিভঙ্গি। রঙধনুর মতো আছে এক নিখাঁদ গদ্যশৈলী। ঝরঝরে তাঁর কথনরীতি। আছে শিল্প, আছে শিল্পের স্বাতন্ত্রিকতা। তাঁর গল্প মানেই যেন ফকফকা রোদের আলো চিন্তার উঠোনে। আর বা যেন, ধারা তাঁর অবিরল স্ফটিকস্বচ্ছ জলের মতোন। বয়ে যায়, যাবে অবিরত।
হাঁটুজলে হেঁটে যেতে পানির চপ চপ শব্দের মতো ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয় তাঁর কলমে। কালিতে তাঁর বেজে চলেন স্বয়ং তিনি এবং তিনি-ই। রসালো শব্দের জোড়াতালি দিতে পারেন বহু কর্মকার, সবার থেকে টসটসে জীবনবোধ তেমন আভা ছড়ায় না, শাহাদুজ্জামানের জানলার কাঁচ বেয়ে উঁকি দেয় যেমন জীবনবোধ। গল্প কতটা সাবলীল, হৃদয়গ্রাহী আর মনোঃপুত হবার ক্ষমতা রাখে, ‘কয়েকটি বিহ্বল গল্প’ তার প্রমাণ। ‘কয়েকটি বিহ্বল গল্প’ আমার পড়া শ্রেষ্ঠ বইয়ের একটি।
পাওলো কোয়েলহো, দ্য অ্যালকেমিস্ট
ব্রাজিলিয়ান লেখক পাওলো কোয়েলহো’র যুগান্তকারী উপন্যাস ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’-এর কথা বলতে গেলেযুবাইর ভাই মানে যুবাইর ইসহাকের কথা বলতেই হয়। যে ক’জন মানুষের সাথে ওঠাবসার ক্ষেত্রে অবাক হবার মতো দুয়েকটা পরিস্থিতির সম্মুখীন হই, যুবাইর ভাই তাদের একজন। গেলবছর মাস তিনেকের মতো আমাদের এক হোস্টেলে থাকা পড়ে। সে সুবাদে প্রায় ভোরেই উপশহরের আশপাশ ধরে হাঁটাহাঁটি করতাম। প্রকৃতির আশ্চর্য লীলায় আমরা মজে থাকতাম। সকালের কোমল হাওয়ায় মুগ্ধ হতে হতে আবার ফিরতাম ক্যাম্পাসে। চলার পথে জমে উঠত আমাদের আলাপচারিতা। পর্যায়ক্রমে বইয়ের প্রসঙ্গ উঠলেযুবাইর ভাই জিজ্ঞেস করত, এই বইটা পড়েছো, অইটা পড়েছো? এই জিজ্ঞাসার ধারাবাহিকতায় যুবাইর ভাইয়ের বলাতে সংগ্রহ করি বিদেশি সাহিত্যে আমার পড়া তৃতীয় বই ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’।
অনুবাদগ্রন্থের ক্ষেত্রে অনুবাদকের অনুবাদের উপর পুরো বইয়ের মান নির্ভর করে। সেক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেক অনুবাদক শুধু শব্দের অনুবাদটাই করে গেছেন, লেখকের মূল ভাবটা হারিয়ে গেছে অতলে। মূল বই পড়লে অন্তত এই বিভ্রান্তি থেকে বাঁচা যায়। আমার যখন মূল বই হাতের নাগালে নেই, তদুপরি লিও তলস্তয়, শেক্সপিওর-সহ বিদেশি অনেকের লেখা পড়লেও পাওলো কোয়েলহো’র ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’ই আমার কাছে শ্রেষ্ঠ মনে হলো। বিশেষত কাহিনির দিকটা উল্লেখযোগ্য।
বইটা পড়তে গিয়ে বোধ হলো, বইয়ের প্রতিটা লাইনই যেন আমাকে ঘিরে লেখা। উপন্যাসটি ঊনিশ শতকের পটভূমি অবলম্বনে, সান্তিয়াগো নামের আন্দালুসিয়ান এক রাখালকে কেন্দ্র করে লিখিত। লেখক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, একজন মানুষ কীভাবে পৌঁছাতে পারে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। রয়েছে ঘটনার ঘনঘটা, উত্তেজনা এবং পলে পলে জীবনের নিগূঢ় তথ্যাবলি। আর এটাই একজন লেখকের সফলতা ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। মাকসুদুজ্জামান খানের অনুবাদকৃত এই বইটি টানা দুবারে শেষ করেছিলাম, মনে পড়ে।
লেখক : শিক্ষার্থী, জামিয়া গহরপুর, সিলেট
আগস্ট 2019

