এ যেন ধ্বংসের খেলায় মেতেছি

সংখ্যা:

 

পশ্চিমারা—আরও স্পষ্ট করে বললে আমরা যাদেরকে ‘ওরিয়েন্টালিস্ট’ বা ‘প্রাচ্যবিদ’ বলে ডাকি, তারা শত শত বছর ধরে ইসলাম ও মুসলিম বিশ্ব নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা ও গবেষণা করে আসছে এবং এ বিষয়ে তারা হাজার হাজার বই, গবেষণাপত্র, প্রবন্ধ-রচনা করেছে। এমনকি এখনো স্বমহিমায় তাদের এই প্রয়াস চলমান। এর ফলে তারা ইসলামের সার্বিক বিষয় সম্পর্কে সাধারণ যেকোনো মুসলিমের চেয়ে অধিক জ্ঞান রাখে এবং মুসলিমদের চরিত্র, মুসলিমদের সংস্কৃতি-কৃষ্টি ও আচরণ, বৃহৎ ও ক্ষুদ্র দলের বিভক্তি, মাজহাব ও আঞ্চলিক বিভেদ, শাসক ও প্রজার মধ্যে সম্পর্ক, ধর্ম ও ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে জনগণের সম্পৃক্ততা—মোটকথা, মুসলিমদের ইতিহাস থেকে শুরু করে বর্তমান হকিকত সম্পর্কে যাবতীয় জ্ঞান তাদের কাছে রক্ষিত আছে। মুসলিমদের কোরআন থেকে শুরু করে মাসনুন দোয়ার বইসহ সকল জ্ঞানগত বিস্তৃতি তাদের নখদর্পণে।

কয়েক শ বছর ধরে তারা তাদের এই কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। ফলে ইসলাম ও মুসলিম সম্পর্কে এখন তাদের জ্ঞান ও বিজ্ঞান এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে তাদের সঞ্চিত জ্ঞানের মাধ্যমে তারা যখন ইচ্ছা তখন যেকোনো মুসলিম অঞ্চলে বিভেদ তৈরি করতে পারে, হাঙ্গামা বা যুদ্ধ সৃষ্টি করতে পারে। আবার যেভাবে তারা ইচ্ছা করে সেভাবে মুসলিমদের নাড়ি-নক্ষত্রের আচরণ ঠাওর করতে পারে। কীভাবে? কারণ, কয়েক শ বছর ধরে তারা ইসলাম ও মুসলিমদের ব্যাপারে ব্যাপক আকারে জ্ঞান আহরণ করেছে এবং মুসলিমদের আচরণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আসছে। ফলে খুব সহজেই মুসলিমদের নাড়ির টান বুঝতে তাদের জন্য খুব একটা কষ্টের কাজ নয়।

এই পরিপ্রেক্ষিতে গত এক শ বছরের মুসলিম বিশ্বের দিকে একবার নজর দেওয়া যাক। গত এক শ বছরে পৃথিবীর অধিকাংশ মুসলিম দেশ নানা ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছে এবং এখনো যাচ্ছে। কোথাও স্বাধীনতার জন্য লড়াই হয়েছে এবং হচ্ছে, কোথাও সন্ত্রাস দমনের নামে যুদ্ধ জারি রয়েছে, কোথাও-বা মুসলিমদের মধ্যে আঞ্চলিক বা জাতিগত লড়াই অব্যাহত। তার চেয়েও বড় ক্ষত হলো, গত শতাব্দীতে অধিকাংশ মুসলিম দেশ ইউরোপীয় উপনিবেশের দগদগে ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। কোনো কোনো দেশ সেসব ক্ষতের আঘাত সয়ে এখনো সুস্থ হয়ে উঠতে পারেনি।

আমাদের উপমহাদেশের বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানই তার জ্বলজ্বলে উদাহরণ। দরকার হলে আফ্রিকার দেশগুলোও দেখা যেতে পারে। যেসব মুসলিম দেশ নানা যুদ্ধ ও ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে গিয়েছে এবং যাচ্ছে, ভালো করে তাকালেই দেখবে, প্রতিটি দেশ দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত। এই দারিদ্র্যের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হলো, শিক্ষার অপ্রতুলতা। ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার ফলে একটা দেশ কোনোভাবেই বিশ্বের অন্য দেশের সামনে নিজেকে উন্নত হিসেবে দাঁড় করাতে পারছে না।

এরই মধ্যে এসব দেশের সামনে আরেক মুলা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে—তোমাদেরকে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে হবে, মধ্য আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশের কাতারে যেতে হবে। এই মুলা অর্জনের লক্ষ্যে আমাদের মতো ‍দরিদ্র দেশগুলো পাগলা ঘোড়ার মতো উন্নয়নের পেছনে ছুটছে। ওদিকে সঠিক ও উন্নত শিক্ষার অভাবে দেশের কোমর ভেঙে যাচ্ছে, মানুষের মাঝে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নিয়ে বিভেদ ফুঁসে উঠছে, জাতির যুবকশ্রেণি উদ্ভাবনী শিক্ষার অভাবে চাকরি নামের সোনার হরিণের পেছনে ছুটে নিষ্প্রভ হয়ে পড়ছে, সেদিকে আমাদের নজর নেই। ফলে আমরা আরও পিছিয়েই পড়ছি।

স্থিতিশীল মুসলিম দেশগুলো দেখো, বিশেষত আরব রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে আমরা অন্তত আমাদের শিক্ষা ও বিজ্ঞানের বর্তমান হকিকতটা স্পষ্ট বুঝতে পারব। আরব রাষ্ট্রগুলো স্থিতিশীল রাষ্ট্র ও পরিবেশের কারণে আধুনিক সভ্যতায় নিজেদের অবস্থান করে নিতে পেরেছে। আধুনিকতার পাশাপাশি শিক্ষা ও বিজ্ঞান গবেষণায়ও তাদের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। সুতরাং রাষ্ট্রীয় ও জাতিগত উন্নয়নের জন্য স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা আবশ্যিক বিষয়।

তুমি-আমি আধুনিকতা যতই নাক সিটকে চলি না কেন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে যেভাবেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পিঠ বাঁচিয়ে থাকি না কেন, এই সময়ে তুমি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ছাড়া সঠিকভাবে ধর্মীয় অনুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। আর তার জন্য সবার আগে প্রয়োজন শিক্ষিত ও আত্মোন্নত মুসলিম জাতি।

‘শিক্ষিত’ বলতে আমি কেবল দাওরা হাদিস বা মাস্টার্স পাস চাকরিপ্রত্যাশী যুবকদের বোঝাচ্ছি না। শিক্ষিত বলতে সেই ব্যক্তি, যে মুসলিম উম্মাহর উত্তরণের হাতিয়ার কোরআন-হাদিস থেকে শুরু করে পৃথিবীর ইতিহাস-ঐতিহ্য, বর্তমান পৃথিবীর সাধারণ জ্ঞান, বিজ্ঞান ও ভবিষ্যৎ পৃথিবী নির্মাণের প্রজ্ঞা আয়ত্ত করবে। এরা হবে সেই যুবকদের উত্তরসূরি, যারা প্রথম হিজরি শতাব্দীতে যখন কোনো জনপদ জয় করেছে, তখন সেখানকার জ্ঞান-বিজ্ঞানকে নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে এসেছে। প্রতিটি বিজিত জনপদে তারা নির্মাণ করেছে নতুন নতুন শিক্ষাকেন্দ্র, সেখানে শিক্ষার নতুন নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

ইবনে ইসহাক, ইবনে রুশদ, ইবনে খালদুন, আল-কুরতুবি, ইবনে সিনা, আল-বিরুনি, জাবির ইবনে হাইয়্যান, আল-খাওয়ারেজমি, আল-ফারাবি, আল-কিন্দি, আল-হাইসাম, আল-ইদরিসি—এমন আরও শত শত মুসলিম স্কলার ও বিজ্ঞানীর জন্ম হয়েছিল মুসলিম উপনিবেশগত অঞ্চলে। কীভাবে? কারণ, মুসলিমরা যেখানেই গিয়েছে সেখানেই তারা প্রথমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে এবং সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সে সময়কার সকল আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান পাঠদানের ব্যবস্থা করেছে। এ কারণেই ইসলাম আরব ছেড়ে এশিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং আফ্রিকা পার হয়ে ইউরোপেও স্থায়ী আসন পোক্ত করতে পেরেছে।

কিন্তু ইংরেজ উপনিবেশের ফলাফল দেখো। তারা যেখানেই তাদের রাজত্ব কায়েম করেছে, সেখানকার স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এই উপমহাদেশে তারা মুসলিমদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে পিষে ফেলেছে, যাতে নতুন করে তারা আর সংগঠিত হতে না পারে। উপরন্তু তারা শিক্ষার নামে এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের মাথার ওপর চাপিয়ে দিয়েছে, যেটা আমাদের উন্নতির পরিবর্তে বরং অনুন্নয়নেই বেশি কাজ করছে।

সভ্যতা কখনো দেশজয়ের মাধ্যমে উন্নত হয় না, সভ্যতা নির্মিত হয় শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। যে অঞ্চলের শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যত উন্নত ও আধুনিক, সে অঞ্চল তত বেশি উন্নত হবে। শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি বা সভ্যতা কখনো উন্নতি করতে পারবে না। মঙ্গোলযোদ্ধা চেঙ্গিস খানের অনুসারী তাতারিরা পঙ্গপালের মতো আক্রমণ করে অর্ধেক পৃথিবী জয় করে ফেলেছিল, কিন্তু পৃথিবীতে তাদের সাম্রাজ্যের নাম-নিশানা ৫০ বছরও টেকেনি। কেন? কারণ, তারা ছিল বর্বর এবং শিক্ষাবিমুখ এক যোদ্ধা জাতি। যারা রাজ্য জয় করার কলাকৌশলই কেবল জানত, রাজ্য শাসনের জ্ঞান ও শিক্ষা তাদের ছিল না। তাদের রাজ্য দেখভালের জন্য তারা কোনো শিক্ষাকেন্দ্র তৈরি করেনি। শিক্ষা না থাকার কারণে তারা সভ্য হতে পারেনি, যার দরুন তাদের কোনো সভ্যতাও গড়ে ওঠেনি।

এমন অবস্থায় আমাদের দেশের মাদরাসাগুলোর পশ্চাৎপদতা কেমন নাজুক কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে, দেখো। দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তার পূর্বেকার ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা থেকে নতুন এক চিন্তা নিয়ে। দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতাগণ যুগের প্রয়োজনে সময়োপযোগী এক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন। সেই দেওবন্দে যুগের প্রয়োজনে আরও বহুবিধ সময়োপযোগী পরিবর্তন, পরিবর্ধন হয়েছে। নতুন নতুন পাঠ্যপুস্তক সন্নিবেশিত হয়েছে, নতুন উচ্চতর গবেষণাকেন্দ্র সংযোজন হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের মাদরাসাগুলোতে শিক্ষাক্রমে তেমন কিছুই পরিবর্তন হয়নি কিংবা হতে দেওয়া হয়নি। দেওবন্দ বদলে গেছে, কিন্তু আমরা দেওবন্দের অনুসারী হওয়ার ঝান্ডা বুকে গেড়ে বসে আছি—আমাদের কিছুই পরিবর্তন করা যাবে না। সময়ের প্রয়োজনে দেওবন্দ নিজেই যেখানে তার পূর্বেকার শিক্ষাব্যবস্থা থেকে পরিবর্তিত হয়ে নতুন এক শিক্ষাব্যবস্থার উদ্ভব ঘটিয়েছে, আমরা দেওবন্দের অনুসারী বলে গোঁড়া অনুসারীর মতো ঝান্ডা গেড়ে বসে আছি।

আরও চিন্তার বিষয় হলো, আমরা কওমি মাদরাসাকেন্দ্রিক পড়াশোনা যারা করি, তাদেরকে বলা হয় দেওবন্দের চিন্তার বাইরে অন্য কোনো শিক্ষা গ্রহণ করা যাবে না; এমনকি অন্য কোনো শিক্ষাব্যবস্থা বা চিন্তার কোনো বই-পুস্তকও পড়া যাবে না, সাধারণ শিক্ষিতদের সঙ্গে মেশা যাবে না, সমাজে যারা পাপে ডুবে আছে তাদের কাছাকাছি যাওয়া যাবে না। এমন আরও নানা বিধিনিষেধ দেওয়া আছে মাদরাসার চৌহদ্দির ভেতর। ফলে কী হয়? দেখা যায়, আমাদের মাদরাসার শিক্ষার্থীরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি আলাদা আলেমশ্রেণি হিসেবে বেড়ে ওঠে। তারা সমাজের কাছ থেকে নানা সাহায্য-সহযোগিতা নিচ্ছে ঠিকই কিন্তু তারা আবার সেই সমাজকেই অচ্ছুত মনে করছে।

না, এটা তো হতে পারে না। আমাদের নবীজি তো সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো নেতা ছিলেন না। তিনি সমাজের সবচেয়ে সংবেদনশীল ব্যক্তি ছিলেন। সমাজের প্রতিটি কাজে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মনে রাখবে, তুমি সমাজ থেকে দূরে সরে গেলে সমাজও ধীরে ধীরে তোমার থেকে দূরে সরে যাবে। ইসলাম সামাজিক ধর্ম, সমাজবদ্ধ ধর্ম। তুমি সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে সেই সমাজে ইসলামের বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না।

আরও জরুরি বিষয় হলো, ধর্মের নামে আমাদের মাঝে বিভাজন ইদানীং প্রকটভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে। এই প্রবণতা সৃষ্টিতেও পশ্চিমাদের হাত রয়েছে। তারা মুসলিমদের মাঝে নানা দল, মতবাদ, ফেরকা, উপদল সৃষ্টি করতে সহায়তা করে যাচ্ছে; যাতে মুসলিমরা নিজেদের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষের ফলে নিজেরাই ঝগড়া-ফ্যাসাদে জড়িয়ে পড়ে। ডিভাইড অ্যান্ড রুল—ভাগ করো এবং শাসন করো। এটা হলো তাদের মূলমন্ত্র। তারা আমাদেরকে দল-উপদলে বিভক্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত। আমরা ধর্মরক্ষার নামে তাদের সেই পাতা ফাঁদে বোকার মতো পা দিয়ে নিজেদের বিরুদ্ধে নিজেরাই লড়ে যাচ্ছি।

ঠান্ডা মাথায় একবার চিন্তা করে দেখো, ইসলাম আসলে কী জিনিস! নবীজি কী বার্তা নিয়ে পৃথিবীতে নবী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ইসলামের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো, দিগ্্ভ্রান্ত মানুষকে আল্লাহর পরিচয়ের মাধ্যমে ধর্মের সঙ্গে জুড়ে নেওয়া, তাদেরকে দোজখ থেকে বেহেশতের পথে আগুয়ান করা, অন্ধকার জীবন থেকে আলোময় জীবনের দিকে এগিয়ে নেওয়া। এটাই তো ইসলামের মূলমন্ত্র, তাই না? নবীজি তো তাঁর জীবনভর এ বাণীই মানুষের দ্বারে দ্বারে বলে গেছেন।

তাহলে আমরা কী করছি? আমরা এখন ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে হাজারো দল, ফেরকা, মতবাদ, মতাদর্শ, চিন্তা ও কাজে বিভাজন করে ফেলেছি। আরবরা বলছে হিন্দুস্তানিরা মাজারপূজারি, হিন্দুস্তানিরা বলছে আরবরা সালাফি-লামাজহাবি, জিহাদিরা বলছে কতল না করলে তুমি জিন্দিক-কাফের, তবলিগওয়ালারা বলছে চিল্লা না দিলে মুসলিম হওয়া যায় না, কওমিরা বলছে জামাতিরা বাতিল, এক দল আরেক দলকে বানাচ্ছে মডারেট, কাউকে বলছে দেওবন্দের চেতনাবিরোধী, কেউ বেরলভি, কেউ আহলে হাদিস, কেউ জেনারেল শিক্ষিত, ওর পেছনে নামাজ হবে না, ওর কথায় বিশ্বাস করা যাবে না, ও ইহুদি-খ্রিষ্টানদের দালাল…।

আর কত বলব! এ রকম শত শত দলে বিভক্ত করা হয়েছে আমাদের। আমাদের শরীরের হাড়গুলো যেমন একটার সঙ্গে আরেকটা শক্তভাবে জোড়া লাগানো, একটার সঙ্গে আরেকটার নিবিড় সম্পর্ক, একটা হাড় ভেঙে গেলে যেমন পুরো শরীরটাই বেদনায় নীল হয়ে যায়; তেমনি সমস্ত মুসলিম তো একটা দেহের মতোই। এটা নবীজির হাদিস। তাহলে আমরা কেন বারবার আমাদের নিজেদের শরীরেই আঘাত করে যাচ্ছি? কেন আমরা নিজের হাতকে বলছি—তুই ফাসেক-ফুজ্জার? কেন নিজের পা’কে বলছি—তুই জিন্দিক-কাফের? কেন নিজের বুককে আঘাত করে বলছি—তুই ইহুদি-খ্রিষ্টানদের দালাল? কেন নিজের পিঠে নিজেই চাবুক মেরে বলছি—তুই জামায়াত, তুই লীগ, তুই সালাফি? আর কেনই-বা আমাদের শরীরে আঘাত করলে আমাদের হৃদয়ে সামান্যতম ব্যথা অনুভূত হচ্ছে না?

তুমি আজ ইরাক-সিরিয়া-ফিলিস্তিন-আফগানিস্তানের নিষ্পাপ শিশু ও নিরপরাধ নিহত মানুষের জন্য প্রায়ই অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছ, কিন্তু যখন তুমি জানতে পারবে ইরাকে নিহত ওই লোকগুলো ছিল শিয়া, সিরিয়ায় নিহত অতগুলো মানুষের অনেকেই ছিল আলাভি, ফিলিস্তিনে নিহত কিশোর-যুবকেরা ছিল কট্টর সালাফি, আফগানিস্তানে নিহত ব্যক্তিরা ছিল দ্রুজ সম্প্রদায়ের; তখন কী করবে তুমি? একজন মানবতাবাদী মানুষ হিসেবে তোমার রোনাজারি জারি রাখবে, নাকি তাদের হত্যা করার জন্য হত্যাকারী বাহিনীকে সাধুবাদ জানাবে?

দিনশেষে দেখবে, তুমি তোমার পাশে তোমার মতবাদের মাত্র গুটিকয়েক মানুষ নিয়ে হামাগুড়ি দিচ্ছ। এভাবে দল-ফেরকা দিয়ে মানুষের মাঝে বিভাজন তৈরি করো না। ইসলাম মানুষকে এভাবে পৃথক করতে দুনিয়ায় আসেনি, ইসলাম এসেছে দুনিয়ার সকল মানুষকে এক কাতারে শামিল করতে। যত বেশি পারা যায় মানুষকে ইসলামের ছায়াতলে শামিল করো। সামান্য মতভেদের কারণে কাউকে ইসলাম থেকে বের করে দিয়ো না। বিশ্বাসগত বিভক্তির কারণে কাউকে হেয় বা অপমানের দৃষ্টিতে দেখো না।

হ্যাঁ, এটাই ইসলাম।

 

ফেব্রুয়ারি ২০২০

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১