শিরোনামহীন গল্পের আসর

সংখ্যা:

 

অনেক দিন পরে চিরচেনা এই শহরে আসলাম। জীবনের অনেক বড় একটা অংশ কেটেছে এখানে। এই শহরের পথ, মানুষ—তুমুল ভালোবাসায় কাছে টেনেছে বারবার। আর এখন আমি বহুদূর! ভুলে গেছি অনেক কিছু। তবুও খুব ইচ্ছে করে, তিতাসের পাড়ে আবার জমাই শিরোনামহীন গল্পের আসর, যখন ঢেউয়ে-ঢেউয়ে ভাঙতে থাকে চাঁদের আরশি—মৃদু হাসির কলরোল মিলিয়ে যাবে দূরের কাশবনে। কিন্তু সময় যে বড় কঠিন বাস্তবতা, হারিয়ে গেলে আর ফিরে আসে না।

ফিরতি পথে আরও কত কিছু মনে পড়ে! লিখতে পারি না। পথে-পথে ফেলে আসা স্মৃতির নির্দয় হাতছানি, বিমূর্ত মায়ার নির্ভেজাল টান; তবু দিনশেষে গোধূলির গোত্তা খাওয়া ঘুড়ির মতো ফিরে আসতে হয় দীর্ঘশ্বাসে ভরা জীবনের কাছে। সময়ের অফুরান ভালোবাসা বুকে তুমি আপন স্রোতে বয়ে যাও তিতাস। আসা-যাওয়ার এই ধারাবাহিকতা হয়তো খুব বেশিদিন থাকবে না, ব্যস্ত এই জীবনের বিরামহীন ঘূর্ণনে পেছনে তাকানোর সময়ও নেই, তবু আমার মনে থাকবে, জীবনের সবচেয়ে স্বর্ণালী অধ্যায়ের কথা। ভাষা পাওয়ার আগে মরে যাওয়া ভালোবাসার কথা। পরিচিত সেই অট্রালিকা, বিনম্র কোলাহল।

স্নেহ, শাসনের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা কোমল সময় আর নির্মোহ ভালোবাসায় ভরপুর সেইসব প্রহর—আমি কখনো ভুলতে পারব না। আগামী কয়েকটি বছর খুব ব্যস্ত থাকব আমি, তবু তোমার সান্নিধ্যের একটি প্রহর বুকে আমৃত্যু প্রতীক্ষায় থাকব। দিনশেষে বিষণ্ন বিকেল, হু হু বাতাস, রক্তিম গোধূলি—নৈঃশব্দ্যের সুরে সুরে বয়ে যাওয়া বেলা, তুমি দূর আকাশের নির্লপ্ত তারার মতো হারিয়ে যেতে থাকো দূরের কোনো পথে, বহুদূর!

অনেক কথা বলার ছিল তোমার সাথে। কষ্টের, যন্ত্রণার, মুগ্ধতার—যাপিতের কত কত গল্প জমিয়ে রেখেছি হৃদয়ের গোপন কুঠুরিতে। ইচ্ছে ছিল, এক-এক করে সব বলব তোমাকে। নিঝুম নীরবতা বয়ে গেল সময়, কিন্তু কিছুই তো বলা হলো না। কিছু কথা থাকে, যেগুলো চাইলেই বলে ফেলা যায় না।

সেই না-বলতে পারার যন্ত্রণা বুকে প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকতে হয়। না-বলা কথাগুলো শুধু নীরবে পোড়ায়। শেষ রাতের ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদের মতো ক্ষীণ আলোর রেখা হয়ে বুকের ভেতর জ্বলতে থাকে বেদনা। এভাবে কত না-বলা কথা বুকে চাপা দিয়ে ফিরে আসি, ফিরে আসতে হয় প্রতিবার—তুমি হয়তো জানো না কিংবা জানবেও না কোনোদিন। এমনি, নিদ্রাহীন রাতের হাহাকারের মতো নিভৃতে কত স্বপ্ন ভেঙে যায়। কেউ জানে না।

আমাদের আকাশে তারা নেই, মলিন চাঁদ বিকেলের চুপসে যাওয়া শাপলার মতো জেগে আছে ক্ষণিক। এই মধ্যরাতে কেউ জেগে নেই। আমি অলস হাতে বইয়ের পাতা ওল্টাই। পড়ায় মন বসে না। তোমার ছবিটা সামনে আসলেই মনটা হু হু করে ওঠে। বুকের ভেতর উথলে উঠতে থাকে অনিরুদ্ধ কান্না। নিজেকে বড় অসহায় লাগে। চারপাশে সব আছে, এতো কোলাহল—তবু যেন কেউ নেই, নিঝুম চারপাশ। নিশুতি রাতে মুঠো-মুঠো বিষাদ নিঃশব্দে বুকের ভেতর ঢুকে স্বপ্নগুলো এলোমেলো করে দেয়। কোত্থেকে যেন ছুটে আসে মেঘের দল। বিজলি চমকায়, প্রবল বাতাসের ঝাপটা এসে লাগে জানালায়। মনখারাপের এই দিনে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামলে বুকের ভেতর জমা হওয়া তুমুল হাহাকার হাসনাহেনার সৌরভে বিমোহিত অন্ধকারের মতো বাতাসে মিলিয়ে যায়।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, জামিয়া ফরিদাবাদ, ঢাকা

 

এপ্রিল ২০১৯

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১