কবি শামসুর রাহমানের কবিতাগুলো রাশেদের বরাবরই ভালো লাগে। বাংলা কবিতায় আধুনিকতা, ব্যক্তির নৈঃসঙ্গ, বিবমিষা ও আনন্দলহরীর অনিন্দ্য রূপকার শামসুর রাহমান—ঝরনা যাঁর কলমে—ভালো লাগে তার নিখুঁত ও গূঢ়াশ্রয়ী শব্দচয়ন। সেই তাঁরই একটি কবিতায় রাশেদ পরিচিত হয় একটা নতুন শব্দের সঙ্গে—‘মাৎস্যন্যায়’। মাৎস্যন্যায় শব্দটির সঙ্গে মৎস্য মৎস্য একটা গন্ধ থাকার কারণে স্বভাবতই রাশেদ একটু দ্বিধায় পড়ে যায়। শব্দটির আসল অর্থ কী হতে পারে তা নিয়ে ভেবে ভেবে সে যখন কিছুতেই কোনো কূলকিনারা করতে পারছিল না, ঠিক তখনই তার হঠাৎ মনে পড়ে ইতিহাসের কথা। শেষ চেষ্টা হিসেবে রাশেদ যখন ফিরে যায় ইতিহাসের কাছে, ইতিহাস তখন তার শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে মেলে ধরে এক অজানা অধ্যায়।
মাৎস্যন্যায় একটি সংস্কৃত শব্দ। যার অর্থ—অরাজক পরিস্থিতি। মূলত খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকে বাংলায় যে এক ভয়ংকর অন্ধকার যুগ নেমে এসেছিল তাকেই মাৎস্যন্যায় বলে অভিহিত করা হয়।
ষষ্ঠ শতাব্দীতে বাংলার ক্ষমতা ছিল গুপ্ত বংশের হাতে। গুপ্তরা মূলত ছিল বাংলার বাইরে থেকে আসা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। গুপ্তদের আগে বাংলায় শাসন করেছিলো মৌর্যবংশীয় রাজন্যবর্গ। বাংলাকে তখন অভিহিত করা হতো ‘গৌড়’ নামে। সেই গৌড়েরই বাসিন্দা ছিলেন শশাঙ্ক নামের এক ব্যক্তি। তিনি ছিলেন সনাতন ধর্মাবলম্বী। শশাঙ্কের বংশপরিচয় ও প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা না গেলেও তিনি যে মনে মনে মাতৃভূমি বাংলাকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাত থেকে মুক্ত করে স্বাধীন এক রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখতেন—সেটা তাঁর পরবর্তী কর্মকাণ্ড থেকেই বোঝা যায়। ষষ্ঠ শতকের শেষ দিকে এসে গুপ্ত রাজারা দুর্বল হয়ে পড়লে তাঁদের দুর্বলতার সুযোগে ৬০৬ সালে শশাঙ্ক গৌড় দখল করে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজ্য।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, শশাঙ্ক একজন সুশাসক ছিলেন। সামরিক দক্ষতার বলে তিনি বহিঃশত্রুর হাত থেকে বাংলাকে রক্ষা করেছিলেন। তাঁর আমলে বাংলার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে। বিশ্ব পরিব্রাজক হিউশেন সাঙ তাঁর গ্রন্থে শশাঙ্ককে ‘গৌড়ের সম্রাট’ বলে উল্লেখ করেছেন। শশাঙ্ক ৬৩৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
শশাঙ্কের মৃত্যুর পরপর গোটা বাংলায় নেমে আসে চরম অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা। এই সময়কেই বলা হয় মৎস্যন্যায়। বাংলার ইতিহাসের এই মাৎস্যন্যায়ের স্থায়িত্ব ছিলো প্রায় একশ বছর। সেই একশ বছরে বাংলা পরিণত হয়েছিলো নরকে। লামা তারানাথ মাৎস্যন্যায়ের বর্ণনা দেওয়ার পর তাঁর কারণ উল্লেখ করেছেন এভাবে—‘সমগ্র দেশের তখন কোনো রাজা ছিল না।’ অর্থাৎ যোগ্য নেতৃত্বের শূন্যতার ফলেই মাৎস্যন্যায়ের সৃষ্টি হয়েছিল। আমরা জানি, মাছের রাজত্বে ছোট ও দুর্বল মাছ সবসময় বড় মাছগুলোর গ্রাসে পরিণত হয়। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলাও যেন মাছের রাজত্বে পরিণত হলো। হিংসা, দ্বেষ ও নির্মম অত্যচারের মাধ্যমে সবলরা দুর্বলদের জন্য নারক করে তুলল বাংলাকে। বিষাক্ত হয়ে গেল আকাশ বাতাস নদী নালা। ভেঙে চুরে মিসমার হয়ে গেল শান্তিকামী জনগণের আজন্ম লালিত স্বপ্ন সাধ কল্পনা। আর, তারও বহু যুগ পর এক কবির কবিতায় ধ্বনিত হলো মাৎস্যন্যায়ের কথা—
জলজ দুপুরে কিংবা টইটম্বুর রাত্তিরে নদী/ যখন সংগীতময় হয়, সে আপন অন্তরালে/ ভাসমান খুশি যেন। তবু ভয়, কাঁটাতার-ভয়/ তার এই মাঝারি সত্তায় লেগে থাকে সারাক্ষণ/ কেমন রহস্যময় বিষাক্ত গুল্মের মতো, বড়ো/ মাছ তাকে দেখলেই ধেয়ে আসে, লোভাতুর—আর/ সে পালায় ঊর্ধ্বশ্বাসে, যেন-বা দেহের কাঁটাজাল/ আসবে বেরিয়ে ত্বক ফুঁড়ে, খোঁজে সগোত্রের ব্যুহ/ এখানে-সেখানে শত্রুতাড়িত, সন্ত্রস্ত, দিক ভুলে/ হায়, এসে যায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্ষুধার্ত মাছের সঙ্গে। /আক্রমণে মত্ত ওরা। সে অত্যন্ত একা, মীনরাজ্যে/ অভিমন্যু, আর্ত, ক্লান্ত সাঁতার- রহিত, নিরূপায়।
জলের গভীরের মাছের মতোই মাৎস্যন্যায়ের শব্দটির পাতালেও যে এতো গভীর একটা অর্থ আছে, ইতিহাসের আশ্রয় না নিলে এটা রাশেদের হয়তো কখনোই জানা হতো না।
মোহাম্মদপুর, ঢাকা
মার্চ 2018

