‘লইয়া যাও দিবাকর, ওরে আমার দরকার নাই। সোনামুখি সুঁই গাঁইথা গাঙ্গে ভাসায় দিয়ো।’
চিমনি ভাঙা চুঁইচুঁই আলোর ভেতর বড্ড উদাস কণ্ঠে উল্টোমুখে কথাগুলো বললেন নির্মল ঠাকুর। নিঃসাড় অন্ধকারমাখা ছায়ার ভেতর একফোঁটা জল কি নেমে পড়ল ঠাকুরের গাল বেয়ে? কোমরে ধূতি গাঁথতে গাঁথতে ভেতরে চলে গেলেন এ বাড়ির কর্তাটি। ওইদিকে কে যেন এক আকাশ শোক মেখে নির্লিপ্ততা মেনে নিয়েছে অনন্তকালের। জীবন ও সময়ের গ্রন্থিতে আঁটা তাঁর আটাশ বছর।
গেল বর্ষায় ঠাকুরের সব শেষ। ফসল সমেত সাতকানি ভরা জমি এক মুখেই নিয়ে গেল বেহায়া গঙ্গা। তারপর গোসাইহাটের চালের মিল এবং সর্বশেষ তীনু তপদার আটকে দিল বয়ড়া বাজারের দোকানঘর। সর্বস্বান্ত ঠাকুর এরপর আর দাঁড়াতে পারেননি। ধর্মে-কর্মে এখন আর মন কই! সারাদিন হুঁকো আর অনূঢ়া মেয়ের সঙ্গে প্যানপ্যান করেই দিন সারা। তাঁরই বা কী করার! জীবনের এই বেপরোয়া মহাস্রোত যে এভাবে আটকে দেবে, এ কি দিব্যি খেয়েও বিশ্বাস করেছিলেন নির্মল?
পূজো-অর্চনা তো আর কম করেননি এক জীবনে। তাহলে এ ঘরেই কেন মেয়েটি অমন ট্যারা হবে। এরপর ভয়ে ভয়ে আর সন্তানও নেননি নির্মল। তাঁর চেয়ে বউয়ের ডরটাই ছিল বেশি। যদি আবারও আরেকটা এমন সন্তান হয়, আবারও যদি মেয়ে আসে সংসারে!
বুড়ো নির্মল হুঁকোতে টান দিয়ে নেতিয়ে পড়েন একদম। বিষণ্নতায় ছেয়ে যায় তাঁর চারপাশ। উঠোনে ছুটোছুটি করা একটি ধূসর রঙের প্রজাপতি দেখে তাঁর শখ জাগে, বড় শখ জাগে উড়ে যাবার। মেয়েটাকে উড়িয়ে দেবার। তাঁর কান্না পায়। জড়তাগ্রস্ত দ্বিধাভরা চোরের মতো তাঁর পালাতে ইচ্ছে করে বারবার। মেয়েটি তবে আটাশ পেরিয়ে গেল এ চন্দ্রেই। বাবা হিসেবে তাঁর এ উনপঞ্চাশ বছর তাহলে মরীচিকার মতোই মিথ্যে। অথবা অকর্মণ্য মাঝির মতোই কসরত করে দাড় টেনেছেন জীবনের। দিনশেষে থলে হাতড়ে দেখেন ওখানে জমা পড়েছে নিতান্ত তুচ্ছ দু’পয়সার রেজগি। অথবা তিনি কী উন্মাতাল, দায়িত্বহীন ঘোড়ার মতো শুধু ছুটে গেছেন সামনেই। পেছনে রেখে যাওয়া খুড়ের পদচিহ্ন ধরে পরিবার তাঁকে খুঁজে বেরিয়েছে যুগ যুগ। তাঁর ফিরে তাকাবার ফুরসত মেলেনি তবুও। একদম বেলাশেষে অস্তাচল নামছে যখন, তখন কি তাঁর সমস্তই ঢেকে নিয়েছে জীবনের এই অন্ধকার, যেখানে এসে নির্মল ঠাকুর মহাশূন্যের বিপর্যস্ত পেন্ডুলামে দেখছেন তাঁর মুখ, তার অতীত সমস্ত?
শাড়ীর আচল ছুঁয়ে মেলে ধরা আকাশ। দিগন্তরেখায় যে ছোপছোপ মেঘের দাগ, ঠিক তেমনই ছোপছোপ কষ্ট জমে আছে নির্মলার ভেতর। বাবার নামে মিল রেখেই রাখা হয়েছে নির্মলা। নির্মল ঠাকুরের মেয়ে নির্মলা ঠাকুর। গৃহস্থ বাড়ির পিসি বলল, বাবা নাকি আজকাল তার কথা এড়িয়ে যান। নির্মল কেন এড়িয়ে যান তাঁর মেয়ে নির্মলার কথা? তাঁর চোখ ট্যারা বলে? বাবাকে বোধহয় হাঁটে-বাজারে নানান কথা শুনতে হয় তার ব্যাপারে। লোকে বোধহয় ঠেস মেরে বলে, ‘ও ট্যারা বেটির বাপ। ঘরে আইবুড়ো মাইয়া বসায় রাইখা করো কী, অ্যাঁ?’ অথবা এমনও বলতে পারে, ‘বুইড়া মাইয়া কার গলায় ঝুলাইবা ঠাকুর?’
অনেক বছর আগে পূবপাড়ার মৌমিতা’দি লোকের কথা সইতে না পেরেই তো গলায় দড়ি দিল। শুধু একপা ছোট বলে পাড়াগাঁয়ে কত কী বলত লোকে। শেষে আর সইতে পারেনি মৌমিতা’দি। এক ভোরে পুকুরপাড়ের হিজল গাছটাতেই ঝুলে পড়ল সে।
তাহলে কি পৃথিবীতে মেয়েদেরই পূর্ণাঙ্গ হতে হবে? কত ছেলেরই তো হাত-পা নেই। মূক, অন্ধ, বধির—আরও কত দোষে ভরা। ওরা তো জীবন কাটাচ্ছে দিব্বি। মানুষের যত ক্ষোভ, রেশ, মজা-আনন্দ সব কি মেয়েদের ঘিরেই? নির্মলা নিঃসীম দাঁড়িয়ে থাকে মায়ের ঘরের কোণে। স্থিত ভাগ্যের চক্রবাক কোথায় নিয়ে যাবে তাকে? বিছানায় পড়ে থাকা রোগা টিনটিনে মায়ের বয়সটাই বা হলো কত? একটি ঘোর এবং অহেতুক জীবনের পেছনে তাকিয়ে নির্মলা দেখে, প্রকৃতি তাকে নিয়ে মিছেমিছি সংসার ছড়িয়েছে। যুদ্ধ করা এত শুক্রাণুর ভেতর একটি পঙ্গু বিষাক্ত শুক্রাণুই কি সে? এ কেমন ভাবনা! অবাস্তব বিহ্বলতার ভেতর আটকে যায় নির্মলা। নিঃশব্দ কান্না আসে তার। মনে হয় যদি একটিবার বেরিয়ে পড়ে এই কান্নার স্বর, তাহলে ভেঙে যাবে জগতের সমস্ত দেবালয়।
আটাশ বছরের অস্পৃশ্য এই নারীটি উঠে যায় ধীরে ধীরে। তার যৌবন ও আহ্লাদপ্রেম নুইয়ে পড়ে মাটিতেই। নিজের বুক দেখে ঘেন্না লাগে তার। আস্তে আস্তে আরেকটু কুঁজো হয়ে পড়ে সে। আগুনের তাপটুকু বড্ড লাগছে এবার। চড়চড় করে উঠছে শাড়ির পাড়।
উফ! গতকাল রাতে বাবার কথাগুলো কানে বাজছে মন্দিরের ঘন্টার মতোন। প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বারবার। ‘লইয়া যাও দিবাকর। ওরে আমার দরকার নাই। সোনামুখি সুঁই গাঁইথা গাঙে ভাসায় দিয়ো।’
লেখক : তরুণ কবি ও গল্পকার, ঢাকা
মার্চ 2018

