স্থায়ী রুহে, ভয় নতুবা অভয়ের গুঞ্জন

সংখ্যা:

 

‘মধ্য উনিশ বয়স এই, কী ভয়ংকর

নিজেকে মনে হতে থাকে অকারণ ঈশ্বর’

এই পঙক্তিটা সেদিন তুষারপাতের মতো অনবরত ঝরছিল বনবিভাগের বাংলোটার উঠোনে, পুরনো মরচে ধরা দোলনাটাকে কেন্দ্র করে জমছিল অহংকারী বাক্যের স্তূপ।

ঝিরঝির হিমঝরা রাতে কারই-বা মন শুয়ে থাকে বিছানায়? আর যদি বিগত ষাট হেমন্তের স্মৃতিরা সব মনের বন্ধ দরজা-জানালার ওপাশে হানা দেয়, কাঁচের ওপর রক্তখেকোদের মতো কাটতে থাকে বিষাক্ত নখের আঁচড়, থাকা যায়? ঘরে?

যাপিত জীবনের সব বিস্মৃতি এক ঝিঁ ঝিঁ রাতে হঠাৎ জান্তব হলে আমার শুকনো বৃদ্ধ দেহ থরথর করে, বুক, চোখ, হাত, কাঁপে। ছিটকিনি খুলতে খুলতে ও বেরোতে বেরোতে টের পেলাম, আমাকে ডাকছে কোনো এক অশ্রুত ভাষার জগত।

পুরোনো দোলনাটায় কেউ বসে বসে দোল খাচ্ছে। উঠোনে ল্যাম্পপোস্ট, গাঢ় কুয়াশায় তার আধুনিক আলো বাসি হয়ে আছে। দোলনায় যে দুলছে ধীরে জোরে, দশদিকের ঠিক কোনদিক বরাবর তার মুখ, সংজ্ঞায়িত করা গেল না। সমান্তরাল কোনো ভিন্ন জগতের দিকে মুখ করে কি সে অধিষ্ঠিত?

আমি একা থাকি। কিশোরবেলায় ছিলাম ভবঘুরে। বিয়ে-থা’য় যাইনি কখনো। পাখি ভালোবেসেছিলাম এক—উড়ে যায় পাখি, এই তার বিধি। আমার এই বাড়ি, শহর থেকে বহুদূরে, থানা-মফস্বলও ছাড়িয়ে, না গঞ্জ, শেষ গ্রামটিও এখান থেকে সাত তবক জমিন বা জিবরাইলের শেষ গন্তব্য সিদরাতুল মুনতাহা থেকে আরশের সত্তর হাজার পর্দা পর্যন্ত দূরে, আমি ছাড়া আর কোনো মানুষ আসবে না এখানে। কে বসে আছে তবে ওখানে?

সদ্য কৈশোর পেরোনো অথবা তারুণ্যসুলভ স্পর্ধী শরীরের কেউ বসে আছে। নিবিড় কুয়াশার আড়ালের ভেতর ঢুকছে, বের হচ্ছে, ঢুকছে, বের হচ্ছে, দোলনা দোলার তালে তালে।

আমি তাকে ডাকতে ডাকতে গিয়ে ধাম করে এক হোঁচটে পড়লাম। পৃথিবীর বাছুমণ্ডলের মতো একটা দুর্ভেদ্য বলয় যেন ছেলেটার চারপাশে পাঁক খাচ্ছে। আমি হঠাৎ প্রচণ্ড ডিনামাইট বিস্ফোরণের মতো ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে অসংখ্যেয় পরমাণুর ধাক্কায় সেই বলয়ের পাকটিকে চকিত বিভ্রান্ত করে ওইপাশে গিয়ে পড়লাম।

থরহর করে কেঁপে উঠল যামিনী, সামাল দিতে গিয়ে আমার লাফ, ওর দেহে। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম স্থির… সাত সমুদ্রের সব বাতাস আমাকে উড়িয়ে নিতে চাইছে আবছা অবয়বটির সামনে থেকে।

যেন মাথা নিচু করে অথবা মাথাই নেই কোনো তার—বসে থাকা অবয়বটির দিকে চল্লিশ হাজার বছর এক প্রখর ধারালো তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রওয়ার পর, ধীরে ধীরে, আবার এক পলকে, সজোরেও হতে পারে, আরো চল্লিশ হাজার বছরে ব্যাপ্ত স্রোতস্বতী সময়ের উজান বেয়ে সে মুখ তার দেখা দিল।

তারপর আমার চোখের সামনে দিয়ে পলকে পলকে যেন লক্ষ লক্ষ মুখ, লক্ষ লক্ষ চেহারা, লক্ষ লক্ষ আকৃতির আলোর গতিতে বেগবান মিছিল গেল, আমি তাঁর একটি নির্দিষ্ট রূপ ধরে উঠতে পারলাম না।

দীর্ঘ সময় বা ওটা যেন সময় নয়, কিন্তু কিছু একটা কিছু একটা… অপেক্ষার মতোন—পর, দেখলাম তার মুখ, ওটা আমার চেহারা। আসলে সে তো আমিই। চারপাশ উজালা অন্ধকার। আগুনপোড়া তারুণ্যের ঝলসিত আমি’র সেই মুখ।

তবে, আমার চোখ দুটি তো ওরকম গনগনে চুলার চোখের মতো লাল জ্বলজ্বলে ছিল না! যেন লাখ লাখ তারকা জ্বলছে নিভছে প্রবল আক্রোশে ওর চোখেমুখে, আমার তো অত ক্রোধ ছিল না। সারাজীবনই অন্যে আমাকে নিঃস্ব করে নিয়ে গেছে, আবার গড়েছি, আবার নিঃস্ব করেছে, কই, চিরকাল অপ্রতিভ নির্বিবাদী আমি সলাজ আপত্তিটুকুও করতে পারিনি। আমি যেন তাকে ঠিক, বা হয়তো অতীতের আমিকেই চিনতে পারছি না।

আবার মনে হলো সে খুব মায়াবান চোখের, জগতব্যাপী সকল প্রাণীর সমস্ত মায়ার শত শত গুণ বেশি মায়া ধরা তার চাহনীতে, যেন এখনই গলে যাবে ভালোবেসে ছুঁয়ে দিলে।

‘তোমার কথা এত যে লিখলাম, তা নাম কী তোমার খোকাবাবু?’

‘আমি তোমার পরম সত্য, আমিই জ্যোতির্ময় পরম সত্তা।’

‘না না, হতেই পারে না, অসম্ভব! তোমাকে আমি কল্পনায় গড়েছি। তোমাকে আমি দেখিনি।’

‘আমি তোমার কণ্ঠহারের চেয়েও কাছে বাস করি। আমাকে আড়াল করে, মানুষের দৃষ্টির সে ক্ষমতা নেই, যদি না আমি নিজেই নিজেকে আড়াল করে রাখি।’

আমার সামনে কেউ নেই। আমি দাঁড়িয়ে আছি এক তেপান্তরের গড়ে, চারদিকে হু হু শূন্যতা, যেন অতলান্তিক সমুদ্রের মাঝখানে আমার টাইটানিকটি পুরোপুরি ডুবে যেতে যেতে কেউ এক চুমুকে শেষ করে ফেলেছে সমুদ্রের শেষ জলবিন্দুটি, আর আমি পৃথিবীর অতল তলের এক তাজা মরু বিয়াবানে একাকী পথহারা মুসাফির।

কে কথা বলে, কথা কে বলে, সংলাপগুলো বেজে উঠলো কার কণ্ঠে, আমি খুঁজতে থাকি তারে, দিগন্ত থেকে দিগন্তে কদম কদম ছুটতে ছুটতে সহসা আবিষ্কার করি, আমিই মূলত সে, আরে আমারেই তো আমি খুঁজছি!

 

লেখক : তরুণ গল্পকার, ঢাকা

 

মার্চ 2018

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১