ধুলো জমেছে সেই পুরোনো ডায়েরিটায়। আজ প্রায় পাঁচ বছর পর নবধ্বনিতে লেখা দেওয়ার জন্য ডায়েরিটা খুঁজে বের করলাম।
মা মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে আমার জন্মদিনে ডায়েরিটা উপহার দিয়ে বলেছিলেন, ‘স্মৃতি একপ্রকার ছায়া, যা মানুষের পিছু ছাড়ে না। আমি চাই তোমার জীবনের ভালো ভালো স্মৃতিগুলোও তোমার পিছু না ছাড়ুক। তাই এ বছর তোমার জীবনের ঘটে যাওয়া ভালো ঘটনাগুলো এই ডায়েরিতে লিখে রাখবে। যেন মন খারাপের দিনগুলোতে এসব দেখে কষ্টগুলো একটু হলেও ভুলে থাকতে পারো।’
আমার রোজনামচা লিখতে কখনোই তেমন ভালো লাগত না। তাই রোজনামচা লিখতাম না। তবে মায়ের সাথে কাটানো কিছু ভালো-মন্দ স্মৃতি আর কবিতা লিখেছিলাম ডায়েরির পাতাজুড়ে।
খুব করে মনে পড়ে মা যখন বেঁচে ছিলেন সেই দিনগুলোর কথা। মা প্রতিদিনই ফজরের নামাজের জন্য আমাকে ডাকতে আসতেন। কিন্তু আমি কখনোই ঘুম থেকে উঠতাম না। তবে মাঝে মাঝে চোখ খুলে তাকালে দেখতাম, মা ডায়েরির লেখাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন। তাই এই ডায়েরির অজস্র পাতাজুড়ে আছে আমার মায়ের ঘ্রাণ, হাসি, কান্না, রাগ আর কখনো বা নাকের ডগা থেকে পড়া বিন্দু বিন্দু ঘাম।
মায়ের সাথে কাটানো প্রায় সব স্মৃতি মধুর হলেও মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে মা যখন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন—সেই দিনগুলো ছিল খুব কষ্টের। চোখের সামনে মা প্রতিনিয়ত এমনভাবে কষ্ট পাচ্ছিলেন কিন্তু কিছুই করতে পারছিলাম না। সহ্য হতো না। তখন অনেক কিছুই লিখে রেখেছিলাম। যেদিন শেষ ডায়েরি লিখেছিলাম সেইদিনের শেষ লাইনটা এমন ছিল—‘মা একঘণ্টা যাবত প্রচুর কষ্ট পেয়েছে। রাত একটার পর নাইট শিফটরত প্রায় সব নার্সই কীভাবে ঘুমিয়ে যায় কে জানে! একঘণ্টা ডাকার পর অবশেষে ঘুম থেকে উঠে এসে অক্সিজেন মাস্ক দিলো! এই নির্মমতার একটা বিহিত করতেই হবে। মাকে নিয়ে যেদিন বাসায় ফিরব সেদিন অভিযোগ বাকশে এ বিষয়ে অবশ্যই অভিযোগ করে যাবো।’ (১৩.০৭.২০১৩)
লেখাটা লিখেছিলাম রাত দুইটার দিকে। দুর্ভাগ্য আমার, সেই অভিযোগ আর কখনোই করা হয়নি! জানা হয়নি নার্সদের জন্য সেভাবে রাতের বেলায় আজও কোনো মানুষ কষ্ট পায় কি-না। অথবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে কি-না। জানার আগ্রহও আর ছিল না। কারণ সে-রাতে ঠিক ৩টা ১৭ মিনিটে মা মারা গিয়েছিলেন।
মা মারা যাওয়ার পর অনেকবার ডায়েরি লিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ডায়েরিটা খোলার পর শেষ লেখাটা পড়লে আবার বন্ধ করে দিতে হয়েছে। আর কখনো লিখতে ইচ্ছে হয়নি। বড় আপু বলেছিলেন, নতুন একটা ডায়েরি নিলেই তো হয়। কিনেও দিয়েছিলেন বেশ কয়েকবার। কিন্তু এই আমি আর কখনোই ডায়েরি লিখতে পারিনি।
ধুলোমাখা ডায়েরির এই প্রচ্ছদটা প্রতিদিন নতুন ধুলোয় ধূসরিত হয়। এখনও আমি মাঝেমাঝেই দূর থেকে ডায়েরিটা দেখে ভাবি মায়ের কথা। আজও সবই আছে, নেই শুধু আমার মা। তাই হয়তো আর কেউই আগের মতো ফজরের নামাজের সময় ডায়েরির পাতায় আবদ্ধ আমার কবিতা এবং আমার আর মায়ের স্মৃতিগুলো পড়তে আসে না। আমারও আর লেখা হয় না কিছু।
শিক্ষার্থী, রামপুরা একরামুন্নেসা ডিগ্রী কলেজ, ঢাকা
ফেব্রুয়ারি 2019

