রাত এগারটা বেজে বিশ মিনিট। এলাকার রাস্তাটা জনশূন্য। মার্কেটের দোকানগুলোর শাটার নেমে গেছে। রাতে বড় খ্যাপ মারার আশায় দুতিনটা রিক্সা দাঁড়িয়ে আছে করিম বেকারির সামনে। টুংটাং শব্দ করে দুটো রিক্সা একটা গলির ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল। রাস্তার পাগলটা ল্যাম্পপোস্টে হেলান দিয়ে বিড়ি টানছে। দক্ষিণ দিক থেকে হেঁটে আসছে একটা ছায়া-মূর্তি। গায়ে সাদা জুব্বা। মাথায় টুপি। চলার ছন্দে কেমন মন-খারাপের ভঙ্গি। যুবকের মাথাটা নিচের দিকে। করোটির ভেতর হাজারও চিন্তা। বুকের মধ্যে ধুকপুকানি। টাকাটা আসবে কোত্থেকে?
তার নাম রফিকুদ্দিন। জালিয়াপাড়া এলাকার বাইতুল মামুর মসজিদের ইমাম সে। এই রাতবিরেতে সে আসছে নন্দিপাড়া ব্রিজের দক্ষিণ দিক থেকে। তার বড়ভাইয়ের বাসা ওদিকে। কিছুদিন হয় রফিকের মা ঢাকা এসেছেন। তিনি ভীষণ অসুস্থ। ডাক্তার দেখাতে বড় ছেলের বাসায় উঠেছেন। রফিক প্রতিদিনই মাকে দেখতে যায়। তার যে সামান্য আয় তাতে নিজ সংসারই চলে টেনেটুনে। মায়ের তেমন খেদমত সে করতে পারছে না। ওখুধ-পথ্যির খরচ বড়োভাই-ই দিচ্ছেন। রফিক কিছু ফলটল নিয়ে যেত মাঝেমধ্যে।
বিশ দিন চিকিৎসার পর ডাক্তার বললেন, এখনই একটা ছোট্ট অপারেশন লাগবে। খরচ হবে ১০ হাজার টাকা। মাসের শেষ। বড়োভাই নয় হাজার টাকা জোগাড় করেছেন। রফিককে জরুরি তলব করে বাসায় ডাকলেন তিনি। বললেন, ‘ভাই, আমি তো নয় হাজার টাকা জোগাড় করলাম। মাসেরও শেষ। আর কারও কাছে ধারের জন্য যাওয়ারও নেই। কালকের মধ্যে নয়শ’ টাকা তুই জোগাড় কর, ভাই।’
মাসের শেষ। শহরের সব মানুষেরই মাসের শেষ। রফিকেরও মাসের শেষ। তার পকেটে শেষ সম্বল হিসেবে আছে মাত্র একশ’ টাকা। এই সময়ে সবারই টানাটানি। এখন ধার চাওয়াও অমানবিক। কোথায় পাবে রফিক বাকি ১০ হাজার টাকা!
***
শরীফুন্নেছার স্বামী আছগর আজ দুদিন ধরে অসুস্থ। একেবারে বিছানাগত। গরিব রিক্সাচালক সে। দিন আনে দিন খায়। আগামী দুদিনেও আছগরের সুস্থ হবার কোনো লক্ষণ নেই। দুপুরে ভাত-লবণ আর পানি দিয়ে চলে গেছে ওদের। সংসারের চারটা পেট চলে আছগরের প্যাডেলে। রিক্সার চাকা থেমে গেলে সংসারও স্থবির হয়ে যায়।
রাতে খাওয়ার কিছু নেই। আছগরের অসুস্থ শরীর। না খেয়ে ওখুধও বা খাবে কীভাবে! বাচ্চা দুটো কী করে থাকবে না খেয়ে। শরীফুন্নেছা লজ্জায় কারও কাছে হাতও পাততে পারছেন না। কিন্তু না। তিনি আর পারলেন না। মেয়েটার মুখ শুকিয়ে গেছে। ছেলেটা ছোট। বয়স চার। তবু ওর মুখে রাও নেই কোনো। কচি বয়সেই সে যেন বুঝে গেছে জীবনের মর্মজ্বালা।
শরীফুন্নেছা সন্তান দুটোকে নিয়ে রাস্তায় নেমে গেলেন। আছগর শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলেন। জ্বরের আতিশয্যে তার চোখদুটো বুজে এল পরপরই।
***
বড়োরাস্তা ছেড়ে গলির মধ্যে ঢুকে পড়ল রফিক। তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে টাকার চিন্তা। কার কাছে ধার চাইবে সে! ‘হে আল্লাহ! সাহায্য করো। সুস্থ করে দেও আমার মাকে।’—মনে মনে সে কেবলই এই প্রার্থনা করছে।
নন্দীপাড়ার চার নম্বর গলির ভেতর পা দিল রফিক। সামনে থেকে একটা আর্তনাদ ছুটে এল। তার কানে আঘাত করল। সম্বিৎ ফিরল তার। ক্রমাগত আর্তি ছুটে আসছে সামনের ঐ বিল্ডিংটা থেকে। রফিক এগিয়ে গেল। চোখ নিবদ্ধ রাখল সামনের ঐখানটায়। সাততলা ডিল্ডিংয়ের সামনে এল। দেখল, একজন মা তার দুই সন্তান নিয়ে পাঁজর-ভাঙা হাহাকার করছেন। আকাশ-ছোঁয়া বাড়ির দিকে মুখ তুলে দুমুঠো ভাত চাচ্ছেন। তাঁর সন্তানের জন্য দুমুঠো ভাত দেয়ার মতো সামর্থবান কেউ নেই ঐ বিল্ডিংয়ে। মা তাঁর সন্তান দুটোকে নিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালেন। কাঁদতে-কাঁদতে এগিয়ে যাচ্ছেন। তার গলা চিড়ে একটা আবদারই বেরিয়ে আসছে—‘দুমুঠো ভাত দিবেন স্যার-ম্যাডামরা…!’
আনমনেই রফিকের পকেটে হাত চলে গেল। একশ’টা টাকা তার পকেটে। সামনে অভুক্ত তিনটা প্রাণ। একদিকে শয্যাশায়ী মা। ১ হাজার টাকা তার অপারেশনের জন্য দরকার কাল ভোরেই। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে অসহায় মায়ের সামনে চলে এল সে। ফুটফুটে মেয়েটাকে দেখে রফিকের বড্ড মায়া লাগল। তার চোখে ভেসে উঠল তারই আত্মজা কন্যার ছবি। ভাবল, তার মেয়েটাও তো আজ রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে পারত। বিমর্ষ মুখ করে খাবারের জন্য দুয়ারে দুয়ারে ছুটতে পারত। আর কিছু ভাবল না সে। টাকাটা বের করে বিপন্ন মায়ের হাতে গুজে দিলো। টাকা পেয়ে তো শরীফুন্নেছা অভিভূত। দুহাত তুলে ধরলেন তিনি মহান প্রতিপালকের দরবারে। রফিক মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে বাসার পথে হাঁটা দিলো।
বাসায় ফিরে মেয়ে আয়েশাকে বুকে নিয়ে হুহু করে কান্নায় ভেঙে পড়ল রফিক।
***
ফজরের নামাজ শেষে ইমাম রফিকুদ্দিন বসে আছে। মায়ের জন্য টাকার ব্যবস্থা কীভাবে করবেন, সেই চিন্তা তার মাথায়। সারা রাত নির্ঘুম কেটেছে। শেষ রাতে উঠে রবের দরবারে জানিয়েছে অশ্রুঝরা নিবেদন।
মুসল্লিরা একে একে বেরিয়ে যাচ্ছেন। কাতারের উত্তর দিক থেকে এগিয়ে আসছেন আবু জাফর সাহেব। ইমামকে সালাম দিয়ে মোসাফাহ করলেন। হাস্যবদনে বললেন, ‘হুজুর! গত রাতে আমার একটা নাতি হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ! ছেলে-বউ আর নাতি দুজনেই সুস্থ আছে। হুজুর, আপনি একটা নাম ঠিক করে দিন।’
মুচকি হেসে সুন্দর একটা নাম ঠিক করে দিলেন ইমাম সাহেব। আবু জাফর সাহেব ওঠার সময় মুষ্ঠিবদ্ধ ডানহাত সামনের দিকে এগিয়ে কাচুমাচু হয়ে বললেন, ‘হুজুর, আপনার জন্য সামান্য হাদিয়া।
রফিক দেখল পাঁচশ টাকার দুটো চকচকে নোট দিয়েছেন আবু জাফর সাহেব। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল গত রাতের সেই অসহায় মায়ের মুখ। যিনি হাত তুলে বলছিলেন, আয় আল্লাহ, এমন সন্তান যেই মায়ের, সেই মাকে তুমি ভালো রাইখো।’
ফেব্রুয়ারি ২০২০

