তখনও আমি লিখতে শুরু করিনি। হিফজ শেষ করে মাত্রই ফার্সিখানায় ভর্তি হয়েছি। মাদানীনগর মাদরাসায় তখন বাংলা লেখালেখির অবাধ স্বাধীনতা। প্রায়দিন ফজরের আগে ঘুম থেকে উঠেই দেখতাম দেয়ালে দেয়ালে নতুন দেয়ালিকা। ব্রাশ করতে করতে পড়তাম দেয়ালজুড়ে স্বপ্ন তৈরি করে রাখা লেখাগুলো। প্রতিটি দেয়ালিকায় একটি বিভাগ নিয়মিত পড়তাম—ডায়েরি। তারিখ দিয়ে লেখা সারাদিনের বৃত্তান্ত।
চারপাশের এইসব লেখালেখি দেখতে দেখতে ইচ্ছে হলো, আমিও লিখব। বলবার মতো গল্প নেই ঠিক, কিন্তু সকালবেলা বোর্ডিংয়ে রান্না হয় যে স্বর্গীয় স্বাদের খিচুরি, তার কথাই আমি লিখব। লিখব মাদরাসার মাঠে আমগাছে বসে থাকা জোড়া শালিকের কথা। কেমন করে একটি শালিক আরেকটি শালিকের উষ্ণ আরামে ডুবে থাকে, তার কথা। ডায়েরিতে নিঃসঙ্গতার গল্প বলব; হাউজের পানিতে টলোমলো চাঁদের সাঁতার কাটার কথা বলব।
একদিন এক বড় ভাইকে বললাম, ‘আমি লিখতে চাই। কী করতে পারি?’ তিনি মুচকি হেসে বললেন, ‘ডায়েরি থেরাপি নিতে পারো।’
থেরাপি শব্দটি একটি হাসপাতালীয় শব্দ। শব্দটি শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে অনেকগুলো যন্ত্রপাতি। আর কীসব হাবিজাবি। বেডে শুয়ে আছি। নার্স থেরাপি দিচ্ছে। ভয়ে চোখ বন্ধ করে আছি দেখে নার্স বলছে, ভয় পাচ্ছো বাবু? আমি ভারী যন্ত্রের কারণে মাথা নাড়াতে পারছি না। চেহারায় সামান্য হাসির ছোঁয়া দিয়ে বুঝালাম, খারাপ লাগছে না। খারাপ যেহেতু লাগছে না, ভয়ও লাগছে না।
আমি বড় ভাইকে বললাম, ‘ডায়েরি থেরাপি কী?’
তিনি বললেন, ‘প্রতিদিন ডায়েরি লিখবে। যা পড়ছ, যা ভাবছ, যা দেখছ—লিখে রাখবে। ডায়েরি লিখতে লিখতে লেখায় সাবলীলতা আসবে। ভাষায় মনের অনুভূতি ব্যক্ত করার হাজারও আঙ্গিকের সঙ্গে পরিচিত হবে।’ আমার ডায়েরি লেখার দিন শুরু হলো।
ডায়েরি লেখা মানে সময়টাকে ধরে রাখা। সুখগুলো, দুঃখগুলো, হাসিগুলো, আনন্দগুলো জমিয়ে রাখা যাদুর বাক্সে। একদিন আমরা যখন সময়গুলো ফেলে যাই, তখন আবার সময়গুলো দেখতে ইচ্ছে করে। যাদুর বাকশো খুলে বসি, বাকশের ডালা মেলে দিলেই আকাশ ভরে যায় স্মৃতিতে। দিনশেষে যখন নিঃসঙ্গ হয়ে যাই, এই যাদুর বাকশে জমিয়ে রাখা স্মৃতিগুলোই আমাদের দারুণ সঙ্গ দেয়।
যিনি ডায়েরি লিখতে শিখিয়েছিলেন, তিনি এখন আর আমাকে ডায়েরি লেখার কথা জিজ্ঞেস করেন না। কালেভদ্রে দেখা হলে জিজ্ঞেস করেন, ‘কোন পত্রিকায় লিখছ?’ আমি লজ্জায় পড়ে যাই। লজ্জায় লাল হয়ে যায় মুখ। গোঁফ ভিজে ওঠে অস্বস্তির ঘামে। দুষ্টুমিতে ধরা পড়ে যাওয়া ছাত্রের মতো মাথা নিচু করে বলি, ‘কোনো পত্রিকায় লিখি না।’ তিনি ভরসা দেন—‘লিখতে পারো।’
আমি আবার ডায়েরি লিখতে শুরু করি। নিজেকে নিজে প্রশ্ন করি, পত্রিকায় লিখতে পারবি? সাহস আছে গল্প বলার? সাহস আছে স্বপ্ন ছড়িয়ে দেবার? আমার সাত বছরের সবগুলো ডায়েরি একসঙ্গে বলে ওঠে, আমরা সাক্ষী, তুই পারবি। আমাদের প্রতিটি পাতায় তুই স্বপ্ন ছড়িয়ে দিয়েছিস। গল্প বলে গিয়েছিস অনর্গল। আমাদের বুকে এত শিহরণ, আনন্দের এত উদযাপন—রাত জেগে তুই দিয়েছিস।
আমার ডায়েরির সঙ্গে আমি কথা বলতে শুরু করি। যাপিত জীবন এবং যৌবনের কথা। যেখানে স্বপ্নের ধোঁয়ায় সবকিছু কেমন ঘোরের মতো লাগে। যা দেখি সবই নতুন লাগে। ডায়েরির সঙ্গে কথা বলা শেষ হলে আমি একটি পত্রিকার জন্য গল্প লিখতে বসবো। ডায়েরি লেখা থেকে প্রমোশন পত্রিকায়। যেন একটি প্রমোশনাল গল্প।
ফরিদাবাদ মাদরাসা ঢাকা’র শিক্ষার্থী
ফেব্রুয়ারি 2019

