ডায়েরি আমার কাছে কেবল ডায়েরি নয়, বরং আমার সবচেয়ে মনোযোগী শ্রোতা। আমি মনে করি আমার জন্য ডায়েরির চেয়ে মনোযোগী কোনো শ্রোতা খুঁজে পাওয়াই ভার।
মন খারাপ? ডায়েরিটা খুলে বসি। ভীষণ আনন্দ? তখনও ডায়েরিই আমার সঙ্গী।
বুকের ভেতর পুষে রাখা শত মান-অভিমানের নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে থাকে এই ডায়েরি। হাজারো অভিযোগেও বাধ সাধে না কোনোদিন। স্বপ্নের সফলতায় আমার আনন্দের উদ্বেল আর স্বপ্নভঙ্গের বেদনাময় আর্তনাদ—সবটাই শোনে আমার ডায়েরি।
ডায়েরির সঙ্গে এই সখ্য শুরুর গল্পটা একটু অন্যরকম। তখন আমি খুব ছোট। সবে ক্লাস থ্রিতে পড়ি। মোটামুটি ধরনের গলার দরুণ একটা শিল্পীগোষ্ঠীর সদস্য হয়েছিলাম। প্রথম যেদিন অডিশনে টিকে যাই, ভাইয়া একটা ডায়েরি কিনে দেন। আমার প্রথম ডায়েরিতে প্রথম লেখা ছিল একটা ইসলামি গান—‘বিসমিল্লাহ বলো বিসমিল্লাহ’।
সেই শিল্পীগোষ্ঠীতে বেশিদিন সক্রিয় ছিলাম না। মাসখানেক পরে ছেড়ে দিয়েছিলাম ওসব। কিন্তু ততদিনে ডায়েরি আমার বন্ধুত্বের জায়গা দখল করে নিয়েছে। প্রথম প্রথম শুধু ইসলামি গান সংগ্রহ করতাম ডায়েরিতে। একদিন সাহস করে দু’লাইন নিজেই লিখে ফেললাম।
‘একটা ছিল পাজি বুড়ি
বয়স কে জানে কয় কুঁড়ি
নবির পথে কাঁটা দিত…’
এতটুকু লিখেই হাঁপিয়ে গেলাম। আর মিলাতে পারছিলাম না। বান্ধবীদের সাথে পরামর্শ করলাম। লাভ হলো না। আমার কবিতা লেখার সাধ মাঠেই মারা গেল।
দমলাম না। বড়মামার প্রেরণায় রোজনামচা লিখতে শুরু করলাম। অল্প ক’শব্দ করে প্রতিদিন লিখতাম। ততদিনে ক্লাস ফাইভে উঠে গেছি এবং আমার ডায়েরির সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু আমি আলসে হয়ে গেছি। ডায়েরিগুলোয় ধুলো জমতে শুরু করেছে।
ক্লাস ফাইভের সমাপনী পরীক্ষার পর দীর্ঘ ছুটি পেলাম। একঘেয়েমি বোধ কাটাতে ফিরে এলাম ডায়েরির কাছে। প্রতিদিনের টুকরো গল্প জমতে থাকে ডায়েরির পাতায়। ছুটি শেষ হয়। ফের ব্যস্ততা জাপটে ধরে আমাকে।
দিনগুলো কাটতে থাকে নানান রঙে, নানান ঢঙে। কখনো হর্ষে, কখনো বিষাদে। পৃথিবীটা অন্যরকমভাবে ধরা দেয় আমার কাছে। আমি আবিষ্কার করি আমার চারপাশে কাছের কেউ নেই। পাশে থেকেও যেন সবাই ভীষণ দূরের। ফের কাছে টেনে নিলাম পুরোনো বন্ধুকে। প্রতিটি বিষণ্ন বিকেলের সঙ্গী হয়ে ওঠে ডায়েরি।
আমার জগতে তখন শুধু আমি আর ডায়েরি। হবেই না-বা কেন? ডায়েরির তো আমার সাথে মতবিরোধ হয় না। মনোমালিন্য হয় না। আমার অকারণ বিষণ্নতার কারণ পুছে বিরক্ত করে না। ঠিক যেন মনবন্ধু। মন যা চায় লিখে যাই। ডায়েরির স্তূপ জমে। নতুনগুলোয় লেখা হয় আর পুরোনোগুলোতে ধুলো জমে। মনের কোণে বেজে ওঠে গানের সুর—ধুলো পড়া ডায়েরিটা পড়ে আছে যেমন তেমন…
বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী থেকে
ফেব্রুয়ারি 2019

