ডায়েরির পাতা থেকে

সংখ্যা:

 

মথিত কুয়াশার ভেতর একপিঠ হিম অনুভব করেই ভোরটা মাড়ালাম। দু’পা হেঁটে কোনো এক নির্জীব বয়স্ক মানুষের মতোই কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে অমল নিরুদ্বেগ জীবনের কোল ঘেঁষে টই টই অথবা সুস্থির চলে যাব কোথাও। যেখানে ক্লেদ ও সহিংস কোনো চোখ আমাকে দেখবে না। ডাকবে না আনাড়ি গোমড়া কেউ। একটু আলাদা, সামান্য প্রয়োজনীয় বিচ্ছিন্নতা। এই তো। একটি দোয়েল পাখি কিবা সারশের মতো গাছেতে, জলেতে আমি বইবো। অথবা দোল খাব এই শিশিরভেজা কাঁঠাল পাতাটির মতো। যেটি সবে কিছুটা ঘুরে আমার সম্মুখে পদানত হলো। সর্বাঙ্গ ভেজা পাতাটির গায়ে কী অপরূপ শিশিরকণা। মাটিতে একাকার হয়ে গড়িয়ে আছে যেন সুন্দর। আমি উবু হই। পাতাটি বুক-পকেটে ভরে সামনে এগোই। আর কোনোদিনও যদি এই সকাল ও বিমোহিত সুন্দর হয়ে পাতা পড়া আমার চোখে না পড়ে, তবুও আমার দুঃখ নেই। অথচ আমরা কেমন এগোতেই থাকি। এগোতে এগোতে কোথায় যে চলে যাই। কোন পথের বাঁকে! তা কি আর আমাদের জানা রয়! প্রহর থেকে প্রহর। আমরা প্রবাহিত হই সময় ও একটি বহমানতার সাথেই।

এই তো তারপর। বিকেল এলো। দুপুর নাগাদ কত রঙ ধরে এলো আকাশ। রোদ নরেম। কিছুটা হালকা উষ্ণ প্রলেপ। বারোটা নাগাদ মরা মরা। এরপর কিছুটা কড়া। তবে তেজ নয়, মোলায়েম। এই করে দূর গাছটির ওপর জ্বলে ওঠা রোদটি, আমার ঘরের মাঝে জানালার একপাট দিয়ে উড়ে আসা রোদটি, কম্বলে দাগ পড়া রোদটি ধরতে ধরতেই কিনা সময়টা চলে গেল। অথচ ধরা হলো না একখণ্ড রোদ। যেন-বা ঘাসবনে বিপ্রতীপ প্রজাপতিটির পুচ্ছতেই এই রোদ বড় অয়োময়। গোলাপ ও নাম না জানা ফুলটির হলুদ পাপড়িতে লেগে থাকা এই আলো আরও লাস্যময়। ফুলের বুক যদি নারীদের মতোই দেখা যেত! ছোঁয়া যেত! বলছি, নারীদের মতো আকৃতি যদি হতো ফুলের, তাহলে যে করেই হোক, যেভাবেই হোক আমার সমস্ত রোদ আমি ফুলেদের বুকে ঢালতাম। কিবা রোদ তাড়িয়ে নিয়ে যেতাম রাখালের মতোই। তখনও প্রতিদিন বিকেল নেমে যেত। যে-করে এখন নেমেছে।

রিকশায় বসে শহুরেপনা দেখছি। দূর থেকে রমনা পার্কটি গোচর হতেই মনে পড়ে গেল অতীত। কী এক অদ্ভুত ভাবনায় তাড়িত হয়ে শরতের আকাশ দেখব বলে আমরা এসেছিলাম এইখানে। ঢাকা শহরে তো আর অমন শান্ত, সুস্থির হয়ে কোথাও একদণ্ড বসবার অবকাশ নেই। তাই এই ঘাস ও গাছের তৃণমূলের ভেতর আমি আর আমার বন্ধুটি এসেছিলাম। এখন খুব করে মনে পড়ছে ওকে। এই রমনা। ওই তো আরেকটু ভেতরে। শকুন্তলার নিচেই বসেছিলাম আমি আর আব্দুল্লাহ। কবি মন ছিল ওর। অথচ পড়ে থাকত নভেল-নাটক নিয়ে। সারাক্ষণ কলকাতার উপন্যাসে মুখ গুঁজে বেমালুম ভুলে যেত ইহজগতের কথা। হঠাৎ এক দুপুরের পর ও-ই তো বলেছিল, ‘চল, শরতের আকাশ দেখে আসি।’ ‘কোথায়?’ ‘রমনায়।’ দু-একবার হ্যাঁ-না করে চলে এসেছিলোম। সেই তিন বছর আগে আজকের মতোই কোনো এক শরতের বিকেলে। সেইদিন এত মানুষ চোখে পড়েনি। এত ভিড়, কোলাহল, উৎসবের মতো করে বেড়ানো দেখিনি। আমরা নিশ্চুপ নিষ্পলক খানিক সময় আকাশে তাকিয়ে ছিলাম। রোদগুলো তখন যায় যায়। আড়াল হতে হতে মোটা গাছের ওপাশে চলে গেলে আমাদের ওপরে পড়ে একটি ছায়া। একটি তিরোহিত রোদের কোনো সলীল খোলসটা বুঝি। আমি অত কাব্যি নই। তাই অতটা অনুভব করিনি বোধহয়। কিন্তু আব্দুল্লাহ! আব্দুল্লাহকে দেখেছিলাম যেন করুণ এবং পলকহীন বিমূঢ় বিস্ময়ে রোদের শেষ ছায়াটিও দেখতে চাইছেন।

আব্দুল্লাহ এখন সাভারে। এক মাদরাসার মস্ত হুজুর। তাঁর সাথে আমার কথা হয়। দেখা হয় মাঝেমাঝেই। কখনো সখনো রাতে তার দেখা পাই। আমি যেখানে থাকি। মালিবাগে। এখানে তাঁর বোনের বাসা, ভাইয়ের বাসা। তাই আসা হয় বোধহয়। কিন্তু আমি তা মনে করি না। সজ্জন ও প্রবল বন্ধুভাজন নিঃস্বার্থ আব্দুল্লাহ বোধকরি আমার ও আমাদের সাক্ষাতেই আসে। যদিও আমাদের কথা হয় না। সময়ের অভাবে। কাজের চাপে। তাঁর দ্রুত চলে যাওয়ায়। কিন্তু এই যে আসা, একটিবার চোখে দেখে যাওয়া, তা কি এমনিতেই মুছে যাবে? হারিয়ে যাবে কোনো দমকা হাওয়ায়? তা তো নয়। এ তো মোছবার নয়। এইরম এক নিস্তেজ বিকেলের পারে বসে তাই আব্দুল্লাহকে আমার স্মরণ হচ্ছে ক্রমশ। নিতান্ত অনিচ্ছা নিয়ে আমি স্মৃতিকাতর হচ্ছি বন্ধু। তুমি তো এ শহরেই। সব ঠিকই চলছে। ভালোই আছ, জানি। কিন্তু এই যে বিকেল চলে যায়, শীতের বিকেলগুলো রোদ ঠকে চলে যায় অনন্ত বিলুপ্তির পথে, তোমাকে কি তা অনুরিত করে? আমার মতোই এমন নিঃসীম একাকী করে ভাবায়? এই প্রশ্ন রিকশায় করে যেতে রমনার সদর প্রধান প্রবেশদ্বারটিতে ছুড়ে মেরে গেলাম।

যদি কোনোদিন আবার ফেরা হয়, আবার পেছনে আসা হয় ধীমত্ত কবি অথবা ভবঘুরে বোহেমিয়ান হয়ে, যেখানে কোনো তোয়াজ বা নিয়মের তোয়াক্কা নেই, আমরা বিকেল ও সন্ধ্যার আগমনে রোদ তাড়িয়ে নেব ষষ্ঠীর মতোন। তবে আসিও। এই রমনায়। এই শহরেই ফিরে ফিরে আবার আসবার তাড়া আসুক আমাদের। দলছুট বিচ্ছিন্ন পাখির মতোই কোনো এক মালতির পদচিহ্ন ধরে আমরা ফিরে আসব। এই রোদন ও আকাঙ্ক্ষা আরও ঘন ও তীব্রতর করে আমাদের জাগিয়ে তুলুক আবার। সেইদিন আবার আসা হবে। প্রশ্নটি তুলে সদর প্রবেশদ্বার দিয়ে ভেতরে যাব। কারও মুখ না-চেয়ে সোজা সেই গাছটির তলে। শকুন্তলায় গিয়ে একদণ্ড বসতে পারার অমোঘ স্বাদ নিয়ে হাঁটব। হাঁটব, হাঁটব… এভাবেই সন্ধ্যা নেমে যাবে। আর আমি একা। আপনি একা। সবাই একা।

 

তরুণ কবি ও সাহিত্যিক

 

ফেব্রুয়ারি 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১