অক্ষুব্ধ এক স্তব্ধতা নেমে আসা ওই হিফজখানার মখমল বিছানাটিতে শুয়ে আছি আমি। এখানে একটি ডিমবাতি জ্বলে আছে। সবুজ রঙের এ ডিমবাতিটি কী ঐশ্বরিক আলোকে পুরো কামরা জড়িয়ে রেখেছে। মশারির ভেতর ভোর রাতে সবক শোনাবার অধৈর্য অস্থিরতা নিয়ে শুয়ে থাকা এক শূন্যচিন্তক আমি, যার হাতে এখন একটি ‘ডায়েরি’। যাতনার ইতিহাসে ভরা এ ডায়েরিটির রঙিন প্রচ্ছদে ঢেউ খেলানো অক্ষরে লেখা ‘আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি’। আধো আলো আধো জোছনার ভেতর নির্ঘুম ‘আমি’ খচখচে শব্দের ছন্দে ছুটে যাচ্ছি বিরতিহীন। যেন বক্ররৈখিক এক জীবনের মাঝে বৃত্তের আগমন কিঞ্চিত নির্বিশঙ্ক অভয়।
তখন থেকেই মূলত ডায়েরির প্রতি আমার অভিরতি অনুরতির সৃষ্টি। ইতিহাস সৃষ্টির খেয়ালে কিংবা একান্ত মনের আলাপ বেঁধে রাখবার জিগিরে আমি রোজ রাতেই বসতাম আমার ডায়েরির সান্নিধ্যে। পৃথিবীর কাউকে না-বলতে পারা সব বাতচিত আমি ওর সঙ্গেই করতাম। ভুল বানানে প্রেমের তাশরিহ অথবা অব্যক্ত প্রেমিকার কাছে ওড়াতে থাকা চিঠির শব্দগুলো আমি খুব সন্তর্পণে এখানে গুছিয়ে রাখতাম। নিভু নিভু ডিম বাতির আলোয় লিখতে থাকা আমার মনে হতো একদিন নিশ্চয়ই ছুঁয়ে যাব পৃথিবীর আকাশ; সেদিন কি এ অক্ষরগুলো জ্যোতির মতো জ্বলজ্বলে হয়ে উঠবে না? ভেবে ভেবে নিজের কাছেই লজ্জায় মুখ নুয়ে আসত আমার। ফিক করে হেসে ফেলে বন্ধ করে দিতাম রংচঙে সেই ডায়েরিটি।
একটি মাত্রই ডায়েরি আমার লেখা হয়েছে যদ্দুর মনে পড়ে। কিন্তু সে ডায়েরিটি কী অবাক বিস্ময়ে আমার শেলফে আজও তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। পুরোনো প্রেম অথবা কৈশোরে আমাদের জীবনে নেমে আসা সব সংগ্রামের ইতিহাস, একে একে আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় ফেলে আসা সেই সময়ে। আমাকে নিয়ে যায় টিনের চালা দিয়ে কোনোরকম নির্মিত সেই ছোট্ট দালানটির বিচিত্র আঙিনায়। রাতে বৃষ্টি হলে ফুটো দিয়ে পানি পড়বার শঙ্কা নিয়ে আমরা ঘুমোতে যেতাম। কখনো বৃষ্টি নেমে এলে আমাদের ‘আম্মু’ হন্যে হয়ে সে রাতেই পানি সেঁচে ফেলার জন্যে তড়িঘড়ি করতেন। কত যাতনাময় সে সময়ের গল্প। আমার ডায়েরির পৃষ্ঠাগুলো ধরে ধরেই কেবল আমি ফিরে যেতে পারি আমার সেই সময়গুলোতে। এ সময়গুলোকে আমি কখনো ‘হারানো’ সময়ও বলি। নানা দুর্বিষহতার ভেতর দিয়েও নারকেলতলায় আমাদের রিনরিনে সে সুখের গল্প যখন হাজির করে আমার ডায়েরি, তখন আমার সত্যিই মনে হয় ‘মা মাদা মাদা, লাইসা লাহুল কাদা’।
‘ডায়েরি’ আমার মনে অবিচ্ছেদ্য এক অংশকে নিয়ন্ত্রণ করার পেছনে আরও কিছু কারণ ছিল। ওই যে ঘর, নারকেলতলায় টিকে থাকা জুবুথুবু সময়, তখন মাঝে মাঝেই দেখতাম আম্মু কী যেন পড়ছেন লুকিয়ে। আমাদের উপস্থিতি টের পেলেই আম্মুর মুখে সেটা লুকিয়ে ফেলার ব্যস্ততা টের পেতাম। কখনো ওড়নায় মুখ জড়িয়ে আস্তে করে কেটে পড়তেন। মাঝে মাঝে নরম সুরে আমাদের সরে আসতে বলতেন। কিন্তু ‘আল-ইনসানু হারিসুন ফি মা মুনিয়া’র পদভারে পিষ্ট আমাদের কৌতূহল কেবলই বাড়তে থাকত। আমাদের ছোট্ট মন বলত, আম্মু এটা পড়ে কাঁদছেন কেন? কী আছে এতে? ওড়নার একটি পাশ আস্তে করে ধরে যখন তিনি মুছতেন তাঁর চোখ দুটি, আমাদের হৃদয়ে হতো প্রবল রক্তক্ষরণ।
ক’দিন পরই আমরা এর রহস্য খুঁজে বের করতে পেরেছিলাম। আব্বুর প্রবাস-জীবনে একা একা এ দেশটিতে পড়ে থাকা আম্মুর সে সময়কালের লেখা একটি ডায়েরি এটি। আব্বুর অনুপস্থিতিতে তীব্র যাতনার ভেতর দিয়ে চলতে থাকা আম্মুর সে সময়ক্রম, যেন এখন সবই ভাবনার ঊর্ধ্বে। বেসামাল সাংসারিক অতৃপ্তি, এখানের মানুষজনের উচ্চাভিলাষ, সত্যিই সদ্য বিশ পেরোনো এক কিশোরীর জন্যে আকাশসম ভার ও দুর্বহ। সবকিছু হরফে হরফে লিখে রাখা একটি ডায়েরি একটি জীবনের জন্যে কী এক অবিস্মরণীয় স্মৃতিকে ধরে রেখেছে, আম্মুর সে ডায়েরি আজও আমাদেরকে বিহ্বল করে তোলে। মনে করিয়ে দেয় জীবনের এ ক্ষণকাল, এক তৃতীয়াংশ অতীত আর দুই তৃতীয়াংশ ভবিষ্যতের যে সময়ক্রম, সবগুলোকে একটি সুতোয় গেঁথে রাখবার জন্যে একটি ডায়েরিই তো যথেষ্ট।
কেউ দেখে না-ফেলুক এ রত্ন। আলমারিতে কাপড়ের নিচে অথবা ড্রয়ারের কোণে ডায়েরিটা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা আমি সবসময়ই করতাম। ভেতরে টুকে রাখা চুপিচুপি আলাপ কেউ যদি জেনে ফেলে, কী কাণ্ডটাই না হবে! আব্বুর ভয় আর আম্মুর আদুরে শাসনের কাছে আমি পরাস্ত ছিলাম সবটা সময়। লুকোচুরির এ খেলা খেলে যাওয়া সত্ত্বেও একদিন সব একসঙ্গে জেঁকে বসল যেন। বালিশচাপা দিয়ে রাখা ডায়েরি হুজুর দেখে ফেললেন। জমা নিয়ে আব্বুকে দিয়েও দিলেন। চারপাশে এক ডায়েরিকে কেন্দ্র করে রই রই রব উঠলো। ছেলেপেলের মুখে শোনা গেল নানান কিসিমের কথাবার্তা। পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় সাজিয়ে রাখা কল্পিত এক প্রেমিকার চরিত্র ঝুলিয়ে দিল নিন্দার অসম পর্বতের বিশল্যকরণী লতায় লতায়। সেই থেকে আমার মনেও বাজতে থাকল একটি শব্দ—‘মাহফুজা, হায় মাহফুজা!’
আসলে একটি ডায়েরি এমনই বিচিত্র সত্ত্বার ধারক। কখনো ঝকমকে ঝুমকো লতার মতো চটকদার, আবার সে-ই তো অব্যাখ্যেয় এক সমঝের অংশীদার। ফলে সব সময়ই জীবন অথবা ঘরের চোখ ধাঁধানো শেলফে সে অবর্ণনীয় আলোকের মাঝে এক নিরপরাধ আঁধার।
মাদরাসাতুল কাউসার ঢাকা’র শিক্ষার্থী
ফেব্রুয়ারি 2019

