যেখানে লেখা থাকে যাপিতের দীর্ঘশ্বাস

সংখ্যা:

 

কখন কোথায় প্রথম ডায়েরি দেখি, মনে পড়ে না। এইটুকু মনে পড়ে, আমাদের হিফজের সময় শিক্ষকের ডেস্কের ওপর কালো প্রচ্ছদের একটা ডায়েরি রাখা, উনার অবর্তমানে আমরা সেটা উল্টেপাল্টে দেখি। চোখে অপার মুগ্ধতা। ভেতরে কিছু সুন্দর দৃশ্য ছিল; ওগুলোই হয়তো আমাদের মূল আগ্রহের কারণ। বড় কোনো মাদরাসার বিদায়ী ছাত্রদের করা কাজ ছিল বোধহয়। আজ আর সেসব স্পষ্ট মনে পড়ে না। দুরন্ত কৈশোর তখন। চোখে মুগ্ধতার আবেশ। চারপাশে যা দেখি ভালো লাগে, নির্মল।

মাদরাসার পাশের লাইব্রেরিতে প্রায়ই যেতাম আমরা। অবসরের সময় অথবা শিক্ষকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে নানা অজুহাতে যাওয়া হতো। স্কুলের পাঠ্যবই ছাড়া আর কোনো বই চোখে পড়েনি কখনো, তবে বাহারিরঙের খাতা, কলম, রঙপেন্সিল, ইরেজার আরও কতো কী! একবুক হাহাকার নিয়ে ফিরতাম মাদরাসায়।

সেই লাইব্রেরিতেই একদিন বিকেলে দাঁড়িয়ে আছি একলা। হঠাৎ করেই চোখ পড়ে বেগুনি রঙের একটা বাকশোর ওপর। অনেকক্ষণ পরে বুঝতে পারি এটা ডায়েরি। প্রচ্ছদে লাল-হলুদের ডোরাকাটা, অনেক সুন্দর। দেখে আর চোখ ফেরাতে পারি না। ভাবি, যে করেই হোক এটা নিতে হবে; কিন্তু এত টাকা পাব কোথায়? বাড়ি থেকে তখন একশ’ টাকা করে দেয় মাসে। দুরুদুরু বুকে দোকানিকে দাম জিজ্ঞেস করে যা শুনলাম তার জন্য আমাকে আরও চার-পাঁচ মাস অপেক্ষা করতে হবে। এদিক-সেদিক না ভেবেই বলে ফেলি ডায়েরিটা আমার এখন প্রয়োজন; প্রতিমাসে পঞ্চাশ টাকা করে দিয়ে দেবো। দোকানি অনেকক্ষণ চুপ থেকে চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে পেপার দিয়ে বেঁধে দেন।

বুকের ভেতর একবুক কৃতজ্ঞতা আর তুমুল উচ্ছ্বাস নিয়ে মাদরাসায় প্রবেশ করি। পাশের সিটের নাঈমকে জাগিয়ে তুলে ঘটনা বললে ও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বলে, ‘এটা রাখবি কোথায়?’ আমিও ভাবনায় পড়ে যাই, মাদরাসায় আমার ট্রাঙ্ক-সিট কিছুই নেই। শেষে নাঈম ওর ট্রাঙ্কে রাখার কথা বলে। আমিও রাজি হয়ে যাই।

ছাদে গিয়ে প্যাকেট খুলে দেখি—উপরে যেটা ছিলো ওটা ডায়েরির প্রচ্ছদ, মূল ডায়েরি ভেতরে। খয়েরি রঙের প্রচ্ছদ, তার উপরে খোদাই করে লেখা : ২০০৯। ভেতরে তিন রঙের পৃষ্ঠা। পৃষ্ঠার শেষে মনীষীদের বাণী।

বিকেলে দোকান থেকে রঙবেরঙের কলম কিনে আনি, অথচ আমি জানিও না এই ডায়েরিতে আমার কী কাজ! রাতের বেলা পাশের বাড়ির বাগান থেকে গোলাপ এনে পাপড়ি ছিঁড়ে রেখে দিই ডায়েরির ভেতর, সাথে দিবসের সমস্ত উচ্ছ্বাস। কিছুদিন পর ধূসর-মলিন হয়ে মিশে থাকে পৃষ্ঠার সঙ্গে। কড়া সৌরভে ভরপুর প্রতিটা পৃষ্ঠা—এসবের ভেতর শব্দহীন আমার কৈশোরের উদ্বেল-উদ্বাহু দিন।

শীতের রাতে একা-একা ফিরি মাদরাসায়। বহুদূর থেকে ভেসে আসে সুরেলা আওয়াজ। কিছু শব্দ মাথায় গেঁথে যায়। হাতের লেখা সুন্দর—এমন কাউকে দিয়ে তা লিখিয়ে নিই ডায়েরির পাতায়।

একদিন এক শিক্ষকের কামরা পরিষ্কার করার সময় পাই পুরোনো অনেক পত্রিকা। ঘাঁটাঘাঁটির সময় একটা নামে চোখ আটকে যায়—সাদ্দাম হোসাইন। উপরে তাঁর ছবি। আমাদের শৈশবের নায়ক। কাঁচি দিয়ে সুন্দর করে কেটে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিই ডায়েরির রঙিন পৃষ্ঠায়। ফেলে আসা দিনগুলো কলকলিয়ে ওঠে যেন। ঝটপট আরও কিছু ভালোলাগা ছবি নিয়ে নিই সেখান থেকে। তারপর এই দৃশ্যাবলি সংগ্রহ করার একটা নেশা চেপে যায় মাথায়।

বছরের শেষদিকে একজন ছাত্র এসে ভর্তি হয়, ভালো আঁকতে পারে সে। ফাঁকে ওকে দিয়ে আঁকিয়ে নিই কিছু একটা। মন খারাপ হলে ভাঙা-ভাঙা শব্দে লিখে রাখি বেদনা, সুবহে সাদিকের ক্ষোভ। এভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছে বছর, ডায়েরিভর্তি কৈশোরের দুরন্তপনা। শেষের দিকে এসে আজেবাজে আর কিছুই স্থান পায় না, শেষ হয়ে গেলে আবার!

এর মধ্যে হঠাৎ একদিন বাড়িতে চলে যাই। ডায়েরি নাঈমের ট্রাঙ্কে। বাড়িতে থাকার সারাটা সময় বুকে উৎকণ্ঠা। ফিরে এসে দেখি নাঈম নেই। সপ্তাহ পেরোলেও ফেরে না। বুকটা চিনচিন করতে থাকে। নাঈমের ট্রাঙ্কে তালাবদ্ধ আমার ডায়েরি, রঙিন দৃশ্যাবলি, গুচ্ছ-গুচ্ছ বেদনা। রাতে ঘুম হয় না। ছটফট করতে করতে কেটে যায় অন্ধকার। বাড়ি থেকে নিয়ে আসা উচ্ছ্বাস বুক-পকেটে মিইয়ে যেতে থাকে। বিকেল হলেই ওর আসার পথে উদাসীন তাকিয়ে থাকি। সন্ধ্যা নামে পৃথিবীতে। চারপাশের কোলাহল থেমে যেতে থাকে ক্রমশ। বুকে দুর্বিষহ যাতনা। একদিন দুপুরের ঘুমের পর মাদরাসায় এসে দেখি নাঈমের ট্রাঙ্ক নেই। শুনি, এখানে আর পড়বে না ও, তাই ওর বাবা এসে নিয়ে গেছে সব। মনে হয়, কোথাও কেউ নেই। আমার অপাপবিদ্ধ কৈশোরের সমস্ত উচ্ছ্বাস নিয়ে চলে গেছে নাঈম।

হিফজ শেষে অনেকদিন ডায়েরির কাছে আসা হয়নি। ভুলেই গিয়েছিলাম—ডায়েরির রঙিন পৃষ্ঠা, শেষের দিকে মন ভালো করে দেওয়া বাণী, সেখানে জমা করে রাখা গুচ্ছ-গুচ্ছ বেদনা, গোলাপের ধূসর পাপড়ি; অপাপবিদ্ধ কৈশোরের সমস্ত উচ্ছ্বাস জমা করে রাখার নিঃশব্দ ডাকবাকশো কিংবা হঠাৎ উড়ে আসা বাতাসের কোলাহল। জীবন তখন বয়ে চলছে ভিন্ন এক দ্যোতনায়।

তারও বহুদিন পর, যখন আমি ভুলে গেছি ফেলে আসা জীবনের অনেক স্মৃতি। সময়ের ধূসরতায় মলিন হয়ে গেছে জীবনের অনেক স্বপ্ন—নাঈমের ট্রাঙ্কে তালাবন্দী আমার সমস্ত দীর্ঘশ্বাস। কারও কাছ থেকে পাওয়া আঘাতের কথা লিখে রাখার জন্য আবার তুলে নিই ডায়েরি। আগের মতোন রঙচটা নয়, জীর্ণ অবয়বে সাদামাটা পৃষ্ঠার। রাত জেগে কাগুজে পৃষ্ঠার বুকে তুলে রাখি বেদনার নির্যাস। সেই থেকে শুরু আবার—জীবনের নিত্যকার টানাপোড়েন, হাহাকার, হাসি-কান্না, কোলাহল অথবা নির্জনতার গল্প লিখে রাখি ডায়েরির বিশ্বস্ত পৃষ্ঠায়। চাইলেই লিখে ফেলা যায় জীবনের না-বলা গল্প। সময়ের ধূসরতায় স্মৃতিতে সেইসব মলিন হলেও ডায়েরির গোপন পৃষ্ঠায় সেগুলো থেকে যায় জীবন্ত।

বাড়িতে এলে মাঝে-মাঝে বিষণ্ন দুপুরে অথবা বৃষ্টিদিনে ড্রয়ার থেকে খুলে নিই এসব। পুরোনো ডায়েরির ধুলিমলিন পৃষ্ঠার বুকে হাত বুলিয়ে দিই পরম মমতায়। পৃষ্ঠা উল্টালে চমকে উঠি কখনো। একসময় কাউকে ঘিরে আমার এমন ভাবনা ছিল? কত মানুষের গল্প পাতায় পাতায়, যাদের সঙ্গে কখনো দেখাই হয়নি কিংবা দেখা হলেও আলাপ হয়নি কোনোদিন; অথচ কী অবলীলায় আমি লিখে রেখেছি তাদের প্রেম, উপেক্ষা, কোলাহল। এমনি প্রতিনিয়ত ডায়েরির পাতায় জমা হয়ে থাকে ব্যক্তিগত জীবনের ব্যর্থতা, বিষাদ, যন্ত্রণা আর গ্লানির গল্প।

 

জামিয়া ফরিদাবাদ ঢাকা’র শিক্ষার্থী

ফেব্রুয়ারি 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১