সালিশ

সংখ্যা:

উপজেলা সরকারি হাসপাতালের সাত নম্বর সিটে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে হারু। কয়েকটা মাছি অস্থিরভাবে তার মুখের ওপর ভনভন করছে। কখনো নাকে বসছে কখনো মাথায়। হারু ডান হাত দিয়ে তাদের তাড়াতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। মাছি তাড়াতে গিয়ে হারুর বাম হাতটা হঠাৎ নড়ে যায়। তখনই সে ব্যথায় ‘ও আল্লা’ বলে চিৎকার করে ওঠে। মাছি তাড়ানোর চেষ্টা বাদ দিয়ে সোজা হয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করে হারু। এর ফাঁকে এক পলক তার ডান হাতটাকে দেখে নেয়। কলাগাছের মতো কেমন অসম্ভব বড় হয়ে উঠেছে হাতটা। উপরের সাদা ব্যান্ডেজ যেন ফেটে বের হতে চায়। ভেতরে অসহ্য যন্ত্রণা।

হারু ঘুমাবার আশায় চোখের দুনো পাতা ফেলে দেয়। তার সামনে আবার স্মৃতিটা ভেসে ওঠে। মনে মনে বের করবার চেষ্টা করে, আসলে দোষী কে? সে ঘটনাটা আবার প্রথম থেকে ভাবে।

হারুর ছেলে মানিক বিকেলে গাঁয়ের ছেলেদের সঙ্গে মাঠে খেলতে গেল। গিয়ে মণ্ডলবাড়ির ছেলের সঙ্গে ঝগড়া বাঁধিয়ে দেয়। এখন হারুর মনে হচ্ছে, এরকম ঝগড়া তো হরহামেশা ছেলেরা বাঁধায়। তারা নিজেরাই আবার এসব ঝগড়া মিটিয়ে ফেলে। মা-বাবা পর্যন্ত জানতে পারে না অনেক সময়। তার ছেলেবেলায়ও এরকম ঝগড়া হয়েছে। কিন্তু সমস্যা ঘটল আরও পরে। হারু বাজার থেকে বাড়ি ফিরে দেখে মানিক কাঁদছে। মণ্ডলবাড়ির সব কয়টি ছেলে নাকি তাকে ধরে মেরেছে।

হারু সহ্য করতে পারল না। সন্তান আঘাত নিয়ে বাড়ি ফিরুক—এমনটা হয়তো কোনো বাবাই সহ্য করতে পারেন না। ছেলের হাত ধরে টানতে টানতে মণ্ডলবাড়ির গেটে দাঁড়ায় হারু। চিৎকার করে মণ্ডলদের ডাকাডাকি করে। এ ডাকাডাকিতে গালি মেশানো। এ গালি বড় ঝগড়ার দিকে আহ্বান। বের হয়ে আসে মণ্ডলবাড়ির দুই জোড়া ছেলেপেলে। হাতে দেশীয় অস্ত্র। এসেই কথা না বাড়িয়ে হারুকে শুরু করে আঘাত। হারু মনে মনে ভাবে, যদি তাদের পথের মুখে এরকম ডাকাডাকি না করতাম, হয়তো ঝগড়াটা বাঁধত না। পোলাপান ঝগড়া করছে এইসব তো মিটেই যেত।

হারুর ভাবনায় ছেদ পড়ে তার কেবিনের সামনে কয়েকটা পায়ের শব্দ শুনে। চোখ খুলে ও দিকে তাকায়। দেখে গ্রামের দুতিনজন মাতব্বর দাঁড়ানো। এরাই গ্রামের বিভিন্ন সমস্যার সালিশ করে। হারু ভদ্রতা করে শুয়া থেকে উঠে বসার চেষ্টা করে। মাতব্বররা তাকে থামিয়ে বলে, ‘ঘুমাইয়্যা থাক হারু। উঠতে অইবো না।’ হারু বিছানার এক পাশে সরে তাদের বসার জায়গা করে দেয়। বয়স্ক মাতব্বর হারুর পাশে বসে। বাকিগুলো গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

মাতব্বর হারুর মাথায় হাত রাখে। জিজ্ঞেস করে, ‘হারু, এহন শইল্যের খবর কিতা?’ হারু ভাঙা ভাঙা গলায় উত্তর দেয়, ‘হাতটা ফাটে ফাটে করছে। গায়েও বাড়ি কটা। এপাশ ওপাশ করতে পারি না। খুব যন্ত্রণা দেয়। এহানে ডাক্তারও ঠিক মতোন আইয়্যা দেহে না।’ মাতব্বর সমব্যথিত হতে হতে বলে, ‘কী আর করবা হারু, কিছু একটা হয়ে গেল। শয়তান ঘটিয়ে ফেলসে। নে আমরা তোর লাগি কিছু নাস্তা আনছি, ওগুলো খা।’ সঙ্গে আনা ব্রেড আর জুস এগিয়ে দেয় মাতব্বর।

‘ওসব আইন্যা আর ক্যান টাকা নষ্ট করতে গেলা’ হারু খাবারের পলিথিনের দিকে লোভের চোখে তাকায়। মাতব্বর বলে, ‘বাদ দে হারু, যা হইবার হইছে। মণ্ডলের পোলাপান ভুল করসে। মণ্ডল চাইতেছে ওসব শেষ হোক। তুই তো চিকিৎসা করাতি। টাকার বিষয়-আশয়। মণ্ডল তোরে ১০ হাজার টাকা দিয়া দিব নে। বাদ দে ওসব।’ পাশে দাঁড়ানো বাকি মাতব্বররাও তাকে সায় দিয়ে বলে, ‘বাদ দে হারু, বাদ দে।’

হারু গোঙাতে গোঙাতে বলে, ‘আগে আমি ভালা অইলই।’

মাতব্বর হারুর পাশে আর বেশিক্ষণ দাঁড়ায় না। হয়তো দাঁড়ানোর প্রয়োজনও পড়ে না। ‘হারু, যা কইছি ভাইব্যা দেখিস, এহন যাই’ বলে উঠে দাঁড়ায়। বাকি মাতব্বররাও তাকে অনুসরণ করে দরজার দিকে এগিয়ে যায়।

মাতব্বররা চলে যাবার পর হারু অস্পষ্ট আওয়াজে তার বউকে ডাকে। কিন্তু আশেপাশে তার বউকে খুঁজে পায় না। হঠাৎ মনে পড়ে, তার বউ সকালে বাড়িতে গেয়েছিল। এখনো আসেনি। সে বিরক্ত হয়ে পাশের সিটের দিকে তাকায়। দেখে, মধ্যবয়স্ক একলোক শুয়ে আছে। আর তার পাশে নিথর হয়ে বসে আছে লোকটির স্ত্রী।

পরদিন হারুকে দেখতে আসে সদাগর পাড়ার আরো কিছু মানুষ। এরাও বিচারসালিশে মাতব্বরের ভূমিকায় থাকে। তবে গ্রামের সবাই জানে মণ্ডলদের আর সদাগরদের বিবাধ অনেকদিন ধরে। সদাগররাও তার পাশে বসে। বাজার থেকে কিনে আনা এটা-ওটা তার সামনে ছড়িয়ে দেয়। মমতা মাখিয়ে হারুকে জিজ্ঞেস করে, ‘এখন শরীর কেমন?’ হারু অস্পষ্ট সুরে উত্তর দেয়, ‘ভালো না। হাত-মাথায় ব্যথা বেশি। বড় সদাগর কিছুটা ধমক মিশিয়ে বলে, ‘কিতা হারু, হুনছি তুই নাকি সালিশ করতে যাচ্ছিস? সালিশে যাবি না। বেটারে জেলের ভাত খাওয়ায়ে ছাড়বে। থানাত গিয়া মামলা কর, আমি কইলাম, আমি তোর সঙ্গে আছি।’ হারু দ্বিধায় ভোগে। হ্যাঁ না কিছুই বলে না। ঘেনঘেন করে কেবল বলে, ‘আগে ভালা অই লই চাচা।’

হারু পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেনি। তার বউ আর ছেলে তাকে নিয়ে কোর্টে গেল। এর পেছন থেকে ইন্ধন দিয়েছে সদগার গোষ্ঠী। উকিলের সঙ্গে বুঝে দেখল মামলা আসলে অনেক কিছুর ব্যপারস্যপার। তাছাড়া মণ্ডলের টাকার জোর থাকায় তাকে জেলের ভাত খাওয়ানো নাও যেতে পারে। হারু টাকার হিসেবনিকেশ কষে মামলা না করার সিদ্ধান্তে বাড়ি ফেরে।

ধীরে ধীরে সুস্থ হয় হারু। মণ্ডলের সঙ্গে তার ঝগড়টাও সালিশের দিকে এগোয়। একদিন সন্ধ্যায় মাতব্বররা তার উঠানে এসে ডাক দেয়, ‘কিরে হারু, বাড়ি আছস নি?’ হারু ঘরেই ছিল। বের হয়ে ‘আসো আসো’ বলে তাদের ঘরে নেয়। এই মাতব্বরদের মধ্যে সদাগর পাড়ার দু’একজনও আছে। গরিব হারু তাদের পান খেতে দেয়। বয়স্ক মাতব্বর হারুর হাতে ১০ হাজার টাকা তুলে দিয়ে বলে, ‘হারু, যা হবার হইছে, সবকিছু ভুলে যা। যা দিছি সবুর থাকিস। কাউরে কিছু বলিস না। লোকে হুনলে খারাপ কইবো।’

হারু মাস-পনের দিন পর জানতে পারে তার আর মণ্ডলের ঝগড়া নিষ্পত্তির জন্য মাতব্বররা মণ্ডলের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নিয়েছিল।

 

হবিগঞ্জের নবীন লেখক

জানুয়ারি 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১