ছন্দময় জীবনের বর্ণিল উপাখ্যান

সংখ্যা:

 

মাওলানা মুহিউদ্দিন খান রহ.। ছোট্ট এই নামে এক বৃহৎ ইতিহাস সুপ্ত। শুধু একজন সংগঠক নন তিনি, বরং নিজেই একটি সংগঠন। শুধু একজন লেখক ছিলেন না, ছিলেন বহু লেখকের জন্মদাতা। ছিলেন বটবৃক্ষ। যাঁর ছায়ায় অশ্রয় নিতো সর্বহারার দল। আজকের লব্ধপ্রতিষ্ঠ বহু লেখক তাঁর একান্ত স্নেহাশীষে বেড়ে উঠেছেন। জ্ঞান-গরিমায় বিশ্বকোষ-তুল্য ছিলেন তিনি।

তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা প্রতিকুল সময়ের সঙ্গে। সাম্রাজ্যবাদীদের সৃষ্ট পঞ্চাশের মন্বন্তরে ভুখা-নাঙ্গা কঙ্কালসার জীবনমৃত মানুষগুলো দেখে ছুরি হাতে নেবার ইচ্ছা জেগেছিল ছোট্ট খান সাহেবের কচি মনে। ব্রিটিশ বেনিয়াদের কারণে মানুষ না খেয়ে মরছে, সম্ভ্রান্ত পরিবারের বৌ-ঝিরা ছিন্নবস্ত্রে পথে-ঘাটে ঘুরছে, নেংটিসার মানুষের দিশেহারা চাহনি—বিভিষিকাময় এসব দৃশ্য মহিউদ্দিন খানের ছোট্ট হৃদয়ে ব্যাকুলতার ঝড় তোলে। ইসলাম ও মুসলমানের শত্রু ব্রিটিশ বেনিয়াদের প্রতি তাই এক রাশ ঘৃণা নিয়েই ছুরি হাতে নেওয়ার কথা ভাবেন তিনি। কিন্তু তাঁর বাবা বলেন, ছুরি নয়, তুমি কলম তুলে নেবে। কলমের আঁচড়ে দ্বিখণ্ডিত করে দেবে চক্রান্তের সব দেয়াল। ছিন্ন করবে ষড়যন্ত্রের যত জাল। একটু বয়স হবার পর খান সাহেবেরও উপলব্ধি হয়, চাকু নয়, কলমই মোক্ষম অস্ত্র।

ছেলেকে কলমসৈনিকরূপে গড়ে তুলতে ছোট্ট থেকেই উৎসাহিত করতেন পিতা হাকীম মাওলানা আনসার উদ্দিন খান। তিনি নিজেও ছিলেন লেখক। ছেলে যেন দক্ষ কলমসৈনিক হয়ে গড়ে ওঠে, সে জন্য পিতার কত কসরত! খান সাহেবের মা-ও ছিলেন বিদূষী নারী। লেখাপড়ায় ছেলেকে উৎসাহিত করতে বলেছিলেন, ‘ভালো করে পড়লে তোমাকে হাতি কিনে দেবো।’ সেই থেকে পাঠশালায় তাঁর বন্ধুর কমতি নেই। সকলেই ছোট্ট খানের সঙ্গে থাকে তাঁর হাতিতে চড়ার আশায়। তাদের কেউ উল্টাপাল্টা করলে ছোট্ট খান ধমক দিয়ে বলতেন, ‘তোকে হাতিতে চড়াব না।’

কিন্তু সেই আশার গুড়ে বালি। জমিদার বাড়ির মস্ত হাতি দেখে তাঁর ইচ্ছায় ভাটা পড়ল। এত বিশাল হাতি তিনি রাখবেন কোথায়! হাতির স্বপ্ন তিনি পরিত্যাগ করলেন। স্বপ্নের মোড় ঘুরিয়ে নোঙ্র ফেললেন এমন এক বন্দরে, যেখানে হাজার বছর ধরে মানুষ তাঁর স্বপ্ন থেকে উপকৃত হবে।

কৈশোরে এসে খান সাহেব কলম তুলে নিলেন হাতে। এবং আমৃত্যু কলম নিয়েই ময়দান দাপিয়ে বেড়ালেন। অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার কচি বয়স থেকেই। সময়ই তাকে সংগ্রামী বানিয়েছে। লড়াই করার মানসিকতা জুগিয়েছে। তাই ইসলাম-প্রশ্নে কোনো আপস করেননি কখনও। অভাব-অনটনেও সরকারের ফাঁদে পা দেননি। বাবার সাফ জবাব, ‘তোমাকে টাকা কামাতে দীন শেখাইনি।’ এমন বাবার ছেলে মাওলানা মুহিদ্দিন খান রহ.।

তিনি তাঁর জীবনের কথা লিপিবদ্ধ করেছেন ‘জীবনের খেলা ঘরে’নামক গ্রন্থটিতে। তাঁর বেড়ে ওঠা ছিল সত্যিই ঈর্ষণীয়। পরিবার পরিবেশ প্রতিবেশ তাঁকে গড়ে তুলেছে। মানুষ তার সময়কেই ধারণ করে, নিজের মাঝে লালন করে। সময় মানুষকে অনেক কিছুই শেখায়। কাগজে কলমে যা শেখা অকল্পনীয়। আমাদের বোধ ও বিশ্বাস তৈরি হয় চলমান সময়ের গতিধারায়। মাওলানা মুহিউদ্দিন খান রহ. ইতিহাসের এমন সময়গুলো প্রত্যক্ষ করেছেন, যা তাঁর মানস গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে এবং তাঁর জীবনের প্রতিটা কাজেই সেই সময়ের আলোচ্ছটা প্রতিবিম্বিত হয়েছে। তিনি বিগত অর্ধশতাব্দীর বহু স্মরণীয় ঘটনা-দুর্ঘটনা এবং বিপ্লব-বিপর্যয় আর উত্থান-পতনের নানা তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা-প্রবাহ নিজ চোখে দেখেছেন। এবং স্মৃতির মণিকোঠা থেকে তা মলাটবদ্ধ করেছেন এই বইয়ে।

পাকিস্তান আমল থেকেই এই পূর্বাঞ্চলে যারা অপসংস্কৃতির সয়লাব ঘটাবার অপচেষ্টা করেছে, তাদের হাল-হাকিকত জানা যাবে এই বইয়ে। ডিগবাজি-বিশারদ বুদ্ধিজীবীদেরও আমরা চিনতে পারব। সবচেয়ে বড় যে বিষয়টা জানতে পারব তা হলো, বহু কলম সাধকের নাম-পরিচয় ও কর্ম—যাঁরা ছিলেন ইসলামের একেক জন সিপাহসালার। হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি থেকে জাতিকে বাঁচাতে, অপসংস্কৃতির সয়লাব ঠেকাতে যাঁরা ছিলেন সদাজাগরুক অকুতোভয় ও নির্ভিক। কিন্তু আমরা তাঁদের মূল্যায়ন করিনি এক বিন্দুও। বরং তাঁদের নামও আজ অজানার আস্তরণে আচ্ছন্ন।

ইসলামি সংস্কৃতির পুনর্জাগরণে খান সাহেবসহ অন্যদের সংগ্রাম-সাধনার ইতিহাস নিজেকে রোমাঞ্চিত করে। কল্পনায় ডুব দিয়ে তাঁদের প্রতিকৃতি আঁকতে মন চায়। তাঁদের ভিড়ে নিজেকে শামিল করবার বাসনা জাগে। ইচ্ছে হয় আমিও হবো লড়াকু কলমযোদ্ধা। ইসলামি সংস্কৃতিকে করব মূর্তিমান।

গ্রন্থটি ছোট হলেও গল্পে গল্পে অল্পকথায় অনেক কিছু জানা যাবে। তিনি ইতিহাসের কঠিনতম বাকগুলো প্রত্যক্ষ করেছেন। সেগুলোর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন সাবলীল ভঙ্গিতে।

গ্রন্থটি পাঠের সময় কোনো রকম ক্লান্তি বা অবসাদ কিছুই অনুভূত হয় না। বরং মনে হয়, জ্ঞানে সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ মহীরূহসম এক তাপস হাত নেড়ে নেড়ে নিজের জীবনের গল্প বলছেন। নিজে হাসছেন, অন্যকে হাসাচ্ছেন। তাঁর কান্নায় অন্যরাও আপ্লুত হচ্ছে। তাঁর মায়ের মৃত্যুর কথা যখন পড়ি, তখন তাঁর শোকাশ্রুর তপ্ততা আমাকেও কাঁদিয়েছে।

পুরো বইটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটা গল্পের আসর। যা শেষ হয় কিন্তু রেশ রয়ে যায়। এই সন্ত জ্ঞানতাপসের জীবনে রয়েছে সঞ্জীবনী শক্তি, যা জীবনের পাথেয় যোগায়।

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১