আবিস্কার

সংখ্যা:

দুজন প্যাসেঞ্জার নিয়ে দ্রুত প্যাডেল মারল রাসেল। এটাই ওর শেষ ক্ষেপ। রাতের ঢাকার এই সময়টা বেশ চুপচাপ থাকে। নিয়ন লাইটের আলো আর দু’একটা রিকশার টুংটাং শব্দে বেশ রোমাঞ্চকর একটা পরিবেশ।

প্যাসেঞ্জার দুই তরুণের একজন অপরজনকে বললো- ‘দোস্ত, একটা গজল গাও তো!

‘রোমান্টিক কিছু গাই, কী বলো?’

‘হুম, তাহলে তো ভালোই হয়!’

তরুণটি চমৎকার একটা বাংলা গজলে সুর তুলল-

অনুভবের গভীরে

ন্য আমার কুটিরে

মুছে দিলে যাতনা

তুমি কি তা জান না?

সঙ্গিনী প্রিয়তমা,

তুমি শুধু আমার উপমা

তুমি ক তা জান না?

বধূবেশে সেজে এসে নিয়ে নিলে ভালোবাসা

সেই থেকে মন-সঙ্গে তুমি স্বপ্ন আশা কান্না হাসা

মুখরিত আলোছায়া

অনুরিত মোহমায়া

তোমায় ঘিরে বেঁচে থাকা

সুখ নিরন্তর ভালোবাসা

এখন আমার দৃষ্টি নত

ঋাবনা গভীর শতশত

তুমি আমার অন্য আলো

আঁধার ঘরে প্রদীপ জ্বালো

তুমি কি তা জান না?…

গাওয়া শেষ করতেই সঙ্গী তরুণ বলতে লাগল- ‘অসম্ভব ভালো লাগল দোস্ত গজলটি। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার কী চমৎকার বহিপ্রকাশ ঘটেছে এখানে!’

‘হ্যাঁ, আসলে কি জানো! আমাদের সমাজে এমন অনেক লোক আছে, যারা নিজেদের স্ত্রীদের কখনো বুঝতে চায় না। স্বামীর সোহাগ থেকে বঞ্চিত নারীদের কত যে কষ্ট! অথচ কত স্ত্রী তার প্রিয়তম স্বামীর জীবনে আলো হয়ে বেঁচে থাকে। আর তারা সেই আলো ইচ্ছে করেই নিভিয়ে দেয়।’

‘ঠিক বলেছ। আমি কিন্তু ভাই বাসর রাতেই নববধূ প্রিয়তমাকে এটা গেয়ে শুনাব!’

‘বাব্বাহ! এত্ত প্ল্যান-প্রোগ্রাম…’

‘হুম, এত্তই…!’

দুজনই হো হো করে হেসে উঠল।

 

দুই

রাসেল ধীরগতিতে প্যাডেল মারছে। এত তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরার তাড়া নেই ওর। আগে নিত্যপ্রায় কিছু বাজে খায়েশ মিটিয়ে তারপরেই না ঘরে ফেরা!

একটু আগের প্যাসেঞ্জার দুই তরুণের কথাবার্তা রাসেলের ভেতর কী একটা ঝড় তুলে গেছে, সে নিজেই বুঝতে পারছে না। ওর রিকশায় প্রতিদিন কত তরুণ-তরুণী এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ায়! তাদের ফিসফিসিয়ে প্রেমালাপ, হাসাহাসি, খুনসুটি-কত কিছু শুনে রাসেল। তবে ওসব নিয়ে ও অতোটা ভাবে না। ও ভাবে, সামান্য রিকশাওয়ালার অতো ঢং মং থাকতে নেই!

এত আহ্লাদি ভালোবাসা-বাসি তার সাথে যায় না। ঘরে একদিন চাল না থাকলে ওদের প্রেম-ভালোবাসা সব চুলোয় যায়। তাই দিনভর খাটনি করে সামান্য যে ক’টাকা হাতে আসে তা বস্তির অন্য রিকশাওয়ালাদের সাথে জুয়াবাজি করেই হাত খালি করে ফেলে। বউ-সংসার বলে যে কিছু আছে তা যেন ওর বুঝার প্রয়োজনই নেই। এভাবেই চলে ওর জীবন।

তরুণের ওই নাশিদের কথা সাধারণ রাসেল কিছু না বুঝলেও পরবর্তীতে ওদের কথোপকথন থেকে বুঝতে পারে যে ওটা স্ত্রীদের নিয়েই গাওয়া।

ওর একটা মজবুত হৃষ্ট-পুষ্ট চায়না মোবাইল আছে। ওতে কানফাটা লাউডে কত ধরনের গান শোনে ও, তাতে ওর মনে অতো রঙচঙ ধরে না। কিন্তু আজ এই গজলটা শোনার পর তেকে ওর হৃদয়ে কেমন যেন ভাঙচুর শুরু হয়ে গেছে। সাথে সাথে স্ত্রী শিউলির কথা মনে পড়ে। অপরাধবোধে মাথা নিচু হয়ে আসে তার। লজ্জা কষ্ট আর মায়ায় চোখ ছলছল করে ওঠে। বুকের উপর কেমন যেন একটা ভারী পাথর জেঁকে বসেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। সে ভাবতে থাকেÑবিয়ের প্রথম রাতের পর থেকে কেবল অবহেলাই করে এসেছি ওকে। কত কষ্ট দিয়েছি। ভালোবাসা দিয়ে কখনো একটা কথাও বলিনি।

রাসেল যখন রাতে ঘরে ফিরত, তখন ওর চোখে-মুখে ভোগের তৃপ্তি দেখে শিউলি সবই বুঝতে পারত। আর মুখে আঁচল চেপে শুধু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদত। রাসেল ওসব আমলেই নিত না কখনো।

হঠাৎ কী ভেবে রাসেল জোর কদমে রিকশায় প্যাডেল ঘুরায়। তাকে খুব দ্রুত ফিরতে হবে ঘরে। সে অন্যায় করে ফেলেছে, বড় অন্যায়। রিকশা যখন সেই অবৈধ পাড়ার সামনে চলে আসে, ঘৃণায় তখন ওর মুখে একদলা থুথু চলে আসল। পাড়ার দিকে থুথুটা ছুঁড়ে মেরে দ্রুত ও জায়গাটা ত্যাগ করে।

ঘরে ঢুকে রাসেল দেখল শিউলি শোবার চৌকিতে ওপাশ ফিরে কমন জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছে। ও জানে শিউলি ওর আগে কখনোই ঘুমায় না। তারপরও ওর কাছে গিয়ে মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে মায়াকণ্ঠে ডাকল- ‘শিউলি ঘুমায়া গেছ?’

শিউলে চমকে উঠে ওর দিকে তাকাল। ও হতভম্ব হয়ে আছে। রাসেল ওকে এভাবে ডাকছে!

‘ওডো, আমি ভাত বাইরা আনতাছি।’

শিউলির কাছে যেন সব স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। ও কোনো কথাই বলতে পারছে না।

একটা প্লেটে বেশি করে ভাত-তরকারি নিয়ে ওর পাশে এসে বসল রাসেল। তারপর ছোট ছোট লোকমা করে শিউলিকে খাইয়ে দিল, নিজেও খেল। শিউলির মনে একটা চাপা আনন্দের ঢেউ খেলছে। আবার ভয়ও হচ্ছে একটু একটু- এটা মার-টারের ছুঁতো না তো আবার!

খাওয়া শেষ করে সব গুছিয়ে যখন শিউলি শুতে যাবে অমনি রাসেল ওর হাত ধরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে লাগল- ‘শিউলি, তুমি আমারে মাফ কইরা দাও! অনেক কষ্ট দিছি তোমারে।’

এমন অবস্থায় শিউলি যেন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। পা কেমন অবশ হয়ে আসছে ওর। ও ধপাস করে বিছানায় বসে পড়ল। রাসেল তখনো ওর দুই হাত ধরে আছে। শিউলি আস্তে করে পাশে বসিয়ে ওর মাথাটা নিজের বুকের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল।

শিউলির গাল বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। তাকে জীবনের এ পর্যন্ত তো কেঁদে-কেটেই পার করতে হয়েছে কত! কিন্তু কান্নাও যে এত সুখের হয়, চোখের জলও যে এত মধুর হয়, সেটা সে এই মাত্র অনুভব করল। অপ্রত্যাশিত এই সুখ সহ্য করতে পারছে না ও।

সুখের এই অশ্রুধারা টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছে মাত্র আবিস্কার করা অন্য এক রাসেলের উপর।

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১