ছোট্ট বাবুটা অসুস্থ তাই অফিস থেকে আগেভাগে ছুটি নিয়ে বাসায় যেতে হচ্ছে। বাবুটাকে নিয়ে প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় আছি। গতরাত থেকে হঠাৎ করে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এসেছে। সাথে সর্দি-কাশিও।
বাবুর আম্মুর অবস্থা আরো খারাপ। মেয়ের অসুস্থতায় নিজেও ভেঙে পড়েছে একদম। অফিসে আসার আগে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে একটু খাইয়ে দিয়ে এসেছিলাম। এরপর দুপুর গড়িয়ে এখন বিকেল, কিচ্ছু খায়নি। কান্নাকাটি করছে।
তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ছাতা আনা হয়নি বলেই আজ ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। অফিস থেকে বের হয়ে বেশ কিছু পথ রিকশায় চড়ে মেইনরোডে যাওয়া লাগে। সেখান থেকে বাস ধরে বাসা। বৃষ্টির কারণে আজ কোনো রিকশা চোখে পড়ছে না। কী করি? এদিকে আমাকে যেকোনো উপায়ে তাড়াতাড়ি বাসায় পৌঁছুতে হবে। বাবুকে ডাক্তার দেখানো লাগবে। বড় ডাক্তাররা আবার বিকেল চারটার পর হাওয়া হয়ে যান। তারা নিজেদেরকে ভিন্ন কিছু একটা ভাবেন। ডিউটির টাইমটুকু বড় কষ্টে চেম্বারে বসে থাকেন, এরপরই তাড়াহুড়া করে বের হয়ে যান। নিজস্ব চেম্বারে গিয়ে গদি খুলে বসেন আর পঞ্চাশ টাকার ভিজিট এক হাজার টাকা ধরে রোগী দেখেন।
ভাবছিলাম কী করবো?
বৃষ্টিতে ভিজেই রওনা হবো নাকি রিকশার জন্য অপেক্ষা করবো? আমার আবার বৃষ্টির পানিতে অ্যালার্জি আছে। ভিজলেই জ্বর এসে যায়।
বিয়ের পরপর বৈশাখের কোনো এক বিকেলে আমরা বৃষ্টিবিলাস করেছিলাম। ঝুম বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সারা ঢাকা রিকশার হুড ফেলে ঘুরেছিলাম দু’জনে। এরপর টানা চার দিন শোয়া থেকে উঠতে পারিনি। বাবুর আম্মুর সে কি কান্না! আমার জন্যই তোমার এমনটা হলো- আরো কত কথা! সেসব স্মৃতিমন্থন আজ থাক।
সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম। হঠাৎ দেখলাম বৃষ্টিতে জবুথবু হয়ে একজন রিকশাওয়ালা আসছে।
: ড্রাইবার, যাবা?
: কই যাইবেন স্যার?
: নিকুঞ্জ।
: উইঠা পড়েন স্যার।
: কত?
: দেড়শো’ ট্যাকা দিয়েন স্যার।
: কী বলো! সত্তর টাকার ভাড়া দেড়শো’ টাকা!
: স্যার, বৃষ্টি হইতাছে একটু বাড়ায়া দিবেন না?
: আচ্ছা একশো টাকা দেবো, যাবা?
: আচ্ছা উঠেন স্যার, আল্লাহ ভরসা।
বড় পলিথিনটা রিকশার সিট থেকে হাত দিয়ে মেলে ধরে আমাকে বৃষ্টিজল থেকে বাঁচিয়ে রিকশায় বসতে সাহায্য করলো রিকশাওয়ালা। সেক্টরের ভেতর দিয়ে চলছে রিকশা, বাসে যাওয়ার চিন্তাটা তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্যই বাদ দিয়েছি। দেখা যাবে মেইনরোডে গিয়ে বাস না পেলে দাঁড়িয়ে থাকা লাগবে আবার খিলক্ষেত গিয়ে রিকশা না পেলে দাঁড়িয়ে থাকা লাগবে। তারচে’ এক রিকশায় চলে যাই সেটাই ভালো।
রিকশাওয়ালাকে তাড়াতাড়ি চালানোর তাগিদ দিলাম, যেন তিনটার মধ্যে বাসায় পৌঁছতে পারি। তাহলে হসপিটালও তাড়াতাড়ি যেতে পারবো।
রিকশাওয়ালা যতোটা সম্ভব জোরেশোরে প্যাডেলে চাপ দিচ্ছিলো। হঠাৎ একটা গাছের নিচে রিকশাটা থামিয়ে পাশের অ্যাপার্টমেন্টের নিচে চলে গেলো। লুঙ্গির গোছা থেকে পলিথিনে মোড়ানো মোবাইলটা বের করে কার সাথে যেন পেরেশান চেহারায় মিনিট খানেক কথা বলে আবার চলে এলো।
: কিছু মনে কইরেন না স্যার, বউ ফোন দিছিলো। তাড়াতাড়ি যাওয়া লাগবো।
: না না, ঠিকাছে, আমি কিছু মনে করিনি।
পৌঁছতে পৌঁছতে তিনটা বেজে দশ মিনিট। আগেই ফোন দিয়ে বাবুর আম্মুকে বলে রেখেছিলাম রেডি হয়ে থাকতে। বাসায় এসে দেরি করবো না।
ভাড়া মিটিয়ে রিকশা থেকে নামতে যাবো, অমনি রিকশা ওয়ালা জিজ্ঞেস করলো- স্যার, কয়টা বাজে?
: তিনটা দশ।
: স্যার, আমারে আরো পঞ্চাশটা টাকা দিলে বড় উপকার হইত।
: তোমার ভাড়া তো দিলামই।
: স্যার, আমার বাচ্চাটার খুব জ্বর। অষুধ কিনার টাকা এখনো পঞ্চাশটা কম। আপনে পঞ্চাশ টাকা দিলে আমি অহনি অষুধ কিন্যা বাসায় যাইতাম। বাচ্চাডার অবস্থা খুব খারাপ, বউ কান্নাকাটি করতাছে স্যার।
রিকশাওয়ালাকে একশো’ টাকার আরো দুইটা নোট বের করে হাতে গুঁজে দিয়ে বললাম- পুরোটা রেখে দাও। হাতের মুঠ খুলে একটা হাসি দিয়ে স্যার তাইলে যাই বলে রিক্সায় উঠে গেলো সে। তার চলে যাওয়ার মুহূর্তে তার হাসিমাখা মুখের চেয়ে চোখের কোণের জলটাই বেশি দেখা যাচ্ছিলো।
ইচ্ছে হচ্ছিলো মানিব্যাগের সবগুলো টাকা তাকে দিয়ে দিই। কিন্তু আমিও যে মধ্যবিত্ত! মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে বড় হিশেবি হয়ে চলতে হয়। মধ্যবিত্ত বাবাগুলোকে বড় কষ্ট সহ্য করে বয়ে নিতে হয় সারাটা মাসের খরচ। অনেক কিছু ইচ্ছে হলেও পূরণ করতে নেই তাদের!
লেখক : নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা
