মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সমাজতান্ত্রিক নেতারা বলতেন ‘রেড মাওলানা’ বা ‘প্রফেট অব ভায়োলেন্স’। সমাজতান্ত্রিক নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার পরও কেন তাঁরা তাঁকে এইসব অভিধায় অভিহিত করতেন, এর উত্তরটা পাওয়া যাবে মাও সেতুং-এর সঙ্গে মওলানা ভাসানীর একান্ত আলাপে।
একান্ত আলাপে মওলানা ভাসানী মাও সেতুংকে বলেছিলেন, ‘আমি আপনার সমাজতন্ত্র গ্রহণ করতে পারতাম, যদি এতে আল্লাহ থাকতেন।’ মাও সেতুং হেসে বলেছিলেন, ‘মওলানা, আপনারা কোরআনে যা পড়েন, আমরা বাস্তবে তা কাজে লাগিয়ে সমাজতন্ত্র গড়ে তুলেছি।’
মাওলানা ভাসানী ছিলেন বঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষের প্রতি অকৃত্রিম এক দরদী নেতা। আর এই শ্রেণীর মানুষের মুক্তির জন্য সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন সমকালীন পৃথিবীতে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। অন্যদিকে ইসলামপ্রিয়দের ছিল না কোনো উল্লেখযোগ্য সংগঠন। ইংরেজ শক্তির প্রতি নানা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটালেও সমাজের নিপীড়িত মানুষের পক্ষে এদের দ্বারা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার সুযোগ ছিল না। তাই মাওলানা ভাসানী নিপীড়িত মানুষের পক্ষে আন্দোলন বেগবান করতে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মানুষের সাথে মিশতেন। প্রয়োজনের কারণে মিশতেন ঠিক, কিন্তু ওই যে মাও সেতুংকে বলেছিলেন ‘সমাজতন্ত্রে আল্লাহ নেই’, এই দর্শনটুকুই তাঁকে আলাদা করে রাখত সবসময়।
মওলানা ভাসানী ছিলেন একজন ত্রিকালদর্শী মওলানা। ইংরেজ আমলে আসামে আরম্ভ তাঁর কর্মতৎপরতা। পাকিস্তান আমলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি এক বলিষ্ঠ চেতনা। বাংলাদেশেও তাঁর অনমনীয় কণ্ঠে ছিল বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের বজ্র উচ্চারণ। ইসলামি আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হলে বঞ্চিত মানুষ তাদের অধিকার সমানভাবে পাবে—এই বিশ্বাস লালন করতেন মওলানা ভাসানী। এজন্যই তিনি হুকুমাতে রব্বানিয়া প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন। শেষ জীবনে তিনি যখন তাঁর রাজনৈতিক সংগঠন ন্যাপের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন, তখন ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবার আমি এদেশের কৃষক-শ্রমিক, সর্বহারা-মেহনতি মানুষকে নিয়ে এমন এক বিপ্লব করব, যা বিশ্বের কেউ কোথাও দেখেনি। আমি হুকুমাতে রব্বানি কায়েম করব। যেখানে প্রতিষ্ঠিত হবে এক শোষণহীন খোদায়ি সমাজব্যবস্থা।’
১৯৪৬ সালে আসামে মওলানা ভাসানী এবং মাওলানা আজাদ সুবহানি এক বৈঠকে মিলিত হন। মাওলানা আজাদ সুবহানি হুকুমাতে রব্বানিয়া প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করার প্রস্তাব পেশ করেন। এই প্রস্তাবে সম্মতি পেশ করে মওলানা ভাসানী বলেন, আমার সকল সংগ্রাম হুকুমাতে রব্বানিয়া প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত হবে।
সন্তোষে তাঁর কৃষক সমিতির অফিসের সামনের সাইনবোর্ডে লেখা ছিল—‘হুকুমাতে রব্বানিয়া, আল্লাহর রাজত্ব কায়েম কর।’
১৯৪৬ সালে যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, এর প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় পরে এসে ১৯৭৪ সালে তিনি বলেন, সব কথা ও কাজের একটা মওসুম আছে। যদি তা মওসুম মাফিক মানুষের নিকট পেশ না করা হয়, তবে অতীব কল্যাণকর বিষয়ও অর্থহীন ও পুরুষত্বহীন হয়ে পড়ে। ইমাম গাজালি বলেছেন, যদি কোথাও আজান দিয়ে মানুষকে নামাজের দিকে না আনা যায়, তবে ঢোল বাজিয়ে আনো। বাংলাদেশের মানুষ বহুত ঘুমিয়েছে। এতদিন ঢোলের বাড়িতে ঘুম ভাঙত, এখন আজানের ধ্বনিতে ঘুম ভাঙার অভ্যাস হয়েছে।
জনদরদী তো অনেকই ছিলেন। কিন্তু মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী কেন এতটা উজ্জ্বল এবং প্রত্যুজ্জ্বল হয়ে উঠলেন? মূলত কিছু মানুষ অন্যায় দেখলেই ব্যথিত হন। তাঁদের মধ্যে যাঁরা এই অন্যায়ের প্রতিবাদে এগিয়ে আসেন না, তাঁদের সংখ্যা অনেক বেশি। এগিয়ে আসার সংখ্যা অনেক কম। অন্যায়ের প্রতিবাদে এগিয়ে আসার এই স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যখন ধর্মীয় আবেগ ও দায়িত্ব-চেতনা যুক্ত হয়, তখন সেটির প্রবাহ সহস্র গুণে বৃদ্ধি পেয়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এই চেতনার বলেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিলেন। তালপাতার টুপি পড়ে, পাজামা-পাঞ্জাবি গায়ে চড়িয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন বিশ্ব। আর্ত মানবতার পক্ষে উচ্চকিত করেছিলেন কণ্ঠস্বর। এক মওলানা হয়ে উঠেছিলেন বঞ্চিতদের অধিকার পাবার হাতিয়ার।
খোদাপরস্ত মানুষ মাওলানা ভাসানী। তাঁর রাজনৈতিক জীবনেও ছিল ইবাদত-বন্দেগির নিয়মিত রুটিন। বাংলাদেশ ও আসামে ছিল তাঁর হাজার হাজার মুরিদান। তবুও দীনবেশে, চটিজোড়া পায়ে পরে কাটিয়ে দিয়েছেন জীবন। কোরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতেই তিনি হুকুমাতে রব্বানির স্বপ্ন দেখেছিলেন। স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, আমাদেরকে অবশ্যই শোষণহীন ভ্রাতৃত্বময় সাম্যবাদী সমাজ কায়েম করতে হবে। যাতে আল্লাহর প্রত্যেক বান্দা নিশ্চিন্ত মনে ইবাদত-বন্দেগি করতে সক্ষম হয়। এটাই হবে সকলের প্রচেষ্টা।
মওলানা ভাসানী তাঁর স্বপ্নের বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। কিন্তু একটা আবহাওয়া ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন—ধর্মকে বাদ দিয়ে কোনো সামাজিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। শোষণহীন সমাজ গড়তে হলে ধর্মের চেতনা ও ব্যবহার লাগবেই।
নভেম্বর 2019

