সিন্দাবাদের কবি। সাত সাগরের মাঝি। দুঃসাহসিক যাত্রী। ছড়ার পাখি। ছোটদের প্রিয় কবি। আদর্শের কবি। তোমরা জান কে তিনি? আমি বিশ্বাস করি তোমরা তাঁকে চেনো। ভালো করেই জানো তাঁকে। হ্যাঁ, তোমাদের প্রিয় কবি ফররুখ আহমদের কথাই বলছি। ইসলামি রেনেসাঁর কবি তিনি।
ছোটদের খুব ভালোবাসতেন তিনি। অনেক আদর করতেন। সোহাগ দিতেন মন উজাড় করে। ভালোবাসার পরশ বুলিয়ে কাছে টানতেন সবাইকে। বিশেষ করে ছোটদের। ব্যবহারে যেমন ছিলেন আকর্ষণীয় লেখাতেও ছিলেন তেমন প্রিয়। তোমাদের নিয়ে তাঁর লেখা শিশুতোষ ছড়া থেকে তুলে ধরছি কিছুটা।
কবি ছোটদের কলমি লতার সাথে তুলনা করেছেন। শিশুদের মাঝে সবুজের হাতছানি দেখেছেন। দেখেছেন কোকিল-ফিঙের নাচানাচি। তাই কোকিল ফিঙের বন্ধু করেছেন সোনামণিদের। তোমাদের। সবুজ বনের কলমি লতা যেন তোমরাই। কবির ভাষায়—
‘ক য়ের কাছে কলমি লতা
কলমি লতা কয় না কথা,
কোকিল ফিঙে দূর থেকে
কলমি ফুলের রঙ দেখে।’
উুল-পাখিদের সাথি তোমরা। তোমাদের প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন কবি। তোমরা খেলতে ভালোবাসো। চানা আর বুট তোমাদের প্রিয় খাবার। কবি তা বোঝেন। তাই তোমাদের সাথে করে বুট খেতে চান মুটমুট করে। কুটকুট করে। তোমাদের সাথে খেলতে চান মাঠে। সবুজের জমিনে। কবির ভাষায়—
‘গ য়ের খেলা গোল্লাছুট,
জিতলে চানা, হারলে বুট,
তোমরা খাবে কুটুর কুট,
আমরা খাব মুটুর মুট।’
ঘোড়ায় চড়তে সবারই ভালোলাগে। কবির নিজেরও। ঘোড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে মজা লুটে নাও অনেকেই। ঘোড় দৌড়ে প্রতিযোগিতাও করো কেউ কেউ। ঘোড়ার সাথে তোমাদের সখ্যতার কমতি নেই। কবি সে কথাও ভুলে যাননি। তাই তো তোমাদের নিয়ে লেখা। কবির ভাষায়—
‘ঘ য়ের ঘোড়া এল যেই
খোঁড়া হ’ল সকলেই,
কালো ধলো দুই ঘোড়া
দু’য়ে মিলে এক জোড়া।’
ছড়া দিয়ে গণনাও পড়া শেখালেন কবি। কত্তো আদর কবির! কত্তো ভালোবাসা, তাই না!
কাজী নজরুল ইসলামের ‘ঝিঙে ফুল’ ছড়াটি অনেকেই পড়েছ হয়তো। ঝিঙে ফুলের সাথে তোমাদের আড়ি থাকার কথা। কবি ফররুখ আহমদেরও ছিল। তোমাদের সাথে খেলতে গিয়ে কবিও আদুরে হয়ে গেছেন। তোমরা জানো ঝিঙে ফুলে ফিঙেরা নেচে বেড়ায়। কবি তাই তোমাদের সাথে ফিঙের নাচানাচি দেখতে চান। খেলতে চান। কবির ভাষায়—
‘ঝ য়ের পাশে ঝিঙে,
ঝিঙে লতায় ফিঙে
ঝিঙে লতা জড়িয়ে গেল
কালো গরুর শিঙে।।’
কী মজা, তাই না! হ্যাঁ, খুব মজার কবি ছিলেন তিনি। মজা করে খুব আনন্দ পেতেন কবি।
কাক আর টিয়ার লড়াই খুব ভালোলাগে কবির। তাই ওদের ঝগড়া দেখে বেশ মজা পান তিনি। তোমাদেরকেও সেই ঝগড়ায় শামিল হয়ে আনন্দ নিতে বলেন। তাঁর ভাষায়—
‘ট য়ের পাশে টাটটু,
খেলছে ওরা লাটটু,
টয়ের কাছে টিয়ার ঝাঁক
অবাক হয়ে দেখছে কাক।।’
কাক আর টিয়ার ঝাঁকে কবি সখ্যতার ভাব খুঁজে পান। ভালোবাসার মেলবন্ধন দেখাতে চান তোমাদেরকে। আজ আমাদের মাঝে পারস্পরিক সখ্যতা নাই। নাই ভালোবাসার মেলবন্ধন। কবি কিন্তু কাক আর টিয়ার সখ্যতার মধ্য দিয়ে আমাদেরকেও তা শেখাতে চেয়েছেন।
তারাভরা রাত দেখেছ তোমরা? হ্যাঁ, দেখেছ নিশ্চয়ই। কবি তারাভরা রাতে পলক-হারা হয়ে যান। তন্ময় হয়ে ভাবেন রাতের তারাদের। এক সময় কবি তারাদের গুণতে চেষ্টা করেন। কিন্তু পেরে ওঠেন না। তাই তারাদের সাথে মিতালি করতে চান। তারাদের ভাবতে ভাবতে কবির রাত সারা হয়ে যায়। কবির ভাষায়—
‘ত য়ের কাছে তারা
তাকায় পলক হারা
সকল তারা গুণতে গিয়ে
রাত হয়ে যায় সারা।।’
কবি রাতের সহচর। আবার ফুলের সাথেও মিতালি গড়েন। খুকুর খোঁপায় বাঁধেন দোপাটি। দোয়েলের সাথেও খেয়ালে মেতে ওঠেন তিনি। তোমাদেরকেও সাথে রাখতে চান। ভুলতে চান না তোমাদের। কবির ভাষায়—
‘দ য়ের কাছে দেয়ালে
দোয়েল নামে খেয়ালে,
ফুল ফুটেছে দোপাটি,
বাঁধছে খুকু খোঁপাটি।।’
এখন নবান্নের সময়। মাঠে মাঠে সোনালি ধানের ছড়াছড়ি। কৃষকদের আনন্দের ছুটোছুটি। রাত জেগে কিষাণ বধূর ধান সিদ্ধের মাতামাতি। গ্রামের ধুলো-বালির রাজ্যপাট দেখতে মন চায় কবিরও। তোমরাও গ্রামে যেতে চাও নিশ্চয়ই! হ্যাঁ, কবি তোমাদের গ্রামের ধানের ক্ষেতে বেড়াতে নিতে চান। ধুলোবালির রাজ্যপাটে ঘুরতে চান। চল না, কবিকে সাথে নিয়ে একটু ঘুরে আসি। কবির আকুতি—
‘ধ য়ের কাছে ধান খেতে
ওঠে আমার মন মেতে,
ধকে নিয়ে ধু ধু মাঠ
ধূলা-বালির রাজ্যপাট।।’
কবি ধুলা-বালির গাঁয়ের লোকজনের সাথে মিশে গিয়েছেন আপনার করে। হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা দিয়ে। আমরাও কবির মতো করে গ্রামের সহজ সরল লোকজনকে আপন করে নেবো হৃদয় দিয়ে।
কবি ফুল-পাখিদের রাজ্যে তোমাদের যেতে বলেন। তাদের সাথে মিতালি করতে বলেন। কবি নিজেও ফুল-পাখিদের ভালোবাসেন। ওদের রাজ্যে সময় কাটান। কবির ভাবনায়—
‘ফ য়ের কাছে ফলসা,
ফলসা গাছে জলসা,
জলসা হবে আজ যে
ফিঙে পাখির রাজ্যে।।’
ছোট্ট সোনামণিরা, আমরা কিন্তু তোমাদেরকে ভালো মানুষ হিসেবে দেখতে চাই। তাই আদর্শ ও চরিত্রবান হয়ে গড়ে উঠতে হবে তোমাদেরকে। আনন্দ-রাজ্যে সুখের নহর বইয়ে দিতে হবে তোমাদেরকেই। তাই এসো, আমরা সবাই ভালো মানুষ হই। সুজলা-সুফলা এ দেশটাকে মায়ের মতো ভালোবাসি। দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে সোনার বাংলাদেশ গড়ি। তোমাদের অনাগত সুন্দর জীবনের প্রত্যাশায় রইলাম।
মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্স লিমিটেড
আরশি প্লাজা, তৃতীয় তলা, ডিবি রোড, গাইবান্ধা
অক্টোবর 2019

