কিছু স্মৃতি কিছু অভিমান

সংখ্যা:

 

আসরের পর মাদরাসা ছুটি হতেই এক দৌড়ে বাড়ি এলাম। তালিম-ঘরে তালিম হচ্ছে। পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা। ফলের ঝুড়ি হাতড়ে বড়সড় একটা আপেল নিলাম। একটা কামড় বসিয়ে ঘর থেকে বের হলাম, উদ্দেশ্য পুকুরপাড়ের বেল গাছ। গ্রামের ছেলেরা নাকি অতি দ্রুত গাছে চড়া শিখে ফেলে। আমি গ্রামের না হলেও গ্রামে আছি প্রায় দুই বছর। এতদিনে কম-বেশি সব গাছই চষে বেড়ানোর কথা। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও এই কম্মো আমার দ্বারা হাসিল হয়নি। এই বেল গাছটা ব্যতিক্রম। প্রথম চেষ্টাতেই আমি গাছে চড়তে সফল। গাছটাও যেন আপন করে নিল আমাকে।

এরপর থেকে প্রতিদিন আসরের পর আমার একটাই কাজ, খাবার-দাবার নিয়ে গাছে ওঠা। সূর্যের আলো আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়, শুরু হয় হাজারও পাখির কলরব। পাখির কিচিরমিচিরের সাথেই যেন হয় আমার মিতালী। স্তব্ধ পৃথিবী, পড়ন্ত বিকেলের শীতল হাওয়া, আরামে চোখ বুজে আসে। গাছের সবচেয়ে নিচু ডালটি মোটা হয়ে বেঁকে গেছে অনেকটা, যেন কারও বসার জন্য বানানো হয়েছে ওটাকে। ডালে বসে পা দুলাই আর হাতে থাকা আপেলটাতে কচ করে কামড় দিই। মাঝে মাঝে ও বাড়ির ছোটো নানা আসেন পুকুর থেকে পানি নিতে, আমাকে দেখলে জিজ্ঞেস করেন, ‘কী রে? সন্ধ্যেবেলা গাছে উঠে বসে আছিস কেন?’

‘এমনি।’

‘এই সময় গাছে জিন-ভূত থাকে জানিস না?’

আমি কোনো উত্তর দিই না। নানা তাড়া দেন, ‘শিগগিরই নেমে আয়।’

আমি নির্বিকার জবাব দিই, ‘পরে নামব।’

নানা বিড়বিড় করতে করতে বাড়ির পথ ধরেন।

গাছের উপরের ডালগুলোতে আমি ওঠার চেষ্টা করি না; একবার করেছিলাম, ফলাফল ভালো হয়নি। পড়তে পড়তে বেঁচে গেছি। পড়ে গেলে হয়তো হাত-পা ভাঙত, তখন দোষ দেওয়া হতো গাছটাকে। গ্রামে-গঞ্জে কোনো কথা রটে যায় খুব সহজেই। দেখা গেল কিছুদিন পর মা তার ছেলে মেয়েদের বলছে, ‘এই, তোরা কিন্তু পুকুর পাড়ে কখনোই যাবি না, ঐখানে বেল গাছে জিনের বাস আছে।’ এই সুবাদে হিন্দুরাও হয়তো এসে পুজো দিতো। যাক বাবা, বড় বাঁচা বেঁচে গেছি। সেদিনের পর থেকে এই নিচু ডালটাই আমার আস্তানা।

পড়ন্ত বিকেলের নরম আলো, উদাস দৃষ্টি, আমি হারিয়ে যাই কল্পনার রাজ্যে। মাঝে মাঝে খুবই ইচ্ছে হয় কারও সাথে কথা বলতে, তখন কথা বলি তার সাথে। সে অবশ্যি বলে না, কথা যা বলার আমিই বলি, সে শুধু শুনে যায়।

আমার চোখদুটো অস্থির হয়ে খুঁজছে বেল গাছটাকে। এই তো এখানেই ছিল।কিন্তু কোথায় বেল গাছ! সমস্ত জায়গা জুড়ে মস্ত বড় এক পাকা-ঘর। আমি অযথাই ঘোরাঘুরি করতে লাগলাম। মনকে প্রবোধ দিলাম, হয়তো ভুল জায়গায় এসে গেছি। মন এই মিথ্যাপ্রবোধ গ্রহণ করে নিল।

নিয়তির নির্মম সত্যকে সে মেনে নিতে চাইল না। ছোটো নানাকে দেখলাম বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন, আমাকে দেখেই বললেন, ‘কী খবর নাতি! কখন আসলা? এবার তো বহুদিন পরে আসছ।’

‘জি নানাভাই, ভালো আছি।’ আঙুল দিয়ে ইশারা করে বললাম, ‘এখানে একটা বেল গাছ ছিল…’

‘ও, ওটা তো কেটে ফেলেছি। দেখো না কত সুন্দর একটা ঘর উঠিয়েছি।’ নানার চোখ-মুখ খুশিতে চকচক করছে, নানা আরও কী কী যেন বললেন তারপর, আমার কান দিয়ে ওসব ঢুকলেও খেয়াল তখন ওই ঘরের দিকে। শূন্য দৃষ্টিতে ঘরটার দিকে তাকিয়ে রইলাম শুকনো একটা হাসি ধরে রাখার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে।

কথা বলতে বলতে নানা ফিরে গেলেন ততক্ষণে; নিজের অজান্তেই চশমার ফাঁক গলে গড়িয়ে পড়া দুফোঁটা অশ্রু তাঁর নজর এড়িয়ে গেল।

 

লেখক : শিক্ষার্থী: মাদ্রাসা বাইতুল উলুম, ঢালকানগর

 

জুলাই, ২০১৯

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১