সেদিন দুপুরে বাড়ির উঠোনে চেয়ার পেতে বসে বই পড়ছিলাম। হঠাৎ একটা লাল পিঁপড়ে এসে আমার পায়ে কামড় দেয়, বই পড়ার মনোযোগটা আপাতত শেষ। একটু চুলকালাম, বেশ ভালো লাগছে। এখন যেদিকটায় আমি বসে আছি, সেটা পশ্চিম। কড়ই গাছ ও মেহগনি গাছের শামিয়ানায় ছাওয়া জায়গাটা। পাশেই আমাদের পুকুর। এখানে বসে বই পড়তে বেশ লাগে। পূর্ব পাশটায় প্রচণ্ড রোদ আসে। সেখানটা কাপড় শোকাবার জন্য, বাঁশ দিয়ে আড় বানানো হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে আম্মা কিছু ভেজা কাপড় নেড়ে গেছেন। আমাদের কাপড়ের সঙ্গে বাবার পাঞ্জাবিও আছে সেখানে। বাবার পাঞ্জাবিটা আমাদের জামার সাথে বড্ড বেমানান দেখাচ্ছিল। আমার স্মৃতিতে যতটুকু স্মরণ আছে, প্রায় সাত-আট বছর যাবৎ দেখে আসছি এ জামাটা, শুধু এ জামাটাই না, বাবার সবগুলো জামাই বেশ পুরানো।
বই পড়ার আগ্রহটা একেবারেই নষ্ট হয়ে গেল। বাবার জন্য দুঃখ হলো। এই মানুষটা এমন কেন? তাঁর কি কোনো রুচিবোধ নেই? এই মানুষটা কী এমন করতে চায়? আমাদের সুখ কি তাদের দুঃখ সয়ে যাওয়ার মধ্যেই? নিজের ইচ্ছেকে গলাটিপে হত্যা করে, সন্তানের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়া। আচ্ছা, পৃথিবীর সব বাবাই এমন করে, না আমাদের মতো নিম্ন মধ্যবিত্তের বাবারা এমন করে?
আমরা কিছুদিন পরপর জামা বানাই, কিন্তু বাবা সেই কবেকার বানানো জামাগুলোই পরছেন। আজ পাঁচ বছর যাবৎ, বাবাকে কোনো ঈদে, নতুন জামা নিতে দেখিনি। কিন্তু ঈদের দুমাস আগেই আমাদের জিজ্ঞেস করেন, এবার জামার জন্য কত টাকা লাগবে? এবার আরো ভালো জামা বানাবে। কখনও কোনো কষ্ট করবে না। যা পছন্দ হবে তাই বলবে। আমি আমার রক্ত বিক্রি করে হলেও তোদের জন্য করবো।
বাবার পাঞ্জাবিটা দেখার পর মেজাজটা চটে যায়। রেগে ফুঁসে পাঞ্জাবিটা হাতে নিয়ে আম্মাকে জিজ্ঞেস করি—‘এ পাঞ্জাবিটা আর কত বছর পরবে আব্বা?’
আম্মা অসহায়ের মতো করে বলেন, ‘আমি তো তোর বাবারে কতো করে বললাম, একটা নতুন জামা বানাতে, কিন্তু তোর বাবা বানায় না, আমা কী করার আছে!’ এরই মাঝে আমাদের সংসারের শাহজাদি দৌড়ে এসে বলে, ‘ভাইয়া, তুমি কাকে বলছ আব্বুর জামার কথা?’
‘কেন, আম্মাকে বলেছি!’
‘ভাইয়া, তুমি তাঁকে জিজ্ঞেস করো সে কেন নতুন কাপড় নেয় না?’
আমি আম্মার কাপড়ের দিকে কোনোদিন খেয়াল করিনি। আজ দেখে মনে হচ্ছে, এ সংসারের অনেক বোবা কষ্টের আর্তচিৎকার আমার কানে আসে না, বা কখনো আসতে দেওয়া হয় না।
এরপর আম্মাকে আর কিছু বলিনি। লজ্জায় কুঁকড়ে গেছে আমার আমি। তাঁদের কাছে আজন্ম হার মেনেছে আমার আমি।
ভালো থাকুন পৃথিবীর নব নিম্ম মধ্যবিত্ত বাবা—মা। ভালো থাকুন আমার আব্বা এবং আম্মা।
লেখক : ছাত্র, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া দক্ষিণ যাত্রাবাড়ি, ঢাকা
জানুয়ারি 2020

