আমার সাইয়িদ : যেখানে খুঁজে পাই আমার সংগ্রামের তারিফ

সংখ্যা:

 

মখমলে উষ্ণতার এক সাদাভ যৌবনে সদ্য ঢুকে পড়া এক বৈপ্লবিক সাবাহের কথা আমার খুব মনে পড়ছে আজ। আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে সেই যে পান করে গিয়েছি রোজ সন্ধ্যায়; এক সমুদ্র বিপ্লবের শরাব—সুমিষ্ট ‘লাজজাত’ আর সারি সারি রায়ট কারের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আমার ‘ইল্লাল্লাহ’র সমুচ্চারিত আবেগের তাড়না, সবই আমার মনে পড়ছে আজ। মনে পড়ছে বারেবার আমার সায়্যিদ—দূর থেকে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে তাঁর সোনাঝরানো বক্তৃতার সেইসব শব্দমালা। শব্দের ভেতর শব্দে শব্দে তরঙ্গাভিঘাত। সন্তর্পণে নিজের অগোচরে বলছি শুধু—সায়্যিদির রাঈস, দেখা হবে জান্নাতে, আধোছেঁড়া হাত, রক্তাক্ত সদর আর প্রেমের মুলাকাতে একে অপরকে জড়িয়ে। অন্তঃস্থ ‘শুউর’কে ‘শুয়ারা’য় পরিণত করে এক অভিনব ছন্দের তালে।

আজকের এ সকালে সবুজ রঙের পুরোনো ক্যানভাসে আলতো করে বাঁকানো দুটো তরবারির একটু নিচেই দগদগে হলুদ কালিমায় অর্ধসমাপ্ত একটি স্লোগান—‘ওয়া আয়িদ্দু’-এর কথা প্রাণভরে স্মরণ করতে ইচ্ছে করছে আমার। বিস্ময়ভরা চোখে একটু নত হয়ে সে শ্রদ্ধার অনুভূতি, আমি ভুলে যাইনি কিংবা যেতে পারিনি এতো এতো কাল পরেও। পৃথিবীভরা ক্রান্তির এ সময়ক্ষণে রীতিমতো আমাকে যে বলে গিয়েছে শক্তির সমস্তটা পুঁজি করে ছুটে চলো যুদ্ধের ওই ময়দানে, যেখানে তোমার ভাই অপেক্ষারত। অপেক্ষারত তোমার অপ্রতিরোধ্য রক্তের টগবগে তারুণ্য। সত্যি সত্যিই সে সময়গুলোর কথা ভেবে অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছি আমি, যে সময় আমাকে ভেঙে পড়া এক কওমের হাত টেনে সাহস জুগিয়েছিল বাড়িয়ে দিতে অদম্য ‘আকদাম’। ‘ইখওয়ান, ইখওয়ান’ নামের ক্রমাগত ‘আযকার’, আমাকে বলছিল ‘নাসরুম মিনাল্লাহি ওয়া ফাতহুন কারিব।’

জাগতিক বাস্তবতাকে ব্যাখ্যার তত্ত্বগুলো আমি ভাঁজ করে রেখে দিয়েছিলাম ঠিক তখন থেকে। ভুলে যেতে চেয়েছি ‘বাঁচতে হবে’র নির্মম অসত্য কথাকে। সশস্ত্র সংগ্রামের বিধ্বস্ত কলাকৌশল রপ্তের এক অভিনব এরাদা আমার মনে কেমন করে যেন জেগে জেগে উঠেছে ক্রমশ। আমার মনে কেবল বেজে গেছে সেই এক শব্দ—হাসান আল বান্নার চির অপ্রতিরোধ্য ‘ইখওয়ানে’র ‘ওয়া আয়িদ্দু’। কী অভূতপূর্ব আহ্বান। কালপরম্পরায় তা জ্বলে উঠেছে। নিভেছে। গভীর বিধ্বস্ততার ভেতরেও মুছে দিয়ে গেছে অসত্যের প্রলাপ। তবে কথা তো তাই—‘ওয়া আয়িদ্দু’র পুাকাবাহী এ মুভমেন্ট, কী অভূতপূর্ব তাসিরে তাসিরে ভরপুর করে দিয়ে গেছে আমার এ ক্ষুদ্র জীবন। কেননা আমি জানি এ ব্যানারটির ভেতরে লুকিয়ে আছে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সংগ্রামের ইতিহাস। উত্থান থেকে পুনের মধ্যবেলায় খুলুসিয়্যাতের নানাবিধ ‘আমসিলা’ আর ‘শাওয়াহেদ’ এখানে টইটম্বুর।

১৯৪৯-এর শুববানুল মুসলিমিনের সেই কার্যালয় সম্মুখে হাসান আল বান্নার রক্তের দাগ এখানে লেগে আছে। এখানে আছে আবদুল কাদের আওদাহ আর হামিদা কুতুবের ফাঁসির মঞ্চে ঝুলে থাকা নিথর দেহ। এবং আরও আছে সাইয়েদ কুতুবের ওপর কুকুর লেলিয়ে নির্যাতনের মতো নির্মমতা। বহু নির্মমতার পরও এখানে উজ্জ্বল হয়ে আছে সাইয়েদ কুতুবের হত্যার কিছু সময় পূর্ব পর্যন্ত ‘আল্লাহু আকবর ওয়া লিল্লাহিল হামদ’ বলে চিৎকার করে উঠবার মতো অবিচলতা। সাহস। আমৃত্যু সংগ্রাম। সবশেষে সায়্যিদি—প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসি; ইখওয়ানের এ তীব্র উত্থান-পুনের মাঝে পূর্বের মতোই নির্যাতনের যাতাকলে পিষ্ট আপনাকে এ রঙিন সকালবেলায় জানাই লাল সালাম, যখন এ ভূপৃষ্ঠে আপনার হৃদয়ের কোনো কম্পন, হৃদস্পন্দন আর হচ্ছে না। এবং অভিবাদন জানাই মৃত্যু-পূর্ব আপনার ওই কবিতা-পঙক্তিকে—‘আমার এ পবিত্র শহর, যদি আমার প্রিয়জন প্রেমাষ্পদের উপরও চালায় নির্মম অত্যাচার, আর জুলুমের পদভারে পিষ্ট হয়ে আমার পরিবার পরিজন জীর্ণতায় নুয়ে পড়ে; তবুও এ শহর আমার হৃদয়ের মেহরাবে আঁকা এক সম্মানের ছবি।’

ত্রিমুখী ষড়যন্ত্রের পদভারে ইহজাগতিক ক্ষমতার লড়াইয়ে হয়তো হেরে গিয়েছেন আমার সাইয়িদ। ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যের যে বিন্যাসের আকাঙ্ক্ষা করে, রাজনীতির যে ধরন ও চরিত্র চায়, আমেরিকার নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার যে চিত্র আঁকে, তারা এ উত্থানকে কোনোভাবেই কবুল করতে পারছিল না হয়তো। আমার সাইয়িদ মধ্যপ্রাচ্যের আমেরিকান বিন্যাসের পথে হয়তো হয়ে উঠেছিলেন মস্ত বড় এক সমস্যার কারণ। কেননা তিনি তো একটি প্রেরণা হয়ে উঠছিলেন ক্রমশ দেশে দেশে স্বৈরাচারবিরোধী প্রতিরোধী জনতার সামনে। কেননা তিনি সব হাতড়ে ফিরে মানবমুক্তির একমাত্র আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিলেন ইসলামের চিরশান্তিময় এ আলয়ে। যার ফলে স্পষ্ট কালিমায় বলে দিতে পারি, সাইয়িদ, তিনি অবশ্যই জিতে গেছেন আসল লড়াইয়ে। কেননা তিনি আমাদেরকে তো শেখাতে পেরেছিলেন—কীভাবে পশ্চিমা রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির চির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েও কারাগারের অবরুদ্ধ শেকল ছিন্ন করে চিৎকার করে বলা যায় ‘লা নাখশা ইল্লাল্লাহ’। অযাচিত হেকমতের শরণাপন্ন হয়ে চিরকাল ঘুমিয়ে না থাকার শিক্ষাটাও তিনি আমাদেরকে দিয়ে গেছেন। আজকের পৃথিবীটা আমাদের না জেনেও ‘আল কুরআনু শারিয়াতুনা’র স্লোগান দিয়ে যাবার যে ছন্দ, অবশ্যই তিনি আমাদেরকে শিখিয়ে গেছেন। কারাগার প্রকোষ্ঠে তাঁর তিলে তিলে ক্ষয়ে যাওয়া রক্তের কসম, মুসলিম উম্মাহ এখানে পেতে পারে তাঁর হারিয়ে যাওয়া শক্তি, সাম্রাজ্য আর অধঃপুন থেকে বেরিয়ে আসার আকাঙ্ক্ষিত পথ।

সবশেষে আপনাকে আবার স্মরণ করি হে সাইয়িদ। দেখুন, আপনার অবর্তমানে ফিলিস্তিনকে আবার হাঁটতে হচ্ছে সেই সিনাই উপ্যুকার দিকে। হুব্বে ওয়াতানের সব স্মৃতির কথা ভুলে গিয়ে ছেড়ে দিতে হচ্ছে প্রাণময় ‘ফিলিস্তিন’। ফিলিস্তিনের পথে পথে রোজকার যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা সে শিশুগুলো হয়তো এ জীবনের সব মোহ ছেড়ে বারেবার ভাবছে এ পৃথিবীতে কি সত্যিই সব ‘মুরসি’রা হারিয়ে গেছে? সত্যি সত্যিই সবাই কি ভুলে গেছে তাদের আসল পরিচয়? হয়তো ‘সফকাতুল র্কান’-এর এ চুক্তি শেষে তারা গাট্টিবোচকা নিয়ে হেঁটে যাবে সিনাইয়ের দিকে। অভিমান করে একপলক আকাশের দিকে চেয়ে বলে ফেলবে আমার সাইয়িদ মুরসি তো আর নেই। ফিলিস্তিনের ওই শিশুদের মতোই আমি আজ এই বৃষ্টিমৃখর সকালে নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিতে পারি হে আমার বিপ্লব-সংগ্রামের পথ দেখিয়ে দেয়ার শিক্ষক, আপনি তো আর নেই।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, মাদরাসাতুল কাউসার, ঢাকা

 

জুলাই, ২০১৯

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১