মুরসি-জীবনের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত

সংখ্যা:

 

পুরোনাম মুহাম্মদ মুরসি ইসা আইয়াত। ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে উত্তর মিশরের শারকিয়া জেলার আদওয়া গ্রামে জন্ম। গ্রামে থাকতেই কুরআন হিফজ শেষ করেন এবং সেখানেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য মিশরের রাজধানী কায়রোতে আসেন এবং কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৫ সালে প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক ও ১৯৭৮ সালে একই বিষয়ে সম্মান ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি উচ্চ শিক্ষার্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যান। ১৯৮২ সালে ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ক্যালিফোর্নিয়াতে মুহাম্মাদ মুরসির প্রকৌশল বিষয়ে গবেষণা শেষ হয় এবং তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।

 

কর্মজীবন

এর আগে স্নাতক শেষ করে মুহাম্মদ মুরসি কিছুদিন কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করেন। ১৯৭৫-৭৬ সালে মিশর সেনাবাহিনীতে সেবা দান করেন। ১৯৮২ সালে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, নর্থরিজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৮৫ সালে শারকিয়া প্রদেশের জাকাজিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপনার চাকরি ছেড়ে মিশরে ফিরে আসেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই তিনি ২০১০ সাল পর্যন্ত অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া লিবিয়ান ফাতেহ বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে পাঠদান করেন।

 

আদর্শিক ও রাজনৈতিক জীবন

ছাত্রজীবন থেকেই মুহাম্মদ মুরসি ইসলামি ধারা গ্রহণ করেন। ১৯৭৭ সালে ইখওয়ানুল মুসলিমিনে যোগ দেন। ইখওয়ানের সাংগঠনিক কাঠামোর সাথে জড়িত ছিলেন তিনি। ১৯৯২ সালে ইখওয়ান রাজনৈতিক শাখা গঠন করলে এর সদস্য হিসেবে কাজ করেন এবং পরবর্তী সময়ে সর্বোচ্চ কমিটির সদস্য হিসেবে নিযুক্ত হন। পাশাপাশি সবসময় সামাজিক ও সেবামূলক কাজে জড়িত থাকেন। ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন।

মুহাম্মদ মুরসি ২০০০ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সাংগঠনিকভাবে তিনি ইখওয়ানুল মুসলিমিনের সদস্য হলেও নির্বাচনে তাঁকে ইখওয়ানের অন্যান্য নেতাদের মতো আইনের মারপ্যাঁচের কারণে স্বতন্ত্রভাবে লড়তে হয়। কারণ, হোসনি মুবারকের শাসনামলে ইখওয়ান মিশরের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নিষিদ্ধ ছিল। সংসদীয় মেয়াদে মুহাম্মদ মুরসি তাঁর ধারার নেতা হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন এবং সংসদে ভূমিকার জন্য বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হন। এ সময় বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হন তিনি। এর মধ্যে ২০০৬ সালে বিচারক নিয়োগে অনিয়মের প্রতিবাদে ডাকা বিক্ষোভ থেকে তাঁকে আটক করা হয় এবং প্রায় সাত মাসের মতো তিনি বন্দী ছিলেন।

 

আরব বসন্ত

আরব বসন্ত শুরু হলে ২০১১ সালের ২৮ জানুয়ারি অপর ২৪ ইখওয়ান-নেতার সাথে মুরসিও গ্রেপ্তার হন। তবে দুই দিন পর তিনি কায়রোর জেল থেকে পালিয়ে যান। দুর্গম ওদিউন নাতরুন কারাগার থেকে পলায়নের ঘটনা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। মিশরের তৎকালীন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে কারাপ্রহরীরা পলায়ন করলে স্থানীয় জনতা তাঁদেরকে মুক্ত করেন। সিসি ক্ষমতা দখলের পর মুরসিকে এই ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

 

মিশরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০১২

মূলত দলীয় উপনেতা ও রাজনৈতিক প্রধান খাইরাত আল-শাতেরই ছিলেন ইখওয়ানুল মুসলিমের মূল রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী। কিন্তু একটি আদালত প্রচারণা শুরুর আগে শাতের-সহ একাধিক প্রার্থীকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করলে ইখওয়ানের রাজনৈতিক শাখা থেকে প্রার্থী হিসেবে মুহাম্মদ মুরসির নাম উঠে আসে, যিনি মূলত সংগঠনটির দ্বিতীয় মনোনয়ন ছিলেন। পরে ইখওয়ানের রাজনৈতিক শাখা ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিজ পার্টি মুরসিকে তাদের প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করে।

ইখওয়ানের এক দলত্যাগী জনপ্রিয় নেতার অংশগ্রহণ সত্ত্বেও মুহাম্মদ মুরসি ২৩ মে ২০১২-এর নির্বাচনে ২৫.৫ শতাংশ ভোট পান, যা ছিল সর্বোচ্চ। প্রথম পর্বের পর মুহাম্মদ মুরসি ও আহমেদ শফিক দ্বিতীয় পর্বের চূড়ান্ত ভোটাভুটির জন্য মনোনীত হন। দ্বিতীয় পর্বের নির্বাচনের আগে মুহাম্মদ মুরসি মিশরের সর্বস্তরের মানুষের প্রতি আহমেদ শফিকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।

মুরসির রাজনৈতিক দল আহমেদ শফিককে, যিনি সাবেক বিমান বাহিনী প্রধান এবং হোসনি মুবারাকের অধীনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাকে ক্ষমতাচ্যুত মুবারকের রক্ষাকর্তা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় এবং বলা হয়, শফিক নির্বাচিত হলে মিশরের ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসন নতুন জীবন পাবে। ২৪ জুন ২০১২ তারিখে মুরসিকে দ্বিতীয় পর্বের নির্বাচনে জয়ী, অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। এর পরপরই মুরসি ইখওয়ান ও ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি থেকে আনুষ্ঠানিক অব্যাহতি গ্রহণ করেন।

 

প্রতিবিপ্লব

এক বছর যেতে না যেতেই মুরসি-সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবদেল ফাত্তাহ সিসি মুরসির বিরুদ্ধে অনাস্থা জানান এবং সিসির নেতৃত্বে সাময়িকভাবে সংবিধান স্থগিত করা হয়। বিচারপতি আদলি মনসুর অন্তবর্তীকালীন প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। জনবিক্ষোভের অজুহাতে সামরিক বাহিনী মুরসির সরকারকে বরখাস্ত করে।

মুরসিকে আটক করে অজানা স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েক মাস পর আদালতে হাজির করে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ আনা হয় তাঁর বিরুদ্ধে। যার মধ্যে কারাগার থেকে পলায়ন ও হামাসের সাথে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ অন্যতম। এ দুটো অভিযোগে তাঁকে ২০১৫ সালে যথাক্রমে ফাঁসির রায় ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

 

ইন্তেকাল

গত ১৭ জুন ২০১৯, সোমবার তাঁকে আদালতের সামনে হাজির করা হয়। তিনি আদালতের কাছে বক্তব্য দানের অনুমতি চান। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে গোপন কিছু তথ্য আছে, মিশরের নিরাপত্তার কথা ভেবে তা আমি প্রকাশ করছি না।’ বক্তব্য দানের মাঝপথে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বিরতিতে চলে যাওয়া হয়। বিরতির সময়েই তিনি জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়েন। আসামি সেলে তিনি একাই ছিলেন। পাশের সেল থেকে চিৎকার চেচামেচি শুরু করা হয়। আধা ঘণ্টা পর উদ্ধার করে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ততক্ষণে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন মহাকালের যাত্রায়।

 

ইন্টারনেট অবলম্বনে লিখেছেন হামমাদ রাগিব

 

জুলাই, ২০১৯

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১