রৌদ্রস্নাত জীবন

সংখ্যা:

 

রোদে পুড়ে যাচ্ছিলাম। রোদের প্রখরতায় একেবারে সিদ্ধ হয়ে যাবার জোগাড়। এত রোদে কারও অপেক্ষায় কি দাঁড়িয়ে থাকা যায়? ফোন করে করে বকাবাজি করছি আর রাস্তায় পায়চারি করছি। এই দুইটাই ছিল আমার তখনকার কাজ। মেজাজটা উঠেছিল চরমে। রাস্তার যে পাশে আমি পায়চারি করছিলাম, সে পাশে একজন পাঁপড়-ভাজা বিক্রেতা বসে আছেন বেশ গুটিসুটি হয়ে। মাথায় পুরানো টুপি। জীর্ণ কাপড়। শীর্ণ দেহ। শরীর-চেহারা ধুলোমলিন। গালে সুন্নতি দাড়ি। রোদে পুড়ে যেন কালো হয়ে গেছেন। রোদের তাপে উপর দিকে তাকানো দায়। কয়েকটি করে পাঁপড় ভাজা পলিথিনে প্যাকেট করা। রাস্তা দিয়ে তাঁর পাশ কেটে যে-ই যাচ্ছেন, তিনি তাঁর পা অথবা চেহারার দিকে তাকাচ্ছেন। যেন ভাবছেন, ‘এই হয়তো তাঁর ক্রেতা।’ আমার দিকে তাঁর চাহনি যেন বলছিল, ‘কয়েকটা পাঁপড় ভাজা নেন না, ভাই!’ হঠাৎ পাঁপড় ভাজা খেতে ইচ্ছে করল আমার। বাসায় ফোন করে অনুমতি নিয়ে পাঁপড় ভাজা বিক্রেতার কাছে গেলাম। বললাম, ‘দুইটা পাঁপড় ভাজা দেন তো!’

শরীর, হাত, পা কাঁপতে কাঁপতে আধো আধো কণ্ঠে বললেন, ‘না, ভাই! দুইটা দেওয়া যাবে না। পাঁচ পিস বিশ টাকা।’

তাঁর করুণ অবস্থা আর চাহনি দেখে আমি অবাক হলাম। কেননা তাঁকে দেখে মোটেও বোঝার উপায় নেই যে, তিনি এতটা অসুস্থ। হতবিহ্বলতার আতিশয্যে তাঁকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই বললাম, ‘আচ্ছা দেন, পাঁচটাই দেন। এই নিন বিশ টাকা।’

পাঁপড় ভাজা হাতে নিয়ে মহাসড়ক পার হতেই মনে পড়ে গেল, বিশিষ্ট এক সাহাবির কথা। যিনি একজন সংকটাপন্ন দরিদ্রের কাছ থেকে কয়েকগুণ মূল্য বেশি দিয়ে একটি উট ক্রয় করেছিলেন।’ আমি ফের রাস্তার ওপারে গেলাম পাঁপড়-বিক্রেতার কাছে। বললাম, ‘ভাই, সাধারণ নিয়মানুযায়ী পাঁচটি পাঁপড় ভাজার দাম হয় পঁচিশ টাকা। যাইহোক, এই টাকাটা রাখুন। এমনিতেই দিলাম আপনাকে।’ খুব হাস্যোজ্জ্বল হয়ে টাকা গ্রহণ করলেন সাদরে। মনে অজানা এক প্রশান্তি অনুভব করলাম। সুযোগে তাঁর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করল। তাঁকে জানতে মনটা উতলা হয়ে উঠেছে এতক্ষণে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই, নাম কী আপনার?’

‘মুহাম্মদ রাকিবুল ইসলাম।’

‘সুন্দর নাম। তো, আপনার কী হয়েছে? শারীরিক অবস্থা এতটা নাজুক কেন?’

‘চার বছর আগে ব্রেইন স্টোক করেছিলাম। দুই মাস হাসপাতালে ছিলাম। এরপর বাড়ি এসে প্রায় তিন বছর ছিলাম শয্যাশায়ী। স্টোকের পর থেকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত আমি। সারাটা শরীর শুধু কাঁপে। অন্যজনের সাহায্য ছাড়া কিছুই করতে পারি না।’

‘আপনি কি সম্পূর্ণ চিকিৎসা করিয়েছিলেন?’

‘না রে, ভাই! ওই দুইমাস ঢাকা মেডিক্যালেই অনেক টাকা লেগেছিল। ডাক্তার বলেছিলেন সম্পূর্ণ চিকিৎসা করতে দুই-তিন লাখ টাকা লাগবে। এত সামর্থ্য যে নাই, ভাই। তাই আর চিকিৎসা করাতে পারিনি।’

‘‘জানেন! আমার চাচাও স্টোক করেছিলেন। দীর্ঘ একটা বছর শয্যাশায়ী ছিলেন। হাতের দুইটা আঙুল ছাড়া কিছুই নাড়াতে পারতেন না। বিছানায় পড়ে থাকতেন নিথর হয়ে। প্রায়ই চোখ বেয়ে টপটপ করে পড়ত যন্ত্রণার অশ্রুজল। তিনটা সন্তান রেখে গেছেন। বড়ো ছেলেটার এখন মাত্র ১০ বছর।’

‘আহ! কতটা কষ্ট করেছেন আপনার চাচা। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতে দিক। ওনার তুলনায় অনেক অনেক ভালো আছি আমি, আলহামদুলিল্লাহ।’

‘বিয়ে-শাদি করেছেন নাকি?’

‘জি, ভাই! তিনটা সন্তানও আছে।’

‘বড় সন্তানের বয়স কত?’

‘এই তো ১০-১২ বছর হবে।’

‘আপনার বয়স কত?’

‘৩৩-৩৪।’

‘আগে কী করতেন?’

‘আগে কাটিংমেশিন চালাতাম। ভালো বেতন পেতাম। স্টোকোর পর থেকে ওই কাজ শেষ। সামান্য ভারি কাজ করার জন্য এতটুকুও শক্তি নেই।’

‘পাঁপড় ভাজা কি কিনে আনেন?’

‘না, আমার স্ত্রী বানিয়ে দেয়। আর আমি বিক্রি করি।’

‘থাকেন কই?’

‘ডেমরা।’

‘এতটা পথ, এতকিছু নিয়ে আসেন কী করে?’

‘একা আসি না, এই রিকশাওয়ালারা দিয়ে যায় আমাকে। একা কিছু করার জো নেই।’

‘এত রোদে, তপ্ত পিচঢালা পথে, ধুলাবালিতে এতটা সময় বসে থাকেন কী করে? একটা ছাতা কিনতেও তো পারেন।’

‘না, ভাই! ছাতা কেনার সামর্থ্য নাই। ২০০ টাকা দামের ছাতা কী করে কিনব? তাহলে তো সারাদিনের আয়ই শেষ হয়ে যাবে। আর কষ্ট করে পাঁপড় ভাজা না বেচলে যে ছেলে-মেয়েগুলো না খেয়ে মরবে।’

‘আপনি কি সবসময় এখানেই বসেন? আগে তো খেয়াল করিনি আপনাকে।’

‘হুম, এখানেই বসি প্রতিদিন।’

‘আচ্ছা ভাই! আপনাকে একটা ছাতা কিনে দেব আমি। এখন যাই। আবার দেখা হবে, ইনশাআল্লাহ।’

পরদিন ছাতা কিনতে গেলাম মার্কেটে। দামাদামি করে মধ্যম মানের একটা ছাতা কিনলাম। মনে মনে নিয়ত করে নিলাম, যতটা দিন তাওফিক হয়, ততটা দিন তাঁকে সাহায্য করে যাব সাধ্যমতো। আমাদের সমাজে তো এমন আরও কত রাকিব ভাই আছেন, তাঁদের কি কোনো খবর রাখি আমরা? তাঁদের দেখেও যেন আমরা না-দেখার ভান করে থাকি। মুখ ফিরিয়ে নিই অবজ্ঞাভরে। কেন এতটা স্বার্থপর আর নিষ্ঠুর আমরা? কেন মৃত আমাদের মানবতা? অথচ আমাদের সদিচ্ছা এবং সামর্থ্যানুযায়ী ছোট ছোট সহযোগিতাগুলোও পারে অসহায়-দুস্থদের বড় বড় মুসিবত ঘোচাতে। এত সব কষ্টের মাঝেও অন্যরকম এক প্রশান্তিময় হৃদয় নিয়ে রাকিব ভাইয়ের বসার স্থানটায় গেলাম। কিন্তু হায়, এ কী! তিনি যে নেই সেখানে! তারপরের দিনেও পেলাম না তাঁকে। হায়রে, কত কথা বলেছিলাম সেদিন, অথচ মোবাইল নম্বর রাখলাম না, নির্দিষ্ট করে ঠিকানাটাও নিলাম না। আমি একটা আস্ত বোকা। জানি না, কী হয়েছে তাঁর, কেন আসেন না তিনি। জানি না, আর কখনো রাকিব ভাইকে ছাতাটা দিতে পারব কি না।

 

তুষারধারা আবাসিক এলাকা, কদমতলী, ঢাকা

 

ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১