ভালোবাসি

সংখ্যা:

 

‘মেয়েটা স্কুলে পড়ে। বেতন দেওয়া হয়নি কয়েক মাস হলো। কিস্তির টাকার জন্য বৌদি তাড়া দিয়ে গেল। ঘরে চাউল নেই। কী করে সংসার চালাই, বলো! কোনো চিন্তা আছে তোমার সংসার নিয়ে?’

কাজল সিগারেটে শেষ টানটা দিয়ে মুখে ধোঁয়া জমায়। শারমিনের চুলের মুঠি ধরে মুখটা নিজের মুখের সামনে এনে ধোঁয়া ছাড়ে। শারমিন নিজেকে ছাড়ানোর জন্য বৃথা চেষ্টা করে গেল কিছুক্ষণ। কাজলের শক্তির কাছে পরাস্ত হয়ে নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও সিগারেটের ধোঁয়া নাকে-মুখে ঢোকে। বমি হবার উপক্রম শারমিনের। মুখের মধ্যে জমানো ধোঁয়া শেষ হবার পর চুলের মুঠি ছাড়ে কাজল।

কাজল এবার আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। এলোমেলো উস্কু চুলে চিরুনি করে শারমিনের দিকে তাকায়। মুখে একটু হাসি দিয়ে বলে, ‘দেখো তো, চুলের মাঝখানে সিঁথি করায় কেমন লাগছে আমায়?’

‘লাগছে, তোকে শয়তানের মতো লাগছে। শয়তানের বাচ্চা! সংসার করতে মন না চাইলে আমাকে বিয়ে করলি কেন? কেন বিয়ে করলি, কেন সংসার বাঁধলি?’

কাজল উত্তেজিত না হয়ে শান্ত স্বরে বলে, ‘শোন, তোর সঙ্গে আমি এখন বেশি কথা বলতে পারব না। আজকে আমি নতুন একটা কাজ শুরু করব। বাবার ব্যাবসা, বাবার। এটাকে আমরা মাল বলি। এ মালগুলো একবার বিক্রি করলে আমাদের কোনো কষ্ট থাকবে না আর। সবার পাওনা সবাইকে দিতে পারব। কিস্তির টাকা দিতে পারব। চাউল কিনতে পারব। আমি অনেক চিন্তা করেছি জানিস? এ ছাড়া আর কোনোভাবেই সংসাওে সচ্ছলতা আনতে পারব না। ঘরে বসে বসে দোয়া কর। প্রথম দিনেই পুলিশি কোনো ঝামেলায় যেন না পড়ি।’

শারমিন কাপড়ের আঁচল কোমরে গুজে দু হাত উপরে তুলে বলে, ‘দোয়া করি, ঘর থেকে বেরুলেই যেন তোকে পুলিশে ধরে। পিটিয়ে হাত পা যেন ভেঙে দেয়। তাহলেই তোর উচিত শিক্ষা হবে। তা ছাড়া তুই ভালো হবি না।’

কাজল এবার রাগ সংবরণ করতে পারল না, মাথায় রক্ত উঠে গেল তার। হাতের কাছে ছিল পানির জগ। জগটা হাতে নিয়ে ছুড়ে মারল শারমিনের দিকে। শারমিন সরতে পারেনি। পড়ল কপালের ওপর। বাবা গো বলে চিৎকার দিয়ে মাথা ধরে কান্না শুরু করল। মেয়ে দোলা খেলা করছিল উঠোনে। মায়ের চিৎকার শুনে দৌড়ে এলো। দেখে বাবা জামার বোতাম লাগাতে লাগাতে দরজা দিয়ে বেরুচ্ছে। আর মা ঘরের মাঝখানে কপাল ধরে কাঁদছে। শরীর ভেজা। একটা জগ কাত হয়ে পড়ে আছে অদূরে।

হন হন করে কাজল বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। যাবে দক্ষিণের মন্দির বাগানে। বাড়ি থেকে আধ কিলোমিটার দূরে। শওকতের সঙ্গে দেখা করবে। শওকত আসবে উখিয়া থেকে। সেখানে তার মুদি দোকান। সবাই তাকে মুদি দোকানি জানলেও সে দোকানি না। সে হলো ইয়াবা ব্যাবসায়ী। দীর্ঘ এক বছর ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। প্রতি মাসে একবার কুসুমপুর এলাকায় মাল দিয়ে যায়। শাহিন, রাসেল তা কিনে খুচরা বিক্রেতাদের হাতে তুলে দেয়।

এক পিস পঞ্চাশ টাকা কওে কেনে শওকত। বিক্রি করে একশ টাকায়। আর দুইশো টাকা দরে বিক্রি করে শাহিন, রাসেল। দুজনই কাজলের বন্ধু। কিছু দিন আগেও তারা কাজলের মতো ছিল অসচ্ছল। নুন আনতেই পানতা ফুরোতো। আজ তাদের সব জায়গায় সচ্ছলতার ছাপ। দিন দিন টাকার পাহাড় গড়ছে।

তাদের অগ্রগতি কাজলকে অনুপ্রেরণা দেয়। উদ্বুদ্ধ হয়ে নাম লেখাতে চায় তাদের দলে। প্রথমে রাজি না হলেও এক সময় কাজল ঠিকই রাজি করিয়ে ফেলে দুই বন্ধুকে। শাহিন, রাসেল টাকা নিয়ে মন্দির বাগানে যেতে বলে। সেখানে উখিয়া থেকে আসবে শওকত। শওকতের কাছ থেকেই কিনতে হবে প্রথমে। শওকতের সঙ্গে দেখা করতেই এখন যাচ্ছে।

কাজল আজকে এতো দিনের জমানো সব টাকা নিয়ে বেরিয়েছে। মুখে আর যাই বলুক পরিবার নিয়ে তারও একটা চিন্তা আছে। শারমিনকে সে ভালোবাসে অনেক। কিন্তু মুখ ফুটে ভালোবাসার কথা কখনো বলতে পারেনি। কী করে বলবে ভালোবাসার কথা? যদি অন্তরঙ্গ সেই মুহূর্তে কিছু চেয়ে বসে, কিছুর আবদার করে বসে!

একবার কাজল বলতে চেয়েছিল। গোসল করে এসে ভেজাচুলে সেদিন শারমিন কাজলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। কাজল একবার শুধু চোখ বুলিয়েছে। হৃদয় জুড়িয়ে গেছে ওর। ইচ্ছে করেছিল ওর ভেজা চুলগুলোর ওপর একবার হাত বোলায়। শারমিন বেশিক্ষণ দাঁড়ায়নি। সামনে থেকে সরে একটু দূরে দাঁড়িয়ে চুলের পানি নিচ্ছিলো। কাজলের সাধারণত এমন হয় না। শারমিনকে ঘিরে বাহ্যিক ভালোবাসার প্রকাশ খুবই কম। এগুলো বলতেও কেমন লজ্জা লজ্জা লাগে। কাজল বিছানা থেকে নামে। আজকে সব লজ্জা ঠেলে ভালোবাসার কথা বলবে। একেবারে পেছনে এসে দাঁড়ায়। পেছন থেকে ওকে জড়িয়ে ধরে কানে কানে ভালোবাসার কথা বলবে।

পেছনে আসতেই শারমিন পেছনে ফিরলো। চোখ বড় বড় করে বলল, ‘কী, কোন মতলবে আজকে চেহারায় সাধুর ভাব নিয়ে আসলে? পকেট খালি নাকি? দেবো, এই নোলকটা তুলে?’

ওর যা মেজাজ এখন। এ অবস্থায় যদি ভালোবাসার কথা বলতে যায় নিশ্চিত জুতো খুলে পেটাবে।

কাজল ভালোবাসার কথা সেদিন আর বলেনি। শারমিনের এমন ব্যবহারে কাজলের তৎক্ষনাত রাগ উঠলেও জানে শারমিনের মনের কথা। শারমিন যে ওকে জান-প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে সেটা ভালো করেই জানে সে। যদি ভালোই না বাসত তাহলে কি এতো অসম্মান আর টানা পোড়নের মাঝেও সংসার চালিয়ে যায়?

কাজল জানে এগুলো খারাপ। রাগের মাথায় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সচ্ছলতা থাকলে শারমিনকে মাথায় তুলে রাখতো। ওকে কোনো কাজেই হাত লাগাতে দিত না।

প্রথম যেদিন শারমিন এ বাড়িতে আসে সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। পাশের গাঁয়ের করিমতের মেয়ে শারমিন। বাবা-মা পছন্দ করেছিল। তখন অবশ্য খারাপ কোনো ধান্দার সঙ্গে কাজল যুক্ত ছিল না। সন্ধ্যায় সব মেহমান চলে যাবার পর কাজল ঘওে ঢোকে। ঘরের কোণে কেবল টিম টিম করে একটা প্রদীপ জ্বলছিল। খাটের মাঝখানে গুটিশুটি মেরে ঘোমটা দিয়ে বসেছিল শারমিন। কাজল আস্তে আস্তে নতুন বউয়ের কাছে যায়। খাটের ওপর বসে। ঘোমটা তুলে চেহারার দিকে তাকায়। অন্ধকার। কিছু দেখা যায় না। আবার ওঠে। প্রদীপটা হাতে নেয়। এবার এক হাতে ঘোমটা তুলে আরেক হাতে প্রদীপটা চেহারার সামনে নিয়ে আসে। একটা নিষ্পাপ চেহারা প্রদীপের আলোয় কাজলের সামনে প্রস্ফুটিত হয়। মাথা কাত করে কাজল হা করে তাকিয়ে থাকে। শারমিন লজ্জায় সেদিন মাথাটা আরো নিচু করে ফেলেছিল। কাজল মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার নাম কী?’

কাজল জানে ওর নাম শারমিন। বাবা-মায়ের কাছ থেকে শুনেছে। কিন্তু নতুন বউয়ের মুখ থেকে শুনতেই তার এ জিজ্ঞাসা।

শারমিন নিচের দিকে মাথা নুইয়েই অস্ফুট স্বরে বলল, ‘শারমিন।’

কাজল বলল, ‘বেশ নাম, বেশ। আমার নাম কাজল। জানো তো?’

শারমিন উপর-নিচ মাথা নাড়ালো। জানালো সে জানে।

কাজল কথা বলার জন্য আর কোনো কথা খুঁজে পায় না। সেই কখন থেকে দুজনের মাঝখানে প্রদীপটা ধরে রেখেছে। প্রদীপটা এবার বিছানার ওপর রেখে বলল, ‘আমার নাম কেন কাজল বলতে পার?’

শারমিন, মাথা নাড়ালো। জানালো, সে জানে না।

‘কাজল কোথায় দেয় জানো?’

শারমিন মাথা নাড়িয়ে জানালো সে জানে।

‘কোথায়?’

হাত দিয়ে চোখের দিকে ইশারা করল। হাত নাড়াতেই হাতের চুড়িগুলো ঝনঝন করে উঠলো। কাজলের পুরো শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। বিছানা থেকে নেমে প্রদীপটা আগের জায়গায় রেখে নিভিয়ে দেয়। সেদিনও ভালোবাসার কথা মুখ ফুটে বলতে পারেনি সে।

সেদিনের সে লাজুক মেয়েটি সময়ের তালে তো আজকের শারমিন হয়ে গেল। কাজল জানে, এটা কাজলের জন্যই হয়েছে। আজকের ব্যবসায় যা লাভ হবে লাভের টাকা কোনোমতেই খরচ করবে না। এ টাকা শারমিনের জন্যে বরাদ্দ। আলতা ওর খুব পছন্দ। পায়ে আলতা পরে ঘুরতে ওর ভালো লাগে। বিয়ের আগে আলতা-পায়েই ঘুরত সবসময়। বিয়ের দিন আলতা লাগিয়ে আসার পর আর লাগানো হয়নি।

কাজল সিদ্ধান্ত নিল, আলতা নিলেই শারমিন বেশি খুশি হবে। জগ লাগায় মাথায় ব্যথা পেয়েছে। মনের মধ্যেও আছে নানান ক্ষোভ। সব একনিমিশে চলে যাবে ওই আলতা দেখলেই।

হাঁটতে হাঁটতে মন্দির বাগানে চলে আসে কাজল। বাগানটা অন্ধকার। গাছগাছালিতে ছাওয়া। তবে জায়গাটা নিরাপদ। পুলিশ আসার কোনো ভয় নেই। পুলিশ এলেও পালিয়ে যাওয়ার ঢের জায়গা আছে।

নির্দিষ্ট স্থানে না বসে একটু দূরে সরে বসে সে। যদি কোনো অঘটন ঘটে তাহলে যেন দৌড়ে পালাতে পারে। অনেক্ষণ হলো দাঁড়িয়ে আছে। বিরক্তি দূর করতে একটা সিগারেট ধরালো। লম্বা লম্বা টানে সাবাড় করে ফেলছে সেটা। টেনশন কাজ করলে কাজল এভাবেই সিগারেট খায়। দুটো শেষ করে যখন তৃতীয়টা ধরাতে লাইটারে আগুন ধরালো তখনই খেয়াল করে মানুষের পায়ের শব্দ। গাছের পাতা সরিয়ে খচখচ করে এ দিকেই আসছে। দু-চারজন লোক এক সাথে আসছে। লাইটার নামিয়ে সিগারেট মুঠির মধ্যে নিয়ে ভেঙে ফেলে। নিজেকে একটা গাছের পেছনে আড়াল করে নেয়। দৌড়ালেই পাতার শব্দে অবস্থানটা জেনে যাবে। তাই আপাতত চুপ করেই গাছের পিছে লুকিয়ে পড়লো।

লাল রংয়ের টিশার্ট পরা একজন। তার হাতে হাত কড়া। কাজল বুঝতে পারল ও-ই শওকত। সাথের দুজনের গায়ে সাদা শার্ট। সাদা শার্ট পরা লোক দুটো দুপাশে। তিন জন মিলে কাউকে খুঁজছে। চারপাশ ভালো করে পর্যবেক্ষণ করছে। এসময় শওকত শাহিন, রাসেল বলে ডাক দিলো। আড়াল থেকে বের হবে কি-না কাজল ভাবছে।

সিদ্ধান্ত নিল এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবে। সামনেও যাবে না, পেছনেও না। একটু নড়লেই তো শুকনো পাতার শব্দ হবে। অবস্থান টের পেয়ে যাবে ওরা। তখন দুজনের সাথে দৌড়ে কূল পাওয়াও মুশকিল হবে।

না, আর যাই হোক। শারমিনের সাথে আজকে এমন আচরণ করা মোটেই ঠিক হয়নি। ওর দোয়া হয়তো আল্লাহ শুনেছেন। এখান থেকে বাঁচতে পারলে আর কখনো শারমিনের সাথে এমন করবে না বলে প্রত্যয় নেয় কাজল।

 

এসময় কাজল একটা গুলির শব্দ শোনে। সাথে একটা মানুষের আর্তচিৎকার। অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে ওর। আস্তে করে উঁকি দিয়ে সামনে তাকায়। সাদা শার্টপরা দুটো লোক কেবল দাঁড়িয়ে। লাল জামাপরা শওকত নেই ওদের পাশে। দু জনের পায়ের ফাঁক দিয়ে সামনে দৃষ্টি দিল। কাজলের চোখ ছানাবড়া। কলজে শুকিয়ে গেল। মাটিতে শওকত। ধড়পড় করছে। রক্তে ভেসে গেছে আশপাশ। দুজন লোক এবার সামনে থেকে পেছনে ফিরলো। কাজল মাথাটা সরিয়ে সটান দাঁড়িয়ে থাকল। নিজেকে লুকিয়ে ফেলল গাছের আড়ালে। বুক ধুক ধুক করছে ওর। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এখন সে। দু জনের চারটা চোখের কোনো একটায় পড়লেই শেষ। জীবনের সমাপ্তি ঘটবে। শ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকল কাজল।

শুকনো পাতা মাড়ানোর শব্দ হচ্ছে। দূর থেকে আস্তে আস্তে আরও কাছে চলে আসছে শব্দ। দুটো মানুষ কাজলের দিকেই আসছে কোনো সন্দেহ নেই। ওরা কি তাহলে কাজলকে দেখে ফেলল?

কাজলের অদূরেই এসে থামল পায়ের শব্দ। এসময় এক জনের ফোন বেজে উঠল। রিসিভ করে বলল, ‘আমি মন্দির বাগানে। ইয়াবা ব্যবসায়ী শওকত বন্দুক যুদ্ধে নিহত। ওর কাছে দুজন ক্রেতা আসার কথা। ওদের অপেক্ষায় আছি। ওরা এলে ওদের নিয়ে আসবো। থানায় বলে দাও।’ ফোন কেটে দিল। ও প্রান্তে কী বলল কাজল সেটা আর শুনল না।

চোখ বন্ধ করে আল্লাহর কাছে ওদের প্রস্থানের দোয়া করছে। চোখ খুলে দেখে সাদা পোষাকপরা লোকদুটো তার সামনে দাঁড়িয়ে। একজন ওর চুলের মুঠি ধওে জিজ্ঞেস করল, ‘কী করছিস এখানে?’

কাজলের শরীর কাঁপে। আজরাইল ধরে ফেলেছে। আমতা আমতা করে বলে, ‘আমি লাকড়ি টোকাতে এসেছি।’

একজন আরেক জনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘নাম কী তোর?’

‘আমার নাম কা, কাজল!’ কাজল ভয়ে ভয়ে বলে।

‘শওকতকে চিনিস?’

‘না, শওকত নামের কাউকে চিনি না।’

‘শাহিন, রাসেলকে চিনিস?’

‘হু, চিনি।’

‘কীভাবে ওদের সাথে পরিচয়।’

‘আমরা একই গ্রামের তো, ছোটবেলা থেকে ওদের সাথে পরিচয়।’

‘ওরা বাড়িতে কী কাজ করে?’

‘শুনেছি ওরা বড় ব্যবসা করে।’

‘কীসের ব্যবসা?’

‘সেটা তো জানি না।’

‘তুই লাকরি টোকাতে এসেছিস না বাবা কিনতে আসছিস ঠিক করে বল!’

‘তওবা, আসতাগফিরুল্লাহ! স্যার, আপনি কী বলছেন এসব?’

‘হু, ঠিক কথাই বলছি। এবার তুই সঠিকটা বল।’

‘আমি তো বললাম, আমি লাকড়ি টোকাতে এসেছি।’

‘নজরুল, দেখো, ওর পকেটে টাকার বান্ডিল আছে কিনা?’ এ কথা বলে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালো। বড় করে একটা টান দিয়ে কাজলের দিকে তাকিয়ে থাকল।

পাশের জন বলল, ‘জি স্যার, দেখছি।’

‘থাকলে কী হবে স্যার?’

‘থাকলেই বুঝতে হবে ও খরিদ্দার। শওকতের থেকে বাবা কিনতেই এখানে এসেছে। আমাদের দেখে আর সামনে আসেনি।’

কাজলের কলিজায় টুক করে একটা কামড় পড়ল। দুইয়ে দুইয়ে চার—এরা তো হিসাব মিলিয়ে ফেলল! প্রথমে বুকপকেটে হাত দিলো ওই লোকটি। পকেট খালি। বলল, ‘না স্যার, পকেটে কোনো কানাকড়িও নেই।’

এবার নিচের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্যার, ওর তো লুঙ্গি পরা। লুঙ্গি খুলে দেখব?’

কাজল মনে মনে বলছে, নাউজুবিল্লাহ! কী বলছে এসব?’

‘জামা উল্টিয়ে দেখো, কোমরে খুঁচে রেখেছে কিনা।’

কাজলের পেটে আবার একটা কামড় পড়ল। শেষ। বাঁচার কোনো উপায় নেই। জামা উল্টিয়ে কোমরে তাকালেই এতো দিনের জমানো টাকার বান্ডিলটা চোখের সামনে চলে আসবে। আর এতেই সে সাব্যস্ত হয়ে যাবে খরিদ্দার হিসেবে।

জামা উল্টিয়ে লোকটা কোমরে তাকালো। কাজলকে ঘুরিয়ে পেছনেও তাকালো। বলল, ‘না, কিছুই তো নেই স্যার!’

কথাটা কাজলের মনে ধরল না। কিছু নেই মানে? টাকার বান্ডিল কোথায় গেল তাহলে?

নিজেই লুঙ্গি খুলে ঝাড়া দিল। নিচে পড়লো কি না তাকিয়ে দেখলো। কই, না তো! কিছুই পড়ল না।

‘কী দেখছিস তুই?’ একজন কাজলকে জিজ্ঞেস করল।

‘না, আপনাদের বিশ্বাস করাচ্ছি। আমার কাছে যে কিছু নেই সেটা তো আপনারা বিশ্বাস করছেন না। তাই লুঙ্গি খুলে ঝেড়ে দেখাচ্ছি আপনাদের।’

ওদের কী বলবে, নিজের কাছেই বিশ্বাস হচ্ছে না কাজলের। টাকার বান্ডিলটা গেল কোথায়?

শারমিনের কথা মনে হলো। ঘর থেকে বেরুনোর সময় ঝগড়া করে বেরিয়েছে। মাথা ছিল গরম। জামাটা গায়ে চড়িয়ে কোনো মতে বোতাম লাগিয়ে বেরিয়েছে। তোষকের তলে যে জমানো টাকা ছিল, সাথে নিতে ভুলে গেছে। টাকা ছাড়াই চলে এসেছে। এ কথা মনে হতেই কাজলের প্রাণ ফিরে এলো। একটা প্রশান্তি ছেয়ে গেল পুরো সত্তা জুড়ে। চোখ বন্ধ করে বড় করে একটা শ্বাস ছাড়ল। আহ, শারমিনের সাথের ঝগড়াটাই আল্লাহর রহমত হয়ে গেল!

‘লুঙ্গির ভেতর কিছু পরেছিস?’ সাদা পোষাকধারী লোকের কথায় কাজল বাস্তবে আসে।

‘ইয়ে না মানে, আমি কিছু পরি না।’

‘স্যার, এ ধরনের লোক সব করতে পারে। কয়েক দিন আগে দেখলেন না, পেটের ভেতর থেকে দু পোটলা বের করেছিলো।’

‘হু, সে তো ইয়াবা পাচারকারী। কিন্তু ওকে তো তেমন মনে হচ্ছে না।’

‘ওই লোকটাকে দেখেও এমন নিষ্পাপ মনে হয়েছিল।’

‘স্যার, একটা কথা বলবো?’

‘বলো।’

‘দেখেন, লোকটা আমাদের সাথে দেখা হবার পর থেকে কেমন চুপসে দাঁড়িয়ে আছে না?’

‘কী বলতে চাও তুমি?’

‘আমি বলতে চাই, ও বোধহয় দু’রানের চিপায় টাকা ধরে রেখেছে।’

কাজলের মন চাইলো ওর কানের তিন ইঞ্চি নিচে কষে একটা থাপ্পড় মারে। কী যা তা বলছে এসব? রানের চিপায় কেউ টাকা ধরে রাখে আবার?

সিগারেট ফুঁকতে থাকা লোকটা বলল, ‘কীরে, ধরে রেখেছিস?’

‘কাজল দুই পা দুই দিকে প্রসারিত করে বলল, ‘এই যে দেখেন। কোনো কিছু নেই। আপনাদের সন্দেহ হচ্ছে আমি লুঙ্গির নিচে কিছু পরেছি, ইচ্ছে করলে আপনারা দেখতে পারেন।’

‘না, দেখা লাগবে না। নজরুল! তুমি ওর কোমরে হাত দাও। তাহলেই বুঝবে।’

নজরুল কাজলের কোমরে হাত দিল। বলল, ‘না স্যার। কিছু পরা নেই।’

এ সময় একটা পুলিশের গাড়ি এসে থামল। কাজলের একটা হাত ধরে দু জন সামনে আসলো। লাশ গাড়িতে উঠিয়ে ফেলেছে। কাজল ওসিকে চেনে। ওসিও মোটামুটি। কাজলকে দেখে বলল, ‘কীরে, তুই এখানে কী করিস?’

‘লাকড়ি কুড়াতে এসেছিলাম স্যার।’

‘ও এগুলোর সাথে জড়িত?’

‘না, ওর নাম তো নেই। তারপরও গাড়িতে তুলে দেন। জিজ্ঞাসাবাদ করি।’

কাজলকে পুলিশ থানায় নিয়ে গেছে। সন্দেহভাজন হিসেবে। এক দিন রেখে হয়তো ছেড়ে দেবে। অথবা নেওয়ার কিছুক্ষণ পরও ছেড়ে দিতে পারে। কাজলের সে বিষয়ে কোনো চিন্তা নেই। অপরাধ যখন নেই তখন ছাড়া পাবেই সে। আজ না হয় কাল। কিন্তু এ ছোট সময়ে শারমিন যে একবারও আসবে না দেখতে এ ব্যাপারে নিশ্চিত কাজল। এরকম দুর্ব্যবহার করার পরও কোনো মানুষ কি কাউকে ভালোবাসতে পারে?

কাজল ভেবে রাখল। থানা থেকে বেরিয়ে ঘরে যাবে। টাকা নিয়ে বাজারে আসবে। আলতা কিনে তবে শারমিনের সাথে কথা বলবে। ওর কাছে মাফ চাইবে।

কাজলের মনে ছোট একটা সংশয় কাজ করছে এখন। অপরাধ ধরা পড়েনি। পড়বেও না। কারণ এখনো সে অপরাধের সাথে যুক্ত হয়নি। তবে যদি কেউ তার নামে নালিশ করে বসে, সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্য বলে দেয়, তাহলেই কাম সারা। জেলে থেকে পঁচতে হবে। উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানে কেবল  শারমিনই। শারমিনের যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সে ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে যদি থানায় এসে অভিযোগ করে বসে?

এ একটা চিন্তায় উদ্বিগ্ন হয়ে আছে কাজল। শারমিনের যা সাহস, ওর দ্বারা এটা অসম্ভবও না। যেকোনো মুহূর্তে থানায় চলে আসতে পারে। এ চিন্তাটাই কাজলের মাথায় ঝট পাকিয়ে দিচ্ছে এখন।

গারদের ভেতর কাজল একা। দুই হাঁটু এক করে বসে আছে। চিবুক হাঁটুর মাঝখানে ঠেকানো। এখান থেকে সরাসরি দরজা দেখা যায়। কে এলো, কে গেল সব স্পষ্ট। সে দিকেই তাকিয়ে আছে কাজল।

দুজন আগন্তুককে দেখে কাজলের চোখ কপালে ওঠার অবস্থা। বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থাকল সে। বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। লোক দুটো কাজলের কাছে না এসে আগে অফিস রুমে গেল। যে আশঙ্কায় ছিল এতক্ষণ সেটাই হচ্ছে। শারমিন আর দোলা থানায় এসেছে। অফিসে ঢুকে নিশ্চিত এখন সব বলে দেবে। এত রাগ কেন মেয়েদেও, বুঝে আসে না কাজলের।

কিছুক্ষণ পর দেখে শারমিন আর দোলা গারদের দিকে আসছে। তাদের পেছনে একজন পুলিশ। কাজলের মন চায় ওদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে। বিশেষ করে শারমিনের থেকে। কিন্তু দোলার কারণে পারে না। দোলা কাজলকে দেখে একটা হাসি দিয়ে দু হাত বাড়ায়। কাজল গারদের ফাঁকে হাত বের করে দোলাকে জড়িয়ে ধরে।

কাজল বলে, ‘কেন আসছো তোমরা?’

‘তোমাকে নিতে আসছি, বাবা।’

‘আমাকে নিতে?’

‘হু, তোমাকে নিতে।’ কাজল দোলাকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। শারমিনের চেহারা দিকে তাকায়। কপাল ফুলে কালো হয়ে আছে। জগটা বোধহয় ভালো করেই লেগেছে। কাজল খুব নরম সুরে বলে, ‘আমাকে ছাড়াতে এসেছ?’

শারমিন কোনো কথা বলে না। পায়ের বৃদ্ধাঙুল মেঝেতে ঘষতে থাকে। নত মুখে সেদিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ।

কাজলের নিজের ওপরই রাগ লাগে। কী সব বাজে চিন্তা কাজ করেছে শারমিনকে ঘিরে। এতদিনেও বুঝতে পারেনি সে শারমিনের ভালোবাসা। কাজল বুঝতে পারে, মেয়েদের ভালোবাসা। একবার কাউকে ভালোবাসলে সে ভালোবাসা আর কিছুতেই যে মলিন হয় না তার সাক্ষাৎ প্রমাণ তার বউ, শারমিন।

সাথে আসা পুলিশ গরাদের তালা খোলে। দরজা খুলে বলে, ‘আসুন, আপনি বেরিয়ে আসুন। অফিসে একটা সাইন দিয়ে চলে যাবেন।’

কাজল মাথা নিচু করে হাজতখানা থেকে বের হয়। অফিসে একজন পুলিশ বসা। তার সামনে অনেক কাগজপত্র। সেখান থেকে একটা ডায়রি বের করে খুলে ধরল। বলল, ‘এখানে একটা সাইন করে নিন।’

কাজল কলম হাতে নিয়ে খুব মেহনত করে তার নাম লিখলো। তার কসরৎ আর মেহনত দেখে পুলিশ বলল, ‘এক পৃষ্ঠা লিখতে বললে তো বোধহয় কলমই ভেঙে ফেলতেন।’

কাজল কোনো উত্তর দেয় না। সামান্য মুচকি হাসে কেবল।

জেল থেকে বেরিয়ে কাজল মৃদু স্বরে বলে, ‘তোমার কাছে টাকা হবে?’

শারমিনও আস্তে করে বলে, ‘কত টাকা?’

‘দেড়-দুইশ!’

কাপড়ের আঁচলের কোণ হাতে তুলে নেয় শারমিন। গিঁট খুলে কাজলকে দুশো টাকা দেয়।

কাজল টাকা পেয়ে বলল, ‘তোমরা বাড়ি যাও। আমি বাজার থেকে আসছি।’

কাজল বাজারে চলে গেল। শারমিন মনে মনে বলল, বাঁদর কখনো ভালো হয় না। বাঁদর বাঁদরই থাকে।

বাজার থেকে ফিওে সোজা বাড়ি আসে কাজল। ঘরে ঢুকে নিজের বিছানার উপর বসে। চুপ করে। দোলা খেলতে চলে যায় পাড়ার ছেলে-মেয়েদের সাথে। শারমিন ঘরে আসতেই কাজল বিছানা থেকে উঠে দরজা বন্ধ করে দেয়।

শারমিন ভ্রু কুঁচকে বলে, ‘দরজা বন্ধ করলে কেন?’

‘কেন করলাম জানতে চাও?’

‘চোখ বন্ধ করো। আমি না বলা পর্যন্ত চোখ খোলো না।’

শারমিন বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘উহ, ডং দেখলে আর বাঁচি না। বন্ধ করলাম চোখ।’

কাজল লুকিয়ে রাখা আলতার কৌটা বের করে। আঙুলে লাগিয়ে শারমিনের পা ছুঁতেই শারমিন লাফিয়ে উঠলো। ‘এ মা, কী করছো তুমি?’

বাঁকা হয়ে পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখে পায়ে আলতা লাগাচ্ছে কাজল। শারমিন খুব বিস্ময় নিয়ে বলল, ‘তুমি আমার জন্যে আলতা আনলে?’

কাজল চুপ করে মাথা নাড়াল। শারমিন কাজলের সামনে মাটিতে বসলো। দুই হাতে ওর চেহারা উঁচিয়ে ধরে বুকে জড়িয়ে ধরলো। আবার বলল, ‘আমার জন্যে আলতা আনলে?’

‘কেন, বিশ্বাস হচ্ছে না তোমার?’

‘এই নাও তোমার আলতা, আর এই নাও তোমার থেকে ধার করা দুইশো টাকা।’

কাজলের এমন পরিবর্তন শারমিন কখনো কল্পনাও হয়তো করেনি। কিন্তু সেটাই হলো। শারমিনের মনে আনন্দের হিল্লোল। আনন্দ উপচে পড়ছে তার পুরো অবয়ব থেকে। যেন খুশির নির্ঝরণী বয়ে যাচ্ছে তার মাথা থেকে পা অবধি। জড়িয়ে ধরলো সে স্বামীকে। দু হাত দিয়ে চেপে ধরে বলল, ‘তুমি আমাকে ভালোবাসো?’

কাজল মাথা নাড়ায়।

‘না, মাথা নাড়লে হবে না। মুখে বলতে হবে। বলো, ভালোবাসো আমাকে?’

কাজল কখনো ভালোবাসার কথা মুখে বলেনি। ইতস্তত করছে। শারমিন অভিমান করলো। গলা ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে। তোমার বলতে হবে না। আমার কাজ আছে। আমি যাই।’

এ বলে বাইরে চলে যেতে উদ্যত হলো সে। দরজার কাছে যেতেই কাজল পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি!’

শারমিন ঘুরে কাজলের বুকে একটা ধাক্কা দিল। ধাক্কাটা জোরে হয়ে গেছে। কাজলকে পেছনে পড়ে যেতে দেখে দু হাতে কাজলের জামা মুঠ করে ধরলো। তাতেও রক্ষে হয়নি। বরং জামার বোতাম ছিড়ে গেল। শেষ অবধি টেবিলের কোণা ধরে নিজেকে পড়া থেকে বাঁচালো কাজল। কিন্তু ততক্ষণে যা হবার হয়ে গেছে। টেবিলের ওপর রাখা জগটা আবার সশব্দে পড়ে গেল। কাজল, শারমিন দুজনই হাসছে।

এ সময় দরজায় করাঘাত হলো। দোলা আসছে। কাজল দরজা খুলে দিল। দরজা খুলে দিয়ে বোতাম ঠিক করতে করতে বেরিয়ে গেল।

বড় বড় চোখ করে দোলা বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। বাবা বেরিয়ে গেছে। এবার বিস্ময় নিয়ে তাকাল সে মায়ের দিকে। সকালের মতো এখনো মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে মা। জগটা পড়া মাটিতেই। পুরোই সকালের চিত্র। পার্থক্য কেবল এটুকু, সকালে মা কপালে হাত দিয়ে কাঁদছিল, আর এখন হাসছে।

 

ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১