লংমার্চ
দরজায় ঠকঠক আওয়াজ হলো এই সকালে।
‘কী চাই?’
‘আমি সব নিই। মুড়ি, চিড়া, গুড়, কলা।’
‘ভাবসাব কী? হুজুরদের খাওয়াবেন নাকি?’
‘কী যে কন আপনারা! নিজেই খাইতে পাই না, আবার হুজুরদের!’
‘বলা যায় না।’
বৃদ্ধ ভিক্ষুক নাহিদের পাশে দাঁড়িয়ে তার মুড়ি-গুড় খাওয়া দেখছেন। বৃদ্ধের চোখে স্বর্গীয় আনন্দেও দ্যুতি খেলা করছে। সারা জীবন মানুষের কাছ থেকে খেয়ে এসেছেন, কিন্তু মানুষকে খাওয়ানো যে এত আনন্দ, তা কখনো টের পাননি। দীর্ঘ এই লংমার্চ না হলে হয়তো কখনো টেরই পেতেন না।
বৃদ্ধ বললেন, ‘আপনি ঢাকায় পড়েন?’
‘জি না, কুমিল্লায়। কুমিল্লা থেকে মেঘনা গাড়িতে আসছি। মেঘনা থেকে হেঁটে সাইনবোর্ড।’
‘আহারে!’
‘আপনাদের আপ্যায়ন দেখে চোখে জল এসে গেছে।’
বৃদ্ধ চোখ মুছে বললেন, ‘ওই ঘর থেকে মিথ্যা বলে মুড়ি-গুড় আনলাম নিজে খাবো বলে। এখন আপনাকে খাওয়াচ্ছি। আমার কি পাপ হবে?’
অবরোধ
ঢাকা অবরোধ। ফজরের পর থেকেই থমথমে অবস্থা। ঢাকায় কোনো গাড়ি ঢুকতেও পারছে না, ঢাকা থেকে বেরুতেও পারছে না। তবে অ্যাম্বুলেন্স দেখলেই ছাত্ররা সরে দাঁড়াচ্ছে। রাস্তা ফাঁকা করে দিচ্ছে। সুন্দর জীবনের জন্য অবরোধ। মানুষ হত্যার জন্য নয়। রোগীর গাড়িকে তাই কেউ আটকাচ্ছে না।
একটা অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে যাচ্ছিল কাঁচপুর দিয়ে। দু’-একজন ছাত্র এগিয়ে গেল দেখার জন্য। ড্রাইভারের পাশে দুজন ভদ্রলোক বসা। জানলার কাঁচ নামিয়ে বলল তাদের একজন, ‘মহিলা রোগী। দেখান যাইবো না।’
‘আমরা মহিলার চেহারা দেখব না, শুধু দেখব বেডে রোগী আছে কিনা।’
‘বিশ্বাস হয় না?’
‘দেখালেই বিশ্বাস হয়।’
অ্যাম্বুলেন্সে কোনো রোগী ছিল না। ছিল কিছু দাহ্য পদার্থ। ছাত্ররা অতসব বুঝে উঠতে পারেনি, দাহ্য পদার্থকে মশার ওষুধ বলে চালিয়ে দেওয়া হলো।
‘গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে না। হেঁটে যান।’
ভদ্রলোকটি লাল চোখে তাকালেন। এতো ছাত্র এই পয়েন্টে, মাথা গরম করা ঠিক হবে না। অ্যম্বুলেন্স নিয়ে আস্তে করে বেরিয়ে গেলেন।
পরদিন পত্রিকার প্রথম পাতায় শিরোনাম এলো—‘নিষ্ঠুর হেফাজত : অবরোধের নাম করে শহরে অ্যাম্বুলেন্সও ঢুকতে দেয়নি।
কাফন
কয়েকজন ছেলে বেধড়ক পিটিয়ে যাচ্ছে লোকটাকে। তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছে গলগল করে। হাতে শক্ত করে ধরে আছে কাফনের কাপড়ের পুটলিটা। ওটা কোনোক্রমেই হাতছাড়া করা যাবে না।
লোকটির চুল ধরে ঘাড়টা উপরে তুলে একটি ছেলে জিজ্ঞেস করল, ‘সারাদিন অবরোধ কইরা আশ মেটেনি, এখন আইছোস সমাবেশ করতে, কাফনের কাপড় নিয়া, মরার খুব শখ?’
নাক থেকে গড়িয়ে রক্ত ঠোঁটে লেগেছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও জিভে লেগে গেছে একটু। পুরো শরীর গুলিয়ে ওঠে। নিজের রক্তের স্বাদ এতো নোনতা! এত তিক্ত! নিজেকে সামলে নিয়ে লোকটি বলল, ‘সমাবেশে আসি নাই আমি। ছাইড়া দেন।’
ছেলেগুলো একসঙ্গে খিলখিল করে ওঠে। হঠাৎ একজন বলল, ‘তাড়াতাড়ি শেষ কর ওরে। আরও কাজ আছে।’
সঙ্গে সঙ্গে একটি ছেলে তার বুকের মধ্যখানে গুলি করে। লোকটা বসা থেকে পড়ে যায় চিত হয়ে। যন্ত্রণায় লাফাতে থাকে কাটা মুরগির মতো। শেষবারের মতো স্থির হতে হতে লোকটির গলা থেকে বেরোলো গোঙানির মতো, ‘আমার বাবা মারা গেছে। তার জন্য কাফনের কাপড় কিনছিলাম।ৎ’
শাপলা চত্বরে লোকটিকে কাফন পরানো হলো বাবার জন্য কেনা কাফনের কাপড়ে। তার বাবার জন্য কাফনের কাপড় পরে কে কিনে দিয়েছিল?
গুলি
দুটো হসপিটালই যখন পায়ের গুলিটা খুলতে অস্বীকৃতি জানাল, গোঙাতে গোঙাতে ছেলেটি বলল, ‘একটা প্লাস আর ছুরি দিন, আমার পায়ের গুলি আমিই খুলতে পারব। যন্ত্রণা আর সহ্য হচ্ছে না!’
লাস্ট ম্যাসেজ
দোকান খুলতে এসে শাটারের নিচে একটা মোবাইল পেলো দোকানওয়ালা। নিশ্চয়ই মোবাইলটা গতরাতে কেউ ফেলে গেছে। নিয়ে যাবার সুযোগ হয়নি। বাসায় বসে টিভিতে দেখেছিল—সমাবেশে আসা লোকেরা রাতে এখানে-সেখানে ঘুমিয়ে ছিল। আক্রমণের তীব্রতায় ঘুম ভেঙে গেলে মোবাইলের কথা হয়তো মনেই পড়েনি। বিপদ যত তীব্র হয়, সবার আগে নিজেকে বাঁচানোর কথাই মনে পড়ে মানুষের।
কী আছে মোবাইলে? স্মার্টফোনে? দোকানওয়ালা সবার আগে চেক করে ম্যাসেজবক্স। রাত দুইটায় একটা ম্যাসেজ সেন্ড করা হয়েছে। যেই নম্বরে সেন্ড করেছে, সেই নাম্বারটি ‘বড়আপা’ লিখে সেভ করা।
পকেট থেকে চশমা বের করে দোকানওয়ালা ম্যাসেজটি পড়ল—‘আপা, আমি মারা গেলে মাকে দেখে রাখিস। জাহান্নামে আটকা পড়েছি, কীভাবে বের হবো জানি না।’
দুপুর তখন ছুঁই ছুঁই। দোকানওয়ালা ‘বড়আপা’র নম্বরে ফোন দিলো। জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার ভাই বাড়ি ফিরেছে?’
ঝড়ে ভেঙে যাওয়া ডালের মতো কাতরে উঠল বোন, ‘নাহিদ, কই নাহিদ! আপনি পাইছেন তারে? তার নম্বর পাইছেন কই? আমরা তো তার খবর পাইতেছি না।’
দোকানওয়ালা বলল, ‘মতিঝিলে আমার দোকান। দোকানের সামনে মোবাইলটা পেলাম। তাই জিজ্ঞেস করলাম।’
ওপাশে একটা চিৎকার শোনা গেল। মনে হলো আকাশটা বুঝি এখনই ফেটে যাবে মুহুর্মুহু করে।
ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

