মহীয়সী নারী, জয়নব বিনতে জারির

সংখ্যা:

 

বিখ্যাত তাবেয়ি ইমাম শাবি রহমতুল্লাহি আলায়হি কাজি শুরায়িহ রহমতুল্লাহি আলায়হির বন্ধু ছিলেন। একবার ইমাম শাবি কাজি শুরায়িহ-এর নিকট গেলে তিনি বন্ধুকে পরামর্শ দিলেন, ‘শাবি, তুমি বনু তামিম গোত্রের রমণী বিয়ে কোরো। কেননা, আমি তাঁদের জ্ঞানী ও বুদ্ধিমতি হিসেবে দেখেছি।’

শাবি জানতে চাইলেন, ‘সেটা কীভাবে?’

শুরায়িহ বললেন—আমি এক দুপুরে জনৈক ব্যক্তির জানাজা-শেষে এক বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। বাড়ির দরজায় দেখলাম এক বৃদ্ধা এবং তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক বালিকা। মেয়েটি ছিল অতি সুন্দরী। এটা দেখে আমি তাদের দিকে এগিয়ে গেলাম এবং পানি পান করতে চাইলাম।’

বৃদ্ধা বললেন, ‘কোন ধরনের পানীয়?’

আমি বললাম, ‘সহজলভ্য যে কোনো পানীয়।’

বৃদ্ধা মেয়েটিকে বললেন, ‘এঁকে দুধ পান করাও।’

আমি বৃদ্ধাকে প্রশ্ন করলাম, ‘মেয়েটি কে?’

তিনি বললেন, ‘তার নাম জয়নাব বিনতে জারির। হানজালা পরিবারের এক মেয়ে।’

আমি বললাম, ‘বিবাহিতা না কুমারী?’

তিনি বললেন, ‘কুমারী।’

আমি বললাম, ‘তার সাথে আমার বিয়ের ব্যবস্থা করে দিন।’

তিনি বললেন, ‘তুমি যদি তার যোগ্য হও তবে হতে পারে।’

আমি এ কথা শুনে ঘরে ফিরলাম। জোহর আদায় করে আমার বন্ধু সম্মানিত কারি-সাহেবদের সাথে নিলাম। তাঁদের মধ্যে আলকামা, আসওয়াদ, মুসাইয়্যেব ও মুসা ইবনে আরফাতা প্রমুখ ছিলেন। আমরা মেয়েটির চাচার নিকট পৌঁছলাম। কুশল বিনিময়ের পর আমি বললাম, ‘আপনার ভাতিজি জায়নাবকে বিয়ে করার প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।’

তিনি জবাবে বললেন, ‘সেও আপনার ব্যাপারে আগ্রহী।’

তারপর তিনি তার সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দিলেন। বিয়ের পর তামিম গোত্রের মেয়েদের অন্তরের রূঢ়তার কথা আমার মনে পড়ল। তখন চিন্তা করলাম, যা হওয়ার হয়েছে। যদি মর্জিমতো চলে তবে ভালো, নতুবা পথ তো খোলাই রয়েছে। তারপর তামিম গোত্রের মেয়েরা তাকে আমার কামরায় প্রবেশ করিয়ে দিল।

আমি বাসরঘরে প্রবেশ করে দেখলাম আমার স্ত্রী অপূর্ব সুন্দরী। বয়স ১৮-১৯ হবে। যৌবন জোয়ার কানায় কানায় ভরা। শিশিরে নাওয়া ফুটন্ত গোলাপের মতো চেহারা। অর্ধফোটা রাঙা কুসুমের মতো তার পাতলা ঠোঁটে আঁধার রাতে বিদ্যুত চমকানোর মতো হাসি। কপাল জুড়ে আছড়ে পড়ে আছে লতার মতো সোনালি চুল। কাজল-কালো চোখ দেখে মনে হয় যেন মায়াবী হরিণীর নিকট থেকে চোখ দুটি ধার এনেছে। আমি মনে মনে ভাবলাম, এটি কোনো মানবী না বেহেশতের হুর। যাই হোক, কল্পনাতীত সুন্দরী স্ত্রী পেয়ে শোকরিয়াস্বরূপ সুন্নত অনুযায়ী দুই রাকাত সালাত আদায় করলাম।

সালাম ফিরিয়ে দেখলাম, সেও আমার পেছনে সালাত আদায় করেছে। অতঃপর আমি তার নিকটবর্তী হলাম এবং তার দিকে হাত বাড়ালাম, কিন্তু সে আমাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘জনাব, একটু থামুন। প্রশান্তি ও ধৈর্যের সাথে নিজ স্থানে অবস্থান করুন। আমি তো আপনারই।’ তারপর বলল, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্ল¬াহ তাআলার জন্য নিবেদিত। আমি তাঁর প্রশংসা করছি এবং তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি। দরূদ ও সালাম পেশ করছি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর পরিবারের প্রতি।

‘হে আমার জান, নিঃসন্দেহে আমি আপনার নিকট একজন অপরিচিত অবলা নারী। আমি আপনার আচরণ, অভ্যাস ও রীতি-নীতি সম্পর্কে অবগত নই। দয়া করে বলুন, আপনি আমার কাছে কেমন আচরণ প্রত্যাশা করেন, যাতে করে আমি আপনার পছন্দমতো চলতে পারি। আর আপনি যা অপছন্দ করেন তা থেকে বিরত থাকতে পারি।’

সে আরো বলল, ‘সন্দেহ নেই, আপনার গোত্রে আপনার উপযুক্ত মেয়ে ছিল। আর আমার গোত্রেও আমার জন্য উপযুক্ত পুরুষ ছিল, কিন্তু আল্ল¬াহ যা ফয়সালা রেখেছিলেন তাই হয়েছে। আল্ল¬াহর যা নির্দেশ হয় মানুষ সেটাই করে। অতএব আপনি যার মালিক হয়েছেন তার সাথে আল্ল¬াহর নির্দেশ মোতাবেক আচরণ করবেন। অর্থাৎ সদ্ভাবে জীবন পরিচালনা করা অথবা ভালোভাবে পৃথক করে দেয়া। আমার কথা এটুকুই। আমি আল্ল¬াহর কাছে আপনার জন্য ও আমার জন্য মাগফিরাত কামনা করছি।’

তার এ কথাগুলো শুনে আমিও একটি বক্তব্য দেয়ার প্রয়োজন অনুভব করলাম। আমি হামদ এবং দরূদ ও সালামের পর বললাম, ‘নিঃসন্দেহে তুমি এমন কিছু কথা বলেছ, যদি তুমি তার ওপর দৃঢ়পদ থাকো তবে উপকৃত হবে, কিন্তু যদি এর বিপরীত হয় তবে এগুলো তোমার বিপক্ষে দলিল হবে। আমি অমুক অমুক জিনিস, কথা, কাজ ও খাদ্য পছন্দ করি। আর অমুক অমুক জিনিস, কথা, কাজ ও খাদ্য অপছন্দ করি। আমরা দুজন একই সূত্রে গাঁথা। তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না। ভালো কিছু দেখলে তা প্রচার করবে। আর মন্দ কিছু দেখলে তা গোপন করবে।’

সে বলল, ‘আরও কিছু কথা ছিল যা বলা হয়নি। আমার পরিবারের লোকদের বেড়াতে আসা আপনি কি পছন্দ করবেন?’

আমি বললাম, ‘আমি চাই না আমার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আমার পেরেশানি ও ক্লান্তির কারণ হোক।’

সে বলল, ‘আপনার কোন কোন প্রতিবেশীকে আপনি পছন্দ করেন আর কাদের অপছন্দ করেন আমাকে বলুন, সে অনুযায়ী আমিও পছন্দ-অপছন্দ করব।’

আমি তাকে আমার প্রতিবেশীদের সম্পর্কে বলে দিলাম।’

তার সঙ্গে সে-রাতটি আনন্দের সাগরে ভেসে কাটালাম। তিন দিন তাঁর সঙ্গে থেকে তারপর কাজে গেলাম। এরপর থেকে এমন কোনো দিন পাইনি যে দিনটা আমার কাছে আগের দিনের চেয়ে উত্তম ছিল না। এভাবে একবছর অতিবাহিত হলো। এর মধ্যে আমার অপছন্দনীয় কোনো কিছু আমি তার মধ্যে পাইনি।

একদিন আমি বাড়ি ফিরে দেখি, এক ভদ্রমহিলা গৃহে তদারকি করছেন। আমি জানতে চাইলাম, ‘তিনি কে?’ উত্তর পেলাম, ‘আপনার শাশুড়ি।’ আমি তাঁকে দেখে আনন্দিত হলাম। তিনি আমার নিকট এলেন এবং বললেন, ‘আসসালামু আলায়কুম, আবু উমাইয়া।’

আমি সালামের জবাব দিয়ে বললাম, ‘আল্ল¬াহ আপনাকে আমাদের আরও নিকটবর্তী করে দিন।’

তিনি আমার নিকট জানতে চাইলেন, ‘আপনার স্ত্রীকে কেমন পেলেন?’

আমি বললাম, ‘আলহামদুলিল্ল¬াহ, আমি তাকে অত্যন্ত উত্তম স্ত্রীরূপে পেয়েছি। তাকে পেয়েছি জীবনের উত্তম সঙ্গিনী হিসেবে।’

তিনি আমাকে বললেন, ‘আবু উমাইয়া, কোনো নারী শুধু দুটি অবস্থায় বাঁকা হয়। ১. পুত্র সন্তান প্রসব করলে। ২. অতিরিক্ত স্বামীসোহাগ লাভ করলে। কোনো কিছু আপনার অপছন্দনীয় হলে লাঠি ব্যবহার করবেন। আল্লাহর শপথ, পুরুষেরা খারাপ নারীর চাইতে নিকৃষ্ট কোনো জিনিস গৃহে রাখে না।’

আমি বললাম, ‘আল্ল¬াহর শপথ, আপনি তো তাকে শ্রেষ্ঠ আচরণ ও উত্তম ভদ্রতা শিখিয়েছেন।’

তিনি জানতে চাইলেন, ‘আপনার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আপনাদের কাছে বেড়াতে আসুক, আপনি কি তা পছন্দ করবেন?’

উত্তর দিলাম, ‘তাঁরা যখন চাইবেন।’

তারপর থেকে তিনি প্রতিবছর একবার আমার গৃহে আসতেন এবং আমাকে একইরূপ নসিহত করতেন। আমার স্ত্রীকে নিয়ে আমি ২০ বছর সংসার করছি, এর মধ্যে অপ্রীতিকর কোনো কিছু তার কাছ থেকে পাইনি। তার কাছ থেকে আমি কখনও এমন কিছু পাইনি, যা আমার ক্রোধের কারণ হয়। ফলে আমি সর্বদাই তার ওপর খুশি থাকতে পেরেছি।

শুধু একদিন আমি তার ওপর রাগান্বিত হয়েছিলাম। তবে সেদিনকার পরিস্থিতির জন্য আমিই দোষী ছিলাম। আমিই তার ওপর জুলুম করেছি। বাস্তবে তার কোনো দোষ ছিল না।

ঘটনাটা এরূপ—একদিন আমি ঘরে ফজরের সুন্নত আদায় করলাম। মুয়াজ্জিনের একামত শুনতে পেলাম। আমি ছিলাম ইমাম। এমন সময় একটি বিষধর বিচ্ছু ঘরে দেখলাম। আমি বিচ্ছুটিকে একটি পাত্র দিয়ে ঢেকে স্ত্রীকে এ কথা বলতে বলতে মসজিদের দিকে ধাবিত হলাম, ‘জয়নাব, আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত তুমি নড়াচড়া করবে না।’

এ ফাঁকে বিচ্ছুটি বের হয়ে তাকে দংশন করল, কিন্তু সে আমার নির্দেশ লংঘন করে সে-স্থান ত্যাগ করল না। আমি এসে এরূপ দেখে তার ওপর রাগ করলাম, কেন সে সে স্থান ত্যাগ করল না। সে ছিল স্বামীর আদেশের আনুগত্যকারী। অথচ আমি তাকে এ আদেশ দিয়ে কত বড় ভুলই না করেছিলাম।

সূত্র : তাবায়েউন নেসা, ইবনে আবদে রাব্বেহি আন্দালুসি : ৪৪-৪৬

 

লেখক : শিক্ষাসচিব, জামিয়াতুর রহমাহ, গাজীপুর   

 

ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১