বিভ্রম

সংখ্যা:

 

সাইকিয়াটিস্ট নিশাত আলম অবাক হয়ে রোগীর দিকে তাকিয়ে আছেন। ১৫ বছরের ডাক্তারি জীবনে বহু মাথাখারাপ হওয়া রোগীর চিকিৎসা করেছেন তিনি, তাঁর মনে হচ্ছে এ জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর রোগীটি এখন তাঁর সামনে, চেয়ারে বসে আছেন।

আটপৌরে একজন মানুষ। জুলফিতে সামান্য পাক ধরেছে। মনে হয় এখানে আসার খানিক আগে দাড়ি শেভ করে এসেছেন। তেলতেলে মুখে সাদা বাতির আলো পড়ে কেমন জ্বলজ্বল করছে; যার ফলে বয়সটা অনুমান করা যাচ্ছে না। অথচ এসব রোগীর ক্ষেত্রে বয়সটা জানা ডাক্তারের জন্য খুবই জরুরি।

নিশাত আলম এতক্ষণ চেয়ারে হেলান দিয়ে ছিলেন। এবার কিছুটা সামনে ঝুঁকে গলা খাকারি দিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘কী বললেন, আপনার মানুষ খুন করতে ইচ্ছে করছে?’

‘জি, ডাক্তার! তবে সবাইকে না; শুধু আমার মেয়ে বনি সামনে এলেই মনে হয়—গলা টিপে মেরে ফেলি।’

‘নিশাত আলম ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। লোকটি খুন করার কথা এমনই অবলীলাক্রমে বলে ফেললেন যেন তাঁর কাছে লজেন্সের আবদার করছে একটা শিশু; নিতান্ত অপরিচিত বলে আবদারটা সেভাবে করতে পারছে না।

‘আপনার নাম?’

‘আলতাফ হোসেন।’

‘করেন কী?’

‘টঙ্গীতে একটা গার্মেন্টের সুপারভাইজার। চার-পাঁচ দিন হলো এই টেনশনে অফিসে যেতে পারি না। অফিস থেকে কিছুক্ষণ পর পর ফোন আসে তাই মোবাইলটাও বন্ধ করে রেখেছি। মনে হয় চাকরিটাও এ যাত্রায় টিকবে ন।’

‘আপনার কখন থেকে মনে হলো যে মেয়েকে গলা-টিপে মেরে ফেলবেন।’

‘গত ১৪ জুলাই আমার মেয়ের ১৮ বছর হলো। মা-মরা মেয়ে আনন্দ-অনুষ্ঠান সেভাবে করার সুযোগ পায় না। ভাবলাম এবার একটু বড় করে ওর জন্মদিনটা করি। কথা ছিল সন্ধ্যায় কেক নিয়ে ফিরব, কিন্তু ফিরতে দেরি হয়ে যায়। রাতে বাসায় ফিরে দেখি বনি নেই; ওর বিছানায় শিমু শুয়ে আেেছ। এরপর থেকেই গত চারদিন বনির বিছানায় শিমুকে জবুথবু হয়ে শুয়ে থাকতে দেখি। কিন্তু সকাল হলেই দেখি যে, না, আমার রাতের দেখা ভুল ছিল, ওটা শিমু না, বনিই ছিল।’

‘এই শিমুটা আবার কে?

‘শিমু, ডাক্তার সাহেব, আমাদের কারখানারই এক মেয়ে। দু বছর আগে আত্মহত্যা করে মারা যায়।’

‘সত্যি করে বলুন তো, শিমুর আত্মহত্যার সঙ্গে আপনার কি কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল?ৎ

আলতাফ হোসেন চুপ মেরে যান। এতক্ষণ নিশাত আলমের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বললেও হঠাৎই চোখ নামিয়ে ফেলেন। তাঁর দৃষ্টি এখন টেবিলের ওপর; যেন অতীব জরুরি কোনো জিনিস হারিয়ে ফেলেছেন। জিনিসটা টেবিলের ওপরেই আছে, খুঁজে পাচ্ছেন না। একটু ভালো করে খুঁজলেই পেয়ে যাবেন।

‘চা দিতে বলি? চা খাবেন?’ ডাক্তার বললেন।

‘জি।’

‘চা খেয়ে গলাটা পরিস্কার করেন। আপনাকে ঝেড়ে কাশতে হবে। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, বিস্তারিত না জানলে সমস্যার সমাধান করা আমার পক্ষে কঠিন হবে।’

বেল টিপে চা দিতে বললেন নিশাত আলম। বিরক্তি নিয়ে ঘড়ির দিকে তাকালেন একবার। ঘড়ি দেখে তাঁর কপাল আরও কুঁচকে গেল। রাত বাজে আটটা। আজ তাঁর মেয়ে শ্রাবণীর জন্মদিন। রাতে সবাই মিলে রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া করার পরিকল্পনা ছিল। ন’টার মধ্যেই তাঁর পৌঁছে যাওয়ার কথা। আলতাফ সাহেব কতটা সময় নেন তার ওপর নির্ভর করছে সময়মতো তাঁর ফেরা না ফেরা। পাগলের ডাক্তার হবার এই এক জ্বালা। হুটহাট রোগীর সামনে থেকে উঠে যাওয়া যায় না।

চা চলে এসেছে। আলতাফ সাহেব চায়ে ছোট্ট চুমুক দিয়ে ঝেড়ে কাশতে শুরু করলেন—‘শিমু আমাদের গ্রামেরই মেয়ে ছিল। সাদামাটা, শ্যামল বর্ণেও মেয়ে, তবে দেখতে খারাপ ছিল না। কথাবার্তায়ও ছিল বেশ চটপটে। বাবা নেই। মা-মেয়ের সংসার। একবার আমি গ্রামে গেছি বেড়াতে। ওর মামা এসে বলল ওর জন্য একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিতে। যেকোনো কাজ। শিমু লেখাপড়া যতদূর করেছে গার্মেন্ট ছাড়া অন্য কোথাও ওর কাজের কথা ভাবনায় এলো না। সঙ্গে করে ঢাকা নিয়ে এলাম। আমাদের ফ্যাক্টরিতেই ছোটোখাটো একটা কাজের জোগাড় করে দিলাম।

‘আমার বাসায় আমাদের সঙ্গেই থাকতে লাগল মেয়েটা। নতুন মানুষ। ঢাকা শহরে পরিচিত বলতে আমিই; তাই আমাদের কাছে রেখে দিলাম। আমার মেয়ের সঙ্গে থাকত। শিমুর সঙ্গে বেশ সখ্যও তৈরি হয়ে যায় আমার মেয়ের। ওর মামা আমার ছোটবেলার বন্ধু ছিল। বন্ধুর ভাগ্নিকে তাই নিজের মেয়ের মতোই দেখতাম।

‘একদিন হলো কী, বনি বাসায় নেই। ওর এক খালাতো বোনের বিয়েত গেছে। রাতে বনি সেখানেই থেকে গেল। দুর্ঘটনাটা সেই রাতেই ঘটে। আমার মাথায় ভূত চেপেছিল, নইলে মেয়ের মতো যাকে দেখি তার সঙ্গে এমন নির্লজ্জ কাজ করতে পারি!

‘পরদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি শিমু নেআ। তার তিন-চার দিন পর খবর আসে শিমু গলায় ফাঁস দিয়ে কড়ই গাছে ঝুলে পড়েছে। আমি অনেক বড় পাপ করে ফেলেছি ডাক্তার সাহেব! শিমুর মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ী। এখন ওর আত্মা আমাকে ঘুমোতে দেয় না। খুব বিরক্ত করে। দেখেন, রাত জেগে জেগে চারদিনেই চোখ কেমন গর্তে ঢুকে গেছে।’

‘আলতাফ সাহেব, আপনি শান্ত হোন। কারও আত্মা এভাবে ফিরে আসতে পারে না। এটা এক ধরনের হেলুসিনেশন। আপনার ভেতরের পাপবোধ আপনাকে কল্পনা করতে বাধ্য করছে যে শিমু আপনার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ভাবছেন তার সঙ্গে যে অপরাধ আপনি করেছেন সে তার শাস্তি দেওয়ার জন্য সে ফিরে এসেছে। আমি কিছু ওষুধ লিখে দিচ্ছি, ওগুলো খান। আর অফিস থেকে কিছু দিনের জন্য ছুটি নেন। আপনার বিশ্রাম দরকার। বিশ্রামে থেকে ওষুধগুলো ঠিক মতো খান, আশা করি সব ঠিক হয়ে যাবে।’

‘কিছুই ঠিক হবে না ডাক্তার সাহেব! সব শেষ হয়ে যাবে।’

নিশাত আলম দেখলেন এই পাগলের সঙ্গে আর সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। এমনিতেই তিনি বেশ দেরি করে ফেলেছেন। কে জানে, আজ কী আছে কপালে! রোগীকে বসিয়ে রেখেই চেম্বার থেকে প্রায় ছুটে বের হয়ে গেলেন তিনি।

 

দুই

সাইকিয়াটিস্ট নিশাত আলম বিরস মুখে বসে আছেন। বারান্দার এ জায়গাটা তাঁর অসম্ভব প্রিয়। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে দিনের প্রথম চা এখানে বসেই তিনি পান করেন। মেয়ে শ্রাবণী পাশে বসে পত্রিকা পড়ে শোনায়। আজ তিনি একাই তাঁর পছন্দের জায়গাটিতে বসে আছেন। খবরের কাগজ পড়ার কাজটিও অনিচ্ছাবশত তাঁকেই করতে হচ্ছে। গত রাতে দেরি করে ফেরায় মা-মেয়ে কর্তৃক এটা তাঁর জন্য নির্ধারিত শাস্তি। শাস্তিটা তাঁর জন্য একটু বেশিই দুঃখজাগানিয়া হয়েছে।

খবরের কাগজ পড়তে গিয়ে একটা সংবাদে তার চোখ আটকে গেল। একজন বিষাদগ্রস্ত পিতা তাঁর ১৮ বছর বয়সী কন্যাকে গলা টিপে হত্যা করেছেন। হত্যাকারীকে তৎক্ষণাত গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হত্যাকারী পিতা নিশাত আলমের খুবই পরিচিত। গতরাতে এই লোকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েই তাঁর বাসায় ফিরতে দেরি হয়েছে।

নিশাত আলম অবশ্য এ কারণে উদ্বিগ্ন নন, এটা বরং ভালই হয়েছে; একজন খুনি ধরা পড়েছে। এমন একজন ভয়ংকর খুনি খোলামেলা ঘুরে বেড়াবে এটাই বরং উদ্বেগের কারণ হতো। তাও আবার এমন একজন খুনি যে এক সময় নিজের মেয়ের বয়সী এক কিশোরীকে ধর্ষণ করেছিল।

নিশাত আলমের চোখেমুখে এই যে একরাশ উদ্বেগ, হৃদয়জুড়ে বিষণ্নতার কালো মেঘ, তার কারণ ভিন্ন। গতকাল গভীর রাতে শ্রাবণীর ঘরে উঁকি দিয়ে দেখেন শ্রাবণী নেই, তার জায়গায় মালিহা শুয়ে আছে। তিনি খানিকটা চমকে উঠলেন। মালিহা এখানে আসবে কিভাবে? সে তো ২০ বছর আগেই গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তবে কি তিনিও আলতাফ হোসেনের মতো আপন কন্যার স্থানে ধর্ষিতাকে দেখছেন? কিন্তু তিনি তো আর মালিহাকে ধর্ষণ করেননি! তাদের মধ্যে যে শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল তা তো মালিহার সম্মতিতেই হয়েছিল। দুজনার পারস্পরিক সম্মতির পরিণতিতে যে শারীরিক অন্তরঙ্গতা তৈরি হয় সেটা নিশ্চয়ই ধর্ষণ নয়। নাকি সেটাও ধর্ষণ?

ভাবনার অতলে তলিয়ে যেতে থাকেন সাইকিয়াটিস্ট নিশাত আলম।

 

ফরিদাবাদ, ঢাকা

 

ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১