চেহারাটা নেকাবে ঢাকা। তবে একবার চোখের দিকে তাকালেই যে কেউ বুঝতে পারবে ভেতরে কী পরিমাণ আগুন পুষছে সবুজ রঙের পাগড়িবাঁধা মানুষটা। কালো কাপড়ে মোড়ানো দেহটাও কেমন হালকা-পাতলা। মনে হচ্ছে সদ্য দাড়িগোঁফ গজানো কোনো অল্পবয়সী কিশোর। ঘোড়দৌড়ে এদিকসেদিক হেলে পড়লেও এতটুকু গতি কমছে না তাঁর। বরং যতই তাঁকে পিছুডেকে সতর্ক করা হচ্ছে ততই সে বেপরোয়া হয়ে পড়ছে।
খালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হয়রান হয়ে গেলেন এ যুবকের বীরত্ব দেখে। এদিকে রাফে বিন উমাইয়াও পেরেশান। ভাবছেন, খালিদ বিন ওয়ালিদ ব্যতীত এই বীরত্ব অন্য আর কার হতে পারে? মাত্র শত্রুবাহিনীর ওপর আক্রমণের আদেশ দিতে যাচ্ছেন সিপাহসালার, তার আগেই কোথা থেকে হাজির এই নেকাবধারী। যেন হঠাৎ বিস্ফোরিত হওয়া কোনো জ্বলন্ত অগ্নিগিরি।
এক হাতে লম্বা বর্শা আরেক হাতে ধারালো তলোয়ার। তারপরও ঘোড়াটাকে সামলে রেখেছে। দেখেই বোঝা যায়, লোকটা দক্ষ ঘোড়সওয়ার। খালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু কয়েকবার ডাকলেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা! অদ্ভূতুড়ে এক উন্মাদনায় মেতেছে লোকটা। একবার শত্রুবাহিনীর সামনে যায় আবার পেছনে ফিরে আসে। এরমধ্যে যে সামনে পড়ে তাকেই কচুকাটা করে।
রাফে বিন উমাইয়া খালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন। ‘আরে! আপনি এখানে? তাহলে এভাবে যুদ্ধ করছে কে?’
খালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর উত্তর, ‘আমিও তো তা-ই ভাবছি, এই বীর মুজাহিদটি কে, যে এমন পাগলের মতো লড়ছে!’
রাফে বিন উমাইয়া বললেন, ‘এ তো মুসলমানদের রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। তাঁকে সাহায্য করা দরকার। তাছাড়া যেভাবে আত্মঘাতী লড়াই শুরু করেছে, যেকোনো সময় মারা পড়বে। আপনি অনুমতি দিন যুদ্ধ শুরু করার।’
সিপাহসালার খালিদ নির্দেশ দিলেন। শুরু হলো তুুমুল যুদ্ধ। উপর্যপুরি আঘাতে রোমানরা পিছু হটতে বাধ্য হলো। মুজাহিদরাও ফিরে এলেন নিজ নিজ শিবিরে। সেই যোদ্ধার দেখা মিলল এবার। জামা-কাপড় রক্তে একাকার। তারবারি থেকেও ঝরছে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত। দীর্ঘ বর্শাটা লালে লাল। সিপাহসালার খালিদ রাদিয়াল্লাহু তাঁকে চিৎকার করে বললেন, ‘আল্লাহ তাআলা তোমাকে উত্তম প্রতিদান দান করুক। তুমি প্রাণপণ যুদ্ধ করেছ। এবার নেকাব খোলো। কে তুমি, দেখি।’
নেকাবধারী মুজাহিদ নিশ্চুপ। নিশ্চল।
খালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এবার কঠোর হলেন তাঁর পরিচয় জানতে। গম্ভীর গলায় বললেন, ‘কে তুমি? কী তোমার পরিচয়? চেহারা দেখাচ্ছ না কেন?’
এবার মিষ্টি কণ্ঠের ক্ষীণ আওয়াজ ভেসে এলো নেকাবধারীর কাছ থেকে—‘মুহতারাম সিপাহসালার! আপনি আমার জন্য গায়রে মাহরাম। আমি কীভাবে আপনার সামনে আমার চেহারা খুলব?’
নারীকণ্ঠের আওয়াজ শুনে উপস্থিত সকলেই বিস্ময়ে হতবাক। তাহলে কি এতক্ষণ একজন নারীই…?
বীরাঙ্গনা এই মুজাহিদার পরিচয় জানতে আগ্রহী সবাই। নেকাবধারীর ক্ষীণ স্বরের মিষ্টি কণ্ঠ আবারও বেজে উঠল—‘আমিরে মুহতারাম! আমি খাওলা। উখতে দিরার বিন আজুর। ভাইকে শত্রুদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্যই আমার এই লেবাস। আমি মহিলাদের সঙ্গে অবস্থান করছিলাম। এমন সময় একজন এসে বলল, আমার ভাই দিরার বিন আজুর কাফেরদের হাতে বন্দী হয়েছে। আমি তখনই ঘোড়ায় সওয়ার হলাম এবং যা করার করলাম।’
বিস্ময়ের ঘোর কেটে ওঠার পর খালিদ রাদিয়াল্লাহু তাঁকে স্বান্ত¦না দিলেন। আশ্বাস দিয়ে বললেন, অচিরেই মুক্ত করে আনা হবে তাঁর ভাইকে।
আমের বিন তুফায়েল বলেন, ‘খাওলা যখন সামনে থেকে হামলা করছিল, তখন আমি খালিদের পাশে ছিলাম। রোম সৈন্যরা বলছিল, সব মুসলিম সৈন্য যদি এই অশ্বারোহীর মতো হতো তাহলে আমরা কখনোই তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারতাম না।
দুই
সালার দিরার বিন অজুর রাদিয়াল্লাহু আনহু রোমানদের হাত থেকে মুক্ত হয়েছেন মাত্র একদিন হলো। কাফেরদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। এবার তারা আরও জোরদারভাবে হামলা করল। আর তাদের নেতৃত্বে থাকল রোম রাজকন্যার স্বামীর ভাই বুট্রোস। কীভাবে কীভাবে যেন তারা মুসলিম মেয়েদের তাবু পর্যন্ত পৌঁছে গেল। অবলা মেয়েদের পাকড়াও করে নিল কোনোরকম বাধা ছাড়াই। পাকড়াওয়ের পর মুসলিম নারীদেরকে নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নিল।
কিছু অবলা নারী অসহায় হয়ে শত্রুদের নির্দেশিত স্থানে যাওয়ার জন্য ঘোড়ায় চড়েছেন। এমন সময় গর্জে উঠলেন বীরাঙ্গনা খাওলা। জ্বালাময়ী কণ্ঠে বললেন, ‘হিময়ার ও তুববার গোত্রের মেয়েরা! তোমরা কি রোমানদের লালসার শিকার হবে? আর তোমাদের ছেলেদের মুশরিকদের পা-চাটা গোলাম বানাবে? কোথায় তোমাদের সে সাহসিকতা, যা আরবদের মধ্যে প্রাণসঞ্চার করত? এখন তোমাদের মধ্যে সেসব নেই কেন? রোমান কুকুরদের মনোরঞ্জন করার চেয়ে মৃত্যুই তো ঢের ভালো।’
খাওলার আগুনঝরা আ আহ্বান শুনে আরও একটি কণ্ঠ উচ্চকিত হলো। আফরা বিনতে গিফার আল-হিময়ারি বললেন, ‘আল্লাহর কসম, হে বিনতে আজুর! তুমি সত্য বলেছ। তুমি যে সাহসিকতা ও বুদ্ধির কথা বলছ, আমরা এখনও ভুলিনি। আমাদের রয়েছে অনেক বড় বড় ভূমিকা ও কৃতিত্ব। আল্লাহর কসম, আমরা রাতের অন্ধকারে ওদিকে যাচ্ছি, এটা সত্য, তবে আরেকটি কথা, এ সময়ে তরবারির কাজ অন্যান্য সময়ের চেয়ে ভালো। আমরা চাইছি শত্রুদের অগোচরে তাদের ওপর হামলা করব। কারণ, আমরা তো এখন লাগাম মুখে দেয়া ছাগলের মতো।’
এবার খাওলা অন্যান্য মেয়েদেরকে তাবু ও খুঁটির কাঠ হাতে নেয়ার নির্দেশ দিলেন। যাতে এসব দিয়ে কাফেরদের ওপর আক্রমণ করা যায়। তাঁর কথা ছিল এরকম, ‘হয় মারব, নয়তো মরব। আল্লাহ আমাদের বিজয় দান করবেন অথবা আমরা শহিদ হয়ে যাব, কিন্তু কিছুতেই এসব নিকৃষ্ট লোকের হাতের খেলনায় পরিণত হব না।’
এর পরের দৃশ্যটা ছিল দেখার মতো। প্রথমে খাওলা রাদিয়াল্লাহু আনহা, তাঁর পিছুপিছু আফরা, উম্মে আবান, সালমা বিনতে জিরা, লুবনা বিনতে হাজেম, মাখরুমা বিনতে আমলুক, সালমা বিনতে লুমানসহ অন্যান্য মহিলারা। সবার কাঁধে ছিল একটি করে বড় খুঁটি। খাওলার পরামর্শে তাঁরা বৃত্তের মতো করে চলতে লাগলেন। এভাবে চলার পর একসময় রোমানরা তাঁদের ঘিরে ফেলল। তাঁরাও-বা কম যান কিসে? তাবুর খুঁটি নিয়েই শত্রুদের মোকাবেলায় নেমে পড়লেন। শত চেষ্টা করেও কেউ তাঁদের কাছে ভিড়তে পারল না। কেউ এগোতে চাইলেই তাবুর খুঁটি দিয়ে তার ঘোড়ার পায়ে আঘাত করে। আঘাত খেয়ে লাফিয়ে ওঠে ঘোড়া। আর আরোহী ছিটকে পড়ে মাটিতে। তারপর আর যায় কোথায়? ব্যস। দমাদম খুঁটির বাড়ি। একেবারে পটল না তোলা পর্যন্ত কোনো থামাথামি নেই।
এভাবেই বীরাঙ্গনা নারীরা কাফেরদের ৩০ জনকে হত্যা করে ফেলেন। এসব দেখে বুট্রোস প্রচণ্ড রেগে যায়। সে তার সৈন্যদের নিয়ে পায়দল এগিয়ে আসতে লাগল। এদিকে মেয়েরাও একে অপরকে উৎসাহিত করতে লাগলেন। খাওলা তখন সিংহের মতো নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি আবৃত্তি করছেন এক মর্মস্পর্শী কবিতা—
‘আমরা হচ্ছি তুব্বা ও হিময়ারের বীরাঙ্গনা
আমাদের জন্য কঠিন নয় শত্রুদের ওপর আঘাত হানা
আমরা যুদ্ধে জ্বলন্ত অগ্নি
তোমরা আস্বাদন করবে মহাশাস্তি।’
বুট্রোস খাওলার কবিতা শুনে তাঁকে প্ররোচিত করতে বললো, ‘হে আরব নারী! তুমি এমন করো না। তুমি কি চাও না, আমি তোমার স্বামী হই? আমার তো ধন-সম্পদের অভাব নেই। সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছেও আমি মর্যাদাশীল। আমি তোমার পছন্দনীয় সব কিছু দিয়ে তোমাকে সম্মানিত করব। আমার সবকিছু তোমার জন্যই উৎসর্গিত। তুমি কি দামেস্কবাসীর নেত্রী হতে পছন্দ করবে না? তোমার কাছে আমার অনুরোধ, এভাবে নিজেকে ধ্বংস করো না।’
উত্তরে খাওলা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, ‘হে অভিশপ্তের ছেলে অভিশপ্ত! শুধু একবার সুযোগ পাই, তোর ঘাড় থেকে মাথা আলাদা করব আমি। আল্লাহর কসম, আমি তো তোকে আমার উটের রাখাল হওয়ারও যোগ্য মনে করি না। তোকে কীভাবে সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করব?’
এ কথা শুনে বুট্রোস তার সৈন্যদেরকে নিয়ে আরও জোরালোভাবে আক্রমণ করল। এদিকে মহিলারাও প্রতিরোধে অত্যন্ত ধৈর্যের পরিচয় দিলেন। এমন সময় খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু মুজাহিদদের নিয়ে তাঁদের সাহায্যে এগিয়ে এলেন। রাফে বিন উমাইয়া এগিয়ে এসে মেয়েদের অবস্থা জেনে খালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে অবহিত করলেন যে, আমালিকা ও তাবাবিআ বংশের নারীরা মরণপন লড়াই করছে। তখন খালিদ রা. বললেন, ওদের যুদ্ধ দেখে আমি অবাক হই না। ওরা তো তুব্বার বংশের নারী। যারা কিনা এক শতাব্দী পূর্ব থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রতীক্ষায় ছিল।
খালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু শত্রুদের চতুর্দিক থেকে আক্রমণ করে মেয়েদেরকে মুক্ত করলেন। মুক্তির মুহূর্তে খাওলা রাদিয়াল্লাহু আনহা চিৎকার করে বলছিলেন, ‘তাবাবিআ বংশের মেয়েরা! কাবার প্রভুর শপথ! তোমাদের জন্য সাহায্য এসে গেছে।’
তুমুল যুদ্ধের পর রোমানদের তিন হাজার সৈন্য মারা পড়লো। হামেদ বিন আমের আল ইয়ারবুয়ি বলেন, ‘আমি সেদিন খাওলাকে পাঁচজন কাফের সৈন্য হত্যা করতে দেখেছি।’
দিরার বিন আজুর রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন বীর যোদ্ধা। তিনি মুজাহিদ বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ একজন সালারও। কিন্তু তাঁর বোন খাওলাও যে একজন তেজস্বিনী বীরাঙ্গনা, এ যুদ্ধের আগে এ কথা অনেকেরই জানা ছিল না।
কামারগাড়ি, সদর, বগুড়া
ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

