‘চিত্রল মুক্তা দুষ্প্রাপ্য।’
ইরানের এক শাহজাদা আনমনে বসে কী যেন ভাবছিলেন একদিন, হঠাৎ তাঁর মনে এমন ভাবার্থের একটি ফারসি পঙক্তির উদয় হলো। বিড়বিড় করে তিনি বার কয়েক আওড়ালেন পঙক্তিখানি। কিন্তু পরের পঙক্তি কী হবে, মেলাতে পারছিলেন না। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলেন; নাহ, পছন্দসই কোনো পঙক্তি তিনি তৈরি করতে পারলেন না।
শাহজাদা বলে কথা; দ্বিতীয় পঙক্তি তাঁকে মেলাতেই হবে যেকোনোভাবে। নিজে না পেরে অবশেষে ডাকলেন রাজ্যের বড় বড় সব কবিকে। কবিরা রাজদরবারে এসে নানা ধরনের পঙক্তি তৈরি করে দিলেন, কিন্তু প্রথম পঙক্তির সঙ্গে কোনোটাই মানানসই হচ্ছিল না।
শাহজাদা ঘোষণা দিলেন, যদি কেউ পূর্ণ অন্তমিলে দ্বিতীয় অংশ লিখতে পারে তাকে বড় ধরনের পুরস্কার দেওয়া হবে। ভূষিত করা হবে অনন্য সম্মানে।
তাঁর এ ঘোষণা ইরানের সীমানা পার হয়ে পৌঁছে যায় হিন্দুস্তানের রাজধানী দিল্লিতেও। এমনকি মোঘল শাহজাদির কান পর্যন্ত পৌঁছে এ ঘোষণা।
শাহজাদি একদিন গোসলের পর সাজগোজের সময় চুলে চিরুনি করে চোখে সুরমা ব্যবহার করছিলেন, হঠাৎ তাঁর চোখ থেকে দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আয়নায় তিনি দেখতে পেলেন, সুশোভিত চোখের পালকে ঝলমল করছে অশ্রুর নক্ষত্র। তাতে অশ্রুর শুভ্রতা ও সুরমার দোসরতা মিলে তৈরি হয়েছে অনিন্দ্য সুন্দর এক মুক্তা। তাঁর মনে পড়ে গেলো ইরানের শাহজাদার কবিতার প্রথম পঙক্তি। আর তখনই এ পঙক্তির দ্বিতীয় অংশ হিসেবে তাঁর করোটিতে তৈরি হলো নতুন একটি পঙক্তি। ইরানের শাহজাদার পঙক্তির সঙ্গে মিলিয়ে তিনি বিড়বিড় করে আওড়ালেন—‘চিত্রল মুক্তা দুষ্প্রাপ্য/ তবে অশ্রু মিশ্রিত সুরমায় তার প্রাচুর্য।’
মোঘল-শাহজাদি কবিতাখানি লিখে পাঠালেন ইরান-শাহজাদার ঠিকানায়। কিন্তু নিজের আসল পরিচয় গোপন রাখলেন। শাহজাদা কবিতা পেয়ে তো অবাক! এতো সুন্দর করে কেউ মেলাতে পারে? শাহজাদা যারপরনাই খুশি হলেন। তিনি এ কবির সঙ্গে সাক্ষাত করতে চাইলেন। সেই সঙ্গে ওয়াদা অনুযায়ী কবিকে পুরস্কৃত ও সম্মানিত করতে চাইলেন। মোঘল রাজপ্রাসাদে ইতিমধ্যে এ কান ও কান হয়ে মোটামুটি জানাজানি হয়ে গেছে যে, মোঘল শাহজাদিই লিখেছেন দ্বিতীয় ওই পঙক্তিখানি। জেনে গেছেন মোঘল সম্রাটও।
তখনকার মোঘল সম্রাট ছিলেন অত্যন্ত খোদাভীরু, পরহেজগার এবং পর্দার ব্যাপারে খুব সতর্ক। তিনি মেয়েকে ডেকে বললেন, ‘আমি তোমাকে এ শিক্ষা দিইনি যে তুমি পরপুরুষের সাথে লেনদেনে ব্যস্ত হবে। তোমাকে নিষেধ করলাম, তুমি কোনো ধরনের লেনদেনে আগ্রহী হয়ো না।’
শাহজাদির ঠোঁটের কোণে দেখা দিলো মুচকি হাসির রেখা! পিতাকে নিশ্চিন্ত করতে তিনি বললেন, ‘আপনি এই ব্যাপারে একদমই চিন্তা করবেন না। আমি তাঁকে এমন চিঠি লিখবো, আমার সাথে তাঁর সাক্ষাতের সাধ চিরদিনের জন্য উবে যাবে।’
হ্যাঁ, তিনি লিখলেন। কবিতার পঙক্তি দিয়েই লিখলেন সেই কথাগুলো—
‘আমার মিষ্ট কথায় আমি এমনভাবে লুকিয়ে থাকি
ফুলের ঘ্রাণ যেমন থাকে তার পাপড়িতে,
আমার সাক্ষাতপ্রার্থীর প্রতি আমার আকাঙ্ক্ষা
তিনি এমন দূরদর্শিতা সম্পন্ন হবেন
যেন আমার কবিতা পড়েই বুঝে নিতে পারেন
আমি সবার মতো নই।’
ইরানের শাহজাদা এই পত্রকবিতা পড়ে বুঝে নিলেন, এ কবি নিশ্চয় কোনো পর্দানশীন নারী, খ্যাতি ও সম্মানের জন্য তিনি নিজেকে অনাবৃত করতে চান না। শাহজাদা তাঁকে আর ঘাটতে চাইলেন না।
দুই
মোঘল এই শাহজাদির নাম জেবুননেসা বিনতে বাদশাহ আলমগির। তিনি সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগির ও দিলরাস বানু দম্পতির বড় মেয়ে। শাহ নেওয়াজ খান ছিলেন দিলরাস বানুর পিতা। শাহ নেওয়াজ খানের মূল নাম বদিউজ্জামান। তিনি সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে প্রশাসনের উচ্চপদে আসীন ছিলেন। পরে তাঁকে শাহ নেওয়াজ উপাধী দেয়া হয়। বংশগতভাবে শাহ নেওয়াজ ছিলেন উঁচু ঘরানার। শাহজাহানের শাসনামলের দশম বছর, ১০৪৭ হিজরিতে শাহ নেওয়াজ খানের কন্যার সাথে আলমগীরের বিয়ে হয়।
১০৪৮ হিজরির শাওয়াল মাসে ১৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারি দিলরাস বানুর কোল আলোকিত করে জেবুননেসা জন্ম হয়। বাবা সম্রাট আলমগীর শখ করে কন্যার নাম রেখেছিলেন জেবুননেসা; যার অর্থ ললনাশ্রী।
প্রসবের পর মোঘল বাদশাহদের বেগমেরা সন্তান প্রতিপালন করতেন না, কোনো ধাত্রী নিজের দুধ পান করিয়ে সেই শিশুকে লালন পালন করতো। শাহজাদি জেবুননেসার জন্মের পর, মোঘল রাজপরিবারে চিরপ্রচলিত প্রথা অনুসারে ‘মিয়াবাই’ নামে একজন মহিলার উপর তাঁর প্রতিপালনের ভার অর্পণ করা হয়।
মিয়াবাই ধার্মিক মহিলা ছিলেন। প্রতি সকালে তিনি যখন কুরআন পাঠ করতেন, অল্পবয়স হলেও শাহজাদি জেবুননেসা সে সময়ে তাঁর কাছে বসে একাগ্রচিত্তে কুরআন পাঠ শুনতেন।
বাদশাহ আলমগীর তাঁর কন্যার কুরআন শোনার আগ্রহ ধাত্রীর নিকট থেকে জানতে পেরে কন্যার পাঁচ বছর বয়সে তাঁকে কুরআন পাঠ করানোর জন্য আমির এনায়েতুল্লাহ খানের আম্মা হাফেজা মরিয়মকে নিযুক্ত করেন। ফলে অল্পবয়সেই জেবুননেসা অক্লান্ত পরিশ্রম করে দুই বছর তিন মাসের মধ্যে সমস্ত কুরআন কণ্ঠস্থ করতে সক্ষম হন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র সাত বছর। শৈশব থেকেই প্রচণ্ড ধীশক্তির অধিকারী ছিলেন জেবুননেসা।
এতো অল্প বয়সে তিরিশ পারা কুরআন হিফজ করে ফেলায় বাবা আওরঙ্গজেব আলমগির দারুণ খুশি হন। কন্যার এই কৃতিত্বের জন্য সমারোহে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। সেই উপলক্ষে অনেক গরিব-দুঃখীকে দান-খয়রাত এবং সর্বসাধারণকে ভোজ ও পারিভোষিক ইত্যাদি বিতরণ করা হয়েছিল। সম্রাট আলমগির খুশি হয়ে কন্যাকে ত্রিশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা উপহার দেন। জেবুননেসার শিক্ষিকা হাফেজা মরিয়মকেও দেওয়া হয় বড় অংকের ইনআম।
সম্রাট আলমগীর তাঁর কন্যাকে এইরকম প্রখর মেধার অধিকারিনী ও প্রতিভাশালিনী দেখে তাকে লেখাপড়া শেখানোর জন্য কয়েকজন শিক্ষক নিযুক্ত করেন। তাঁদের মধ্যে মোল্লা সাইদ আশরাফের নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি ইরান নিবাসী সুবিখ্যাত পণ্ডিত সৈয়দ তকি মজলিসির বংশের, এবং সেখান থেকেই ভারতবর্ষে এসেছিলেন।
জানা যায়, জেবুননেসা কুরআন পাঠ শেষ করেই মোল্লা সাইদ আশরাফের নিকট পড়তে আরম্ভ করেননি, পড়েছিলেন কয়েক বছর পর। তার আগে অন্য কয়েকজন শিক্ষক তাঁকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। এরকম প্রায় একুশ বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষা অর্জন করবার পরও তিনি জ্ঞানের চর্চায় জীবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেছেন।
মোঘল রাজপরিবারের নারীদের মধ্যে কেবল শাহজাদি জেবুননেসাই যে পড়াশোনা করেছিলেন তা নয়, অন্যান্য শাহজাদি, বেগম এবং হেরেমের অনেক নারীও লেখাপড়া এবং নানারকম শিল্পকার্যের শিক্ষা নিতেন। নুরজাহান, জাহানারা রওশন আরাসহ প্রায় সকল নারীই সুশিক্ষিতা ছিলেন। তবে তাঁদের মধ্যে কেউই শাহজাদি জেবুননেসার সমকক্ষ হতে পারেননি ।
শাহজাদি জেবুননেসা মোল্লা সাইদ আশরাফের কাছে কেবল আরবি ও ফারসি ভাষা শেখার পাশাপাশি ধর্মীয় জ্ঞান, কাব্য সাহিত্যসহ নানা বিষয়ের অনেক গ্রন্থও অধ্যয়ন করেছিলেন। তবে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ তাঁর কবিতায়ই ছিল। কবিতা ছিল তাঁর মন ও মেজাজের সঙ্গে মেশানো। মোল্লা আশরাফও ছিলেন একজন সুকবি।
জেবুননেসা আরবি ভাষায়ও অর্জন করেছিলেন অগাধ পাণ্ডিত্য। একবার তিনি আরবিতে একটি কাসিদা (একশ্রেণীর কবিতা) লিখলেন। বাদশাহ আলমগিরের দরবারে সে সময় মক্কা শরিফের একজন বিজ্ঞ সভাসদ ছিলেন। আরবি তাঁর মাতৃভাষা ছিল। আরবিতে বিশেষ জ্ঞানও রাখতেন তিনি। জেবুননেসার কাসিদাটি তাঁকে দেখানো হলো। দেখে তিনি মন্তব্য করেন, এটি কোনো আরবদেশীয় লোকের রচনা নয়। কারণ, এই কাসিদা অতি সুন্দর হলেও কোনো কোনো স্থানে বাকপদ্ধতির অসম প্রয়োগ দেখা আছে। তবে কাসিদাটি যে ব্যক্তিই রচনা করুক না কেন, তাঁর যে আরবি জ্ঞানে পাণ্ডিত্য আছে, এ কথা স্বীকার করতে হবে।
আরবিভাষী সভাসদের এ মন্তব্যের পর জেবুননেসা আরবিতে আর কিছু লিখেননি কখনও, যত কবিতা তারপর তিনি লিখেছেন, সবই নিজের মাতৃভাষা ফারসিতে।
জেবুননেসার প্রধান শখ ছিল কাব্যচর্চা। কিন্তু তাঁর পিতা বাদশাহ আলমগির ঘোর কবিতাবিরোধী ছিলেন। তাঁর সামনে কেউ কবিতা আবৃত্তি করলে তিনি বিরক্ত হতেন। তাঁর দরবারে কোনো কবির আদর বা আশ্রয় ছিল না। পূর্বকালের রাজসভায় যেসব কবি ছিলেন, সম্রাট আলমগিরের এরকম ভাবগতি দেখে তারা আপনাআপনি দরবার হতে সরে যান।
সম্রাট আলমগির শুধু যে কবিতা অপছন্দ করতেন তা নয়, সংগীতও একদমই ভালবাসতেন না। তাঁর দরবারে যেমন কোনো কবির স্থান ছিল না, তেমনি কোনো সংগীতবিদ্যাবিৎ ব্যক্তিও স্থান পেতেন না।
বাদশাহ আলমগিরের এই না-পছন্দির যুক্তিসঙ্গত কারণও ছিল। তাঁর আগেকার সম্রাটদের দরবারে যেসব কবি ও গায়েন থাকত, তারা সম্রাটের স্তুতি আর প্রশস্তিই করত কেবল। যার অধিকাংশই মিথ্যা ও তোষামোদিপূর্ণ। তাছাড়া সংগীত গাওয়া হতো বাদ্য-বাজনা সহকারে। সম্রাট আলমগির নেককার ও নিতান্ত ধর্মপরায়ণ একজন শাসক ছিলেন। ইসলাম-বিরোধী কোনোকিছুই তিনি সহ্য করতে পারতেন না। তাই সংগীত ও কবিতার নামে যে মিথ্যাচার ও তোষামোদি চলত রাজদরবারে, এর প্রতি তাঁর ছিল চরম বিরক্তি। নিজে শাসনভার গ্রহণ করার পর তাই এসব ঝেটিয়ে বিদেয় করেছেন রাজদরবার থেকে।
দুনিয়াবিমুখ সম্রাটের পরিবারের কেউ যে বাহারি রঙের পোষাক পরিধান করবে, সেটাও তিনি পছন্দ করতেন না। এ জন্য পিতৃভক্ত শাহজাদি জেবুননেসা প্রায় সবসময়ই সাদা কাপড় পরতেন, অলঙ্কারও বেশী একটা ব্যবহার করতেন না। এ ব্যাপারে তিনি একটি কবিতা লিখেছিলেন। কবিতাটি এমন—
‘বাদশাহর কন্যা আমি কিন্তু গরিবের রূপ ধরেছি।
বেশভূষা আমার এই—এই রূপের যে আমি,
আমার নাম জেবুননেসা—স্ত্রী-ভূষণ।’
কবিতার প্রতি পিতার বিরক্তির কারণে জেবুননেসা প্রকাশ্যে কাব্যচর্চা করতে সাহস পেতেন না। গোপনে একটি পাণ্ডুলিপিতে কবিতা লিখে তা সাবধানে লুকিয়ে রাখতেন, পিতা যেন না দেখেন।
ঘটনাক্রমে একদিন সে পাণ্ডুলিপি মোল্লা সাইদ আশরাফের হাতে পড়ে। তাতে লিখিত কবিতাগুলি পাঠ করে কবিতার লালিত্যে তিনি বিমুগ্ধ হয়ে যান। একরাশ বিস্ময় নিয়ে কবিতাবোদ্ধা মোল্লা সাইদ জেবুননেসাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘শাহজাদি, এসব কি তোমার লেখা?’
উত্তরে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লেন শাহজাদি। জেবুননেসাই এসব কবিতা রচনা করেছেন শুনে মোল্লা সাইদ আশরাফ খুশি হয়ে বললেন,‘সুবহানল্লাহ! তুমি তো একজন সুকবি, তোমার কাব্যপ্রতিভা অসাধারণ। যদি কোনো আপত্তি না থাকে, তবে তুমি যেসব কবিতা রচনা করো, তা আমাকে দেখিয়ো।’
নিজের ওস্তাদের মুখে এরকম প্রশংসা ও উৎসাহবাক্য শুনে জেবুননেসার কবিতা লিখবার উদ্যম বেড়ে যায়। এবং সেদিন থেকে তিনি যখন যে কবিতা রচনা করতেন তা-ই নিজ ওস্তাদকে দেখাতেন। বিভিন্ন পরামর্শের মাধ্যমে সংশোধন করিয়ে নিতেন।
মোল্লা সাইদের তত্ত্বাবধানেই জেবুননেসা কাব্যচর্চা করেন। প্রায় ১৩/১৪ বছর জেবুননেসা মোল্লা সাইদ আশরাফের কাছে নানা বিষয়ে পড়াশোনা করেন। ১০৮৩ হিজরিতে মোল্লা সাইদ আশরাফ ভারতবর্ষ ত্যাগ করে ইরান যাওয়ার ইচ্ছা করেন। সেসময় তিনি একটি কবিতার মাধ্যমে জেবুননেসার কাছ থেকে বিদায় নেন। কবিতাটির ভাষ্য ছিল এমন—
‘একটিবারের জন্যেও মন এ দেশের বিরহ সইতে রাজি হয় না,
যদিও এখন আমার প্রস্থান অতীব জরুরি।
আমাদের জন্য সম্মুখ, নৈকট্য ও দূরত্বে কোনো ফারাক নেই
সম্পর্ক যখন দুই হৃদয়ের, তবে দিল্লি ও ইস্পাহানের দূরত্বে কী যায়-আসে?
হৃদয় সদা তোমার সম্মুখে, কাবুলে থাকি বা কান্দাহারে।’
সুকবি শাহজাদি জেবুননেসার কবিতার অনুরাগ ও চর্চার কথা যখন সবখানে প্রচার হতে শুরু হলো, তখন যেসব কবি নির্জীব অবস্থায় ছিলেন, তাঁদের দেহে যেন আবার জীবনের সঞ্চার হলো; এবং তাঁদের রচিত কবিতা যাতে শাহজাদির নিকট পৌঁছে, সেজন্য তাঁরা যথাসাধ্য চেষ্টা করতে লাগলেন। এমনকি অনেকেই প্রার্থনা-পত্রাদি পর্যন্ত কবিতাকারে লিখে পাঠাতেন।
এমনই একজন নিয়ামত খাঁ আলি। উঁচু মাপের কবি ছিলেন তিনি। অভাবে পড়ে একটা ‘কলিগ’ (পাগড়ি বা টুপির অলংকার বিশেষ) বিক্রয়ের জন্য শাহজাদির নিকট প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু অনেক দিন অপেক্ষা করেও যখন তাঁর জিনিসের কোনো খবর জানতে পারলেন না, তখন তিনি শাহজাদিকে মনে করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ইঙ্গিতে একটা কবিতা লিখে তাঁর কাছে পাঠালেন। কবিতাটির ভাবার্থ এমন—
‘আমার শুভগ্রহ, তোমাকে প্রণাম করি,
আমার অলংকার তোমার সেবায় নিয়োজিত আছে।
যদি ওই শব অর্থাৎ সামান্য দ্রব্য ক্রয়ে অভিপ্রায়
হয়, তবে এটাকে আমার অমূল্য রত্ন জ্ঞান করব।
যদি ক্রয় করতে না চাও তবে আমার
শিরোপরি আঘাত করো।’
কবিতাটি শাহজাদির কাছে পৌঁছলে তাঁর রচনা-কৌশল দেখে তিনি অবাক হন এবং সাথে সাথে পাঁচ হাজার মুদ্রা নিয়ামত খাঁ আলির কাছে পাঠিয়ে দেন।
তিন
কাব্যচর্চা জেবুননেসার রক্তমাংসের সঙ্গে মেশানো ছিল। কবিতা নিয়েই পড়ে থাকতেন দিনমান। সেই সঙ্গে করতেন নানা বিষয়ের ওপর বিপুল পড়াশোনা। রাজকুমারী হয়েও পিতার সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক অবস্থা থেকে তিনি নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতেন। কিন্তু ভাগ্যবিড়ম্বনায় তাঁকেও আটকা পড়তে হয় রাজনৈতিক কূটিলতার ফাঁদে।
১০৯১ হিজরিতে রাজপুতেরা বিদ্রোহ করলে তাদের দমন করতে সম্রাট আলমগির নিজ পুত্র আকবরকে সৈন্যবাহিনী দিয়ে যোধাপুর প্রেরণ করেন। সেখানে গিয়ে রাজপুতদের ছলাকলায় আকবরের মতিভ্রম হয়। সে তাদের প্ররোচনায় পিতার বিরুদ্ধে নিজেই বিদ্রোহ করে বসে।
ভাতৃস্নেহে বিগলিত জেবুননেসা সেসময় শাহজাদা আকবরের সঙ্গে পত্রযোগে যোগাযোগ করতেন। এইসব পত্রে রাজনৈতিক কোনো আলাপ ছিল না, ছিল ভাইবোনের ব্যক্তিগত একান্ত সম্পর্কের বাতচিত। পিতা সম্রাট আলমগিরের কানে পৌঁছে যায় এ পত্রচালাচালির খবর। ন্যায় ও সত্যের পক্ষে অবিচল সম্রাট পুত্র আকবরের বিশ্বাসঘাতকতায় যারপরনাই রুষ্ট ছিলেন তার ওপর। বিদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতক পুত্রের সঙ্গে কন্যা জেবুননেসার এ পত্রচালাচালি তিনি মেনে নিতে পারলেন না। তিনি ভাবলেন, মেয়ে হয়তো ভাইকে কোনো ধরনের সহযোগিতা করছে।
মেয়ের প্রতি বেশ রাগান্বিত হন বাদশাহ আলমগির। রাজনৈতিক চিন্তা থেকে জেবুননেসাকে তিনি সেলিমগড়ে নজরবন্দী করে রাখার নির্দেশ দেন। এবং বার্ষিক ভাতাস্বরূপ জেবুননেসা যে চার লাখ স্বর্ণমুদ্রা পেতেন তা-ও বন্ধ করে দিতে বলেন।
কিন্তু অতিদ্রুতই শাহজাদি নির্দোষ প্রমাণিত হন, বাদশাহ আলমগির বুঝতে পারেন, মেয়ে তাঁর সেরেফ ভাতৃস্নেহ থেকে এ কাজ করেছে। জেবুননেসাকে তিনি ক্ষমা করে দেন। বাবা-মেয়ের সম্পর্ক আগের মতো, বরং তারচেয়ে আরও মধুর এবং সুগভীর হয়ে ওঠে।
১০৯২ হিজরিতে রুহুল্লাহ খানের আম্মা হামিদা বানু বেগম ইন্তেকাল করলে বাদশাহ আলমগির জেবুননেসাকে হামিদা বানুর ঘরে প্রেরণ করেন। এই বছরই জেবুননেসার ভাই, বাদশাহ আলমগিরের চতুর্থ শাহজাদা কাম বখশের বিয়ে উপলক্ষে জেবুননেসার মহলে কয়েকটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
শাহজাদি জেবুননেসা বাদশাহ আলমগিরের অত্যন্ত আদরের কন্যা ছিলেন। অন্যান্য শাহজাদির চেয়ে বাবার ওপর তাঁর অধিকার যেন একটু বেশিই ছিল। হেরেমের অন্য নারীদের তুলনায় জেবুননেসার স্বাধীনতাও ছিল বেশি। তাই তো তিনি কবিতা অপছন্দ করা বাবার কন্যা হয়েও কাব্যচর্চা করতে পেরেছিলেন।
কন্যা ও বাবার মধ্যে প্রায়ই বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে আলাপ হতো। নিজ কন্যার জ্ঞানের গভীরতা দেখে বাদশাহ আলমগির অবাক হতেন। আদরের কন্যাকে বিভিন্ন সফরে তিনি নিজের সঙ্গে রাখতেন। কাশ্মীরের সফর ছিল অধিক কষ্টকর। সে সফরেও জেবুননেসা পিতার সাথে ছিলেন। শাহজাদি কোনো সফর থেকে ফিরলে বাদশাহ আলমগির শাহজাদাদের পাঠাতেন বোনকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য।
ঐতিহাসিকদের রচনা থেকে জানা যায়, জেবুননেসা আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় ছিলেন অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী। হাতের লেখাও ছিল অত্যন্ত সুন্দর। বিশেষত নসখ, নাস্তালিক ও শিকাস্তা লিপিতে ছিলেন পারদর্শী।
অনেকে তার নাম বলেন জেবুননেসা মুখফি। দেওয়ান-ই-মুখফি নামের একটা কবিতা-সংকলনকেও বলা হয় জেবুননেসার রচনা। এই মুখফি বিষয়ক এই আলাপ ও ধারণা আসলে ভুল। কারণ, নির্ভরযোগ্য কোনো ইতিহাসগ্রন্থে জেবুননেসা সংকলিত এমন কোনো কবিতা-সংকলনের তথ্য পাওয়া যায় না। মাখজানুল গারায়েবের গ্রন্থকার আহমদ আলি সান্ধিলভি জেবুননেসার জীবনীর আলাপে লিখেন, জেবুননেসার নামে প্রচলিত কাব্যগুলোর অধিকাংশই তাঁর ওস্তাদ মোল্লা সাইদ আশরাফের রচিত।
তবে তিনি একজন সুকবি ছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। জেবুননেসার রচনা ছিল জেবুন নাশাআত। তাঁর বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থে এর উল্লেখ আছে। আহমদ আলি সান্ধিলভি বলেন, এটি তাঁর পত্র-সংকলন।
জেবুননেসা রচিত অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। তবে তিনি কোনো গ্রন্থ রচনা করুন বা না করুন তাঁর তত্ত্বাবধানে অনেক গ্রন্থ রচনা করা হয়েছে। সেগুলোর নামলিপির শুরুতে জেব শব্দটি যোগ করা হতো।
এসব গ্রন্থের অন্যতম হল জেবুত তাফসির। এটি ইমাম রাজির তাফসিরে কাবিরের ফারসি অনুবাদ। কাশ্মীরের বাসিন্দা মোল্লা সফিউদ্দিন আরদবেলিকে দিয়ে জেবুননেসা এই তাফসিরের অনুবাদ করিয়ে ছিলেন।
জানা যায়, জেবুননেসা বিশাল এক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত অ্যাকাডেমির প্রয়োজনে বহু মূল্যবান গ্রন্থ এতে সংগৃহীত ছিল। মাআসিরে আলমগিরির লেখক জেবুননেসার এই লাইব্রেরির তুমুল প্রশংসা করেছেন।
চার
জেবুননেসা চিরকুমারী ছিলেন। নিজের জ্ঞানচর্চায় ব্যাঘাত ঘটবে, অধ্যয়নের স্বাধীনতার ডানায় শিকল লাগবে বলে বিয়ের প্রতি তিনি ছিলেন অনাগ্রহী। তাঁর এই অনাগ্রহ এবং চিরকুমারিত্ব—শুধু এই একটি কারণে হিংসুটে ইউরোপীয় লেখক, বিধর্মী ও মোঘল রাজপরিবারের নিন্দুকেরা তাঁর সুষমামণ্ডিত পবিত্র চরিত্রের গপর কলঙ্কের কালি লেপনের অপচেষ্টা করেছে। তাঁর সাথে যুক্ত করেছে আকিল খানকে। বিধর্মী লেখক সমরেন্দ্রচন্দ্র দেববর্মণ রচিত ‘জেবুননেসা’ গ্রন্থ থেকে পাওয়া যায় তাঁর ওপর আরোপিত মিথ্যা অপবাদের বিস্তারিত তথ্য।
এই লেখকের ভাষ্যমতে আকিল খান ছিলেন জেবুননেসার প্রণয়পুরুষ। আকিল খানের সাথে নাকি তিনি পত্রযোগে কবিতার মাধ্যমে প্রেমালাপ করতেন। এ পত্রচালাচালিতে ধরা পড়ার পর বাদশাহ আলমগির নাকি আকিল খানকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন। অথচ তা নিছকই অপবাদ বৈ আর কিছু নয়।
আকিল খান সেসময়কার কবি ছিলেন বলে তাঁর জীবনীর আলাপ আছে ইতিহাসের বিভিন্ন গ্রন্থে। আলমগিরনামা, মাআসিরুল উমারা, মাআসিরে আলমগিরি, খাজানায়ে আমেরা, তাজকিরায়ে সারখোশ, ইয়াদে বাইদা, সরদে আজাদ ইত্যাদি গ্রন্থে আকিল খানের জীবনীর আলাপে এসব ঘটনার বিন্দুমাত্র উল্লেখ নেই। অথচ মোঘল ইতিহাসগ্রন্থের মধ্যে এ কয়খানাই নির্ভরযোগ্য সূত্রে পুরো ইতিহাসকে তুলে ধরেছে।
তাছাড়া আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যপুস্তকরূপে পঠিত রাজসিংহ বইটাতে বিদূষী, গুণবতী জেবুননেসাকে উপস্থাপন করা হয়েছে ভ্রষ্টা-পতিতা অপেক্ষাও চরিত্রহীনা রূপে। অথচ তাঁর চারিত্রিক বিশুদ্ধতা বর্ণনা করা হয়েছে উর্দুগ্রন্থ ‘জেওয়ারে জেবুননেসা’-তে। সেখানে এক ঐতিহাসিক লেখেন, ‘জেবুননেসা দিবানিশি কাব্যানুশীলন, পুস্তক অধ্যয়ন ও গবেষণায় রত থাকতেন। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে স্বামীসেবা অবশ্য কর্তব্য হয়ে যাবে। ফলে অধ্যয়ন, কাব্যচর্চা, ও স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবার একটা ব্যাপার চলে আসে। এই ভয়ে নিজের সত্তাকে বিবাহের বর্তমান ঝঞ্ঝাটের মধ্যে তিনি জড়াতে চাননি।’
আবার কোনো কোনো লেখক নাসির খাঁ নামের একজনের সাথে জেবুননেসার অবৈধ প্রেম ছিল বলে অপবাদ আরোপের হীন চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁদের কি মনে ছিল না যে, তাঁদের ভাষ্যমতেই বাদশাহ আলমগির ছিলেন একজন গোঁড়া মুসলমান? তাহলে গোঁড়া মুসলমানের কন্যা হেরেমের এত এত নিরাপত্তাব্যবস্থা বেদ করে কীভাবে আরেক পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়াতে পারে?
পাঁচ
দুনিয়াবিমুখ পিতার কন্যা সবসময় সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। রাজকীয় জীবনে নিজেকে জড়ানো অপছন্দ করলেও মেজাজে মননে তিনি ছিলেন শাহি রুচির অধিকারিণী। তাঁর উন্নত রুচি ও শৌখিনতার পরিচয় পাওয়া যায় কাশ্মীরে তাঁর তৈরি মহল ও বাগানে। ১০৭৩ হিজরিতে বাদশাহ আলমগির কাশ্মীর সফরে গেলে কন্যা পিতাকে নিজ মহলে দাওয়াত করে নিয়ে আসেন এবং প্রচুর উপহার দেন।
১১১৩ হিজরি। বাদশাহ আলমগিরের শাসনামলের বয়স ৪৮ বছর। আলমগির দাক্ষিণাত্যে যুদ্ধের ব্যস্ততায় মশগুল। ঠিক সে সময়েই তাঁর কাছে পৌঁছে আদরের দুলালী জেবুননেসার মৃত্যুসংবাদ। তাঁর নয়নের মণি তাঁর আগেই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন।
প্রিয় কন্যার মৃত্যুসংবাদে একদম ভেঙে পড়েন বাদশাহ আলমগির। থিরথির করে কাঁপে তাঁর চোখের পাতা। অশ্রুর বড় বড় ফোঁটা কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। কলিজার টুকরো কন্যার আকস্মিক মৃত্যুতে নির্জন দুপুরে স্থির জলের মতো সম্রাটও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন। পরে শায়খ আতাউল্লাহ, সাইয়েদ আমজাদ খান ও হাফেজ খানের কাছে পত্র লিখে প্রিয় কন্যার ইসালে সওয়াবের জন্য দান-খয়রাতের নির্দেশ দেন।
১০৪৮ হিজরির শাওয়াল মাসে যে শাহজাদি সম্রাজ্ঞী দিলরাস বানু ও বাদশাহ আলমগির দম্পতির ঘর সুশোভিত করে ফুটেছিলেন ললনাশ্রী নামের ফুল হয়ে, ১১১৩ হিজরিতে তিনি ঝরে পড়েন পৃথিবীর বাগান থেকে।
মোঘল হেরেমকে সুসজ্জিত করার নেপথ্যের অন্যতম নারী রূপকার শাহজাদী জেবুননেসার দূর্বাদলে ছেয়ে থাকা সেই পবিত্র স্মৃতিচিহ্নে প্রতি নিশীথে নির্মল নীল আকাশ থেকে সঞ্চিত হয় বিন্দু বিন্দু শিশির। প্রভাতে স্পর্শ করে তরুণ অরুণের প্রথম আলো। সন্ধ্যায় ছড়িয়ে পড়ে গোধূলির মায়াময় স্বর্ণাভা। মোঘল শাহজাদির শতবর্ষী প্রাচীন সমাধি থেকে আজও উৎসারিত হয় কাব্য ও সুকুমারবৃত্তির অনিন্দ্য লালিত্য। তাতে নিবেদিত হয় ভক্তিনত ত্যাগাকুল হৃদয়ের নম্র লাজুক ভালোবাসা।
তথ্যসূত্র : ১. খাওয়াতিমে ইসলাম কে কারনামে; লেখক : মাওলানা জুলফিকার আলি নকশবন্দি। ২. রাজমহলের নন্দিনী; মূল : আল্লামা শিবলি নোমানি; অনুবাদক : ইমরান রাইহান। ৩. চেপে রাখা ইতিহাস; লেখক : গোলাম আহমদ মোর্তজা। ৪. উইকিপিডিয়া
মিরপুর, বাহুবল, হবিগঞ্জ
ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

