রিকশায় বসা অবস্থায়ই চোখ পড়ে প্রকাণ্ড বটগাছটার দিকে। এখনও এই প্রচণ্ড রোদে ছায়া বিলাচ্ছে অবিরাম। বুকটা হঠাৎ করেই খালি হয়ে যায়। সেখানে হুড়মুড় ঢুকে পড়ে স্মৃতির হু হু বাতাস। অজস্র স্মৃতি এসে দাঁড়ায় সামনে—কোনটাকেই উপেক্ষা করা যায় না। কেউ কি চাইলে ফেলে আসা জীবনকে উপেক্ষা করতে পারে? পারে জীবনের কোনো অংশ ভুলে যেতে?
একটা সময় এমনিতেই ফেলা আসা জীবন খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হয়ে ওঠে বর্তমানে বেঁচে থাকার অবলম্বন। শাহবাগ মোড়টা পেরোতে পেরোতে কতকিছু হাতছানি দিয়ে ডাকে। এই বটগাছ, ক্যাম্পাস, তুমুল আড্ডার বিকেল আর সেই আড্ডার মধ্যমণি শাহেদ। এখানে দাঁড়িয়েই এক বৃষ্টিস্নাত দুপুরে আমার হাত ধরে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়া শাহেদ।
কী এক আড়ষ্টতা সবসময় ওকে সবার থেকে দূরে সরিয়ে রাখত। মেয়েদের আসতে দেখলেই লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠত ওর চোখ-মুখ। খুব দ্রুত পার হয়ে যেত পথ। যেন চোখের আড়াল হতে পারলেই বাঁচে। একই ডিপার্টমেন্টে পড়লেও ওর সঙ্গে কখনো আমার কথা হয়নি। একটি সাহিত্য আড্ডায় আমাদের প্রথম আলাপ। লেখালেখি না করলেও প্রচুর পড়তাম আমি। তাই এসব আড্ডায় প্রায়ই ডাক পড়ত। সেখানে জানলাম শাহেদের বাড়িও আমাদের চট্টগ্রামে। জাতীয় দৈনিকে কবিতা লিখে নিয়মিত।
আড্ডায় খুব প্রাণবন্ত পেলাম তাকে। তারপর নানা সময়ে আরও অনেক কথা হয় আমাদের। কথায় কথায় ব্ঝুতে পারি, ও খুব ধার্মিক। তারও অনেক পরে বুঝতে পারি, আসলে ধর্মই একটা মানুষকে ধীরে ধীরে মহৎ করে তোলে। পৌঁছে দেয়, সততা ও আদর্শের সুউচ্চ শিখরে। কিন্তু আমি এসব ধর্মকর্ম থেকে অনেক দূরে থাকতাম সবসময়।
সেই আড্ডার পর মাঝে-মধ্যে টুকটাক কথাবার্তা হতো। তারপর নানা ঘটনা পরম্পরার ভেতর দিয়ে আমরা পৌঁছে যাই সম্পর্কের গভীরে, মুগ্ধতার নিবিড় অরণ্যে। সেটা বুঝতে পারি অনার্সের শেষের দিকে, যখন আমাদের আলাদা হবার সময় ঘনিয়ে আসে। কিন্তু ততদিনে দু’জনের স্বপ্ন আর লক্ষ্য এক হয়ে গেছে—সাহিত্য করা। শাহেদ কবিতা, আমি গল্প। কল্পনার ভেলায় চড়ে আমরা উড়তে থাকি স্বপ্নের নিঃসীম আকাশে। তারপর আমাদের অনেক দূর হেঁটে যাওয়া—একসাথে, একই স্বপ্ন বুকে।
আমি বাসায় আর শাহেদ হোস্টেলে থাকলেও প্রতিদিনই আমাদের দেখা হওয়া, আড্ডা, ফুসকা খাওয়া সবই চলছিল। বিকেলের নরম রোদের আলোয় উদাসীন একটু বসে থাকা, সন্ধ্যার আগে বুকের ভেতর ঘনিয়ে আসা নতুন স্বপ্ন, নতুন পরিকল্পনা। দিন যত যায়, আমাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, সম্পর্ক আরও গভীর হয়।
এদিকে আমি আমূল বদলে যেতে থাকি। শাহেদের কথায় মাঝেমধ্যই আমি নামাজ পড়ি। হিজাব পরেই ক্লাসে, ক্যাম্পাসে আসি। অনেকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে, কিন্তু আমি ওসব গায়ে মাখি না। তুমুল প্রশান্তির ঢেউ যেন সবখানে। কী এক দুর্বার আকর্ষণ আর ভালোলাগায় মধ্য দিয়ে বয়ে যায় সময়, আমি বুঝতেই পারি না।
একদিন বিকেলে ক্যাম্পাসের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি আমি আর শাহেদ। নানা বিষয়ে কথা হচ্ছে, এর মধ্যে অকারণেই মনখারাপ হয়ে যায়। একটু দূরে শতবর্ষী দালানে রোদের করুণ আলো। বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। হঠাৎ আকাশ কাঁপিয়ে ডেকে ওঠে মেঘ। তারপর অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামে। আমি আর শাহেদ দু’জন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছি খোলা আকাশের নিচে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে হঠাৎ করেই শাহেদ আমার হাত ধরে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়ে। আমি নিষ্পলক তাকিয়ে থাকি তার দিকে। আরও জোরে চেপে ধরি ওর হাত। কান্নাভেজা কণ্ঠে আমাকে বলে—‘কখনো ভুলে যেয়ো না। জানো, জীবনে কারও সঙ্গে এতটা আপন হয়ে আমি মিশিনি, মিশতে পারিনি। তোমাকে খুব মিস করব জীবনে।’
অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে আমার সমগ্র সত্তা। কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকি শুধু। গাল বেয়ে নেমে আসে বেদনার অশ্রুধারা। বৃষ্টির উন্মাতাল স্রোতে মিশে যায় ভালোবাসার বিনম্র জল।
অনার্সের শেষের দিকে হঠাৎ করেই আমার বিয়ে হয়ে যায়। পারিবারিক সম্মানের দিকে তাকিয়ে আমি কিছুই বলতে পারিনি। তিলে তিলে গড়ে তোলা আমার স্বপ্নের নির্মল পৃথিবীটা নিঃশব্দে ভেঙে যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারপাশের সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে যায়। আমার বিনিদ্র রাতের কান্না আর ফুরোয় না। কয়েকদিন ক্যাম্পাসে যাই না। কী করবো, শাহেদের সামনে কীভাবে দাঁড়াব—কিছুই বুঝতে পারি না। এভাবে নীরবে বয়ে যায় সময়। আমি নির্লিপ্ত জীবনের নির্মম ঘূর্ণন দেখি।
এমন কেন হয়, নিয়তি কেন আমাদের আছড়ে ফেলে সময়ের নর্দমায়—করোটিতে অজস্র প্রশ্ন খেলা করে। এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। নিজের চেনা পৃথিবীটা খুব সংকুচিত হয়ে আসে। দুর্বিষহ এক যন্ত্রণা-বুকে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরি জীবনে। ভাবি, এতসব যাতনার ভেতর তো শাহেদ আছে পৃথিবীতে। ব্যস, এইটুকুই আমার।
একদিন সব আড়ষ্টতা ভেঙে ক্যাম্পাসে যাই। গিয়ে শুনি কয়েকদিন হলো শাহেদ ভার্সিটিতে নেই, কোথাও ওর খোঁজ নেই। আমার মাথায় যেন সমস্ত আকাশ ভেঙে পড়ে। চোখে অন্ধকার দেখি। বুকের ভেতর হাহাকার, চোখে-মুখে বিষণ্নতার প্রচ্ছন্ন ছায়া। কিছুই ভালো লাগে না আমার। এভাবে নিঃশব্দে বয়ে যায় সময়। শাহেদ আর ফিরে আসে না। আমিও আমার অঙ্গীকারের পথ থেকে ক্রমশ বহুদূর সরে পড়ি।
এর মধ্যেই একদিন শাহেদের স্মৃতি বুকে পাড়ি জমাই চট্টগ্রামে। শাহেদকে আর বলা হলো না—তোমাকেও খুব মিস করব জীবনে।
আজ চার বছর পর ঢাকা এসেছি। আমার স্মৃতির শহরে, ভালোবাসার নগরে। লাল ইট-সুরকির ক্যাম্পাস, সার্বক্ষণিক আড্ডার বটতলা, ফেরিঅলাদের হাঁক-ডাক—এসবের মধ্যেই আমি আমার অতীতকে খুঁজে ফিরি। ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন, হারিয়ে ফেলা ভালোবাসা—এসবের কিছুই তো আর ফিরে পাব না।
কোথায় আছে শাহেদ? জানতে খুব ইচ্ছে করে। গত চার বছরে সবগুলো জাতীয় দৈনিকের সাহিত্যপাতা আমি নিয়মিত সংগ্রহ করেছি শুধু এই একটি নাম দেখার প্রত্যাশায়। প্রতিবারই আমাকে হতাশ হতে হয়েছে। জীবনটাই এমন, চক্রের মতো ঘুরতে ঘুরতে কখন যে সুর হারিয়ে ফেলে। সেই হারিয়ে ফেলা সুর আর জোড়া লাগে না। নতুন সুর উঠে মিলিয়ে যায় নতুন মোহনায়। জীবন বয়ে চলে আপন স্রোতে।
বিকলের নরম আলো এসে পড়ে বটগাছের সবুজ পাতায়। আমি ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে দাঁড়াই বটগাছের নিচে। অজস্র ছেলে-মেয়ের কোলাহলে মুখরিত। আমি সেই জায়গাটায় গিয়ে দাঁড়াই যেখানে আমি আর শাহেদ প্রতিদিন বসতাম। বুকের ভেতরটা হু হু করে কেঁদে ওঠে। নিজেকে সামলে রাখতে পারি না। গাল বেয়ে নেমে আসে অশ্রুর বাঁধভাঙা জোয়ার।
রক্তিম গোধূলির সৌন্দর্য আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে বৃষ্টি নামে আকস্মিক। আমি বিস্মিত চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। আজও আমি চাই, এই তুমুল বৃষ্টিতে কেউ আমার হাত ধরে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়ুক।
বৃষ্টি থেমে যায়, বেলা গড়িয়ে যায় সন্ধ্যার দিকে। কেউ এসে হাত ধরে না আমার। কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে বলে না, ‘আমাদের আবার দেখা হয়ে গেল, নওরীন। জীবনটা এমনি, বুঝসো! কত রঙ যে তার আকাশে ঝিলমিল।’
কতদিন আমাদের আকাশে বৃষ্টি নেই জানো, শাহেদ? আজ আমি একা, বড় একলা। আমাদের স্মৃতিরা কি এভাবেই মিলিয়ে যাবে? কত গল্প, হাসি, আড্ডা, স্বপ্ন—সবই কি এমন নির্লপ্ত হারিয়ে যাবে—তোমার কি মনে পড়ে না সেইসব দিন, প্রহর?
এভাবে জীবন আমাদের সম্মুখ থেকে আড়াল করে ফেলে কত কিছু—আমাদের প্রেম, মুগ্ধতা কিংবা উপেক্ষা। চেনা-পরিচিত দৃশ্যগুলো দূর আকাশের তারার মতো মিলিয়ে যায় দূরে কোথাও। স্মৃতির মরীচিকার দিকে তাকিয়ে আমরা পার করে দিই একটা মানবজনম। নিয়তির কাছে হেরে যায় আমাদের স্বপ্ন, সাধ, ভালোবাসা। হারিয়ে যাওয়া মানুষের জন্য বুকভর্তি আক্ষেপ নিয়ে পাড়ি দিতে হয় জীবন, বাস্তবতা। তবু মাঝে-মাঝে ইচ্ছে করে সন্ধ্যার নির্জনতা বুকে পুরে আমরা হেঁটে যাই নীলক্ষেতের পথে। তোমার কি একটুও ইচ্ছে করে না? হয়তো আগের মতোই নিশ্চল, নিশ্চুপ তোমার জীবন। যেখানে আমার এইসব ইচ্ছে মূল্যহীন।
এই বৃষ্টি, অন্ধকার বিকেল—মায়ার বর্ণিল রেখা টেনে টেনে ইষ্টিশনে পৌঁছার একটু আগে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনের মতো মিলিয়ে যায় মহাকালের পথে। কেউ একজন একবুক প্রতীক্ষা বুকে দাঁড়িয়ে থাকে নিশ্চল।
ফরিদাবাদ, ঢাকা
ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

