ফারহানা

সংখ্যা:

১.

বিকাল চারটে দশ

করতলব খান মসজিদ, বেগমবাজার

জেলখানা রোড দিয়ে দুই মিনিট হাঁটার পর হাতের বাম পাশেই একটা সরু গলি পড়ে। গলিতে ঢুকে চার নম্বর টিনশেডটায় লাবলুর আস্তানা। গরম পড়েছে প্রচুর। আজকে শ্রমিক দিবস। ছয় কামরার টিনশেড বাড়ির প্রতি কামরায় মানুষ। চকবাজারের কুলি-মজুররাই থাকে বেশিরভাগ। দুইজন আছে কেবল জেলগেটে শরবত বিক্রি করে। ওরা দুই ভাই। লাবলুর সঙ্গে খাতির আছে মোটামুটি। জেলগেটের সামনে দিয়ে গেলে ডেকে নিয়ে খাওয়ায়। ঘনঘন জেলগেটে যাওয়ার কারণে সন্দেহ করে না। এটাই সুবিধা। লাবলু শুনেছে এই মাসের প্রথম সপ্তাহে নাকি আবার ঝড় হওয়ার কথা। ঝড়বৃষ্টি যত দ্রুত হবে ততই মঙ্গল। ঢাকা ছাড়তে সুবিধা হবে।

এই বিকালেও বিদ্যুত নেই। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ফ্যানের তিনটে ডানা। ময়লা জমেছে অনেক। বিছানায় শুয়ে ময়লা-জমা ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছে লাবলু। ঘামে ভেজা চটচটে পাটি পিঠের নিচে। মাথার নিচে তিলক-পড়া বালিশ। পুরো রুমে আসবাব বলতে এই দুটো জিনিসই। আর কিছু নেই।

এই কামরায় আজকে একশো ছত্রিশতম দিন লাবলুর। কাজ শেষ। এখন শুধু বৃষ্টির অপেক্ষা। বৃষ্টি-বাদলের দিন দূরপাল্লার বাসে পুলিশ-চেক কম হয়, নিশ্চিন্তে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া যাবে। যদিও পুলিশ-চেক বা বৃষ্টি-বাদল এসব নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই লাবলুর। সব উপরের নির্দেশ। আজকে বিকালে জহিরুল ইসলাম নামে এক ভদ্রলোক আসার কথা। উনি পরবর্তী দিকনির্দেশনা দেবেন। আর পেমেন্টটাও করে যাবেন। কাজে নামার আগেই পুরো পেমেন্ট নিয়ে থাকে লাবলু। জীবনের ঝুঁকি থাকলে বাড়তি টাকাও নিয়ে নেয়।

গতবছর শ্যামবাজারের আড়তদার নজরুল মুনশিকে সরানোর সময় পরিচয় এই পার্টির সাথে। ঝুঁকি নেই বললেই চলে। শুধু বুদ্ধি খাটিয়ে কাজটা আদায় করতে হবে। পুরো কাজটার জন্য লাবলু পাবে ৮০ লক্ষ টাকা। কাজের আগে ৪০, কাজ শেষ হলে ৪০। জেলের ভেতরে যে আছে সে আরও বেশি পাবে সম্ভবত। এতে আফসোস নেই লাবলুর। গায়ে-গতরে বাতাস লাগিয়ে কাজ করতে ভালোবাসে সে। তাছাড়া এমন একটা শুয়ে-বসে-থাকার কাজের দরকারও ছিল খুব। খুনখারাবিতে ক্লান্তি লাগে লাবলুর। রক্ত দেখলে বমি আসে। গুলিয়ে আসে পেটের ভেতর। লালবাগের ছয় বছরের বাচ্চাটাকে সরানোর পর থেকেই সমস্যাটার শুরু। বাচ্চাটা শেষ মুহূর্তে লাবলুর কোল ভরে বমি করে দিয়েছিল।

আজকে মাল বুঝিয়ে দিতে পারলেই বাকি টাকা হাতে পাবে। ফ্যানের দিকে তাকিয়ে জহিরুলের আসার অপেক্ষা করছে লাবলু। এতক্ষণে চলে আসার কথা। বালিশের নিচে পুটলিতে থাকা জিনিসটায় আরেকবার হাত বুলিয়ে নিল সে। সব ঠিকঠাক আছে।

এবার টাকাটা পেলে গ্রামের বাড়িতে একটা দোচালা ঘর ওঠাতে হবে। মেয়েছেলের পেছনে টাকা নষ্ট হয়েছে অনেক। মা-মরা লাবলুর বাপটা কই আছে কেউ জানে না। একবার শুনেছিল আসামে থাকে। বাপের চিন্তা করে না লাবলু। জন্মের পর থেকে যাকে দেখেনি তার জন্য আবার কীসের চিন্তা! এবার বিয়ে-শাদি করে থিতু হতে হবে। এই জীবন আর না, মনে মনে চিন্তা করে লাবলু।

চিন্তায় ছেদ পড়ে দরজায় টোকার শব্দে। চিলিক মেরে দুলে ওঠে লাবলুর দুটো চোখ। জহিরুল ইসলাম এসেছে নিশ্চয়। লোকটাকে আগে দেখেনি। এই পার্টির সমস্যা এটাই। যোগাযোগ করার জন্য একেক দিন একেক লোক পাঠায়। জেলগেট থেকে শুধু জেনে এসেছে নাম। আর কিছুই জানে না সে।

উঠে গিয়ে দরজা খুলল লাবলু। পরিপাটি চুল, পরনে সাদা চেকের শার্ট আর গ্যাবাডিং-এর প্যান্ট। এক যুবক দাঁড়িয়ে আছে। মুখে মুচকি মুচকি হাসি। হাসি দেখে ভেতরটা প্রশান্ত হয়ে গেল লাবলুর। ভেতরে আসার কথা বলার আগেই ছেলেটি বলল, ‘করতলব খান মসজিদের সামনে একটা মুদি দোকান আছে। ওখানে গেলেই টাকাটা পেয়ে যাবেন। টাকা পাওয়ার পর জিনিসটা ওই দোকানদারের হাতে দেবেন। অন্য কারও কাছে না। দোকানির নাম রাসেল। সবুজ টিশার্ট পরা থাকবে। আপনি গিয়ে দুইবার হাঁচি দিলেই ও চিনবে।’

নিচু গলায় কথা শেষ করে আবার একটা হাসি দিলো ছেলেটি। তারপর চলে যাওয়ার জন্য পেছন ঘুরল। লাবলু ঘরে ঢুকে পুটলিটা বের করল। লুঙ্গির গাঁটে পুটলিটা বেঁধে বের হলো করতলব খান মসজিদের দিকে। গলি দিয়ে বের হয়ে বাঁ দিকের রাস্তায় করতলব খান মসজিদ। অনেক পুরোনো মসজিদ এটা। দূর থেকে দেখলে মাজার বলে মনে হয়। পা চালিয়ে হাঁটলে বড়জোর ১০ মিনিট লাগে। লাবলুর আরেকটু বেশি সময় লেগেছে।

মসজিদের সামনেই মুদি দোকান। সবুজ টিশার্ট-পরা দোকানি। সব ঠিকঠাক। দোকানের সামনে গিয়ে নাকের ভেতর সুতা ঢুকিয়ে অভিনব কায়দায় হাঁচি দিলো লাবলু। পরপর দুইবার। ছেলেটা কোনো ভ্রূক্ষেপ করল বলে মনে হলো না। আবারো হাঁচি দিলো লাবলু। এবার তাকাল ছেলেটা। কটমট করে তাকিয়ে বলল, ‘এমতে হাঁচি দিবার লাকছেন ক্যালা? এইডা মুদি দোকান, ডিসপেনসারি নাহ। দূরে গিয়া মাতেন।’

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকল লাবলু। তথ্য মিলছে করছে না। এখন উপায়? এই পুটলি কী করবে সে? টাকাটাও-বা কীভাবে পাবে?

 

২.

সম্রাট আওরঙ্গজেবের দরবার

বঙ্গের দিওয়ান করতলব খান এসেছে সম্রাটের সঙ্গে দেখা করতে। রাজসভায় এটা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। কিন্তু সম্রাট সম্ভবত এই দিওয়ানের ওপর একটু বেশিই দুর্বল। এই দুর্বলতার কারণ খুঁজতে হয়রান সভাসদবৃন্দ।

করতলব খান ক্রীতদাস ছিল। ইস্পাহানের এক ক্রীতদাস ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কিনে ফৌজে নিয়োগ দিয়েছিলেন তাকে সম্রাট। কিন্তু করতলব খান নিজেকে মারাঠা জেনারেল মুহাম্মদ কুলি খানের নাতি হিসাবে দাবি করে থাকে। গোলকুণ্ডায় ফৌজদার থাকাকালে সম্রাটের কানে আসে করতলব খানের কথা। সম্রাট আওরঙ্গজেব বঙ্গের জন্য একজন সৎ ও দক্ষ দিওয়ান খুঁজছিলেন। করতলব খানকে নিয়োগ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন তখন উজিরে আজম।

সম্রাট ও করতলব খানের এটাই প্রথস সামনাসামনি দেখা। নকিবের ঘোষণায় সবাই নড়েচড়ে বসল। সম্রাট আসছেন দরবারে। পিনপতন নীরবতা। বাঁ দিকের সারিতে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বসে আছে করতলব খান। আস্তিনের ভেতর হাত ঠেকিয়ে কিছু একটা ধরে আছে।

সম্রাট দরবারে প্রবেশ করতেই সবাই উঠে দাঁড়াল। সবাইকে সালাম দিলেন সম্রাট নিজে। সম্রাটের মুখে সালাম শুনে সবাই থতমত খেয়ে গেলো। উত্তর দিলো না কেউ। সম্রাট মুচকি হাসলেন। তারপর ধীর-পায়ে সিংহাসনে এসে বসলেন। স্বভাবসুলভ স্বরে বললেন, ‘গতকাল একটি হাদিস শুনলাম, ‘কোনো কম সংখ্যক লোক যদি বেশি সংখ্যক লোকের নিকট আগমন করে তবে কম সংখ্যক লোক সালাম দেবে।’

দরবারে নীরবতা। নীরবতা ভেঙে উঠে দাঁড়াল করতলব খান। সম্রাাটের হাসি প্রশস্ত হলো। ‘বঙ্গ থেকে কী এনেছ আমার জন্য?’

করতলব খান হাতের ইশারায় তোহফা সামনে আনতে বলল। দুজন রাজসেবক একটা বড় পাত্র এনে সামনে রাখল। ‘জাহাঁপনা, এটা হলো কাঁঠাল। বঙ্গের খ্বু সুস্বাদু ফল। আপনি খেয়ে তৃপ্ত হলে আমি আবারও পাঠাব। খুবই সুমিষ্ট আর মজাদার জিনিস।’

সম্রাট একটা কোয়া হাতে নিয়ে মুখে পুরলেন। স্বাদে চোখ বন্ধ হয়ে গেল তাঁর। ‘বাহ, বাহ!’ বলে আরও একটা ছোট কোষ মুখে ঢোকালেন সম্রাট। ‘তারপর বলো, বর্তমান পরিস্থিতি কী বঙ্গের?’

‘জাহাঁপনা, বাংলার নাজিম আজিমউদ্দিন খুব সমস্যা করছেন।’ সরাসরি রাজপরিবারের কারও নামে অভিযোগ শুনে চমকে উঠল সভাসদবৃন্দ। আজিমউদ্দিন সম্রাটের দৌহিত্র। বাংলার নজিম। সম্রাট কিছুটা গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘কী সমস্যা?’

‘জাহাঁপনা, ফৌজে নিজের ইচ্ছামতন ছাঁটাই করছেন। আমাদের জাঁদরেল সেনাদের বাদ দিয়ে দিচ্ছেন।’

‘এটাতে তোমার সমস্যা কী?’

‘জাহাঁপনা, এটা আমার সমস্যা নয়। এটা গোটা সাম্রাজ্যের সমস্যা। আপনার সমস্যা। আর আপনার সমস্যাতেই তো আমার সমস্যা।’

করতলব খানের চাটুকারিতায় গুঞ্জন উঠল সভায়। সম্রাট নিজেও বুঝলেন করতলব বেশি বেশি বলছে। তবুও আবার প্রশ্ন করলেন, ‘আর কোনো সমস্যা?’

করতলব খান নিচু স্বরে বলল ‘জি জাহাঁপনা, অবৈধভাবে রাজকীয় অর্থকোষে হস্তক্ষেপ করেন তিনি।’

করতলব আরও কিছু বলতে চাচ্ছিল কিন্তু সম্রাট থামিয়ে দিলেন। রাগে চেহারা লাল হয়ে গেছে সম্রাটের। হুংকার দিয়ে বললেন, ‘এখনই রাজকীয় ফরমান লিখো, আজিমউদ্দিনকে পাটনায় চলে যেতে বলো। সে সেখান থেকে বসে নায়েব দিয়ে বঙ্গ দেখাশোনা করবে।’

এবার কাঁচুমাচু হয়ে আস্তিন থেকে একটা পুটলি বের করল করতলব খান। ‘জাহাঁপনা, আপনার জন্য ছোট্ট ইনাম এনেছি, গ্রহণ করলে ধন্য হবো।’

সম্রাট করতলবের হাত থেকে পুটলিটা নিতে বললেন রক্ষীকে। রক্ষী পুটলিটা এনে সম্রাটের হাতে দিলো। সম্রাট নিচু করলেন পুটলির মুখ। একটা হীরার খণ্ড পড়ল সম্রাটের হাতে। এক ঝলক দ্যুতি ছড়িয়ে গেল রাজসভায়। সম্রাট নেড়েচেড়ে দেখলেন। মুহূর্তেই হাসিহাসি মুখ হয়ে গেল সম্রাটের। ‘এই হীরকখণ্ডের একটি নাম দাও কেউ।’ আহ্বান করলেন সম্রাট।

আশোক মোহাম্মদ নামে এক সভাসদ উঠে দাঁড়ালেন। ‘জাহাঁপনা, এই হীরকখণ্ড আপনার মুখে হাসি ছড়িয়েছে। আমি এটার নাম দিতে চাই ফারহানা।’

‘ফারহানা…হুমমম’ বিড়বিড় করলেন সম্রাট। হীরাটি নেড়েচেড়ে দেখতে গিয়ে সম্রাট থমকে গেলেন হঠাৎ।  হীরাটার নিচে ছোট্ট কওে খোদাই করা একটা শব্দ চোখে পড়ল তাঁর। দ্রুত পুটলিতে ভরলেন আর ছুঁড়ে মারলেন করতলব খানের নিকট। গম্ভীর স্বরে  বললেন, ‘আমাকে বঙ্গের ফল খাওয়ানোর জন্য এই “ফারহানা” তোমাকে ইনাম দিলাম।’

রাজসভায় আবারও গুঞ্জন উঠল। সম্রাট এত মূল্যবান জিনিস ফিরিয়ে দিলেন? সেদিন দুপুরে ভোজসভায় করতলব খানকে ‘মুর্শিদ কুলি খান’ উপাধি দিলেন সম্রাট এবং বিকালেই দক্ষিণাত্য ত্যাগ করতে বললেন তাকে। ফিরিয়ে দেওয়া হীরকখণ্ড নিয়ে তীব্র অস্বস্তিতে বঙ্গে ফিরে এলো মুর্শিদ কুলি খান।

 

৩.

পোস্তগোলা, ঢাকা

পোস্তগোলা থেকে লেগুনায় উঠলে বাংলাবাজার যেতে কম করে হলেও আধঘন্টা লাগে। জ্যামের কারণে আরও দেরি হয়। এই পথ পুরোটা মুখস্ত জহিরুলের। স্টিভ অ্যান্ড ব্রাদার্স ছাপাখানার ম্যানেজার জহিরুল। ব্রিটিশরা সর্বপ্রথম ঢাকায় ছাপাখানা খুলেছিল। ওই আমলে শুরুর দিকের কয়েকটি ছাপাখানার একটি স্টিভ অ্যান্ড ব্রাদার্স প্রিন্টার্স। সময়ের সাথে সাথে আধুনিক যন্ত্রপাতি আর দক্ষ কর্মচারী দ্বারা এখনও টিকে আছে এই ছাপাখানা। কয়েকবার মালিক বদলালেও ছাপাখানার নাম বদলাননি কোনো মালিক। এই ছাপাখানার বর্তমান মালিক হাওলাদার সাহেব।

জহিরুল এই ছাপাখানার কর্মচারী হিসাবে ঢুকেছিল সেই ২০ বছর আগে। নদী ভাঙনে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে এসেছিল ঢাকা। সদরঘাটে চাটাই পেতে সংসার পেতেছিল জহিরুলের মা। হাওলাদার সেখান থেকেই তুলে এনে জহিরুলকে চাকরি দেন।

বিশেষ এক কাজের জন্য এমন একটা ছেলেকে অনেক দিন মনে মনে খুঁজছিলেন হাওলাদার। যে কাজে খুব কর্মঠ হবে কিন্তু দুকূলে কেউ থাকবে না। মেরে ফেললেও কেউ দেখতে আসবে না। খোঁজ নেওয়ার কেউ থাকবে না। জহিরুল দেখতে খুব হৃষ্টপুষ্ট ছোটবেলা থেকেই।

সদরঘাটে যখন হাওলাদার জহিরুলকে দেখেন তখন জহিরুল তাগড়া জোয়ান। লঞ্চে কুলির কাজ করে। চাঁদপুর থেকে সেদিন ঢাকায় ফিরেছিলেন হাওলাদার। লঞ্চ থেকে নামার সময় জহিরুল এসে বইয়ের গাঁট্টিটা মাথায় তুলে নিলো আর বলল, ‘স্যার, অল্পকিছু টাকা দিলেই হবে, না কইরেন না।’

হাওলাদার জহিরুলকে ছাপাখানা পর্যন্ত নিয়ে এসেছিলেন। বসিয়ে চা-নাস্তা খাওয়ানোর পর চাকরি করবে কি-না জিজ্ঞেস করতেই টপটপ করে চোখ দিয়ে পানি ফেলেছিল জহিরুল। এখনও স্পষ্ট সব মনে পড়ে ওর। একদম রাস্তা থেকে আজ কোথায় নিয়ে এসেছেন তাকে হাওলাদার। এখন ঢাকায় নিজের একটা ফ্ল্যাট আছে। বিয়ে করেছে ইসলামপুরের এক ব্যবসায়ীর মেয়েকে। একটা ছেলে আছে। ছেলেটার বয়স পাঁচ গিয়ে ছয়ে পড়ল।

জহিরুলের মা খুব সুখী ছিলেন জীবনের শেষ বছরগুলোতে। জহিরুলের বিয়ের পরের বছর মারা গেছেন জহিরুলের মা। ভদ্রমহিলা সবসময় হাওলাদারকে দেবদূত মনে করতেন।

সাধারণ ম্যানেজারের বেতনের চেয়ে ঢের বেশি টাকা পায় জহিরুল। হাওলাদার কেন এত টাকা দেন জানে না ও। মাঝেমধ্যে খুব অদ্ভুত কিছু কাজে পাঠায় হাওলাদার। এই যেমন গতকাল বেগমবাজার পাঠিয়েছিলেন একটা চিঠি দিতে। এক বস্তিতে গিয়ে চিঠি দিয়ে আসতে হবে। অথচ গিয়ে দেখা গেল যে কামরার কথা বলে দিয়েছিলেন সেই কামরায় কেউ নেই। সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে জহিরুল। কেউ আসেনি। ওদিকে ছেলের জন্মদিন ছিল গতকাল। বউ বারবার ফোন দিচ্ছিল। শেষমেশ সাড়ে আটটার দিকে চলে এসছে বাসায়। হাওলাদারকে কিছু বলা হয়নি। বলারই-বা কী আছে! আজকে আবার গিয়ে দিয়ে আসলেই মিটে যায় সব। খন্দকার রোডে বাসা ওর। হেঁটে হেঁটে পোস্তগোলা ফায়ার সার্ভিসের সামনে যায়, ওখান থেকে লেগুনায় বাংলাবাজার।

লেগুনায় বসে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাবছিল জহিরুল। হঠাৎ ফোনে রিংটোন বেজে উঠল। একদম ঠাসাঠাসি করে বসা লাগে এইসব লেগুনায়। স্থানীয়রা এটাকে আবার গুন্ডার গাড়ি, টমটম, চান্দের গাড়ি বলেও ডাকে। অনেক কষ্টে মোবাইল বের করল সে। হাওলাদারের ফোন। হাওলাদার থাকেন টিকাটুলি। প্রেসে এখন আসেন কম। জহিরুলই সব করে।

‘স্লামাইকুম, আমি পথে স্যার। যাচ্ছি প্রেসে।’

‘এলা কই?’

‘মিলব্যারাকের আগে। ফরিদাবাদ।’

‘ওইনেই নাইমা যাও। পুলিশ তোমারে বিচরাইতেছে। কট খাইলে আমিওভি খাইয়া যামু।’

‘পু….পুলিশ? কে..কেন?’

পুলিশের কথা শুনে আর জহিরুলের তোতলানিতে লেগুনার সবার দৃষ্টি এসে থেমে গেল জহিরুলের মুখে। ওপাশে কল কেটে দিয়েছেন হাওলাদার। লেগুনা থেকে নেমে গেল জহিরুল। ফরিদাবাদ মাদরাসার সামনে। পুলিশ কেন খুঁজবে তাকে? কিছুই মাথায় ঢুকছে না।

 

৪.

অলি মিয়ার রঙ মহল

চর অঞ্চলের প্রজারা খুব ঝামেলা করে ফেলল। নিজেরা মিয়া বলে ডাকে তাতে কোনো সমস্যা নেই। তাই বলে ঢাকায় এসেও মিয়া বলে ডাকতে হবে? ফরাসিদের কাছ থেকে কেনা কুঠিবাড়িতে পরিবার সমেত উঠেছে খাজা আলিমুল্লাহর পরিবার। সেই উপলক্ষে সব জমিদারি অঞ্চল থেকে বাছাই করে মোড়ল পর্যায়ের লোকদের জন্য ভোজসভার আয়োজন করেছিলেন আলিমুল্লাহ। এই সভায় ঢাকার অভিজাতরাও ছিল, আর্মেনীয় জমিদাররা ছিল, ছিল ফরাসি বণিকরা। ব্রিটিশ কালেক্টর নিজে উপস্থিত থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরে বিশেষ কোনো কারণে হুগলি চলে গিয়েছিলেন। তার বদলে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি কালেক্টর।

আলিমুল্লাহর জমিদারি অনেক এখন। ব্রিটিশরা আসার পর থেকে ঢাকায় অভিজাতদের সংখ্যা কমছে। সব মুর্শিদাবাদ চলে যাচ্ছে। সহায়-সম্পত্তি খুব কম দামে বিকিয়ে যাচ্ছে। যখন যেটার খোঁজ পাচ্ছেন সেটা কিনে নিচ্ছেন আলিমুল্লাহ। কোম্পানিকেও সাহায্য করছেন যখন যেভাবে পারছেন। চামড়ার ব্যবসার মতো আর কোনো লাভজনক ব্যবসা এখন ঢাকায় নেই। মসলিনের কারবারিরা মার খেয়ে গেছে। আলিমুল্লাহ ফরাসি কুঠিবাড়িটা সংস্কার করে একটা নাম দিতে চেয়েছিলেন। ভোজসভায় আমন্ত্রিত অতিথিদের কাছে নাম আহ্বান করতেন। কিন্তু আহ্বান ছাড়াই নাম রটে গেল।

মোঘলের পতনের পর ঢাকায় কোনো স্থানীয় পরাশক্তি নেই। নায়েবে নজিমরাও সব গুটিয়ে নিয়েছে ব্রিটিশরা আসার পর। আলিমুল্লাহ ঠিকভাবেই এগুচ্ছিলেন। নিজের সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তির কথা ধীরে ধীরে জানান দিচ্ছিলেন সবার কাছে। এই কুঠিতে উঠে নিজেকে আরেকটু শানদার জমিদার প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। নিজের অবস্থান জানানোর জন্য দাওয়াত করেছিলেন ঢাকার অভিজাত আর জমিদারি অঞ্চলের মোড়লদের। বরিশালের দিকের এক মোড়ল সর্বপ্রথম বিপত্তিটা বাঁধায়। ভরা মজলিসে ‘অলি মিয়া’ বলে সম্বোধন করে আলিমুল্লাহকে। অভিজাতরা হো হো করে হেসে ওঠে। দানেশ মোহাম্মদ নামে এক জমিদার সেই পালে হাওয়া লাগায়। বলে, কোকিলের পালক পড়লেই কোকিলকণ্ঠী হওয়া যায় না। ডাক দেওয়ার সময় কা কা করেই ডাকে কাক।

মূলত ঢাকার স্থানীয়রা আলিমুল্লাহর এত উত্তরোত্তর উন্নতি সহ্য করতে পারছে না। ঢাকার বাইরে থেকে এসে গাঁজা আর চামড়ার ব্যবসা করতেন আলিমুল্লাহর পূর্বপুরুষরা। এটা খুব ভালো পরিচয় ছিল না। আলিমুল্লাহর চাচা মারা যাওয়ার সময় ব্যবসার সব টাকা জমিদারিতে বিনিয়োগ করার উপদেশ দিয়ে গিয়েছিলেন। সেই থেকেই ঢাকার বাইরে জমিদারি কেনা শুরু করেন আলিমুল্লাহ। এতে কারো কোনও মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু ইদানীং নিজেকে ঢাকার নবাব বলে জাহির করার প্রবণতা এসেছে তাঁর মধ্যে। ঢাকাবাসী কখনই এটা ঠাণ্ডা মাথায় গ্রহণ করবে না। ইংরেজদের তোয়াজ করে কেউ নবাবি দাবি করুক—সেটা কেউই চায় না।

পলাশীর পর থেকে বিশাল বড় পরিবর্তন ঘটেছে এই ঢাকায়। নামমাত্র মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ যে কিছুই না—সেটাও বুঝে গিয়েছে সবাই। ঢাকার বাইরে কৃষকদের নির্যাতনের খবরও কানে আসে সবার। আলিমুল্লাহ সেই ভোজসভার অপমান এখনও ভুলতে পারেননি। সেই দিনের পর থেকে এই কুঠিকে সবাই ‘আলি মিয়ার রঙমহল’ বলে ডাকে। মনে মনে দৃঢ় শপথ নিয়েছেন আলিমুল্লাহ। এমন কিছু একটা করে দেখাবেন তিনি, যেটা দেখে সবাই তাঁর কাছে নতী স্বীকার করতে বাধ্য হয়। সবাই যেন নির্দ্বিধায় আলিমুল্লাহকে নবাব হিসাবে মেনে নেয়। দরিয়া-ই-নুর হীরা কেনার পরও কেউ তেমন আগ্রহ দেখায়নি আলিমুল্লাহর প্রতি। কলকাতায় গিয়ে নিলামে ওঠা দরিয়া-ই-নুর ৭৫ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছিলেন আলিমুল্লাহ। এখন এর থেকেও দামি কিছু প্রয়োজন। যেটাতে সবার চোখ ধাঁধিয়ে যাবে।

 

৫. জেলখানা রোড, ঢাকা 

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পিঠটান দিয়েছিল লাবলু। করতলব খান মসজিদের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল সঙ্গে সঙ্গে। মিনিট পাঁচেক পর পুলিশ এসে ঘিরে ফেলে পুরো মুদি দোকান। মসজিদের গেটে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনা পরখ করে লাবলু। সবুজ টিশার্ট-পরা ছেলেটিকে টেনে হিঁচড়ে ওঠানো হয় পুলিশের লেগুনায়। এইসব সরু গলিতে পুলিশ লেগুনা নিয়েই চলাফেরা করে। দোকানের ভেতর উল্টে পাল্টে সব তছনছ করে ফেলে পুলিশ। আশেপাশে ভিড় জমে যায় মুহূর্তেই।

সুবিধা হয় লাবলুর জন্য। কোনো কিছু খুঁজে না পেয়ে ছেলেটাকে নিয়ে পুলিশের লেগুনা চলে যায়। লুঙ্গির কোঁচড়ে হাত দিয়ে পুটলির অস্তিত্ব পরখ করে লাবলু। তারপর ভিড়ের ভেতর দিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটে। খুব খিদে লেগেছে। মাল বুঝিয়ে দেওয়ার পর নান্নায় গিয়ে মোরগপোলাও খাওয়ার ইচ্ছা ছিল লাবলুর। কিন্তু এখন এই জিনিস নিয়ে বেশিদূর আগানো ঠিক হবে না। বজ্জাত পুলিশ পেছনে লেগেছে। বস্তিতে যে লোক গিয়েছিল সে পুলিশের টিকটিকি। আরেকটু হলেই ধরাটা খেয়ে যেত সে।

মসজিদ থেকে একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে একটা চায়ের টংয়ে বসল লাবলু। কী হচ্ছেই-বা এসব? পুটলির ভেতর কী আছে সে জানেও না। জানার ইচ্ছা বা প্রয়োজন—কোনোটাই হয়নি। কিন্তু এখন কৌতূহল হচ্ছে। এমন কী আছে যেটার জন্য পুলিশ লাগবে পেছনে।

চায়ের অর্ডার না দিয়ে উঠে পড়ে লাবলু। নিরাপদ স্থানে গিয়ে দেখতে হবে পুটলির ভেতর কী আছে। বস্তির ঘর নিরাপদ না। এখন সব থেকে নিরাপদ স্থান লঞ্চ। সদরঘাটে গিয়ে একটা লঞ্চে উঠে পড়তে হবে। বরিশাল হোক চাঁদপুর হোক। ঢাকা ছাড়তে পারলেই হলো। পুরো পেমেন্ট দরকার নেই। রিকশা নিলো। সরাসরি সদরঘাট। কোঁচড়ে হাত দিয়ে টাইট করে রিকশায় উঠে বসল লাবলু। রিকশাওয়ালা একবার তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘মিয়াভাইয়ের কী হার্নিয়ার সমেস্যা?’

কোনো উত্তর দিলো না লাবলু। খটমট করে বসে থাকল। রিকশাওয়ালা প্যাডেলে চাপ মারতে মারতে আবারও কথা বলতে চেষ্টা করল, ‘সমেস্যাডা কোতায়? তলপেডে ব্যাদনা হয়?’

এবারও কোনো উত্তর করলো না সে। লঞ্চে ওঠার চিন্তা করতে লাগল। নিশ্চয় মহামূল্যবান কিছু আছে এই পুটলিতে। এটা বিক্রি করেই বাকি জীবন কাটানো যাবে। কেন যে এতদিন এই চিন্তা মাথায় আসেনি। নিজেকে নিজে গালি দিলো লাবলু। তারপর বাংলাবাজারের ওই ছাপাখানার মালিকের কথা চিন্তা করে আফসোস করল খানিকক্ষণ। লাবলুকে কেন যে সে বিশ্বাস করেছে। হা হা, লাবলুর মতো হারামখোর পৃথিবীতে আর একটাও নেই। জেলখানার ভেতরে পস্তাতে থাকা ওই লোকটার জন্যেও খারাপ লাগল। আহারে, বেচারা। কবে ছাড়া পাবে তার কোনো ঠিকঠিকানা নাই।

বেশিক্ষণ এসব চিন্তা চালাতে পারল না লাবলু। রিকশা একটা সরু গলির ভেতর ঢুকে পড়েছে। এই বিকালেও অন্ধকার গলি। গলির মাঝখানে দশ-বারোজন লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবার মুুখে কাপড় বাঁধা। লাবলু রিকশা থেকে নেমে পেছনে দৌড় দিতে চাইল, কিন্তু তার আগেই খোদ রিকশাওয়ালা পেছন ঘুরে কিছু একটা দিয়ে বাড়ি দিলো লাবলুর মাথায়। লাবলু অচেতন হয়ে গেল। জ্ঞান পুরোপুরি হারনোর আগে বুঝতে পারল কোঁচড় থেকে পুটলিটা সরিয়ে নিচ্ছে কেউ।

 

৬. মুর্শিদ কুলি খানের বাসভবন

করতলব খান ওরফে মুর্শিদ কুলি খান ঢাকায় আসার পর কখনই হীরার টুকরো ফারহানা কোথাও বের করেননি। সম্রাট এই তোহফা কেন ফিরিয়ে দিয়েছেন—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সময় লাগিয়েছেন অনেকদিন। গোলকুণ্ডার মনসবদার থাকাকালে ওখানকার স্থানীয় এক আমির এই হীরাটি উপঢৌকন হিসেবে দিয়েছিলেন মুর্শিদ কুলি খানকে। মুর্শিদ সেই থেকে সযত্নে এই হীরা আগলে রেখেছিলেন সম্রাটের সঙ্গে দেখা হলে সম্রাটকে তোহফা হিসাবে দেওয়ার জন্য।

যেহেতু সম্রাট এটা ফেরত দিয়েছেন, এই হীরা মুর্শিদ কুলিও ব্যবহার করবেন না। ঢাকা ফিরে এই হীরাটা একবার বের করেছিলেন শুধু। বের করে সম্রাটের রাজ দরবার থেকে পাওয়া নাম ‘ফারহানা’ খোদাই করে লিখিয়েছেন। হীরার নিচে ছোট ছোট অক্ষরে আরও একটা শব্দ লেখা। পড়া যায় না। অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।

পদোন্নতি পাওয়ার পর ঢাকায় একটি মসজিদ নির্মাণ শুরু করেন মুর্শিদ কুলি খান। তিন বছর যাবত চলছে নির্মাণকাজ। আজকে দেখতে যাবেন তিনি। দেহরক্ষীরা এসে মহলের দরজায় দাঁড়িয়েছে। বের হওয়ার আগে সিন্দুক থেকে ফারহানা বের করে বাজুবন্দে ঢোকালেন মুর্শিদ কুলি খান। মহলের নিচে ঘোড়া প্রস্তুত। তলোয়ার হাতে তিন তিন ছয়জন রক্ষী মুর্শিদ কুলির দুই পাশে। আরও দশজন রক্ষীকে খবর পাঠাতে বললেন তিনি।

প্রধান দেহরক্ষী মির্জা জহশ কিছুটা অবাক হলো। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে কখনই ভাবেন না মুর্শিদ কুলি খান। আজকে হঠাৎ বাড়তি নিরাপত্তা! ব্যারাকে খবর পাঠানো হলো।

রক্ষী আসতে বেশি সময় লাগল না। নিজের কালো ঘোড়ায় চড়ে বসলেন মুর্শিদ কুলি খান। কিছুটা চিন্তার ছাপ চেহারায়। সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তো? কপালে চিন্তার ছাপ নিয়ে ষোলোজন দেহরক্ষী সমেত মসজিদে এসে পৌঁছলেন মুর্শিদ কুলি খান। ঢাকার বড় পীর খাজা আবু বকর দিওয়ানের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সাথে তার দলবল। অনানুষ্ঠানিকভাবে মসজিদ পরিদর্শন করতে চলে এসেছেন তিনি। তাই ঢাকার জনগণ খবর পায়নি মসজিদের নির্মাণকাজ যে প্রায় শেষ।

ঘুরে ঘুরে দেখছেন মুর্শিদ কুলি। মসজিদ ভবনটির অলংকরণে এর স্থাপত্যিক বিষয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করতে বলেছিলেন। বিশেষ করে প্রবেশপথগুলির পার্শ্ববর্তী অলংকৃত ক্ষুদ্র মিনার, অবিক্ষিপ্ত মিহরাব, ছত্রী, ছোট গম্বুজ এবং পদ্ম ও কলস শোভিত ফিনিয়াল। প্রবেশপথ ও মিহরাবগুলি ফ্রেমের মধ্যে স্থাপিত এবং এদের শীর্ষ মেরলন শোভিত করা হয়েছে। প্যারাপেট ও গম্বুজ ড্রামের গায়ে রয়েছে উন্নত মেরলন মোটিফ। গম্বুজগুলির ভেতরের দিক পত্র নকশাকৃত করা হয়েছে। তাকিয়ে দেখলেন মুর্শিদ কুলি খান। কেন্দ্রীয় খিলানপথটির অর্ধ-গম্বুজ ভল্ট মুকারনা নকশায়স্টাকো করা হয়েছে। এ ধরনের মসজিদ এই বঙ্গদেশে প্রথম বানালেন তিনি। এই নকশা তিনি দেখে এসেছিলেন দক্ষিণাত্যে।

মসজিদ ঘুরে ঘুরে দেখা শেষে মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন। বাজুবন্দ থেকে মুক্ত করলেন ফারহানা। আধো অন্ধকার মসজিদে ছড়িয়ে পড়ল দ্যুতি। চকচক করে উঠল সবার চোখ। একমাত্র নিষ্প্রদীপ খাজা আবু বকরের চোখ। মুর্শিদ কুলি খান হীরাটি খাজা আবু বকরের হাতে দিয়ে ঘোষণা করলেন হীরাটি আজ থেকে এই মসজিদের সম্পদ। আর খাজা আবু বকর এই মসজিদের মোতাওয়াল্লী। বৃদ্ধ পীর খাজা আবু বকর ধীর স্বরে বললেন, ‘এই মসজিদের নাম হোক করতলব খান মসজিদ’। তাঁর হাতে ঝলমলে হীরকখণ্ড। কিন্তু কোনো আগ্রহ নেই তাঁর ওদিকে।

 

৭. টিকাটুলি, ঢাকা

মাটিতে পুঁতে রাখা গুপ্তধন অথবা নদীতে ভেসে আসা সোনার কলসের মতোই বইটা হাতে পেয়েছিল হাওলাদার। প্রেসটা খুব কম দামে কিনেছিল। বিশাল বড় এক ছাপা মেশিন আর ঢিপি দেওয়া পুরোনো বই। মূলত ছাপাখানার জায়গাটা এ জন্যই পছন্দ ছিল হাওলাদারের। পুরোনো লক্কড় ঝক্কড় ছাপা মেশিন ফেলে দিতে হবে জানতেন। তবুও নামকাওয়াস্তে মেশিনের টাকাও দিতে হয়েছিল।

এই ছাপাখানার আগের মালিক ছিলো বাবু লাল চন্দ্র। শাঁখারিবাজারে থাকতো। এখনও বোধহয় থাকে। পুরোনো বইগুলো সরানোর সময় উল্টেপাল্টে দেখেছিল হাওলাদার। একেকটা বইয়ের নাম পড়ছিল বিড়বিড় করে। The history of Dacca, Buriganga; historical River, 1857 and Bengali musim society সব ইতিহাসের বই। এই প্রেস থেকে সব ইতিহাসের বই বের করা হতো।

হাওলাদারের পৈতৃক নিবাস আমলিগোলা। পড়ালেখা নিম্নমাধ্যমিক। বাংলাবাজারে পানের দোকান ছিল হাওলাদারের বাবার। তখন হাওলাদারের জন্ম হয়নি। ধীরে ধীরে সেই পানের দোকান রূপ নেয় এইচ ফুন্ড এন্ড বেকারিতে। বাবার দোকানে আসা-যাওয়া করার সময় বইয়ের জগতে ঢুকে যায় হাওলাদার। বইপড়ুয়া হিসাবে নয়, বইয়ের প্রস্তুতকারক হিসেবে। একটা বন্ধুও পেয়ে যায় হাওলাদার। পড়ালেখা তখন চুলোয় গিয়েছে। দুই বন্ধু মিলে শ্যামবাজারে বসে বসে সিগারেট পোড়ায় আর আর ভবিষ্যত পরিকল্পনা করে। টিপু ছিলো বন্ধুর নাম। হাওলাদারের সহপাঠী। বোর্ড পরীক্ষায় অঙ্কে দুজন একসাথেই ফেল করে। প্রিন্সিপালের রুমে পরিচয় হয় দুজনের। আরমানিটোলা স্কুলের ছাত্র ছিল দুজন।

দুজন মোটামুটি একমত ছিল যে পড়াশোনা আর তাদের দিয়ে হবে না, অন্যকিছু করতে হবে। টিপুর বাবার বাখরখানির দোকান সূত্রাপুরে। তিন পুরুষ ধরে এই ব্যবসা ওদের। দুজনের অবস্থা একই ছিলো। পড়াশোনা না চালালে বাবার দোকানে বসতে হবে। তাই বিকল্প কিছু করা ছিলো আবশ্যক। বাংলাবাজার, ইসলামপুর, পাটুয়াটুলি, লক্ষ্মীবাজার, শ্যামবাজার সব চষে চষে কোনো কাজ খুঁজে না পেয়ে হতাশ হচ্ছিল দুজন।

প্রেসটার সংবাদ প্রথমে আনে হাওলাদার। একদম ওর বাবার দোকানের বিপরীতে। রাস্তার সাথেই পুরোনো একটা প্রেস সস্তা দরে বিক্রি হবে দোকান, মেশিনসহ। দাম অত্যন্ত কম। এক সপ্তাহের ভিতরে দুই বন্ধু ধার দেনা করে কিনে ফেললো আস্ত প্রেসটা। কেউ কিচ্ছুটি জানলো না। একদিন সকালে হাওলাদার বাবার দোকানে সোনা মিয়ার মিষ্টি নিয়ে হাজির। কদমবুসি করে কাঁচুমাচু হয়ে জানালো এখন থেকে সামনের প্রেসটার মালিক সে। দুপুরের খাবারটা যেন তাকে ওখানে নিয়ে খাওয়ানো হয়। যতদিন না ঠিকঠাক মতো প্রেস চালু হচ্ছে।

হাওলাদারের বাবা এমনিতেই খুব নরম দিলের মানুষ। কিন্তু এটা পুত্রের সাফল্য নাকি নিজের ব্যর্থতা সেটা বুঝতে পারলেন না। মিষ্টি মুখে ঢুকিয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকলেন বাইরের দিকে। টিপু মনে হয় ম্যানেজ করতে পারেনি বাড়িতে। কী হয়েছিল সেটা হাওলাদার জানে না। প্রেস চালু হওয়ার এক সপ্তাহ পরই নিজের ভাগেরটা ফেরত চায় টিপু। বলে, এই ব্যবসায় সে আগ্রহী না। সে পড়াশোনা করবে, আবার পরীক্ষা দিবে। তবে টাকা এখনই ফেরত দিতে হবে না। পরে দিলেও হবে।

টিপুর চলে যাওয়া নিয়ে কোনো ব্যথা ছিল না হাওলাদারের। এখনও নেই। হাওলাদারের ধারণা প্রেসের ব্যবসা করার চিন্তা-ভাবনা কখনই ছিল না টিপুর। সে শুধু শরিক হয়েছিল হাওলাদারকে সাহায্য করার জন্য। টিপু এখন অস্ট্রেলিয়াতে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। শেষ কথা হয়েছিল তিন বছর আগে। হঠাৎ করে একদিন বিকেলে প্রেসে এসেছিল। বলা নেই কওয়া নেই। টিপুকে দেখে ভড়কে গিয়েছিল হাওলাদার। সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দেশে এসেছে সে। দুই দিন থেকে চলে যাবে। শুধু একটু দেখতে ইচ্ছা করছিল হাওলাদারকে তাই এসেছে।

এত বছর পর পুরোনো বন্ধুর আবেগ দেখে ভেতরটা নড়ে উঠেছিল হাওলাদারের, এখনও মনে রেখেছে তাকে। তবে প্রথমে চিন্তায় ছিল। ওই বইটার কথা কি টিপু জানে? জানার তো কথা না। পুরোনো বইগুলো তো হাওলাদার একাই সরিয়েছিল। বইটা হাতে পেলে দেশ ছাড়তো না টিপু। শুধু শুধু চিন্তা করছিল হাওলাদার। বইটা সিন্দুক থেকে বের করে সকাল থেকে বসে আছে। চামড়ার মলাটের বই। ভেতরে মাত্র ষাট পৃষ্ঠা। উপরে লেখা Farhana; The historical Stone.

 

৮. অলি মিয়ার রঙমহল (আহসান মঞ্জিল)

আজ সকাল থেকে আলিমুল্লাহর মেজাজ ফুরফুরে। বাগানে পানি দিচ্ছেন আর গুনগুন করে ফার্সি কবিতা আওড়াচ্ছেন। ভাতিজা আবদুর রহমান সাবা খুব অসাধারণ একটা পরামর্শ দিয়েছে। নবাব হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে অথবা ইতিহাসে জায়গা পেতে হলে ইতিহাস তৈরি করতে হবে। আর ইতিহাস তৈরি করা কঠিন কিন্তু লেখা অনেক সহজ। একবার লিখে ফেললে পঞ্চাশ ষাট বছর পর আর কেউ সত্যতা যাচাই করতে আসবে না। সাবা বলেছে ইতিহাস লিখতে হবে। নবাব পরিবারের ইতিহাস। পূর্বপুরুষদের ইতিহাস লিখতে হবে।

কিন্তু আলিমুল্লার পূর্বপুরুষ তো ছিল দিল্লির রাজকর্মচারী, তেমন অভিজাত কেউ ছিল না। আলিমুল্লাহ বিরস মুখে সাবাকে এই কথা বলার পর সাবা মুচকি হেসে বলেছে তার উপর সব ছেড়ে দিতে। সে নিজের মনমতো ইতিহাস লিখবে। আলিমুল্লাহ যেন শুধু সাহায্য করে পাশে থেকে। সাবার কথায় খুব খুশি হয়েছে আলিমুল্লাহ। ছেলেটা কবিতা-টবিতা লেখে মাঝেমধ্যে। ছেলে হিসাবেও খারাপ না। ছেলেটাকে বিলকিস বানুর সাথে বিয়ে দিয়ে জামাই বানিয়ে ফেলার একটা চিন্তা এসেছে এরই মধ্যে মাথায়।

এইসব চিন্তা করার সময় হঠাৎ আলিমুল্লাহর চোখ পড়ল সদর দরজার দিকে। ঠনঠন করে লাঠি ফেলে এগিয়ে আসছেন এক বৃদ্ধ। চিন্তায় ছেদ পড়ায় কিছুটা বিরক্ত হলেন আলিমুল্লাহ। বৃদ্ধ কাছাকাছি এসে শুদ্ধ উচ্চারণে সালাম দিলেন। আলিমুল্লাহ পরখ করলেন বৃদ্ধকে। সফেদ দাড়ি, ধবধবে ফর্সা চেহারা, গায়ে জড়ানো রঙচটা একটা আলখেল্লা। হাতে ধরা লাঠিটি দামি, হাতলে কারুকাজ করা।

মনে মনে হাসলেন আলিমুল্লাহ। এমন পথে বসা ঢাকাবাসী দিনে দশজন আসে তার কাছে। পুরোনো জিনিসপত্র বিক্রি করতে চায়। উঠিয়ে রাখা গহনা বা খানদানি জিনিসপত্র সব। অধিকাংশ অদরকারী। তবু দয়া করে কিনে রাখে আলিমুল্লাহ। নিজের সংগ্রহে জিনিসপত্র বাড়ছে, হোক অদরকারী। এই বৃদ্ধ আবার কী বিক্রি করার কথা বলে কে জানে। সালামের জবাব দিলেন আলিমুল্লাহ। বাগানের মাঝখানে বেঞ্চি পাতা। ওদিকে ইশারা করলেন বসার জন্য। বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বসতে অস্বীকৃতি জানালেন। জানালেন, কিছু কথা বলতে চান তিনি, বসার প্রয়োজন নেই। পানির পাত্র নিচে রেখে বৃদ্ধের দিকে এগিয়ে গেলেন আলিমুল্লাহ। যত্তসব উটকো ঝামেলা।

বৃদ্ধ নিচু স্বরে কথা শুরু করলেন। জানালেন, তিনি খাজা আবু বকরের নাতি। বংশ পরম্পরায় খুব মহামূল্যবান একটি রত্নের মালিক তারা। এই রত্নটির অনুরূপ কোনো রত্ন এখন পৃথিবীতে নেই। মুর্শিদ কুলি খান আওরঙ্গজেবকে উপঢৌকন হিসেবে দিয়েছিলেন। কিন্তু সম্রাট আওরঙ্গজেব ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশংকায় রত্নটি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এক ঝলক দেখেই বুঝতে পেরেছিলেন মহামূল্যবান এই রত্নটির জন্য যুদ্ধ পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। এজন্য সভাসদদেরকেও ঠিকমতো দেখতে দেননি। নিরাপত্তার ভয়ে মুর্শিদ কুলি খানও সাথে রাখেননি। দান করে দিয়েছিলেন করতলব খান মসজিদের নামে।

ওই মসজিদের মোতাওয়াল্লি ছিলেন বৃদ্ধের দাদা খাজা আবু বকর। তিনি মারা গেছেন অনেক আগে, রত্নটি এখন বৃদ্ধের কাছে। কিন্তু এই রত্ন এখন বৃদ্ধের কাছে নিরাপদ নয়। মসজিদের বর্তমান অবস্থা করুণ। সংস্কারের জন্য অর্থের প্রয়োজন। তাই এটি বিক্রির জন্য এসেছেন। আলিমুল্লাহ দাম জিজ্ঞেস করলে বৃদ্ধ মুচকি হেসে জানালেন, মসজিদের দায়িত্ব নিয়ে সংস্কার করে দিলেই হবে। কোনো টাকা পয়সা লাগবে না।

তারপর বৃদ্ধ আলখেল্লাহর পকেট থেকে একটা থলে বের করে আলিমুল্লাহর হাতে ধরিয়ে দিলেন। সালাম দিয়ে পেছনে ঘুরলেন বৃদ্ধ। যেন এটা দিয়েই দায় শেষ তার। থলে খুলতেই আলিমুল্লাহর হাতে এসে পড়ল একটি হীরকখণ্ড। সূর্যের আলোতে সরাসরি হীরার উপর পড়ায় চোখ ধাঁধিয়ে গেলো তার। থ হয়ে তাকিয়ে থাকলেন আলিমুল্লাহ। এত মহামূল্যবান জিনিস মুফতে পেয়ে গেলো সে?

 

৯. আমলিগোলা, ঢাকা

সোহেল করতলব খান মসজিদের সামনের মুদি দোকানটার কর্মচারী। খুব অল্প কয়েকদিন হলো সে ঢুকেছে এই দোকানে। সূত্রাপুর থানা থেকে বের হয়ে রাস্তায় হাঁটছে সোহেল। দুইদিন হাজতে থেকে আজ ছাড়া পেয়েছে। একদম বিনা কারণে দুইদিন হাজতে কেন কাটালো সেটা বুঝতে পারছে না। কে বা কারা যেন পুলিশকে ইনফর্ম করেছে সোহেল গাঁজার ডিলার। ও দোকানের নামে লুকিয়ে গাঁজা বিক্রি করে। পুলিশ দোকান তল্লাশি করে কিছু পায়নি।

হাজতে ফেলে রাখার পর ভেবেছিল কেউ এসে টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু প্রথম দিন কেউ আসেনি। সোহেল নিজেও জানতো কেউ আসবে না। দোকানের মহাজন কখনই এসব জেল জরিমানায় জড়াবে না। কর্মচারী একটা গেলে আরেকটা আসবে, তার তেমন অসুবিধা নেই। আর গ্রামের বাড়িতে কেউ জানবেও না তার গ্রেফতারের খবর। এক কনস্টেবলের কাছে মোবাইল চেয়েছিল কথা বলার জন্য। শালা একটা মিসকলের বিনিময়ে পাঁচশো টাকা চায়। প্রতি মিনিট এক হাজার। সোহেলের পকেটে একটা ফুটো পয়সা ছিল না।

সোহেল ধরেই নিয়েছিল এখান থেকে আর বের হতে পারবে না দ্রুত। মাসখানেক পর বাড়িতে টাকা না পেলে যদি আব্বা খোঁজ নেয় তাহলে হয়তো আসবে কেউ। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। বাড়িতে তেমন কল দেয় না সোহেল। এই নিয়ে তেমন মাথাব্যথাও নেই কারো। কিন্তু সোহেল দুইদিনের মাথায় হাজত থেকে বের হয়ে দিব্যি হাঁটছে। কে একজন এসে নাকি তার নামে মুচলেকা লিখে গেছে। অবাক হয়েছে সোহেল। কে সেই লোক?

লাবলুকে রাখা হয়েছে একটা বড়সড় বসার ঘরে। মুখ স্কচটেপ দিয়ে বাঁধা। নরম সোফায় বসতে পারছে না লাবলু। পাছা শুধু সরে সরে যাচ্ছে। দুই হাত পিছনে বাঁধা তাই ঠিক হয়ে বসতেও পারছে না কিছু ধরে। লাবলুর কোঁচড়ে পুটলিটা নেই। পুটলিটা লাবলুর সামনের টেবিলে রাখা। পুটলির ভিতরে মহামূল্যবান কিছুই নেই। ছোট একটা ইটের টুকরো ছিলো পুটলিতে।

লাবলুর বরাবর সামনে সোফায় এক মাঝবয়েসী ভদ্রলোক বসে আছেন। চোখে সরু চশমা। রাগে নাকি শোকে পাথর হয়ে আছেন সেটা বুঝা যাচ্ছে না। এই ভদ্রলোকের নাম টিপু। হাওলাদারের পুরোনো বন্ধু। প্রেস কেনার পরদিন একা একা প্রেসে গিয়েছিল টিপু। পুরোনো বইয়ের ঢিবিতে বইটা সর্বপ্রথম সে আবিষ্কার করে। বইটা নিয়ে আসে নিজের বাড়িতে। পাথর বা রত্ন সম্পর্কে আগ্রহ ছিল টিপুর। ভাগ্যনির্দেশক পাথরের কোনো বই ভেবে নিয়ে এসেছিল ও। রাতে বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টাতে গিয়ে শিউরে উঠে। পৃথিবীর মহামূল্যবান রত্ন বাংলাদেশে। বইটি ফার্সি থেকে অনুবাদ। অনুবাদক শেষের দিকে নিজের কথা এবং সেই সময়কার কিছু তথ্য সংযুক্ত করেছেন। বইটির মূল লেখক নবাব আবদুল গণির ফুফা আবদুর রহমান সাবার। ফারহানাকে নবাব পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পদ এবং সরাসরি মোঘল সম্রাট থেকে প্রাপ্ত বলে দাবি করেন তিনি। লিখেন সম্রাট আওরঙ্গজেব নবাব পরিবারের পূর্বপুরুষ কাশ্মীরের শাসনকর্তা হাফিজুল্লাহকে পুরষ্কার হিসেবে দিয়েছিলেন। কিন্তু অনুবাদক ফারহানা হীরা সম্পর্কে লিখেন, লেখক অতিরঞ্জন করেছেন। বাড়িয়ে বাড়িয়ে লিখেছেন।

ঢাকার কোনো এক পথে বসা বনেদি পরিবারের কাছ থেকে কিনেছিলেন তারা হীরাটি, মোঘল সম্রাটদের কাছ থেকে পাননি। আর হাফিজুল্লাহ কাশ্মীরের শাসনকর্তা ছিলেন না। তিনি ছিলেন মোঘল সম্রাটের অধস্তন একজন রাজকর্মচারী। নাদির শাহ আক্রমণের পর যিনি সিলেট পালিয়ে এসে চামড়ার ব্যবসা শুরু করেন। পরে তার বংশধরেরা ঢাকায় এসে বসবাস শুরু করে।

সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং চমকপ্রদ যে তথ্যটি অনুবাদক দিয়েছেন সেটি হলো, হীরকখণ্ডটি নবাব আহসানউল্লাহর সময়ে আহসান মঞ্জিল থেকে খোয়া যায়। হীরাটিকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে অসমর্থিত এক সূত্রে লিখেন, এক চোরকে সন্দেহ করে ব্রিটিশ ফৌজের কাছে সমর্পণ করা হয়। চকবাজারে ইবরাহীম খাঁর নির্মিত দূর্গ যা পরবর্তীতে নায়েবে নাজিমদের বাসস্থান ছিল, সেই দূর্গের ভিতর ছোট একটা কারাগার বানিয়েছিল ব্রিটিশরা। ওখানকার বড় এক পুকুরে হীরাটি ফেলে দেয় চোর। পরে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

তথ্যটি খুবই ভিত্তিহীন। কারণ ব্রিটিশরা এত বোকা ছিল না যে কোনো বন্দিকে বিনা তল্লাশিতে কারাগারে প্রেরণ করবে। সেই দূর্গই বর্তমান পুরোনো কারাগার।

হাওলাদার এক ছেলেকে বিশাল অঙ্কের লোভ দেখিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে ঢুকিয়েছে। ওর কাজ হলো সেন্ট্রাল জেলের পুকুর থেকে হীরাটা উদ্ধার করা। টিপু কখনই বিশ্বাস করতো না জেলের পুকুরে হীরা আছে। এজন্য সে এই হীরার জন্য আলাদা খোঁজ লাগিয়েছিল। দেশে এসে তিন বছর প্রচুর খোঁজ খবর নিয়েছে।

গত পরশু হঠাৎ খবর পেলো, জেলের পুকুরে হীরা পাওয়া গেছে এবং সেই হীরা জেলের বাইরেও চলে এসেছে। পুরান ঢাকার অলি-গলিতে ভরা এখন টিপুর লোক। জেলের পুকুরে হীরার স্বপ্ন এতদিন উড়িয়ে দিতো টিপু। জানতো, হাওলাদার কখনোই খুঁজে পাবে না। কিন্তু গত পরশু খবর পাওয়ার পর ভয় পেয়ে গিয়েছিল। চোর-পুলিশ নাটক সাজিয়ে লাবলুকে উঠিয়ে আনতে বেশি সময় লাগেনি। কিন্তু পুটলিতে ইট কেন? হীরা কি আসলেই পাওয়া যায়নি নাকি জেলের ভিতর যে আছে সে ছলনা করছে? হাওলাদার কি জানে হীরার বদলে ইট দেওয়া হয়েছে? তাকে কি এখন জানানো উচিত? প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে টিপু। টিপুর সামনে বসে থাকা লাবলু বারবার সোফা থেকে পড়ে যাচ্ছে, সেদিকে খেয়াল নেই ওর।

 

১০. টিকাটুলি, ঢাকা

জহিরুলকে প্রেসে চাকরি দিয়েছিল হাওলাদার জেলে পাঠানোর জন্য। কিন্তু ছেলেটার উপর অন্যরকম একটা মায়া জন্মে গিয়েছিল। তাছাড়া জেলের পুকুরে আদৌ কোনো কয়েদি নামতে পারে কিনা সেটা জানে না। শুধু শুধু ছেলেটার জীবন জেলে পচানোর চেয়ে বাইরে রাখাই ভালো। বাইরে অনেক কাজ। টিপু দেশে আসার পর থেকে হাওলাদারের সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছিল। টিপুও বোধহয় হীরার খোঁজে আছে। টিপু থেকে হাওলাদার কোনো অংশেই কম নয়। টিপুকে টোপ লাগিয়ে ধরার জন্য লাবলুকে বলির পাঁঠা বানিয়েছে।

জেলের ভেতর আছে ইসলামপুরের এক ফুট ব্যবসায়ী। দুই বিয়ে করেছে ব্যাটা। বড় বউ মামলা ঠুকে দিয়েছে। এখন জেলে বসে মরছে।

লাবলু পেশাদার কিলার ভাবে নিজেকে। কিন্তু মোটেও তেমন কিছু না লাবলু। অলিগলির মাস্তানও না। একটা ক্ষুর নিয়ে ঘুরে লুঙ্গির গাঁটে। দেয়ালে দেয়ালে ক্ষুর বসিয়ে খিলখিল করে হাসে। স্বাভাবিক যাপনের মধ্যেই হঠাৎ হঠাৎ এসব করে। পুরোপুরি পাগল বলা যায় না ওকে। লাবলু কাজ করতো শ্যামবাজারে। সবজির আড়ৎ দেখাশোনা করতো। গ্রামে বাবা-মা দুজনই একরাতে খুন হয়। দুর্বৃত্তরা মাঝরাতে দুই বৃদ্ধ-বৃদ্ধার গলার রগ কেটে রেখে যায়। মূলত ডাকাতি করতে এসেছিল। লাবলুর বাবা চিল্লাচিল্লি করে গ্রামের সবাইকে জানাতে গেলেই চটে যায় ডাকাতের দল। খুন করে পালিয়ে যায়।

বাবা-মা একসাথে চলে যাওয়ার পর থেকে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে লাবলু। লাবলুর রোগটা অনেকটা সিজোফ্রেনিয়ার মতো। আশেপাশে কাল্পনিক দৃশ্য দেখতে পায়, আওয়াজ শুনতে পায়, বাবা-মায়ের খুনিদের আশেপাশে দেখতে পায়। তাদেরকে খুনও করে লাবলু। এই রোগ হওয়ার কারণে যার সাথে এগুলি হচ্ছে সে সবকিছু সত্যি মনে করলেও তাঁর আশেপাশের লোকরা কিছুই বুঝতে পারে না। স্বাভাবিক ও সুস্থ মানুষের মতো আচরণ করে থাকে সবার সাথে। লাবলুকে খুঁজে বের করতে বেশি বেগ পেতে হয়নি হাওলাদারের। পাওয়ার পর কাজ বুঝিয়ে দিতেও বেশি কষ্ট হয়নি। সাদা কাগজে ‘চল্লিশ লক্ষ টাকা দেওয়া হলো’ লিখে নিচে সাক্ষর করে লাবলুর হাতে দিতেই গদগদ করে হেসে উঠেছিল সে। হাওলাদারের পরিকল্পনা ছিল সূক্ষ্ম।

আর ইসলামপুরের ওই ব্যবসায়ীর বাসা টিকাটুলিতে, হাওলাদারের বাসার পাশে। সাহায্যের জন্য ওই লোকের ছোটবউ হাওলাদারের বউয়ের কাছে এসেছিল। ব্যবসায়ীর নাম রুবেল। হাওলাদার জেলগেটে রুবেলের সাথে দেখা করে অদ্ভুত এই প্রস্তাব দিলে খুব অবাক হয় সে। কিন্তু বিনিময়ে জামিনের নিশ্চয়তা শুনে রাজি হয়ে যায় রুবেল। কাজ বেশি না। কাজ হলো লাবলু জেলগেটে দেখা করতে এলে শুধু গম্ভীর গলায় গমগম করে কথা বলা। কোনো নির্দিষ্ট কথা না। শুধু ষষ্ঠ দিন বলার জন্য দুই লাইন শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর বাকি দিন যা ইচ্ছা তাই। এই কথা বলে কী লাভ সেটা জানে না রুবেল। জানার ইচ্ছাও নেই।

লাবলুকে বলা হয়েছিল জেলগেটে এক সপ্তাহ নিয়মিত দেখা করলে রুবেল একটা পুটলি দিবে। ওই পুটলি এনে হাওলাদারের হাতে দিলে বাদবাকি টাকা দেওয়া হবে। ষষ্ঠ দিনে রুবেলকে বলতে বলা হয়েছিল ‘আজকে মাল ডেলিভারি দিবেন, জহিরুল আসবে বিকালে। সব জানাবে।’ এর ফাঁকে লোক পাঠিয়ে লাবলুর ঘরে বালিশের নিচে একটা ইট ভরা পুটলি রেখে আসা হয়। রুমে ফিরে পুটুলি দেখে লাবলু ভাবতে থাকে সে এটা জেলগেট থেকে নিয়ে এসেছে। টিপুর কানে খবরটা দেওয়ার জন্য নিজেই টিপুকে ফোন দিয়েছিল হাওলাদার। খবর পেয়ে টিপু দুইজন লোক ভাড়া করে লাবলুর উপর নজর রাখার জন্য। ওই দুইজন শরবত ব্যবসায়ী সেজে লাবলুর বস্তিতেই রুম ভাড়া নেয়। এভাবে হাওলাদারের টোপে পা দেয় টিপু।

 

১১.

এই হীরা নিয়ে শুধু টিপু আর হাওলাদরই জানে, এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। স্টিভস অ্যান্ড ব্রাদার্স থেকে ছাপা হওয়া বইটি অনেকের কাছে পৌঁছেছিল। কিন্তু একটা নিছক রূপকথা মনে করে কেউ আগ্রহ দেখায়নি। হাওলাদার এই হীরা নিয়ে অনেকের সাথে খোলামেলা আলাপ করেছে। ঢাকার কাগুজে নবাবদের বর্তমান উত্তরসূরিদের কাছেও গিয়েছে কথা বলতে। তারা এই হীরা সম্পর্কে জানে না কিচ্ছু। নবাব পরিবারের হীরা বললে আগে দরিয়া-ই-নুরের কথা মনে করে।

আলিমুল্লাহর ভাতিজা এবং জামাতা আবদুর রহমান সাবার আরেকটি অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি পাওয়া গিয়েছে। সেখানে তিনি নবাব পরিবারের ইতিহাস লিখেছেন। কিন্তু এই হীরা সম্পর্কে লিখেননি। হীরাটা পাওয়া গেলে নিঃসন্দেহে মহামূল্যবান সম্পদ হাতে আসবে কিন্তু হীরাটার অস্তিত্ব আদৌ আছে কী-না সেটা নিয়েই কথা।

অধ্যাপক ড. আশফাকুজ্জামান টিপু এই হীরা নিয়ে এত বছর প্রচুর ঘাঁটাঘাঁটি করেছে। অস্ট্রেলিয়াতে থাকাকালে গরমের ছুটিতে কয়েকবার ইন্ডিয়াতে এসেছে। গোলকুণ্ডা, দিল্লি সব চষে বেড়িয়েছে। এই হীরার কথা কোথাও পায়নি। বইটা নিয়ে রিসার্চ করেছে বড়সড়। বইয়ে প্রচুর ভুল তথ্য আছে। বইয়ের প্রকাশের সাল লেখা ১৮৭০। অনুবাদকের নাম নেই। অনুবাদক ভূমিকায় লিখেছেন এই বইটি খুবই দূর্লভ। অনুবাদক অনেক কষ্টে খুঁজে পেয়েছেন এবং অনুবাদ করেছেন। মূল লেখকের নাম লেখা হয়েছে আবদুর রহমান সাবা। কিন্তু আলিমুল্লাহর ভাতিজা ও জামাই ফার্সি ভাষার কবি, তার নাম ছিল আব্দুর রহিম সাবা।

সাবার মৃত্যু ১৮৭১ সালে। সাবার মৃত্যুর এক বছর আগেই অনুবাদক বলছেন বইটি দুর্লভ। বিষয়টি কেমন কেমন যেন। সাবার অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির নাম ‘তারিখে কাশ্মিরিয়ানে ঢাকা’। ওই পাণ্ডুলিপিও সংগ্রহ করে পড়েছে টিপু। কোথাও লেখা নেই এই হীরার কথা। গোলকুণ্ডায় গিয়ে স্থানীয় একটি রূপকথা শুনেছিল কিন্তু সেটা তেমন শক্তিশালী কিছু না।

টিপুর সামনে বসে আছে লাবলু। চোখ পিটপিট করছে একটু পরপর। ভাবলেশহীন। ধরা খেয়েছে তার বিন্দুমাত্র ছাপ নেই চেহারায়। মনে হচ্ছে নিজের বাসায় বসে আছে।

‘মিস্টার লাবলু।’

‘কন।’

‘হাওলাদারকে কীভাবে চেনেন?’

‘হাওলাদার কিডা?’

‘তুমি যার জন্য কাজ করছো।’

‘আমি কারো জন্যি কাজ করিনে। নিজির জন্যি করি।’

‘মানে?’

‘উরা আমার মা-বাপরে জবাই করিছে। এট্টারেও রাখপো না আমি। সব কয়ডারে খতম কইরে দেবো। আপনিও কি ছেলেন ওগে সাথে?’

লাবলুর কথার আগামাথা কিছু বুঝল না টিপু। লোকটা খুব ধুরন্ধর মনে হচ্ছে। সহজে মুখ খুলবে না। হাল ছাড়লে চলবে না। মনে মনে ভাবলো টিপু। এই লোকের কাছ থেকেই সব কথা বের করতে হবে। কিন্তু একে বাগে আনা সহজ হবে না মনে হয়। একটু বিরতির পর আবার কথা শুরু করলো টিপু।

‘লাবলু সাহেব।’

‘জ্বে।’

‘জেলগেটে কার সঙ্গে দেখা করতে যেতেন? এই পুটলি কে দিয়েছে?’

‘জানিনে তো। কিডা দেলো?’

‘মশকরা করছেন? আমি খুব ভালো ব্যবহার করছি তাই?’

‘না, স্যার। আমার মনে আসতিছে না। মনে আসলে সত্যি বলতাম।’

‘কী মনে আসছে আপনার?’

‘আমার টাহা। চল্লিশ লাখ টাহা স্যার।’

‘চল্লি¬শ লক্ষ? চল্লিশ লক্ষ টাকা কী হয়েছে?’

‘উরা আমার মা-বাপরে জবাই করিছে। এট্টারেও রাখপো না আমি। সব কয়ডারে খতম কইরে দেবো। আপনিও কী ছেলেন ওগে সাথে?’

‘আবার একই কথা বলছেন?’ রেগে গেলো টিপু। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা দুই সহকারীকে হাতের ইশারায় আবার মুখ হাত বেঁধে দিতে বললো লাবলুর। লাবলু আগের মতোই নির্বিকার। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। হাওলাদারকে জানাতে হবে সরাসরি। জেলগেটে হাতবদল হয়ে গেছে হীরা। আবার এই লোক অদ্ভুত আচরণ করছে। হতে পারে এই লোক নিজেই অন্য কোথাও লুকিয়ে রেখেছে হীরাটি। এখন পাগলের ভান ধরছে। দুটোই হতে পারে। কাগজ-কলমে ছক কষছিল টিপু। কোনটা হতে পারে ভাবছিল।

ঘরে এই সময় প্রবেশ করলো রিপন। রিপন টিপুর ভাগ্নে। মুদি দোকানদারকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া আর লাবলুকে ভুল তথ্য দিয়ে আগে বস্তি থেকে বের করে আনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ফিরোজকে। ফিরোজ রিপনের বন্ধু। ফিরোজ ঠিকঠাক মতো কাজ শেষ করলেও এখনও ফিরে আসেনি। খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে নতুন সংবাদ নিয়ে এলো রিপন। থানা থেকে কে বা কারা যেন মুচলেকা লিখে মুদি দোকানদারকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে।

 

১২. গোলকুণ্ডা, হায়দারাবাদ

আবুল হাসান কুতুব শাহ নিজেও বুঝতে পারলো বিজাপুরের সুলতানের সাথে সন্ধি করা ঠিক হয়নি। ১৬৩৬ সালে চুক্তি অনুসারে গোলকুণ্ডার বার্ষিক কর পরিশোধ করতে অস্বীকার করেছিল আবুল হাসানের বাবা আব্দুল্লাহ কুতুব শাহ। তখন আওরঙ্গজেব গোলকুণ্ডা আক্রমণ করেছিল। এই যুদ্ধে প্রায় হেরে যাচ্ছিল আব্দুল্লাহ কুতুব শাহ।

আওরঙ্গজেবের ভাই দারাশিকোর সাথে ভালো সম্পর্ক ছিল কুতুব শাহদের। সেই সময় দারাশিকো রক্ষা করে গোলকুণ্ডা। শাহজাহানকে যুদ্ধবিরতির পরামর্শ দেন। তখন মসনদে সম্রাট শাহাজাহান। এবার তো আওরঙ্গজেব নিজেই সম্রাট। বিজাপুরকে সাহায্য করার জন্য সন্ধি করা উচিত হয়নি। এবার আর গোলকুণ্ডার রক্ষা নেই। রাজধানীতে যুদ্ধের সাজ সাজ রব। বিজাপুরের পতন হয়েছে। মোঘল বাহিনী গোলকুণ্ডা অবরোধ করে রেখেছে। যেকোনো সময় আক্রমণ করবে। গোলকুণ্ডা দুর্গ খুবই শক্তিশালী। তবে মোঘলদের সামনে টিকবে বলে মনে হয় না। আবুল হাসান কুতুব শাহি সেনাপতিকে খবর দিয়েছেন। এখন রাত। কাল আলো ফোটার আগেই মোঘল শিবিরে আক্রমণ চালাবে কুতুব শাহি বাহিনী। এটাই চূড়ান্ত। লড়াইয়ের পর হেরে গেলে হারবে। কিন্তু লড়াই না করে এভাবে বন্দী হয়ে মরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই। রসদ শেষ হয়ে উঠছে।

রাত একটা, মোঘল শিবির। আওরঙ্গজেবের তাঁবু। সম্রাটের হাত থেকে হীরাটা নিয়ে অনেকক্ষণ বসে আছে আব্দুল্লাহ পানি। বিশ্বাস হচ্ছে না এত মূল্যবান হীরকখণ্ড সম্রাট তাকে দিয়েছে।

আব্দুল্লাহ পানি কুতুব শাহি রাজ্যের রাজকর্মচারী। সুন্নি মুসলমান। এই শিয়া সালতানাতে খুব মানবেতর জীবন কাটিয়েছে আব্দুল্লাহর পরিবার। নির্যাতনে প্রাণ গিয়েছে আব্দুল্লাহর বড় ভাইয়ের। এরপর থেকে সুন্নি পরিচয় গোপন রাখে আব্দুল্লাহ। ভাইয়ের মৃত্যুর পর সাহায্য চেয়ে দিল্লিতে চিঠি লিখেছিল আব্দুল্লাহ। রাজকর্মচারী হওয়ার সুবাদে ভিতরের সব খবর পায় খুব সহজেই আব্দুল্লাহ। আওরঙ্গজেব বিজাপুর বিজয়ের পর মনে করেন আব্দুল্লাহর কথা। শিবির স্থাপনের পর গুপ্তচর মারফত খবর পাঠান আব্দুল্লাহর কাছে। আব্দুল্লাহ এসে ভিতরের গোপন সব তথ্য ফাঁস করে দিয়েছে। কাল সকালে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে কুতুব শাহিরা জেনে মোঘল সম্রাট নিজের বাহিনীকে প্রস্তুত হতে বলেছেন এখনই। রাতের আঁধারেই আক্রমণ করবেন দুর্গে। দুর্গে ঢোকার সহজ পথও বাতলে দিয়েছে আব্দুল্লাহ। খুশি হয়ে মূল্যবান এই হীরাটি আব্দুল্লাহকে ইনাম দিয়েছেন সম্রাট। মায়ের কাছ থেকে পাওয়া এই হীরকখণ্ডে ছোট করে খোদাই করে লেখা ‘মমতাজ’।

ভোর হওয়ার আগেই রক্তে ভেসে গেলো গোলকুণ্ডা। রক্ত কিছুটা ছিটকে এসে আব্দুল্লাহর হীরাতেও লাগলো।

 

১৩. লালবাগ থানা

‘মানুষজনের সাহস এতটাই বেড়েছে যে পুলিশের সাথে মশকরা করে’ গজগজ করে বলল এস আই শহীদুল। ‘ছোকরাটাকে শুধু শুধু গ্রেপ্তার করে আনা, মুদি দোকান তছনছ করেছে বলে। এগুলোতে পুলিশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। এমনিতেই সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে পুলিশ। এমন কাজকর্ম করলে ন্যূনতম শ্রদ্ধাও কেউ করবে না। ভয়ডর তো দূরে থাক। ভুল তথ্য দিয়েছিল যে ছেলেটা, তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। থানার সামনে দাঁড়িয়ে রুটি কলা খাচ্ছিল। সাহস কত বড়। আরে তুই মশকরা করেছিস তো করেছিস, এখন আবার মজা দেখার জন্য দাঁড়িয়েও আছিস?’

রাগে ভেতরটা গুলিয়ে উঠে শহীদুলের। পোদের উপর দুই চার ঘা লাগিয়ে দিলেই পোদ্দারি বেরিয়ে যাবে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ছেলেটাকে ডাকা হয়েছে। দুইজন সেন্ট্রি আনতে গিয়েছে। শহীদুল মনে মনে ঠিক করে রেখেছে সামনে আনলেই প্রথমে দুটো থাপ্পড় লাগাবে কষে, তারপর জিজ্ঞাসাবাদ। শালা ফাজিল! দুজন সেন্ট্রির কাঁধে ভর দিয়ে আসছে ছেলেটা। একটু বেশিই মেরেছে বোধ হয়। ইশ, সুন্দর ছেলেটা একটু মশকরার জন্য এত মার খেলো। কিছুটা দয়া হলো শহীদুলের। থাপ্পড় মারার ইচ্ছাটা বাদ দিলেন।

‘নাম?’

‘ফিরোজ।’

‘কোথায় থাকা হয়?’

‘আমলিগোলা।’

‘পড়াশোনা?’

‘অনার্স থার্ড ইয়ার। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।’

‘বাহ্। এত ভালো জায়গায় পড়েও এসব করো?’

‘স্যার, আমাকে মাফ করে দেন। আমি বুঝতে পারি নাই। স্যার আমাকে মাফ করে দেন প্লিজ।’

‘মাফ তো করাই হবে। কেন করেছো এটা আগে বলো।’

‘আমার বন্ধু রিপনের সাথে বাজি ধরেছিলাম।’

‘পুলিশকে ঠকানো নিয়ে বাজি? বাহ বাহ।’

‘না স্যার। আরো…’

‘আরো কী?

‘আরো একটা কাজের জন্য।’

‘কী কাজ?’

‘রিপন বলেছিল একটা বস্তিতে গিয়ে জহিরুল নামে এক লোকের বেশ ধরে একজনের সাথে কথা বলতে হবে।’

‘কোন লোক? কী কথা?’

‘লোকটার নাম জানিনা। আমাকে যা শিখিয়েছে তাই বলেছি।’

‘কী বলেছো?’

‘বলেছি, “করতলব খান মসজিদের সামনে একটা মুদি দোকান আছে। ওখানে গেলেই টাকাটা পেয়ে যাবেন। টাকা পাওয়ার পর জিনিসটা ওই দোকানদারের হাতেই দিবেন। অন্য কারো কাছে না। দোকানির নাম রাসেল। সবুজ টিশার্ট পরা থাকবে। আপনি গিয়ে দুইবার হাঁচি দিলেই ও চিনবে।”’

‘ওহহো। কেস তো অন্যদিকে যাচ্ছে। তারপর?’

‘তারপর আপনাদের কল করে বলতে বলেছিল ‘ওই মুদি দোকানদার গাঁজার ডিলার।’

‘এগুলো বলল আর তুমি করলে? তুমি কি কচি খোকা?’

‘ধরা খেয়ে যাবো ভাবিনি কখনও। পুলিশ যে ফোন ট্র্যাক করে আমাকে পেয়ে যাবে সেটা মাথায় আসেনি।’

‘হাসালে। আচ্ছা, জহিরুল সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারবে আর?’

‘না স্যার। তবে জানি উনি বাংলাবাজার থেকে আসার কথা ছিল।’

‘রিপনের ঠিকানা দাও। বাজি কত টাকা ধরেছিল?’

‘দশ হাজার। ও থাকে লালবাগ। এখন ওকে কেল্লার ওদিকে পাবেন স্যার।’

১. রিপন, ২. বাংলাবাজরের জহিরুল। নোট করে রাখলো শহীদুল।

 

১৪. আমলিগোলা, ঢাকা

অস্থিরভাবে ঘরে পায়চারি করছে টিপু। ফিরোজ আর রিপন দুটোই গ্রেফতার হয়েছে। সোহেলকে কারা ছাড়িয়ে নিয়েছে খোঁজ পাওয়া যায়নি এখনও। পুলিশ এখন হাওলাদারের ম্যানেজার জহিরুলকে খুঁজছে। খবরটা জানাতে হবে হাওলাদারকে। জহিরুল ধরা খেলে হাওলাদরও ধরা খাবে। আর এত বছরে হীরার কোনো খোঁজ পায়নি টিপু। হাওলাদার লোক পাঠিয়ে জেলের পুকুর থেকে হীরা বের করেছে। কিন্তু এর মাঝে খোয়া গেছে। হীরা উদ্ধারে সাহায্য করলে টিপু ভাগ বসাতে পারবে। আর সুযোগ পেলে হাওলাদারকে সরিয়ে পুরো হীরাটাই নিজে কব্জা করবে। যাইহোক, পুলিশের হাতে পড়তে দেওয়া যাবে না হাওলাদরকে। আর না ভেবে কল করলো হাওলাদারকে।

‘বন্ধু..আমারে ছরণ করলা হঠাৎ। কিসসে? কুনু ছমছ্যা?’ ফোন রিসিভ করে টিটকারি শুরু করলো হাওলাদার।

‘বন্ধু, তোমার সাথে দেখা করতে হবে আর্জেন্ট। কোথায় আসবো?’ টিপুর গলা কাঁপছে। অনেকদিন পর শান্তি পেলো হাওলাদার। টোপ তাহলে গিলেছে ঠিকঠাক।

‘আমার বাছা আছে। দোকানভি আছে। যেইনে মুনচায় আহো।’

‘দোকান নিরাপদ না। বাসায় আসছি।’

‘আহো, আহো। কতদিন খোশগল্প করি না।’ ফোন রেখে দ্রুত রেডি হয়ে নিল টিপু। ওদিকে হাওলাদার ফোন রেখে বিকট শব্দে হাসা শুরু করল। এতদিন পর পুরোনো বন্ধু ধরা খেয়েছে। চুপিচুপি হীরা খোঁজা। হাহাহা।

ঘন্টাখানেক পর হাওলাদারের ড্রয়িং রুম। টিপু বসে আছে সোফায়। হাওলাদার রকিং চেয়ারে। দুজনে প্রায় মুখোমুখি। থমথমে পরিবেশ। টিপু নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছে সে অপরাধী। বইটা যেহেতু আগে সে পেয়েছে তার বলা উচিত ছিল হাওলাদারকে। আর হাওলাদারও অপরাধী। কারণ বইটা পাওয়ার পর সে টিপুকে জানায়নি।

হাওলাদার এই দোষ স্বীকার করেনি অবশ্য। তবে লাবলুকে দিয়ে নাটক সাজানোর ঘটনাটা বলেছে। প্রথমে দুজনেই হো হো করে হেসেছে। যেন সেই শ্যামবাজারে কাটানো বিকেল। একজন আরেকজনকে বোকা বানিয়ে হাসছে। রিপন, ফিরোজের গ্রেফতার আর জহিরুলকে খোঁজার খবর শুনে চুপসে গেছে হাওলাদার। পুলিশ জড়িয়ে গেলে সব শেষ। এখনও কোনো হদিশ নেই হীরার। তবে পুলিশ খুঁজতে পারে জহিরুলকে এমন আশংকা আগেই করে রেখেছিল হাওলাদার। জহিরুলকে প্রেসে আসতে নিষেধ করেছে তাই। কিন্তুযখন পুলিশ পেছনে লেগেছে তখন বিষয়টা এত সহজে নিলে হবে না। জহিরুলকে আত্মগোপন করতে বলতে হবে।

‘দোস্ত, আমরা একসাথে হীরাটা খুঁজতে পারি না? ’ নীরবতা ভেঙে প্রশ্ন করলো টিপু। উত্তরের জন্য তাকিয়ে আছে হাওলাদারের দিকে। হাওলাদার নিশ্চুপ। কথাটা শুনেছে বলে মনে হলো না। কোনো ভাবান্তর নেই।

‘ওই ছ্যারাডারে ছুডাইছো? করতলব খানের উল্ডা পাশের ওই মুদি দোকানের ছ্যারাডারে?’ উল্টো প্রশ্ন করলো হাওলাদার। এবার চুপসে গেল টিপু। এটা বলেনি ইচ্ছা করেই। বলতে ভয় হচ্ছে না আসলে, টিপু নিজেই ভুলে থাকতে চাচ্ছে বিষয়টা।

‘এখানে আরেকটা মিসটেক হয়েছে। কে বা কারা যেন ওই ছেলেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে।’

‘ভালা তো। ছুডাই নিছে। তোমার কষ্ট কমছে। মিছটেকের কি দেকলা?’

‘ওর দোকানের মালিকের কাছে খোঁজ নিয়েছি। সে ছুটাতে আসেনি।’

‘তইলে দেহোগা বাড়িত্তন কেউ ছুডাইছে। ডিজিটাল যুগে সেকেন্ডে সেকেন্ডে খবর যায়গা। আমরা কেবল বিছরায়া পাই না পাত্থর।’

‘আমিও সেটা মনে করেছিলাম। কিন্তু ওর মালিক জানিয়েছে বাড়ি থেকে কেউ ছাড়াতে আসেনি। আর ও বাড়িতেও যায়নি। থানাতেও নাই। নিখোঁজ।’

আবার থমথমে হয়ে গেলো পরিবেশ। তবে কি হাওলাদার আর টিপু ছাড়াও অন্যকেউ ঢুকে পড়েছে এই খেলায়?

 

১৫. আহসান মঞ্জিল

আলিমুল্লার ছেলে আবদুল গণির ইংরেজ শাসকদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন সাতাশ বছর বয়সে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের সময় আবদুল গণি ইংরেজদের অর্থ, হাতি, ঘোড়া, নৌকা সবকিছু দিয়ে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করেছিলেন।

তিন বছর পর ১৮৬০ সালে ঢাকায় মুসলমান শিয়া-সুন্নিদের ভয়াবহ দাঙ্গা হয়। ইংরেজ সরকার থামাতে ব্যর্থ হয়েছিল সেই দাঙ্গা। তখন নবাব আবদুল গণি নিজের চেষ্টায় তিন দিনের মধ্যে ঢাকা শহরকে শান্ত করে ফেলেছিলেন। ইংরেজদের খুব ঘনিষ্ঠ এই অনুচরকে বৃটিশ সরকার সি.এস.আই (কম্প্যানিয়ন অব দি অর্ডার অফ দি স্টার অব ইন্ডিয়া) উপাধিতে ভূষিত করেছিল। শুধু তাই নয়, ১৮৬৭ সালে ভাইসরয় তাঁকে আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে মনোনীত করে। সর্বশেষ ১৮৭৫ সালে বংশানুক্রমিক ‘নবাব’ উপাধি দেয়া হয় আবদুল গণিকে।

আলিমুল্লাহ বুঝতে পেরেছিলেন তার নামের সাথে নবাব উপাধি জুটবে না। ১৯৪৬ সালে বেঁচে থাকতেই পুরো জমিদারির দায়িত্ব আবদুল গণির উপর অর্পণ করেন। মাত্র আঠারো বছর বয়সে নবাব পরিবারের হাল ধরেন খাজা আবদুল গণি। ততোদিনে নামডাক ছড়িয়ে গিয়েছে। পিছন পিছন যে যাই বলুক সামনাসামনি সবাই নবাব বলেই ডাকে। তোয়াজ করে চলে।

আবদুল গণি একবার চিন্তা করলেন, পুরোনো জিনিসপত্রগুলো নিলামে উঠাবেন। জাতে উঠার জন্য অনেক কিছুই কিনেছিলেন তার বাবা। সবগুলোই লোক দেখানোর জন্য। তখন কোনো লাভ হয়নি। আর এখন নামডাক ছড়িয়েছে। এগুলোর কোনো প্রয়োজন নেই। জিনিসগুলো নিলামে উঠিয়ে বিক্রি করে দিতে পারলে বড় অঙ্কের টাকা আসবে। ওগুলো কাজে লাগবে। নবাবের ম্যানেজার তখন খলিলুল্লাহ নামে এক ব্যক্তি। মূলত খলিলুল্লাহই বুদ্ধিটা দিলেন। বুদ্ধিটা খুব পছন্দ হলো নবাবের। হরিণের শিং, বাঘের চামড়া, দরিয়া-ই-নূর, সম্রাট শাহাজাহানের ছড়ি, আকবরের বাজুবন্দ, আরো একটা নামহীন হীরকখন্ড। এগুলো খুব পুরোনো। আক্ষরিক অর্থে কোনো দাম নেই। বেচে দিলেই ভালো।

নিলামের দিন তারিখ পাকা করা হলো। ঘোষকরা ঢোল নিয়ে পুরো ঢাকায় ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করল। নিলামের আগের দিন ভয়াবহ ভূমিকম্প হলো ঢাকায়। জিনিসগুলো আহসান মঞ্জিলের যেই ঘরে রাখা হয়েছিল ভূমিকম্পে মাটির সাথে গুড়িয়ে গেল ঘরটি। ধ্বংসস্তূপ থেকে সবকিছু উদ্ধার করা গেলেও হারিয়ে গেল নামহীন সেই হীরকখণ্ডটি। ১৮৮৮ সালের ওই ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল ঢাকার।

 

১৬. ধুপখোলা, ঢাকা

সোহেল আসলে বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে এসব ওর সাথে। সেদিন হঠাৎ করে পুলিশ দোকান থেকে ধরে নিয়ে গেলো। দুইদিন পর হাজত থেকে ছেড়ে দিলো। থানা থেকে বের হয়ে রাস্তায় হাঁটার সময় নীল একটা মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নিয়েছিল কারা যেন। তারপর কিছু জানে ন সে। এখন একটা গুদামঘরে পড়ে আছে। রোজ সকালে একজন এসে খাবার দিয়ে যায়। একেকদিন একেকরকম খাবার। আজকে এনেছিল মোরগপোলাও। খাবার যত ভালো হোক না কেন, লাভ নেই। খাবার দেয় দিনে একবার।

তনু খাঁ। ঢাকার স্মাগলারদের অন্যতম লিডার। শ্যামবাজারে সবজির চালানের ভিতর দিয়ে হিরোইন আনার কাজ করতো একসময়। ইসলামপুরের ব্যবসায়ী সেজে কাপড়ের লটের সাথে ফেনসিডিলও এনেছে বার কয়েক। ছোটখাটো এসব কাজকর্ম বেশিদিন করা লাগেনি তনুর। প্রথম দিকে তনু খাঁ কাজ করতো এক স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনারের সাপোর্টে। কমিশনার পরিচয় করিয়ে দেয় এমপি পদপ্রার্থীর সাথে। তখন ইলেকশনের সিজন। ওই এমপি ক্যান্ডিডেট তনু খাঁকে ইন্ডিয়া থেকে আগ্নেয়াস্ত্র আনতে পাঠায়। সেই থেকে অবৈধ পথে দেশের সীমানার ওইপাশে যাওয়া শুরু তনু খাঁর।

ইন্ডিয়ার রাঁচির এক গডফাদার ফারহানা হীরার খবর জানায় তনুকে । প্রধমে বিশ্বাস করেনি তনু । সে জানিয়েছিল এই হীরা ঢাকার সেন্ট্রাল জেলের পুকুরে আছে।একটা ইংরেজি বইদেখায় ওই গডফাদার। বলে ওই বইতে আছে হীরাটার কথা।হীরাটা যে হাতে পাবে নিঃসন্দেহে সে পৃথিবীর অন্যতম মহামূল্যবান সম্পদের মালিক হয়ে যাবে। দেশে ফিরে এসে হীরার খোঁজে নামে তনু খাঁ। ততোদিনে তার নাম হয়ে গেছে বুলেট খাঁ। কারণ বুলেট খুব পৈশাচিক পদ্ধতিতে মানুষ মারে। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে বা কোনো পল্টি নিলে তাকে ধরে এনে পাছায় সাপোাজিটারির মতো বুলেট ঢুকিয়ে দেয়।

বুলেটের নিজের সাঙ্গপাঙ্গদের বলে দিয়েছে হীরার কথা। যে যখন জেলে যাবে সে যেন হীরাটা আনার চেষ্টা করে। বুলেট নিজেও জেল খেটেছে অনেকবার। পুরান ঢাকার জেলে ছিলো একবার। পুকুরে নামার সুযোগ হয়নি তার। সাঙ্গপাঙ্গদের অবস্থাও এক। কেউ নামতে পারেনি। বুলেট এই হীরার আশা ছেড়েই দিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ একটা উড়ো খবরে আবার কাজ শুরু করে। বুলেটের আন্ডারে কাজ করা একটা ছেলে জেলগেটে দেখা করতে গিয়েছিল তার এক বন্ধুর সাথে। সেখানে সে হীরার আলোচনা শুনে এসেছে।

এক কয়েদির সাথে বাইরে দাঁড়িয়ে একজন কথা বলছিল। চিল্লাপাল্লার ভিতর বেশিকিছু শুনতে পারেনি। তবে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার পিছু পিছু গিয়ে তার ঠিকানা নিয়ে এসেছে। ‘ব্যাস, আর লাগে কী?’ এমনাই ভেবেছিল বুলেট। চোখ রেখেছিল ওই লোকের উপর। একদিন বিকালে ওই লোক বস্তি থেকে বের হয়ে করতলব খান মসজিদের সামনে আসলো। বুলেটের লোকজনও পিছন পিছন গেলো। খানিক পরেই পুলিশ এসে মসজিদের সামনের এক মুদি দোকানে রেইড দিলো। ধরে নিয়ে গেলো দোকানিকে। পুলিশ আসার কারণে লোকজনের ভিড় বেঁধে গেলো। আর ওই ভিড়ে হারিয়ে গেলো লোকটা। এই খবর আসার পরও হতাশ হয়নি বুলেট। ভেবেছিল যেই ছেলেটাকে পুলিশ ধরেছে ও ওই গ্যাংয়ের লোক। যেই গ্যাং হীরা খুঁজছে। তাই থানার বাইরে লোক বসিয়েছিল। কেউ না কেউ তো ছাড়াতে আসবে। কিন্তু দুইদিন পার হয়ে গেলে কেউ না আসায় বুলেট ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছে ছেলেটাকে। কিন্তু যেই লাউ সেই কদু। এই ছেলে কিছুই জানে না। বুলেট এত সহজে হাল ছেড়ে দিবে না। এই ঢাকায় বুলেটের আগে কেউ হীরা খুঁজে পাবে। সেটা সে হতে দিবে না। কখনই না।

 

১৭. জুরাইন, ঢাকা

জহিরুলের বাসায় আজ সকালে হঠাৎ করেই হাওলাদার এসে উপস্থিত। জহিরুলকে প্রেসে যেতে নিষেধ করার পর জহিরুলের সাথে আর কথা হয়নি হাওলাদারের। হঠাৎ বাসায় এসে উপস্থিত হওয়াতে খুব অবাক হয়েছে জহিরুল। তবে খুশিও নেহায়েত কম নয়।

এত বছরের চাকরি জীবনে এই প্রথম হাওলাদার জহিরুলের বাসায় এলো। কত কত বার কত কত অনুষ্ঠানে দাওয়াত করেছে, কত কত ভাবেই ডেকেছে। জহিরুলের বিয়ে কিম্বা মায়ের চল্লিশা কোনটাতেই হাওলাদার  আসেনি। আসার ইচ্ছাও কখনও প্রকাশ করেনি। সবসময় কাজের অজুহাত দেখিয়ে না বলে দিয়েছে।জহিরুল জানে আক্ষরিক অর্থে কোনো কাজ নেই হাওলাদারের। রাস্তা থেকে তুলে এনে এই পর্যায়ে নিয়ে আসলেও এখনও সেই কুলিই ভাবে জহিরুলকে। এত টাকা-পয়সা দিয়ে পালছে অন্য এক কারণে। কারণটা জহিরুলের কাছে স্পষ্ট না।হাওলারের জন্য যাত্রাবাড়ী মাছের আড়ৎ থেকে বড় মাছ আনা হয়েছে।হাওলাদারের মাছ খুব পছন্দ। জহিরুলের বউ রাঁধছে একদম কোমরে আঁচল বেঁধে। আর ছোট ছেলেটা দাদু দাদু করে খুশিতে এঘর ওঘর করছে। হাওলাদার ড্রয়িং রুমে বসে পত্রিকা পড়ছে। জহিরুলকে কথাগুলো কীভাবে বলবে সব গুছিয়ে নিচ্ছে মনে মনে।

জহিরুল রান্নার তদারকি করছে।আরো কি কি আইটেম যোগ করা যায় সেই পরামর্শ করছে বউয়ের সাথে।এই সময় হঠাৎ হাওলাদারের ডাক। তড়িঘড়ি করে দৌড়ে আসলো জহিরুল।

‘জি স্যার, কিছু লাগবে?’

‘জহির, এট্টু বও আমার ছামনে।’

‘জ্বি জ্বি বসলাম।’

জহিরুল বসার পর ইতিউতি করতে লাগলো হাওলাদার। কীভাবে কথা শুরু করবে বুঝতে পারছে না। গলার স্বর কিছুটা নামিয়ে আবার কথা শুরু করলো। রান্না ঘরে যেন আওয়াজ না যায়।

‘এহন যেইগুলা কমু। এইগুলা উচিত আছিলো আরো আগে কওনের। কিন্তু ছুযোগ অয় নাই। এলা কইতাচি। দিল লাগায়া হুনো।’

‘বলেন স্যার।’

কথা শুরু করলো হাওলাদার। একদম শুরু থেকে। প্রেসে বই পাওয়া। সেই বইয়ের পাঠোদ্ধার করা। হীরা খোঁজ পাওয়া। এত বছর অপেক্ষা করা। জেলে পাঠানোর জন্য জহিরুলকে বাছাই করা। টিপুর দেশে ফেরত আসা। এবং সবশেষে টোপ দিয়ে টিপুকে হাতেনাতে ধরা। এরপর নতুন আরেক পক্ষের আবির্ভাবের আশংকা আর সোহেলকে থানা থেকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটা বললো। ফিরোজ আর রিপন গ্রেপ্তার হওয়ার পর এখন পুলিশ জহিরুলকে খুঁজছে। জহিরুল ধরা পড়লে ধরা পড়ে যাবে হাওলাদরও। বিষয়টা শোনার পর চোয়াল শক্ত হয়ে এলো জহিরুলের। ছোট বাচ্চাটা তখন গাড়ি নিয়ে সামনে খেলছে। গা ঢাকা দিতে হলে কতদিন একে দেখা হবে না কে জানে। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগলো জহিরুলের।

 

১৮. বাংলাবাজার, ঢাকা

টিপু হাওলাদারকে সবিস্তারে জানিয়েছে হীরে সম্পর্কে তার যতটুকু ঘাটাঘাটি হয়েছে। হাওলাদারও বলেছে সে কতটুকু জানে। দুজন যখন মোটামুটি নিশ্চিত এই হীরার কোনো অস্তিত্ব নেই ঠিক তখনই নতুন এক তথ্য আবার আশা জাগিয়ে তুলেছে। তথ্যটা টিপুই দিয়েছে। হাওলাদার বিশ্বাস করেনি এখনও। টিপুকে বিশ্বাস করার প্রশ্নই আসে না। যখন তখন ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে টিপু। টিপু দেশে ফেরার পর মোটা অংকের টাকা খরচ করে কিছু লোক ভাড়া করেছিল। এরা স্থানীয় গুণ্ডা হিসাবেই পরিচিত। এর বাইরে কয়েকজন স্পাই লাগিয়েছিল এদিক সেদিক। গুণ্ডা ভাড়া করেছিল নিরাপত্তার জন্য।কারণ টিপু মনে করেছিল হাওলাদার জেনে গেছে সে পাথরের কথা জানে। এজন্য তাকে মেরে ফেলতে পারে। এই ধারণা যে অমূলক ছিল না তার প্রমাণ মিললো এখন।আর স্পাইগুলো একটাও কাজের না। এতবড় একটা চাল চাললো হাওলাদার। কেউ কোনো খবর দিতে পারলো না।

শিপলু নামে পাট কাঠির স্বাস্থ্যের ছেলে। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ভাতিজা। শিপলু ছেলেটা খুব কৌতুহলী। হীরার কথা জানার পর থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন আলাপ করতে চায় টিপুর সাথে। কই কই থাকতে পারে তাই নিয়ে কথা বলতে চায়। বেশিরভাগ সময় এড়িয়ে যায় টিপু। এসব কথা যত কম বলা যায় ততোই মঙ্গল। আর এরা হীরা বাগে পেলে কুকুরের মতো কামড়াকামড়ি করে শেষ করে ফেলবে। কেউ কাউকে নিতে দিবে না। টিপু আজকে সকালে এসে তথ্যটা দিয়েছে।

গেণ্ডারিয়ায় ব্রিটিশ আমলের একটা বাড়ি আছে। একাত্তরের পর থেকে কেউ থাকে না। বাড়িতে এক হিন্দু পরিবার ছিল। রাজাকারদের হাতে পুরো পরিবার খুন হয়। ওই পরিবার নাকি হীরাটি পেয়েছিল। বাড়ির মাঝখানে একটি কুয়া আছে। সবার মৃত্যু যখন আসন্ন তখন ওই কুয়াতে হীরাটি ফেলে দেয় কেউ একজন। রাজাকাররা পরে কুয়া থেকে হীরাটি উদ্ধরে চেষ্টা করে। কিন্তু হীরা উঠাতে গিয়ে উপুড় হয়ে পড়ে যায় একজন। অনেক গভীর কূপটি। ওই বাড়ীতে সাপের উপদ্রব খুব। স্থানীয়রা মনে করে ওটা আসলে হীরা নয় সাপের মনি ছিলো। তাই এখন সাপ পাহারা দেয়। এত পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু তারপরও জেলের পুকুর থেকে বিশ্বাসযোগ্য। উদ্ধারের চেষ্টা করা যেতে পারে। মিলে গেলে তো সোনায় সোহাগা।

হাওলাদার প্রথমে রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু এখন রাজি। কথা হয়েছে গেন্ডারিয়ার ওই বাড়িতে যাবে মোট পাঁচজন। টিপু আর হাওলাদের সাথে শিপলু আর ওর অনুগত দুইজন। হীরা পাওয়া গেলে তিনভাগ হবে। শিপলু নিশ্চয়তা দিয়েছে ওর সাথের দুইজন কোনো ভাগ দাবি করবে না। বৃহস্পতিবার রাতেই মিশনে নামবে। লোভে চকচক করছে হাওলাদারের চোখ। ড্রয়ারে তুলে রাখা নাইন এম এমটা এবার কাজে লাগবে। ওদিকে টিপুর সাথে শিপলুর চুক্তি হলো হাওলাদারকে ওই কুয়াতেই ফেলে দেওয়া হবে হীরা পাওয়া গেলে।

 

১৯. ফরাশগঞ্জ, ঢাকা

জহিরুল খুব শান্তিতেই আছে। প্রেসের কর্মচারী জাফরের চাচাতো ভাইয়ের বাসায় উঠেছে। ফরাশগঞ্জে বাসা। এখানে পুলিশের আসার কোনো সম্ভাবনাই নেই। জাফরের চাচার বাড়ি এখানে। এখানের স্থানীয়। ঢাকাইয়া কুট্টি বলা যায়। চাচাতো ভাইয়ের নাম মামুন। পোস্ট অফিসের কেরানী। বউটা খুব ভালো। নাম রোখসানা। ওরা নিঃসন্তান। জহিরুল এসে উঠার পর থেকেই সুযোগ পেলেই জহিরুলের সাথে গল্প জুড়ে দিচ্ছে রোখসানা। বিভিন্ন গল্প। বুঝাই যাচ্ছে খুব একাকী দিন কাটে রোখসানার। রোখসানাও অরজিনাল ঢাকাইয়া। ছুরিটোলায় বাপের বাড়ি ছিল। ছিল কারণ হলো এখন আর নেই কেউ।

এক বাপের এক মেয়ে রোখসানা। বাবা-মা দুজনকেই খুব ছোট থাকতে হারিয়েছে। সড়ক দূর্ঘটনায় একসাথে দুজন চলে গিয়েছে। চাচাদের কাছে মানুষ রোখসানা। চাচারা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছে রোখসানাকে। সহায় সম্পত্তির কিছুই দেয়নি। মামুনের মা মৃত্যশয্যায় ছিল বলে দ্রুত বিয়ে দেওয়ার জন্য মেয়ে খুঁজছিল মামুনের বাবা। বিয়ের দুইদিন পর মারা যায় মারা যায় রোখসানার শ্বাশুড়ি। রোখসানাকে একটা পাথর ছাড়া আর কিছুই দিয়ে যায়নি সে। কোনো কথাও বলতে পারেনি শাশুড়ির সাথে রোখসানা। জবান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এই বাড়িতে প্রথম পা দিয়ে সর্বপ্রথম শাশুড়ির শয্যার কাছে গিয়েছিল।

উঠতি কিশোরী তখন রোখসানা। হাতের মুঠিতে ধরে থাকা একটা পাথর রোখসানাকে দিয়েছিল সেদিন শ্বাশুড়ি। মামুন পাথরটা অনেকদিন নেওয়ার জন্য ঘুরেছে। এটা নাকি অনেক দামি পাথর। বিক্রি করলে অনেক টাকা পাওয়া যাবে। ওদের জীবন বদলে যাবে। রোখসানা এসব কানে নেয় না। এটাই শ্বাশুড়ির দেওয়া একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন। যত দামই হোক বিক্রি সে করবে না। মামুনের মা এটা তার শ্বাশুড়ি মানে মামুনের দাদির কাছ থেকে পেয়েছিল। সে পেয়েছিল তার শ্বাশুড়ির কাছ থেকে। এই পাথর সম্পর্কে এর থেকে বেশিকিছু জানে না রোখসানা। কথায় কথায় এগুলো জহিরুলকে বলে রোখসানা।

জহিরুলের এসব কথায় তেমন আগ্রহ নেই। রোখসানা কথা বলার সময় সে শুধু বুকের দিকে তাকিয়ে থাকে। শাড়ির আঁচল একটু সরে যাওয়ার অপেক্ষা করে। কুঁচির মাঝখান দিয়ে অন্যকিছু দেখার চেষ্টা করে। এই মেয়ে কেন তার বউ হলো না। আফসোস হয় প্রচুর। মনের ভিতর দুষ্ট বুদ্ধিও জাগে। পুরো বাড়িতে সারাদিন দুজন একাকীই থাকে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেয় জহিরুল। এখানে সে আশ্রিত। এরা ওকে সাহায্য করছে। জীবন বাঁচাচ্ছে। পাথরটা এবার হাতে নিয়ে এলো রোখসানা।

‘এই দ্যাখেন ভাই, এই পাথরটাই দিয়েছিল আমার শাশুড়ি।’ বলে পাথরটা হাতে তুলে দেয় জহিরুলের। হাতে নেওয়ার আগেই চোখ বড় বড় হয়ে যায় জহিরুলের। এটা তো হীরা। হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে থাকে। এটাই কি সেই ফারহানা? না বোধহয়। এখানে ওটা আসবে কীভাবে। ফার্সি ভাষার কয়েকটা অক্ষরে গুটি গুটি করে দুটো শব্দ  নিচে লেখা। পড়তে পারে না জহিরুল। ওখানে লেখা ‘মমতাজ’ আর ‘ফারহানা’।

 

২০. গেণ্ডারিয়া, ঢাকা

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আলগোছে নাইন এম এমটা পকেটে নিয়ে বের হলো হাওলাদার। শিপলু আর ওর লোকজন বিকাল থেকেই ওই বাড়ির সামনে। পাঁচটা বড় টর্চ, শাপ মারা আর ঝোপঝাড়ে চলার জন্য দুটো লাঠি গাড়িতে নিয়ে বের হলো টিপু। জহিরুল হঠাৎ ফোন করেছিল বিকালে। দ্রুত দেখা করতে চায়। খুব জরুরি কথা বলবে। হাওলাদার নিষেধ করে দিয়েছে। এখন দেখা করে বিপদে পড়ার কোনো মানে হয় না। জহিরুল আসবে আর পিছু পিছু আসবে পুলিশ। ওদিকে হীরা নিয়ে ভাগবে টিপু। কথাবার্তা, দেখা সাক্ষাৎ সব হবে। আগে হীরাটা পাওয়া যাক। তবে গেণ্ডারিয়ার বাড়িটার এড্রেস দিয়ে দিয়েছে। শুক্রবার সকালে যদি হাওলাদার ফোন না করে তাহলে যেন জহিরুল ওই বাড়িতে একবার খোঁজ নেয়। সাথে পিস্তল নিলেও টিপুকে বিশ্বাস করতে পারছে না হাওলাদার। তাছাড়া তিনটে মাস্তান টিপুর ভাড়া করা। ওরাও সুবিধাজনক না। রাত বারোটার আগ পর্যন্ত আশেপাশে ঘুরাঘুরি করেছে সবাই। গেণ্ডারিয়ার স্টেশনে বসে আড্ডা দিয়েছে। সোনামিয়ার মিষ্টি খেয়েছে। মৌসুমি লাচ্ছি খেয়েছে। আবির বেকারিতে গিয়ে ঝালরুটি খেয়েছে।

আসলে কেউ কাউকেই বিশ্বাস করছে না। সবাই শেষরাত হিসাবেই ধরে নিয়েছে। তাই যতটুকু সম্ভব ফূর্তি করে নিয়েছে। বারোটার পর বাড়ির গেটে সর্বপ্রথম ঢুকলো শিপলুর দুই চাল্লি। আশেপাশে পরখ করে ঢুকে পড়লো টিপু তারপর হাওলাদার এবং সবশেষে শিপলু। খুব ছোট্ট একটা গেট দিয়ে ভিতরে ঢোকার পর টর্চ জ্বালালো টিপু। দুটো ঘর পার হয়ে সামনে উঠান।ওখানেই হয়তো কূয়াটা।কিন্তু ওই পর্যন্ত যাওয়া খুবই মুশকিল।ছাদের ইট খসে খসে পড়ছে। নিচে ঘন ঝোপ। টর্চ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে সবাই। হঠাৎ চোখ আটকে গেলো টিপুর। উঠানের দিকে গিয়েছে অনেকগুলো পদছাপ। সবুজ গুল্মলতা মাড়িয়ে গিয়েছে। ছাপ একদম স্পষ্ট। বিষয়টা হাওলাদারের চোখেও পড়লো। ততোক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। ওদের দুজনের কপালে পিস্তলের নল ঠেকে গেছে। পিছন থেকে ফ্যাসফ্যাসে কন্ঠে শিপলু বলছে, ‘সোজা আগা। পালানোর চেষ্টা করবি না।’

বাধ্য ছেলের মতো সামনে আগাচ্ছে টিপু আর হাওলাদার। দুজনই একে অপরকে এখনও সন্দেহ করছে। একজন অপরজনের দিকে কটমট করে তাকাচ্ছে। কিন্তু একটু পরেই সব দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে গেলো। বুলেট চেয়ার পেতে বসে আছে উঠোনে। ওর পিছনে দাঁড়িয়ে আছে দশ বারোজন মুখোশ পরা ছেলে। বুলেটের ঠোঁটে বাঁকা হাসি।

‘প্রফেসর সাব আর পাবলিশার সাব। হীরার খনিতে স্বাগতম।’ নিচু স্বরে ব্যাঙ্গাত্মক স্বরে বললো বুলেট। হাওলাদার আর টিপুর হাত পা আর মুখ ততোক্ষণে বেঁধে ফেলেছে শিপলুর দুই সহকারী। প্লানটা এত ভালো কাজ করবে ভাবতেও পারেনি বুলেট। শিপলু পাড়ার মাস্তান থেকে শিফট হয়ে বুলেটের গ্যাংয়ে ঢুকেছিল নতুন। তখনই টিপু খোঁজ পায় ওর। আর ভাড়া করে। গ্যাংয়ে ঢোকার পরপরই হীরার বয়ান শুনেছিলো শিপলু। টিপুর কাছে শোনার পর দুইয়ে দুইয়ে চার মিলায়। ভেবেছিল নিজেই খুঁজে বের করবে হীরা।কিন্তু টিপু মুখ খুলতেই চায় না। বাধ্য হয়ে বলে দিয়েছে সব বুলেটকে। এরপর বুলেটের এই প্রস্থান।

বুলেটের ধারণা হীরা কই আছে তা জানে এই দুইজন। রাত একটার দিকে নীল রঙের মাইক্রোতে হাওলাদার আর টিপুকে বুলেটের আস্তানায় নিয়ে আসা হলো। প্রথম ঠাণ্ডা মাথায় হীরার অবস্থান জানতে চাইলো বুলেট। দুই বন্ধুও ঠান্ডা মাথায় উত্তর তারা এখনও জানে না। ঘন্টাখানেক জেরার পর বিরক্ত হয়ে গেলো বুলেট। প্রথমে হাওলাদার তারপর টিপুর পাছায় বুলেট ঢুকিয়ে দিলো।

রাত বাড়ার সাথে বাড়তে থাকলো যন্ত্রণা। শেষ রাতের দিকে পায়ে গুলি করা হলো দুজনের। তখনও ওরা বলতে থাকলো কিছুই জানে না। ফজরের আগে দুই বন্ধু একসাথে উড়ে গেলো আকাশে। দুটো লাশ ফেলে দিয়ে আসতে বলা হলো বুড়িগঙ্গায়। ফজরের পর পর একটা ম্যাসেজ আসলো হাওলাদারের মোবাইলে। মোবাইলটা বুলেটের হাতে তুলে দেওয়া হলো। ম্যাসেজটা পাঠিয়েছে জহিরুল। ‘স্যার, একটা হীরার খোঁজ পেয়েছি। দেখা করে বিস্তারিত বলবো।’ নিভু নিভু সলতেতে দপ করে আগুন জ্বলে উঠলো। বুলেট ধরেই নিয়েছিলো হীরাটা পাওয়া যাবে না। জহিরুলকে পোস্তগোলা ব্রিজের সামনে আসতে বলে দলবল নিয়ে বের হলো বুলেট।

 

২১. ফরাশগঞ্জ

ক.

রোখসানা বুঝতে পারলো জহিরুলের লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে পাথরটার উপর। নেড়ে চেড়ে চোখ বড়বড় করে যেভাবে দেখছিল। রাতে মামুন ফেরার পর মামুনকে জানালো রোখসানা সে পাথরটা বিক্রি করতে চায়। রোখসানার মুখে পাথর বিক্রির কথা শুনে চমকে গিয়েছিল মামুন। কেন বিক্রি করতে চায় জিজ্ঞেস করলে রোখসানা বলেছে এভাবে আর কতদিন চলবে সংসার। অভাবের সংসার অনেক হয়েছে এবার একটু সুখ চায় সে। এটা বিক্রি করে একটা সীতা হার বানাবে। আর দুটো বালা। রোখসানার ধারণা সুযোগ পেলে পাথরটা হাতিয়ে নিবে জহিরুল। তাই বিক্রি করাটাই ভালো। স্মৃতি সংরক্ষণ অনেক হলো। শুক্রবার সকালে জহিরুল বাসা থেকে বের হওয়ার পরপরই পাথর বিক্রি করতে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে রোখসানা।

খ.

পোস্তগালা ব্রীজের সামনে আধঘন্টা দাঁড়িয়ে আছে জহিরুল। হাওলাদেরর ফোনে কল দিচ্ছে। কল হয় কিন্তু রিসিভ করে না। রাস্তার অপর পাশে একটা নীল রঙের মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে আছে অনেকক্ষণ যাবত। মাইক্রোবাসের সামনের দরজা দিয়ে একজন বের হলো। মনে হলো হাতের ইশারায় ডাক দিলো জহিরুলকে। জহিরুল প্রথমেও দেখেও দেখলো না। দ্বিতীয় বার লোকটা জহিরুলের নাম ধরে ডাক দিলো। ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো জহিরুল। রাস্তা পার হয়ে গেলো মাইক্রোবাসটার কাছে।

‘আমাকে ডাকছেন?’

‘ হ্যাঁ। হাওলাদার স্যার আপনাকে নিয়ে যেতে পাঠিয়েছে। গাড়িতে উঠুন।’

খুব অবাক হলো জহিরুল। পরক্ষণেই ভাবলো নিরাপত্তার জন্য হয়তো। গাড়ির জানালায় কালো গ্লাস। বাইরে থেকে কিছু দেখা যায় না। গাড়িতে উঠে বসলো জহিরুল। উঠার পরপরই বুঝতে পারলো বড় ধরণের ভুল হয়ে গিয়েছে। ততোক্ষণে তিন চারটে রিভালবাল ঠেকে গেছে মাথায়। পাশের আসনে বসে থাকা বুলেট প্রশ্ন ছুড়লো ‘হীরা কোথায়? কোনদিকে যাবো আমরা? ‘ফরাশগঞ্জ’ ভদ্র ছেলের মতো উত্তর দিলো জহিরুল। চোখের সামনে ভেসে উঠলো ছেলের মুখ। নিষ্পলক তাকিয়ে আছে ওর দিকে।

গ.

রোখসানার হঠাৎ কেমন যেন শরীর ঝাড়া দিয়ে উঠলো। মামুন গেছে বাজারে। খুব খারাপ লাগছে শরীরটা।

ঘ.

মামুনের বাড়ির সামনে গাড়ি আসে না। চিপা গলি। একটু দূরে গাড়ি রেখে স্বাভাবিক ভাবেই হেঁটে আগালো বুলেট আর ওর দলবল। আসার পথে সব বলে দিয়েছে জহিরুল। ভুল হওয়ার কোনো কারণ নেই। জহিরুলের লাশটা গাড়ির ভিতরেই শোয়ানো। গাড়ির ভিতর রক্তারক্তি ভাল্লাগে না বুলেটের। তাই শ্বাসরোধ করে মেরেছে। জহিরুল বলেছিল বাড়িটা একতলা। গলির একদম কুরুতেই বাড়ি। একদম গলির মুখেই দরজা।

সাতসকালে এতগুলো লোকজন গাড়ি নিয়ে এসেছে দেখে অনেকে উৎসুক চোখে তাকাচ্ছে। ওদিকে পাত্তা না দিয়ে দরজায় কড়া নাড়লো বুলেট। ভেতরে কোনো শাড়া শব্দ নেই। মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করে আবারো কড়া নাড়লো। কেউ আসলো না। পুরোনো কব্জা দরোজার। জোরে ধাক্কা দিতেই মড়াৎ করে ভেঙে গেলো। দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকতে দেখে বাইরে লোকজন ভিড় হয়ে গেলো।

বুলেট পিস্তল বের করে দেখালো সবাইকে। এখান থেকে সরে যেতে বললো। মুহূর্তেই খালি হয়ে গেলো জায়গাটা। যে যার মতো পালিয়ে গেলো। উৎসুক জনতার ভিতর একজন একটু দূরে গিয়ে থানায় ফোন করলো। ভিতরে ঢুকলো সবাই হুড়মুড় করে। ঢুকেই ড্রয়িং রুম। ড্রয়িং রুম পার হলে ছোট্ট একটা করিডোর। ডানপাশে রান্নাঘর। বামপাশে বেডরুম। বুলেট দেখলো বেডরুমে খাটের এক মহিলা ঘুমিয়ে আছে। এই মহিলাই তবে রোখসানা। শব্দ করে ঢুকলো রুমে বুলেট। মহিলার খুব ভাঙলো না। সামনে গিয়ে ঝুঁকে দেখলো নির্জীব। নিশ্বাস বন্ধ। একদম ঘুমের মতোই শুয়ে আছে। মাথায় রক্ত উঠে গেলো বুলেটের। তার আগেই কেউ একজন এসেছিল। পুরো বাড়ি তছনছ করলো ওর লোকজন। কোথাও হীরে পাওয়া গেলো না। মহিলার শাড়ি উল্টেপাল্টে দেখলো বুলেট। কোথাও কোনো যখম নেই। স্বাভাবিক মৃত্যুই মনে হচ্ছে। হীরাটা নিলো কে? আরও কেউ জানে নাকি?

 

পরিশিষ্ট

লালবাগ কেল্লার দেয়ালের পাশে খেলছে তিন চারটে বাচ্চা। রাস্তায় দিন কাটে ওদের। কারও মা বুয়ার কাজ করতে গেছে অথবা কারও বাবা-মা কেউ নেই। দেয়ালের পাশে বালুর ঢিবি। চুম্বুক দিয়ে লাল বালু তুলছে। সবার হাতে চুম্বুক। কিন্তু একটা বাচ্চার হাতে ঝলমলে একটা পাথর। সূর্যের আলোতে ঝকঝক করছে। আলোর প্রতিবিম্ব বালুর ওপর পড়ছে।একটু পরপর পাথরটায় চুমু খাচ্ছে বাচ্চাটা। পাথরের নিচে ছোট ছোট করে আরবির মতো লেখা। আরবি লেখায় চুমু খেতে হয়।

 

ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১