অটোমান সাম্রাজ্য বা উসমানি খেলাফত—ইউরোপ জুড়ে প্রবল প্রতাপে এক সময় ছড়ি ঘুরিয়েছে মহান এই মুসলিম রাজবংশ। অটোমান সাম্রাজ্য বলতে বর্তমান তুরস্ককে বোঝায়। অটোমান সাম্রাজ্যের মতো এত বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে শাসন সেই সময়ে অন্য কোনো সাম্রাজ্যের ছিল না, যে কারণে অটোমান সুলতান প্রথম সুলাইমানকে বলা হতো পৃথিবীর বাদশাহ। অটোমান সাম্রাজ্য ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বেশিদিন টিকে থাকা সাম্রাজ্য। ইউরোপ থেকে শুরু করে এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল অটোমান সাম্রাজ্য। উসমানি খেলাফতের বীর-বাহাদুরি নিয়ে যেমন অনেক গল্প আছে, তেমনি এ সালতানাতের হেরেম নিয়েও আছে নিদারুণ রহস্য।
অটোমান সংস্কৃতির এই রহস্যময় অংশ দূর প্রাচ্য থেকে সুদূর পশ্চিম—সব জায়গার মানুষের কাছে এক গোপন আগ্রহের বিষয়। আক্ষরিকভাবে, হারেম মানে হচ্ছে মুসলিম ধনাঢ্য বাড়ির মহিলামহল। ইসলাম ধর্মের নির্দেশানুযায়ী মুসলিম নারীদের অনাত্মীয় পুরুষের সামনে আসা নিষিদ্ধ। অনেকটা সেকারণেই অটোমান ধনাঢ্য ব্যক্তিরা তাঁদের স্ত্রীবর্গ, সন্তান আর দাস-দাসীদের জন্য গড়ে তোলেন এই অন্দরমহল।
‘হারেম’ শব্দটিকে কখনো কখনো ‘হেরেম’-ও বলা হয়। তবে মূল অর্থ একই। ‘হারেম’ শব্দটি তুর্কি হলেও হিব্রু ‘হেরেম’ এবং গ্রিক ‘হারেমিও’-এর সমগোত্রীয় শব্দ এটি। আবার তুর্কি শব্দটির উৎপত্তি আরবি শব্দ থেকে। আরবি ‘হারাম’ শব্দ থেকেই হেরেমের উদ্ভব। আরবি ‘হারাম’ শব্দের আভিধানিক অর্থ নিষিদ্ধ বা অলঙ্ঘনীয় সীমারেখা। তুর্কি ভাষায় হারেম বোঝানো হয়েছে মহিলাদের বসবাসের নিরাপদ স্থান—যেখানে পরপুরুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ। হিব্রু ভাষায় হেরেম-এর অর্থও একই। গ্রিক শব্দ হেরেমি-এর অর্থ গোত্রচ্যুতকরণ।
মূলত আরবি ‘হারাম’ শব্দটিকে তুির্করা খানিকটা সহনীয় করে হারেম-এ পরিণত করে। এরপর যোগ করে ‘লিক’। ফলে তুর্কি শব্দটি দাঁড়ায় ‘হারেমলিক’। বাড়ির যে অংশে মহিলারা থাকেন তুর্কিতে সেই স্থানকে ‘হারেমলিক’ বলা হয়। এই উপমহাদেশে হারেম নামে পরিচিত হলেও ইউরোপীয়দের কাছে হারেম হচ্ছে ‘সেরালিয়ো’। এখানে ইতালিয়ান ও ফারসি ভাষার অদ্ভুত এক সম্মিলন ঘটেছে। ইতালিয়ান ভাষায় ‘সেররালিয়োন’ মানে হচ্ছে ‘বন্য প্রাণীর খাঁচা’। ‘সেররালিয়ো’ এসেছে ফারসি ‘সেরা’ থেকে। তবে ফারসি ‘সরা’ ও ‘সরাই’ মানে হচ্ছে ভবন বা প্রাসাদ বিশেষ। মূলত এই শব্দের সঙ্গে মিলিয়েই এমন অদ্ভুত নামকরণ। অবশ্য ১৬৩৪ সালে হারেম শব্দটি ইংরেজি ভাষার অন্তর্ভুক্ত হয়।
তবে সব শব্দের অর্থ মোটামুটি একই ধরনের, যার অর্থ নিষিদ্ধ। অন্যভাবে বললে এর অর্থ হচ্ছে নিষিদ্ধ বা গোপনীয় স্থান। রাজপ্রাসাদের যে আলাদা অংশে শাসকের মা, বোন, স্ত্রী, কন্যা, নারী-কর্মচারী, উপপত্নী প্রমুখ বাস করতেন তা হারেম, হারিম বা হেরেম নামে অভিহিত হতো। বহিরাগতদের হারেমে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। হারেমকে মহল, জেনানা, হেরেম-সারা, হেরেম-গাঁ, মহল-সারা, রানীবাস ইত্যাদি নামেও আখ্যায়িত করা হতো।
অটোমান সাম্রাজ্যের হারেম পরিচিত ছিল ‘সেরাগ্লিয়ো’ নামে। সেরাগ্লিয়োতে অটোমান সম্রাটের স্ত্রী ও উপপত্নীরাই বসবাস করতেন। সঙ্গে থাকতেন রাজার মনোরঞ্জনের জন্য কংকুবাইন ও দাসীরা।
অন্তঃপুরের নারীদের থাকার জায়গা হিসেবে যার শুরু, এর বিবর্তন কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রহস্য। সাধারণের জন্য নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে ‘হারেম’ সব সময়ই ছিল মানুষের চিরন্তন আগ্রহের কারণ। তবে হারেম মানেই কেবল রাজা-বাদশাহদের মনোরঞ্জনের জায়গা নয়, পেছনে রয়েছে অনেক গল্প, অনেক কাহিনি।
অটোমান হারেমে কঠোর নিয়ম ছিল। এই নিয়ম এতটাই কঠোর ছিল যে, খুব নিকটাত্মীয় না হলে মহিলাদের পর্যন্ত হারেমে প্রবেশ করতে দেয়া হতো না। সুলতান ব্যতীত অপরাপর সকল পুরুষের সেরাগ্লিয়োতে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। তবে হারেমে বসবাসরত নারীদের পুত্র, স্বামী, ভাই ও পিতার ক্ষেত্রে এই নিয়ম কিছুটা শিথিল ছিল। রাজ্যের শিশুদের ক্ষেত্রে বয়স ১৬ হওয়ার আগ পর্যন্ত হারেমে থাকার সুযোগ ছিল। এই সময়টাতে তারা হারেমে সাধারণ শিক্ষা, রাজ্য পরিচালনার কলাকৌশল, ভাষাশিক্ষা, সাংস্কৃতিক শিক্ষা, সমরবিদ্যাসহ সব ধরনের শিক্ষা গ্রহণ করত। অটোমান আমলে হারেমের উদ্দেশ্য ছিল রাজপরিবারের কন্যাশিশুদেরকে প্রচলিত সাংস্কৃতিক ধারায় এবং সঠিক শিক্ষায় বড় করা। হারেমের অভ্যন্তরে থাকা সকল নারী ও দাসীদের ক্ষেত্রেও একই রকম শিক্ষাদানের ব্যবস্থা ছিল।
ইতিহাস-বিখ্যাত তোপকাপি হারেম ছিল অটোমান রাজপ্রাসাদের বিশেষ একটি অংশ। এটি সুলতানের পরিবারের মহিলাদের একান্ত স্থান। হারেমের আরও একটি উদ্দেশ্য ছিল—কন্যাশিশুরা যেন সেখানে অবস্থানরত মহিলাদের কাছ থেকে রাজকীয় আদর্শ শিখতে পারে এবং ভবিষ্যতে যেন কোনো রাজকীয় ও বিখ্যাত ব্যক্তির স্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে। এখানে তাদের বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাও গ্রহণ করতে হতো। কারণ ভবিষ্যতে রাজপরিবারের স্ত্রী হয়ে তাকে জনগণের সম্মুখে আসার সম্ভাবনা থাকত। অটোমান হারেমের অনেক মহিলাই বিশেষ করে সুলতানের স্ত্রী, মাতা কিংবা কন্যারা রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রেখেছেন। কিছু কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন অটোমানদের আমলে এক সময় গোটা শাসনব্যবস্থাই হারেম-নির্ভর হয়ে পড়ে।
এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় অটোমান শাসনের সবচেয়ে সফল শাসক সুলতান সুলাইমানের শাসনকাল বিশ্লেষণ করলে। ইউরোপীয়দের কাছে তাঁর পরিচয় সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট হিসেবে। সর্বকালের সেরা অটোমান শাসক সুলাইমানের একজন স্ত্রী ছিলেন হুররেম সুলতান। সাধারণ একজন দাসী থেকে সুলতানের স্ত্রী হয়ে রাজ্যশাসনে বিশাল প্রভাব রেখেছিলেন হুররেম। বিশ্ব ইতিহাসে এই ঘটনা এখনো বিস্ময়ের জন্ম দেয়। শুধু সুলাইমানের আমলেই নয়, এর আগে-পরেও হারেমের নারীদের প্রভাব চোখে পড়বে ইতিহাসের অন্দরে হাঁটলেই। অটোমান সম্রাট দ্বিতীয় সেলিমের স্ত্রী ও সম্রাট চতুর্থ মুরাদের মাতা কুসেম সুলতানও দারুণ প্রভাবশালী ছিলেন।
অটোমান হারেমেরই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল হারেমে বসবাসকারী একটি বিশেষ গোত্রীয় মানুষ বা খোজা। এরা প্রাচীন ও মধ্যযুগে রাজকীয় হারেমে বা জেনানামহলে প্রহরী, কর্মী ও কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত থাকত। হারেমের পাহারার কাজে আফ্রিকা থেকে নিয়ে আসা হতো খোজা দাসদের। সেই সঙ্গে অন্যান্য দাসীরা সুলতান ও রাজপরিবারের সদস্যদের সেবা ও সুলতানের সেবায় নিয়োজিত ছিল। এই খোজা ও দাসীদের সকলেরই বসবাস ছিল হারেমের ভেতরে।
এদেরকে কিশোর এবং শিশু অবস্থায় নিয়ে আসা হতো। তারপর তাদের ক্যাস্ট্রেশন অর্থাৎ প্রজনন-অঙ্গ কেটে ফেলা হতো, যাতে তাদের সন্তান জন্ম দানের ক্ষমতা না থাকে। ফলে হারেমের নারীদের পাহারাদার ও কর্মচারী হিসেবে এদের চেয়ে উপযুক্ত আর কেউ ছিল না।
সব ক্ষেত্রেই খোজারা সাধারণত চাকর বা দাস শ্রেণির ছিল। তাদের দিয়ে ক্ষমতাসীন লোকদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই তাদেরকে খোজা বানানো হতো। সেই প্রাচীন আমল থেকেই রাজকীয় কোর্ট কিংবা প্রাসাদের অন্দরমহল—যেখানে কেবল রাজা ব্যতীত অন্যান্য পুরুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল সেখানে রাজা ও অন্যান্য নারীদের পাহারা নিশ্চিত করার জন্য খোজা প্রহরীর প্রয়োজনীয়তা ছিল অপরিহার্য। শুধু হারেম পাহারা নয়, আসলে খোজাদের অনেক কাজই করতে হতো। যেমন প্রভুর বিছানা তৈরি, গোসল করানো, চুল কাটা, পালকি টানা, মলমূত্রের পাত্রবহন করা ইত্যাদি কাজ তারা আঞ্জাম দিত। কোনো কোনো বিশ্বস্ত খোজাকে দিয়ে চরের কাজও করানো হতো।
খোজারা কেবল শাসকের নিকটই অনুগত ছিল। সরাসরি শাসক ব্যতীত রাজ্যের অন্য কোনো উঁচু পদের কর্মচারী বা প্রশাসক হলেও খোজাদের নিকট খুব বেশি পাত্তা পেতো না। খোজারা রাজা বা প্রভু-অন্তঃপ্রাণ থাকত। এমনকি কোনো কোনো খোজা কোনো কোনো রাজার জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিল। তারা তাদের বিশ্বস্ততার গুণটিকে খুবই সম্মান এবং মর্যাদার মনে করত। যেহেতু এদের জৈবিক চাহিদা বলতে কিছুই ছিল না, সেহেতু এদের ব্যক্তিগত বংশপ্রতিষ্ঠা বা সংসারস্থাপনের ব্যাপারে কোনো ইচ্ছা ছিল না। তাদের শারীরিক অক্ষমতার কারণেই সমাজে তাদের অবস্থান ছিল খুব দুর্বল। এই দুর্বলতার কারণে তাদেরকে প্রচুর নির্যাতন সহ্য করতে হতো। কখনো কখনো খুব তুচ্ছ কারণে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হতো, এমনকি হত্যাও করা হতো। তারা এতই সহনশীল ছিল যে, এরপরও খোজাদের মধ্যে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতো না। তবে অনেকেই স্বেচ্ছায় এই পদ চাইতেন। কারণ একটাই, উচ্চপদ লাভ।
হেরেমের প্রতিষ্ঠান, খোজা এবং নারীদের দেখভালের জন্য নিয়োজিত থাকতেন একজন প্রধান খোজা। তুর্কি ভাষায় যাদের বলা হতো কিজলার আগাসি বা প্রধান কালো খোজা। তিনি মূলত হেরেমের নারীদের প্রধান বা মাস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
তুর্কি হারেমে খোজাদের দারুণ ভূমিকা ছিল। তাদের হারেমে দু’ধরনের খোজা ছিল-কৃষ্ণাঙ্গ খোজা, শ্বেতাঙ্গ খোজা। কৃষ্ণাঙ্গরা মূলত আফ্রিকার। তারা হেরেমের নারী, অন্যান্য কর্মকর্তা ও নিচুশ্রেণির বাঁদিদের দেখাশোনা করত। তোপকাপি প্রাসাদের শ্বেতাঙ্গ খোজারা ছিল মূলত ইউরোপীয় বলকান এলাকার। যা এখনকার বুলগেরিয়া-রুমানিয়া। শ্বেতাঙ্গ খোজারা তোপকাপি প্রাসাদের বিদ্যালয়ের দেখভাল করত। তবে ১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দের পর এরা আর হারেমের ভেতরে ঢোকার অনুমতি পায়নি।
তবে তুরস্কের প্রাসাদের খোজারা তুির্ক ছিলেন না। এদেরকে বাইরে থেকে আনা হতো। কারণ ইসলামে কাউকে জোরপূর্বক কিংবা স্বেচ্ছায় খোজা বানানো নিষিদ্ধ। তাই অটোমান সম্রাটরা যখন কোনো খ্রিষ্টান দেশ জয় করতেন, তখন তারা সেখান থেকে সাদা ও কালো চামড়ার খোজা নিয়ে আসতেন। প্রধানত মিশর, আবিসিনিয়া, সুদান প্রভৃতি স্থান থেকে খোজাদের সংগ্রহ করা হতো। অটোমান সাম্রাজ্যের দরবার ও হারেমে ৬০০ থেকে ৮০০ খোজা ছিল বলে জানা যায়। অটোমান দরবারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল প্রধান কৃষ্ণকায় খোজার। এদের বলা হতো—চিফ ব্ল্যাক ইউনাখ। চিফব্ল্যাক ইউনাখ ছিল হারেমের গুপ্তচর নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে। আর যে কোনো ধরনের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। হারেমের সকল নারী, খোজা এবং দরবারের অনেকেই তাকে খুব সমীহ করে চলতেন। হারেমের নারীদের নিরাপত্তার বিধান করা তার প্রধান কাজ হলেও সে রাজকীয় অনুষ্ঠানের তদারকি কিংবা হত্যার জন্য কোনো মেয়েকে হত্যাকারীর নিকট নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি কাজ করত।
মধ্যযুগে মুসলিম এবং তুর্কি রাষ্ট্রগুলোতে উপঢৌকন হিসেবে খোজা প্রেরণ করা শুরু করেন অটোমান সুলতান প্রথম মুহাম্মদ। এর পরে মুহাম্মদের উত্তরসূরিরা এই প্রথা অক্ষুণ্ন রাখেন।
১৭ ও ১৮ শতকে কোনো কোনো খোজা খুব শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। প্রভাবশালী এসব খোজা সুলতানের সাথে সরাসরি সাক্ষাতও করতে পারত। এমনকি কোনো কোনো খোজা-প্রধানদের সুলতানের পরিবারে প্রবেশের অধিকারও ছিল। প্রধান কালো খোজা অনেকসময় উজিরের অনুপস্থিতিতে দ্বিতীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করত। উজির যদি কোনো কাজে বাইরে অবস্থান করতেন কিংবা সেনাবাহিনী নিয়ে দরবার থেকে দূরে অবস্থান করতেন তখন প্রধান খোজাই তাঁর হয়ে দায়িত্ব পালন করত। প্রধান খোজা সুলতানের ঘুমাবার কক্ষেও প্রবেশ করতে পারত। এমনকি প্লাস আল্ট্রা অর্থাৎ হেরেমের নারীদের শোবার কক্ষেও তার অবাধ প্রবেশাধিকার ছিল। প্রধান কালো খোজা কখনো কখনো সেনাবাহিনীর বিশেষ ইউনিট হালবারডিয়াস-এর নেতৃত্ব দিত। অটোমান সাম্রাজ্যের জেনারেল বা গভর্নর মর্যাদার পদ ‘পাশা’-তেও অনেক খোজার নিয়োগ দৃশ্যমান ছিল।
অটোমান সাম্রাজ্যে প্রধান শ্বেতাঙ্গ খোজাকে বলা হতো কাপি আগাসি। হেরেমে এবং দরবারের ভেতরে ৩০০ থেকে ৯০০ সাদা খোজা কাজ করত। তারা সাধারণত প্রশাসন সংক্রান্ত বিষয়াদি, সংবাদ আদান-প্রদান, মামলা মোকদ্দমার কাজ, সুলতানের কাছে প্রেরিত রাষ্ট্রীয় নথিপত্র দেখভালের কাজ করত। খোজাদের প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ স্কুলের প্রধান হিসেবেও প্রধান সাদা খোজা কাজ করত। এ ছাড়া প্রাসাদের ফটকের প্রধান, চিকিৎসা-প্রধান এবং রাজকীয় অনুষ্ঠানের সমন্বয় সাধনেও সাদা খোজাদের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। সকল সাধারণ সাদা খোজা প্রধান খোজার অধস্তন হিসেবে কাজ করত। প্রধান সাদা খোজা অনেকসময় সুলতানের সাথে একান্তে আলাপ-আলোচনারও ক্ষমতা রাখত। ধীরে ধীরে সাদা খোজাদের প্রভাব বাড়তে থাকলে তা নজরে আসে সুলতান তৃতীয় মুরাদের। তিনি সাদা খোজাদের ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে হ্রাস করে কালো খোজাদের নিকট বিলিয়ে দেন।
অটোমান সাম্রাজ্যের শেষদিকে এসে কালো ও সাদা উভয় খোজাই প্রবল ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। রাজনৈতিকভাবে এসব খোজারা প্রভাব কায়েম করতে গিয়ে প্রায়শই সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করত। শেষদিকে এদের প্রভাব ও ক্ষমতা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকলে তার লাগাম টেনে ধরেন মুরাদ-পরবর্তী সুলতানগণ। আর এরই সাথে অটোমান সালতানাতে খোজাদের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে থাকে।
হারেমে আরও যা পদ ছিল
ভ্যালিদে সুলতান (সুলতানের মা) : ইনি হচ্ছেন হারেমের শাসনকর্ত্রী এবং সুলতানের পরেই তাঁর অবস্থান। অনেক সময় যেহেতু সুলতানেরা অল্পবয়সে সিংহাসনে আরোহণ করতেন সেহেতু গোটা সাম্রাজ্যেরই ক্ষমতা থাকত ভ্যালিদে সুলতানের হাতে।
হাসেকি সুলতান : সুলতানের প্রিয়তমা।
খাদিম এফেন্দি : সুলতানের প্রথম সন্তানের মা।
ইকবালার : প্রথম সন্তানের জন্ম হওয়ার পর সুলতানের অন্য সন্তানদের জন্ম দিতেন এসব মহিলা। তাঁদেরকে সুলতানের স্ত্রী হিসেবেই গণ্য করা হতো।
হারেমের নতুন সদস্যার জীবনের লক্ষ্য থাকতো একটাই, আর তা হলো সুলতানের আকাঙ্ক্ষার বিষয়ে পরিণত হওয়া। সুতরাং সে লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাঁরা আকর্ষণীয় পোষাক পরতেন, অলংকার পরতেন, এবং যদি কোনোভাবে সুলতানের দৃষ্টি আকর্ষণের সুযোগ পেতেন তবে তাঁদের ব্যক্তিত্বের আকর্ষণীয় ক্ষমতাটা যেকোনোভাবে প্রদর্শনের চেষ্টা করতেন। কারণ, হয়তো এখান থেকেই তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধরের পত্নী হয়ে যেতে পারেন।
বসফরাস প্রণালির কাছে অবস্থিত রাজপ্রাসাদ তোপকাপি সাম্প্রতিক সময়ে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হলেও একশ’ বছরেরও কম সময় আগে তা ছিল এক সুলতানের আবাস, তাঁর হারেম, তাঁর সভাসদদের পদচারণায় মুখর।
অধিকাংশ মানুষের প্রাসাদের এই অংশে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। আগে তো সুলতানের প্রাসাদ থেকেও এটি পৃথক ছিল, কিন্তু এই নিয়ম বদলে যায় সুলতানের উপর এক নারীর প্রভাবে। যাঁর নাম ছিল রোক্সলানা, আর সুলতান তাঁকে ডাকতেন হুররেম বলে। অ্যান্ড্রু কোল্ট তাঁর বইতে লিখেছেন—‘যখন আগুন পুরনো সেরাগলিওর (পুরনো প্রাসাদ) ব্যাপক ক্ষতি করল, রোক্সেলেন এই সুযোগটা কাজে লাগালেন নতুন প্রাসাদে বসবাসের অনুমতি চেয়ে, যা তোপকাপি নামে পরিচিত ছিল এবং যা সুলতানের দরবার ও রাজনৈতিক জীবনের কেন্দ্র ছিল, যেখানে তাঁরও (রোক্সেলেন) একটি আবাস ছিল। তিনি তাঁর সঙ্গে অনেকগুলো কালো ও সাদা খোজা, ক্রীতদাস ও গৃহস্থালি এনেছিলেন; একবার সেগুলো স্থাপনের পর তিনি রয়ে গেলেন। হারেম ও রাজ্য আর পৃথক রইল না; এর পরিণতি ছিল শোচনীয়।’
হারেম ইতিহাসের নানা সাম্রাজ্যে প্রচলিত হলেও এখন যখন হারেম শব্দটা উচ্চারণ করা হয় তখন ইতিহাস মনে করিয়ে দেয় তোপকাপি প্রাসাদের অভ্যন্তরে অটোমান সুলতানদের হারেমের কথা, যার আরেকটা নাম ছিল আনন্দবাড়ি (দারুস সাদ)।
হারেমে ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল ভ্যালিদে সুলতানের আবাসে। সুলতানের মা অথবা স্ত্রীর হাতেই হারেমের কর্তৃত্ব থাকত। হুররেম সুলতান ছিলেন প্রথম ভ্যালিদে, কিন্তু সেলিম দ্বিতীয়ের স্ত্রী নুরবানু সুলতান, আহমেদ প্রথমের স্ত্রী কোসেম সুলতানের নামও এখানে উল্লেখযোগ্য। এই নারীরা যেমন ছিলেন ক্ষমতাধর, তেমনি তাঁদের ছিল দক্ষতা, যার কারণে তাঁরা হারেম কর্তৃক আয় কয়েকগুণ বাড়াতে পেরেছিলেন।
তোপকাপি হারেমে এখনও ১৬ শতকে শাসন করা নারীদের কাজের নমুনা পাওয়া যায়, তবে এখানে সংরক্ষিত বেশিরভাগ কাজই ১৯ ও ২০ শতকের।
সুলতানের হারেমে নারীর সংখ্যা কখনও ৩০০-এর কম ছিল না এবং ঊনবিংশ শতকে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০০-তে। তোপকাপি প্রাসাদে দাস-দাসী ও কর্মচারীসহ প্রায় হাজার খানেক লোক বাস করত।
১৩৬৫ সালে সুলতান প্রথম মুরাদ সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তাঁর সার্বভৌমত্বের প্রতিফলন ঘটে এমন একটা প্রাসাদ তৈরি করা দরকার। ফলে অটোমান সাম্রাজ্যের তৎকালীন রাজধানী এডির্নে (আর্ডিআনপোল) জন্ম হলো একটি প্রাসাদের। প্রাসাদটির নাম ছিল ‘চিয়ান্নুমা কাসরি’। তবে প্রাসাদটির সত্যিকার ঐশ্বর্য বিকশিত হয় এবং হারেমের জন্ম হয়, যখন ১৪৫৩ সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতিহ ইস্তাম্বুল জয় করেন।
অটোমান প্রাসাদগুলো ঘিরে থাকত ভীষণ যত্নে দেখভাল করা বিশাল বিশাল সব বাগান। সেসব বাগানে থাকত নানা আকারের জলাশয় ও ঝর্ণা। আর স্বর্গোদ্যান মাথায় রেখে তৈরি করা সেসব বাগানে ঘুরে বেড়াত বহু বিচিত্র সুন্দরী পরীরা। তাদের মধ্যে যেমন ছিল আয়ারল্যান্ড থেকে আসা লাল চুলের শ্বেতাঙ্গ সুন্দরী, তেমনি ছিল ভারতের বাদামি চোখের অপরূপারা।
সুলতান ও তাঁর উজিরেরা খুব আহ্লাদিত হতেন যদি তাদেরকে কেউ উপঢৌকন হিসেবে সুন্দরী রমণী দাসী পাঠাতেন। ফলে সুলতানকে যাঁরা শ্রদ্ধা জানাতে চাইতেন, তাঁদের অনেকে পৃথিবীর দূর প্রান্ত থেকে তাঁদের পরিবারের সুন্দরী কন্যাদের উপহার হিসেবে নিয়ে আসতেন এসব প্রাসাদে। এই ভাণ্ডারের রত্ন বৃদ্ধিতে দাসব্যবসায়ীরাও একটা বিরাট ভূমিকা রাখতেন।
অটোমানের ক্ষমতাধর নারীরা
হুররাম সুলতান, যিনি রোক্সেলানা হিসেবেও পরিচিত, তিনি ছিলেন উসমানীয় সম্রাট প্রথম সুলাইমানের প্রিয়তম কানিজ (উপপত্নী) ও পরবর্তীকালে তাঁর বৈধ স্ত্রী এবং সম্রাটের সন্তান শাহজাদা মুহাম্মদ, মিরহিমাহ সুলতান, শাহজাদা আবদুল্লাহ, সুলতান দ্বিতীয় সেলিম, শাহজাদা বায়েজিদ এবং শাহজাদা জাহাঙ্গিরের মা। তিনি ছিলেন উসমানীয় ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর নারীদের মধ্যে একজন এবং নারীদের সালতানাত নামে পরিচিত শাসনকালের একজন অন্যতম ব্যক্তিত্ব। হুররেম সুলতানের হাত ধরেই উসমানীয় সাম্রাজ্যে সর্বপ্রথম নারীদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তাঁর স্বামী প্রথম সুলায়মানের শাসনকালে তিনি সুলতানের প্রধান স্ত্রী বা ‘হাসেকি সুলতান’ ছিলেন। তিনি তাঁর স্বামীর মাধ্যমে ক্ষমতা অর্জন করে উসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এবং সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।
অধিকাংশ সুলতানেরা যেখানে হেরেমকন্যাদের রক্ষিতা বানিয়ে রাখতেন, সেখানে সুলতান সুলায়মান উসমানীয় সালতানাতের ২০০ বছরের প্রথা ভেঙে এক হেরেম-কন্যাকে ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন, তিনিই এই হুররাম সুলতান। সুলায়মান তাঁকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, তাঁর অধিকাংশ কাব্য ছিল হুররামকে উৎসর্গ করা।
আধুনিক তথ্যলিপিসমূহে হুররাম সুলতানের প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। এ সকল তথ্যভাণ্ডার হুররাম সুলতানের রুসাইন ও ইউক্রেনীয় জাতিত্ব অথবা তাঁর জন্মস্থান হিসেবে পোল্যান্ড রাজ্যকে উল্লেখ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
১৬ শ’ শতাব্দীর মাঝামাঝি, ক্রিমীয় খানাতে লিথুনিয়ার রাজ ডিউক জমিদারির প্রতিনিধি মিখালন লিটভাইন তাঁর ১৫৪৮ থেকে ১৫৫১ সালের রচনা ‘অ্যাবাউট কাস্টমস অফ তাতারস, লিথুনিয়ান্স অ্যান্ড মস্কো’-তে বাণিজ্য বিষয়ক বর্ণনার মাঝে উল্লেখ করেন, ‘বর্তমান তুর্কি সম্রাটের সবচেয়ে প্রিয়তম স্ত্রী—তাঁর ভবিষ্যৎ-পুত্রের মাতা, যে পুত্র তাঁর পরবর্তীকালে শাসন করবেন, তিনি আমাদের ভূমি থেকে অপহৃত হয়েছিলেন।’
১৬ শ’ শতাব্দীর পরবর্তী এবং ১৭ শ’ শতাব্দীর শুরুর দিকে তুর্কি বিষয়ে গবেষক পোলিশ কবি সামুয়েল তারদভস্কির দেয়া তথ্য অনুসারে, হুররেম সম্ভবত কোনো ইউক্রেনীয় অর্থোডক্স ধর্মযাজক পিতার ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন। তিনি পোল্যান্ড রাজ্যের রুথেনীয় ভয়ভডেশিপের রুহাটাইন নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন (বর্তমান পশ্চিম ইউক্রেন)। ১৫২০-এর দশকে ক্রিমিয়ার তাতাররা ওই এলাকার একটি তড়িৎ অভিযানের সময় তাঁকে বন্দী করে একজন দাসী হিসেবে নিয়ে আসে (সম্ভবত প্রথমে ক্রিমিয়ার নগরী কাফফায়, যা দাসব্যবসার একটি প্রধান কেন্দ্র, এরপর কনস্টান্টিনোপলে) এবং তাঁকে প্রথম সুলাইমানের হারেমের জন্য বাছাই করে। অল্প সময়ের মধ্যেই রোক্সেলেনা তাঁর মনিব সুলাইমানের সুনজরে চলে আসেন এবং সমসাময়িক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ঈর্ষার পাত্রীতে পরিণত হন। শীঘ্রই তিনি সুলাইমানের প্রিয়তম সঙ্গিনী বা ‘হাসেকি সুলতান’ হয়ে ওঠেন। সুলতানের ওপর হুররামের প্রভাবের কথা দ্রুত আশেপাশের সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তিনিই সুলতানের সর্বাধিক সংখ্যক সন্তানের জন্ম দেন, এবং আশ্চর্যজনকভাবে চিরায়ত প্রথা ভঙ্গ করে তিনি দাসত্ব হতেও মুক্তি লাভ করেন। দুইশত বছরের অটোমান ঐতিহ্যকে ভঙ্গ করে, একজন প্রাক্তন উপপত্নী এভাবে অবশেষে সুলতানের বৈধ পত্নী হয়ে ওঠা প্রাসাদ ও নগরীর প্রত্যক্ষদর্শীদের জন্য অত্যন্ত হতবাককারী একটি বিষয় ছিল। এই ঘটনা সুলাইমানকে ওরহান গাজির (১৩২৬- ১৩৬২) পর প্রথম কানিজ বিবাহকারী সুলতানের পরিচয় এনে দেয় এবং প্রাসাদে হুররামের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে, যার ফলশ্রুতিতে তাঁর অন্যতম পুত্র দ্বিতীয় সেলিম ১৫৬৬ সালে সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার লাভ করেন।
সুলাইমান হুররেম সুলতানকে অটোমান সম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী বানিয়েছিলেন আর তাঁর সমান মর্যাদা দিয়েছিলেন। অটোমানের ইতিহাসে অন্য কোনো সুলতানের স্ত্রীকে এই মর্যাদা দেয়া হয়নি। এমনকি সুলতান সুলাইমান দরবার-সভায় হুররেমকে তাঁর পাশে বসাতেন এবং সভায় যেকোনো বিষয়ে হুররামের পরামর্শ নিতেন। এমনকি কোনো অফিসিয়াল কাগজে সুলতানের পাশাপাশি সম্রাজ্ঞী হুররেম সুলতানেরও সাক্ষর আর সিল থাকত।
সুলাইমান বাকি জীবনে রাজসভাতেও হুররেমকে তাঁর সাথে থাকতে দেন, যার ফলে আরেকটি প্রথা ভঙ্গ হয়, আর তা হলো, যখন সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারীগণ উপযুক্ত বয়সে পৌঁছুবে, তাঁদেরকে তাঁদের রাজ উপপত্নীসহ নিকটস্থ প্রদেশে শাসনের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হবে। উক্ত উপপত্নীদের সন্তান ক্ষমতায় বসার আগ পর্যন্ত তারা ফিরে আসতে পারবে না। সুলতানের রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবেও হুররেম ভূমিকা পালন করেছেন, এবং প্রতীয়মান হয় যে, তিনি বৈদেশিক নীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও প্রভাব রেখেছিলেন। রাজা সিগিসমন্ডাস দ্বিতীয় অগাস্টাসকে প্রেরিত তাঁর দুটি চিঠি এখনো টিকে আছে, এবং স্বভাবতই তাঁর জীবদ্দশায় পোলিশ-অটোমান মৈত্রীচুক্তির মাধ্যমে পোল্যান্ড রাজ্যের সঙ্গে অটোমান সাম্রাজ্যের শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজমান ছিল।
রাজনৈতিক উদ্যোগসমূহের পাশাপাশি, হুররেম মক্কা থেকে জেরুজালেম পর্যন্ত বহু রাষ্ট্রীয় স্থাপনার প্রধান কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। সম্ভবত সেখানে খলিফা হারুনুর রশিদের স্ত্রী জুবাইদার কাজের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি এ সকল সমাজসেবামূলক কার্যক্রম হাতে নেন। তাঁর প্রথম স্থাপনাসমূহের মধ্যে ছিল একটি মসজিদ, দুটি মাদরাসা, একটি জলের ফোয়ারা এবং কনস্টান্টিনোপলে নারী-কৃতদাসী বাজারের সন্নিকটে একটি মহিলা হাসপাতাল। তাঁর নির্দেশে নিকটবর্তী হাজিয়া সোফিয়ার উপাসক সম্প্রদায়ের সেবায় ‘হাসেকি হুররেম সুলতান হামামি’ নামে একটি স্নানাগার নির্মিত হয়। ১৫৫২ সালে তিনি জেরুালেমে দুস্থ ও অসহায়দের খাদ্যাভাব মেটাতে ‘হাসেকি সুলতান ইমারেত’ নামে একটি রাষ্ট্রীয় লঙ্গরখানা প্রতিষ্ঠা করেন।
হুররেম গরিব-দুঃখীদের অনেক সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। এমনকি তিনি গরিব-দুঃখীদের অবস্থা জানার জন্য ছদ্মবেশে বের হতেন মাঝে মাঝে হারেমের বাইরেও।
তাঁর নিজের করা অথবা তাঁর নিজস্ব তাত্ত্বাবধানের অধীনে করা কিছু সূচিকর্ম এখনো বিদ্যমান আছে। উদাহরণস্বরূপ ১৫৪৭ সালে ইরানের শাহ দ্বিতীয় তাহমাস্পকে দেয়া এবং ১৫৪৯ সালে রাজা দ্বিতীয় সিগিসমন্ড অগাস্টাসকে দেয়া সূচিকর্মের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।
এস্থার হান্ডালি বহু আনুষ্ঠানিকতায় তাঁর সহকারী ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সুলতান সুলাইমান তাঁর ‘মুহিব্বি’ নামক ছদ্মনাম ব্যবহার করে হুররেম সুলতানের জন্য নিম্নোক্ত কবিতাটি লিখেছিলেন—
‘আমার নির্জনতার সিংহাসন, আমার সম্পত্তি, আমার প্রেম, আমার পূর্ণিমা
আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু, আমার সখী, আমার চিরন্তন অস্তিত্ব, আমার সুলতান, আমার একমাত্র ভালোবাসা।
সুন্দরীদের মাঝে সবচেয়ে সুন্দরীতমা…
আমার বসন্তকাল, আমার সদা প্রফুল্লমুখী ভালোবাসা, আমার দিবস, আমার প্রাণের প্রিয়া, আমার হাস্যোজ্জ্বল পত্র…
আমার গুল্ম, আমার মিষ্টি, আমার গোলাপ—এ জগতে একমাত্র সেই আমাকে কোনো দুঃখ দেয়নি…
আমার ইস্তাম্বুল, আমার কারামান, আমার আনাতোলিয়ার পৃথিবী
আমার বাদাকশান, আমার বাগদাদ আর খোরাসান
আমার সুকেশী রমণী, আমার হেলানো ভুরুর প্রণয়, আমার দুষ্টুমিভরা চোখের প্রেম…
আমি সর্বদা তোমার গুণ গাইবো
আমি, এই ভগ্ন হৃদয়ের প্রেমিক, অশ্রুভরা চোখের মুহিব্বি (প্রেমিক), আমিই তো সুখী।’
হুররেম সুলতান ১৫ ই এপ্রিল ১৫৫৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন এবং ইজনিক মার্বেলপাথর দ্বারা সুসজ্জিত গম্বুজবিশিষ্ট স্বর্গের উদ্যানের আদলে তৈরি করা সমাধিতে (তুরবা) তাঁকে সমাহিত করা হয়। এটি সম্ভবত তাঁর সদা হাস্যোজ্জ্বল প্রকৃতির স্মৃতির প্রতি সম্মান রেখে করা হয়েছিল। সুলাইমানের সমাধির পাশেই তাঁর সমাধি অবস্থিত, যা সুলাইমানিয়া মসজিদের প্রাঙ্গণে অবস্থিত আরও গাম্ভীর্যপূর্ণ গম্বুজবিশিষ্ট একটি পৃথক স্থাপত্য।
হুররেম সুলতানের মৃত্যুর পর সুলতান সুলাইমান নিজ কাঁধে তাঁর লাশের খাটিয়া বহন করেন। অটোমান সম্রাজ্যের ইতিহাসে কোনোদিন কোনো সুলতান তাঁদের স্ত্রীদের লাশের খাটিয়া বহন করেননি। একমাত্র সুলতান সুলাইমান তাঁর প্রানপ্রিয় স্ত্রী হুররেমের মৃত্যুর পর তাঁর সন্তানদের সাথে হুররামের লাশের খাটিয়া বহন করেছিলেন। হুররেমের মৃত্যুর পর সুলতান সুলাইমান বেশ কয়েকদিন দুঃখে কাতর ছিলেন।
ক্ষমতাধর হারেম কন্যাদের মধ্যে আরও ছিলেন কোসেম, তুরহান, মিহরিমাহ, নুরবানু, সাফিয়া, হান্দান, হালিমে। তবে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিলেন কোসেম সুলতান। তিনি সুলতানের থেকেও বেশি ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর ইশারায় সুলতান পরিবর্তন হতো।
তিনি সুলতান প্রথম আহমেদের বিবাহিত স্ত্রী এবং সুলতান চতুর্থ মুরাদ ও সুলতান ইব্রাহিমের মাতা।
কোসেম সুলতান জীবিতকালে অটোমান সাম্রাজ্যে ছয়জন সুলতান সিংহাসনে বসেন। কিন্তু তাঁর ক্ষমতা ছিল এসব সুলতানের আয়ত্তের বাইরে।
আনুমানিক ১৫৮৯ সালে তিনোস দ্বীপে কোসেম সুলতান জন্মগ্রহণ করেন। কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন যে, কোসেম ছিলেন গ্রিক বংশোদ্ভূত তিনোস দ্বীপের (পূর্বনাম আনাসতাসিয়া) একজন ধর্মযাজকের মেয়ে। কিন্তু এই সূত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না অনেক ঐতিহাসিক।
কাভিদ বাইসুন নামক এক ঐতিহাসিক বলেন যে, মাত্র ১৫ বছর বয়সে তাঁকে বসনিয়ার কর্তৃপক্ষ দাসী হিসেবে ইস্তাম্বুলে এনে সুলতান প্রথম আহমেদের হারেমে পাঠান। পরবর্তী সময়ে মুসলিম হওয়ার পর তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় মাহপেয়কার—যার অর্থ চাঁদের মতো মুখ যার এবং তারপরে সুলতান প্রথম আহমেদ তাঁর নাম রাখেন কোসেম।
অটোমান সুলতানদের হারেম পরিচালনার দায়িত্ব থাকত সুলতানাদের কাছে এবং হারেম পরিচালনার দায়িত্ব বংশানুক্রমে পরিবর্তিত হতো। কোসেম সুলতান আহমেদের খাস বাঁদি হওয়ার পর থেকে তাঁর জীবন রাতারাতি বদলে যেতে থাকে। কোসেম খাস বাঁদি থাকার সময় হারেম-এর কর্তৃত্ব ছিল সুলতানের দাদি সাফিয়ে সুলতানের হাতে। কিন্তু সাফিয়ে সুলতান ১৬০৪ সালে তাঁর কর্তৃত্ব হারান এবং তিনি তাঁর বাকিজীবন অন্য একটি প্রাসাদে কাটান। একই বছর সুলতান আহমেদের মা এবং ভ্যালিদে হান্দান সুলতানের মৃত্যুর পর কোসেম সুলতানের নিকট সুযোগ আসে হারেমের কর্তৃত্ব গ্রহণ করার।
সুলতান আহমেদ তাঁকে বিয়ে করলে তিনি হাসেকি সুলতান হিসেবে আখ্যা পান। কোসেম সুলতান অনেকগুলো সন্তান জন্ম দেন এবং হারেমের কর্তৃত্বও চলে আসে তাঁর হাতে।
সুলতান প্রথম আহমেদ মাত্র ২৭ বছর বয়সে মারা যাওয়ার কারণে কোসেম সুলতান তোপকাপি প্রাসাদে তাঁর অবস্থান হারিয়ে ফেলেন এবং তাঁকে তোপকাপি প্রাসাদ থেকে ইস্কি সারাহ প্রাসাদে থাকতে দেওয়া হয়। সুলতান প্রথম আহমেদ মারা যাওয়ার পর সিংহাসনে প্রথমবারের মতো সুলতানের ছেলে না বসে তাঁর ভাই প্রথম মুস্তফা বসেন, যিনি ছিলেন একজন পাগল প্রকৃতির মানুষ। খুব দ্রুত মুস্তফাকে সরিয়ে সুলতান বানানো হয় কোসেম সুলতানের সৎ ছেলে দ্বিতীয় উসমানকে।
যেহেতু কোসেম সুলতানের ছেলে সিংহাসনে বসতে পারেননি, তাই অটোমান রাজ বংশের রীতি অনুযায়ী তাঁকে অন্য কোনো জৌলুসহীন প্রাসাদে থাকতে হবে। কিন্তু কোসেম সুলতানকে খুব বেশি দিন পুরাতন বা ইস্কি প্রাসাদে থাকতে হয়নি। তাঁর ছেলে চতুর্থ মুরাদ সিংহাসনে আরোহণ করার পর তিনি পুনরায় ‘হাসেকি সুলতান’ পদবী ফিরে পান এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তাঁকে এক হাজার মুদ্রা করে মাসিক খরচ দেয়া হতো। কোসেম সুলতানের মৃত্যুর পর হাসেকি সুলতান পদবীটি বিলুপ্ত হয়ে যায়।
কোসেম সুলতানের ভ্যালিদে সুলতান হিসেবে ক্ষমতাপ্রাপ্তি ও প্রয়োগ মোট তিনটি ধাপে ছিল।
প্রথম ধাপ : সুলতান প্রথম আহমেদের মৃত্যুর পর কোসেম সুলতান যে অবস্থান হারান সেই অবস্থানে আবার ফিরে আসেন যখন তাঁর ছেলে সুলতান চতুর্থ মুরাদ সিংহাসনে বসেন। সুলতান মুরাদ ১৬২৩ সালে সিংহাসনে বসার পর কোসেম সুলতান অটোমান সাম্রাজ্যের শীর্ষ অবস্থানে চলে আসেন। সুলতান চতুর্থ মুরাদ অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কারণে কোসেম সুলতান শুধু ভ্যালিদে সুলতানে সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তিনি নিজেকে একজন রাজপ্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত করেন। সুলতান চতুর্থ মুরাদের—১৬২৩ সাল হতে ১৬৩২ সাল পর্যন্ত—শাসনকালে কোসেম সুলতান আড়াল থেকে সাম্রাজ্য চালাতেন। তিনি পর্দার আড়ালে থেকে রাজ সভায় অংশগ্রহণ করতেন। এমনকি ১৬৩২ সালের পর যখন তিনি রাজপ্রতিনিধি ছিলেন না, তখনও।
কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সাম্রাজ্যে অরাজকতা দেখা দেয়। পারস্যের সাফাবিদেরা ইরাক দখল করে নেয় এবং উত্তর আনাতোলিয়ায় বিদ্রোহ শুরু হয়ে যায়। এসব দেখে জেনেসারিরা ক্ষিপ্ত হয়ে উজিরে আজমকে মেরে ফেলেন। এটা দেখে সুলতান মুরাদ ভয় পেয়ে যান এবং তাঁকেও তাঁর সৎ ভাই দ্বিতীয় উসমানের মতো মেরে ফেলা হবে ভেবে ভয় পেয়ে সুলতান পদ থেকে সরে যান। সেই সময় থেকে কোসেম সুলতানের আসল শাসন শুরু হয়।
দ্বিতীয় ধাপ : কোসেম সুলতানের আরও একজন ছেলে ছিলেন, যাঁর নাম ইবরাহিম। সুলতান মুরাদ তাঁকে মেরে ফেলার আদেশ দেন। কিন্তু সে-সময় তাঁকে তাঁর মা কোসেম সুলতান বাঁচান। সুলতান চতুর্থ মুরাদের পর ইবরাহিম ছিলেন তাঁদের মৃতপ্রায় রাজবংশের শাহজাদা। মুরাদের মৃত্যুর পরও ইবরাহিম ভাবতেন মুরাদ এখনও বেঁচে আছে এবং এটা হয়ত তাঁর ফাঁদ। কিন্তু কোসেম সুলতান এবং উজিরে আজম মুরাদের লাশ দেখানোর পর ইবরাহিম সিংহাসনে বসেন। কিন্তু ইব্রাহিম রাজ্য পরিচালনার জন্য মানসিকভাবে অযোগ্য ছিলেন। এর ফলে আবার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন কোসেম এবং তিনিই সাম্রাজ্য পরিচালনা করতেন আড়াল থেকে।
১৬৪৭ সালে কোসেম সুলতান এবং উজিরে আজম সালিহ পাশা ইবরাহিমকে ক্ষমতাচ্যুত করতে গিয়ে ব্যর্থ হন, কিন্তু তিনি তাঁর আরেক সন্তানকে সিংহাসনে বসান।
এই ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর সালিহ পাশাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং কোসেম সুলতানকে প্রাসাদ থেকে বের করে দেওয়া হয়। তার পরের বছর জেনেসারি এবং ওলামাগণ বিদ্রোহ শুরু করলে ইবরাহিমকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং তোপকাপি প্রাসাদে বন্দী করা হয়। ইবরাহিমের মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে নতুন উজিরে আজম আদেশ স্থগিত করতে বলেন। কিন্তু রাষ্ট্রের বিজ্ঞজনেরা মতামত দেন যে ‘যদি দুইজন খলিফা থাকে তবে একজনকে মেরে ফেলো’। কোসেম সুলতান ইবরাহিমের মৃত্যুদণ্ডের পক্ষেই সায় দেন। ১৯৪৮ সালে ইবরাহিমকে মেরে ফেলা হয়।
তৃতীয় ধাপ : কোসেম সুলতান তাঁর সাত বছরের নাতি চতুর্থ মুহাম্মদকে সিংহাসনে বসিয়ে নিজে সরাসরি সাম্রাজ্য পরিচালনা করা শুরু করেন। তিনি নিজেকে পুনরায় রাজপ্রতিনিধি হিসেবে ঘোষণা করে সাম্রাজ্যের সকল দায়িত্ব পালন করেন শিশুনাতিকে সামনে রেখে। চতুর্থ মুহাম্মদ সিংহাসনে বসার কারণে ভ্যালিদে সুলতান হবার কথা তুরহান সুলতানের। কিন্তু কোসেম সুলতান ভ্যালিদে সুলতানের পদ ছেড়ে দেননি।
তুরহান সুলতান কোসেম সুলতানের অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে চাইলেন। তুরহান সুলতানের বয়স যখন মাত্র ১২ বছর তখন ক্রিমিয়ার খান তাঁকে উপহার হিসেবে তোপকাপি প্রাসাদে পাঠান। কোসেম সুলতান নিজে ইবরাহিমের জন্য তুরহান সুলতানকে খাসদাসী হিসেবে পছন্দ করেন। কিন্তু তুরহান সুলতান বিনা রক্তপাতে নিজের পদ দখল করতে চাইলেন। তুরহান সুলতানের পক্ষে ছিলেন উজিরে আজম এবং কোসেম সুলতানের পক্ষে ছিল জেনেসারিরা। কোসেম সুলতান ভ্যালিদে সুলতান পদকে গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরে নিয়ে জেনেসারিদেরকে তুরহান সুলতানের বিরুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রভাব খাটান।
ক্ষমতার যুদ্ধে কোসেম সুলতান তাঁর নাতি মুহাম্মদকে সরিয়ে আরেক জনকে সিংহাসনে বসানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ত^ার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। তুরহানের আদেশে হোক বা অন্য কারও আদেশে, কোসেম সুলতান তাঁর ব্যর্থ চেষ্টার তিন বছর পর খুন হন। মনে করা হয় তুরহান সুলতানই এই আদেশ দিয়েছিলেন। ১৬৫১ সালে অটোমান সাম্রাজ্যের এই ক্ষমতাধর নারীর মৃত্যুর পর তাঁকে তাঁর স্বামী প্রথম আহমেদের কবরের পাশে দাফন করা হয়।
তুরহান ছিলেন কোসেমের পুত্রবধূ এবং প্রধান শত্রু। দুজনেরই ছিল ক্ষমতাশীল পুত্র এবং দুজনেরই ইচ্ছা ছিল শাসকের স্থানটি নেয়া। তবে তুরহান তাঁর কাজকর্মে প্রমাণ করেছেন যে, তিনি ছিলেন নিতান্তই ধূর্ত ও নির্দয়।
তিনি কোসেম ও তাঁর বাহিনীকে কোসেমের ঘরেই হত্যার পরিকল্পনা করেন। শেষমেশ তাঁর পরিকল্পনা সফল হয় ও রাজপ্রতিনিধিত্বের সুযোগটা তিনি পান এবং রাজত্ব করেন অটোমান সাম্রাজ্যে।
কোসেম সুলতান সাম্রাজ্যের সাধারণ মানুষ এবং শাসক শ্রেণী উভয়ের জন্য দান করেছেন। তিনি প্রতি জেলখানায় গিয়ে কিছু মানুষকে মুক্ত করে দিতেন। গরিব পরিবারে মেয়েদের দক্ষ করে তাদের বিয়ে দিতেন। তিনি ১৬৪০ সালে উস্কুদারে একটি মসজিদ ও স্কুল তৈরি করেন। ভ্যালিদে মাদরাসা তৈরি করেন, মানুষের জন্য পানির ঝর্ণা তৈরি করেন। ইস্তাম্বুলের বাইরেও ছিল তাঁর অনুদানে তৈরিকৃত পানির ঝর্ণা। তিনি মিশরের বন্যাদুর্গতদের সাহায্য করেছেন, এবং মক্কার গরিব মানুষদের বিপদে আপদে এগিয়ে আসতেন।
অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের সাথে সাথে বিলুপ্ত হয় আভিজাত্যের এইসব হারেমও। বছরের পর বছর চলে যায়, অথচ হারেমের বিস্ময় জাগানো শেষ হয় না, হারেম নিয়ে জনমনের আগ্রহ কমে না। সেই নারীরা সুলতানের মতো করে আজ পর্যন্ত সাধারণের মনে প্রভাব ফেলেই যাচ্ছেন, হয়তো তা চলবে আরও অনেক দিন।
ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত ও পরিমার্জিত
লেখিকা : ছাত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

