শাহজালালের সিলেট

সংখ্যা:

 

‘ওই যে ভিখারি যায়

ঝোলা ঘাড়ে ফিরে চায়

ডাক ওরে জিজ্ঞাস কী বলে

বাপ-দাদা ধনবান

ছিল বড় মান্যমান

মাথা হেঁটে পূজিত সকলে

তাদের বংশধর

ভিক্ষা মাগে ঘরে ঘর

হাতে কাঁধে ছালা আর ঝুলি

গলায় তসবি দানা

দে রে বাবা এক কণা

প্রাণ যায় মুখে এই বুলি’

মীর মশাররফ হোসেনের ‘ঝোলা ঘাড়ে নিয়ে ফিরে ফিরে চাওয়া’ হতভাগা একজন ভিখারি এই আমিও। শুধু আমিই নয়, মুসলিম উম্মাহর ১৬০ কোটি সদস্যের প্রতিজনই এখন ঝোলাঅলা ভিখারি। কবি মশাররফ হোসেন ভেতরের চোখ দিয়ে মুসলিম উম্মাহর করুণচিত্র অবলোকন করেছেন। গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন তাদের ক্রমাবনতি। পঙক্তিগুলো লেখার সময় হয়তো-বা মনেমনে ভেবেছেন—হায়, ওই যে ঝোলাঅলা ভিখারিরা, তাদের বাব-দাদারা তো ছিলেন কত ধনবান, ছিলেন বড় মান্যমান, কিন্তু তাদের এই অবস্থা কেন? তাদের বাপ-দাদারাই তো হাজার বছর শাসন করেছিলেন পৃথিবী। গোটা পৃথিবীর সভ্যতার নগরীগুলোর জন্মদাতা তো তাদের বাপ-দাদারাই। শিক্ষা-সংস্কৃতি, শিল্প-বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষসাধন তো করেছিলেন প্রথমত তাঁরাই।

স্পেন, করডোভা, গ্রানাডা আর বাংলাদেশের সোনারগাঁ ও জালালাবাদের মতো সভ্যতার রাজধানীগুলো আজও ইতিহাসের সাক্ষী বহন করে চলছে। কিন্তু তাদের বংশধররা আজ ভিখারির বেশে যেন সন্ন্যাসীর জীবনযাপন করছে। সামান্য শান্তির জন্য ‘হা’ করে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে, যারা মুসলিম উম্মাহর ক্রমাগত এই অধঃপতনের জন্য দায়ী। যারা আমাদের শিক্ষা ও বদান্যতায় শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে একপর্যায় আমাদেরই শিক্ষা খেয়েছে, শিল্প খেয়েছে, সাহিত্য খেয়েছে, বিজ্ঞান খেয়েছে, সংস্কৃতি খেয়েছে, এবং খেয়েছে আমাদের পবিত্র মানচিত্রও। ভারত-আমেরিকা আর চীন-রাশিয়া ও জাতিসংঘের কাছে শান্তি ও মুক্তির চাওয়াটা যেন ‘ভিক্ষা মাগে ঘরে ঘর, হাতে কাঁধে ছালা আর ঝুলি’ এবং ‘গলায় তসবি দানা, দে রে বাবা এক কণা’-এর মতো শোনাচ্ছে।

আমাদের পূর্বপুরুষেরা (আল্লাহ তাঁদের ওপর অনিঃশেষ অনুগ্রহ বর্ষণ করুন) শেষরাতের অশ্রুজল, শরীরের ঘাম আর বুকের তাজা খুন দিয়ে রচনা করে গেছেন এমনসব ইতিহাস যা আমাদের প্রতিনিয়ত ভাবানোর কথা ছিল, গভীর রাতে কাঁদানোর কথা ছিল আর কথা ছিল মনন-মিনারে প্রেরণা জোগানোর। কিন্তু জাতি হিসেবে আমরা যেন খুব অকৃতজ্ঞ এবং চরম পর্যায়ের আলসে। তাই তো আমরা শতাব্দীকাল ধরে নির্যাতিত, নিপীড়িত, লাঞ্চিত, বঞ্চিত আর নিজভূমি থেকে বিতাড়িত। শুধু তাই নয়, স্বাধীন দেশেও যেন পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ। কারণ, আমরা জানি না ‘মানুষ জীবিত থাকতে হলে যেভাবে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে হৃৎপিণ্ডে রক্তবাহী নালিতে প্রাণস্পন্দন থাকতে হবে, ঠিক সেভাবে একটি জাতি জীবিত থাকতে হলে শিক্ষা-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও চিন্তা-চেতনার স্রোতধারাকে অবশ্যই অবশ্যই প্রবহমান রাখতে হবে।’

জাগ্রত কবি মুহিব খান অচেতন এই জাতির কাছে প্রশ্ন রেখেছেন, এবং ঠিকই রেখেছেন—

‘তুমি কি তোমার পরিচয় জানো?

জানো তব ইতিহাস?

জানো না, জানো না, জানো না তাই তো

বেঁচে থেকে মরা লাশ

জানো না তোমার পূর্বসূরির

অমর গর্বগাঁথা

বিশ্ব-দুয়ারে তাই তো তোমার

চির অবনত মাথা

তুমি কি খুঁজেছ শিকড় তোমার

কোথা হতে পায় রস?

খোঁজোনি, খোঁজোনি, খোঁজোনি তাই তো

ভাগ্যে নেমেছে ধ্বস

খোঁজোনি তোমার হারানো অতীত

মুছে যাওয়া পরিচয়?

হারাতে হারাতে হেরেই চলেছ

ভুলেই গিয়েছ জয়…’

আমরা যেমন ভুলে গেছি নববিকালের মরণজয়ী সব কাফেলার ইতিহাস, যেমন ভুলে গেছি সোনালি যুগের সব অমর অধ্যায়, যেমন ভুলে গেছি স্পেন-বিজয়ী তারিক বিন জিয়াদ, কনস্টান্টিনোপল-বিজয়ী মুহাম্মদ আল-ফাতিহ, ভার‍ত-বিজয়ী মুহাম্মাদ বিন কাসিমদের গৌরবময় সব বিজয়াভিযান, ঠিক তেমনি ভুলে গেছি গৌড়-বিজয়ী শাহজালালের অমর গর্বগাঁথাও। যিনি পবিত্র মহানগরী মক্কা থেকে দাওয়াতি অভিযান শুরু করেন। যেই অভিযান গৌড় পর্যন্ত এসে জিহাদি অভিযানে পরিণত হয়। আর অবিশ্বাসের অন্ধকূপে প্রজ্বলিত হয় বিশ্বাসের আলো। গোবিন্দালয়ে উড্ডীন হয় তওহিদের পতাকা। প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্র। পৃথিবীর বুকে গড়ে ওঠে সভ্যতার আরেকটি নতুন নগরী। বস্তুত ইসলামের সুবিমল জ্যোতি যেখানেই তার মহিমা নিয়ে ভাস্বর হয়েছে, সেখানেই রচিত হয়েছে নতুন অধ্যায়, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উন্নত সভ্যতা, বিলুপ্ত হয়েছে অন্ধকার, অসভ্যতা আর কুসংস্কার। গৌড়ের ক্ষেত্রেও ঘটেছে ঠিক তাই।

আজকের সিলেট তখন ছিল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত। এর মধ্যে তুলনামূলক বৃহৎ রাজ্য ছিল গৌড়, জৈন্তিয়া ও লাউড়। সিলেটে ইসলামের আলো কখন প্রবেশ করেছে, তার নির্দিষ্ট কোনো সনতারিখ কারও জানা নেই, তবে ধারণা করা হয়, ইসলামের সূচনাকালেই সিলেটে ইসলামের আলো পৌঁছেছে। কারণ, আজকের সিলেটের যে বন্দরবাজার, প্রাচীনকালে এটি ছিল একটি নদীবন্দর। বিখ্যাত আরব পরিব্রাজক সুলায়মান সাররাফিও বাংলার দুটি বন্দরের কথা আলোচনা করেছেন। ‘চট্টগ্রাম’ ও ‘সিলেট’—এই দুটি ছিল প্রাচীন বাংলার বিখ্যাত দুই নদীবন্দর। বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্যবসায়ীরা মালবাহী জাহাজ এনে নোঙর করতেন এই বন্দরগুলোতে। বিভিন্ন মশলা, তেজপাতা, রেশম, কাঠ ও হাতির দাঁতের জন্য আরব ব্যবসায়ীরা বারবার আসা-যাওয়া করতেন সিলেটে। এভাবে আরবের সঙ্গে সিলেটের ব্যবসায়িক বন্ধন তৈরি হয়। এই সত্যটি ইতিহাস-স্বীকৃত। এখানেই আমাদের ধারণা—আরবের ব্যবসায়ী দলের সিলেট আগমন যদি সত্য হয়, তাহলে ব্যবসায়ীর পোশাকে ইসলাম প্রচারকদের আগমনও অসত্য নয়। কারণ, মুসলিম মানেই দাঈ, মুসলিম মানেই মিশনারি। মুসলিমরা যেখানে যে উদ্দেশ্যেই যান না কেন, তাঁরা দাওয়াহ ইলাল্লাহ বন্ধ রাখেন না, সত্য প্রতিষ্ঠার মিশন কখনোই ভুলে যান না। যদিও কালের বিবর্তনে আজকের মুসলিমরা এই স্বভাব হারিয়ে ফেলেছেন প্রায়ই।

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ সিলেটের গাজি বুরহানুদ্দিনকে আরবের সেই বণিকদলের কারও বংশধর বলে উল্লেখ করেছেন। ধারণা করা হয়, গৌড়গোবিন্দ রাজ্যলাভের অনেক আগ থেকে তিনি সিলেটের বাসিন্দা ছিলেন। অধ্যাপক আজরফ লিখেন, ‘সিলেটের বুকে ইসলামের সত্যিকার রূপের পরিচয় সর্বপ্রথম কে দিয়েছিলেন, তা এখনো সঠিকভাবে নির্দিষ্ট হয়নি। তবে সপ্তম শতাব্দীতে হজরত মাহমুদ ও হজরত মুহাইমিন-এর দ্বারা বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারিত হওয়ার যে তথ্যটি আমরা বর্ণনা করেছি, তার ঢেউ যে সিলেটেও এসে লেগেছিল, সে সম্বন্ধে অনুমান করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কেননা, শাহজালালপূর্ব যুগে সিলেট সদরের টুলটিকওে ছিল গাজি বুরহানুদ্দিনের বসতি। তার ওপর তরফে কাজি নুরুদ্দিনের বসবাস। এ দুটো স্থিতি ব্যতীত পূর্ববর্তী পর্যায়ে আজমুরদান বা আজমিরিগঞ্জ নামক স্থান মুসলিম সুলতান মালিক উজবেক তুঘরল-এর হাতে ১২৪৪ খিষ্টাব্দে বিজিত হয়েছিল। শাহজালাল কর্তৃক গৌড় বিজয়ের পূর্বে তদানীন্তন সিলেটের এ অঞ্চলগুলোতে মুসলিমদের বাস ছিল।’

ইসলামের উত্থানকালেই সিলেটে ইসলামের বাণী প্রচারিত হলেও ইসলাম ‘বিজয়ী’ বেশে আসে হজরত শাহজালাল রহমতুল্লাহি আলায়হির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবার মধ্য দিয়ে। এই তথ্যে ইতিহাসবিদদের কোনো বিতর্ক নেই। তবে শাহজালালের আগমন ও রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার সাল নিয়ে ছিল প্রচুর মতভেদ, যার সমাপ্তি হয়েছিল ১৫১২ খ্রিষ্টাব্দে, ৯১৮ হিজরিতে। তখন বাংলার মসনদে অধিষ্ঠিত সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় সিলেটের আম্বরখানা মহল্লায় চালানো হয় প্রত্নতত্ত্ব গবেষণা। মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে ফার্সি ভাষার একটি শিলালিপি। যা বর্তমানে ঢাকা জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। তাতে যা লিখিত ছিল, তা অনুবাদ করলে দাঁড়ায়—‘মুহাম্মদের ছেলে শায়খ জালাল মজররদের আধ্যাত্মিক শক্তিবলে সুলতান ফিরোজ শাহ দেহলভির আমলে ৭০৩ হিজরি সনে সিকান্দার খান গাজি সিলেটে মুসলিম পতাকা উত্তোলন করেন।’ সেই থেকে ৭০৩ হিজরি মোতাবেক ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দকে ‘সিলেটে মুসলিম শাসনের শুভযাত্রা’ ধরা হয়।

শাহজালালের আগমন ও সিলেটে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার গল্পটি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর এক উপাখ্যান। যদিও প্রামাণ্য ইতিহাসের সঙ্গে মিশ্রিত আছে কিছু কথা-উপকথা বা বহুল জনশ্রুতি। ইয়েমেন থেকে মক্কা হয়ে দিল্লি, অতঃপর অনেক চড়াই-উৎরাই আর নদ-নদী পাড়ি দিয়ে গৌড়ে। সত্যিই হজরত শাহজালালের এই অভিযাত্রাটি শত্রু-মিত্র সকলের হৃদয়ে রোমাঞ্চ সৃষ্টি করে আজও।

শাহজালালের জন্মস্থান আরবের হেজাজ ভূমির দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত ইয়েমেনের কুনিয়া শহরে। ৬৭১ হিজরি মোতাবেক ১২৭১ খ্রিষ্টাব্দে। শাহজালালের বয়স যখন তিন মাস, মৃত্যুবরণ করেন তাঁর মহীয়সী মা। বয়স যখন পাঁচ, শাহাদতবরণ করেন তাঁর বাবা। তাঁর বাবা হজরত মুহাম্মদ রহমতুল্লাহি আলায়হি ছিলেন বীর মুজাহিদ। ইয়েমেনে একটি জিহাদে তিনি শহিদি শরাব পান করেন।

শাহজালাল যখন মা-বাবাহীন, বলা যায় দুনিয়াবি আশ্রয়হীন, তখনই এগিয়ে এলেন তাঁর মামা। তাঁর মামা শায়েখ আহমদ কবির সোহরাওয়ার্দি ছিলেন আধ্যাত্মিক ব্যক্তি। তাঁর পিতা সৈয়দ জালাল সুরুখ বুখারিও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি শাহজালালের জন্মেরও আগে ভারতবর্ষে ইসলামের প্রচারাভিযান পরিচালনা করেন। তিনি ভারতের মুলতানের নিকট আউচে বসবাস করেন এবং শেষ নিঃশ্বাস সেখানেই ত্যাগ করেন।

শায়েখ আহমদ কবির শিশু জালালকে ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলি শিক্ষাদান করেন। তিনি নিয়ত করেন, তাঁকেও বানাবেন আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ। সেই লক্ষ্য থেকেই তিনি তাঁকে নিয়ে যান পবিত্র শহর মক্কায়। মক্কায় শায়েখ শিহাব উদ্দিন রহমতুল্লাহি আলায়হি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ইসলাহি খানকাহ—আধ্যাত্মিক বিদ্যালয়-এর তিনি ছিলেন তৎকালীন প্রধান খাদেম বা তত্ত্বাবধায়ক। মামাপীরের সাহচর্যে শরিয়ত-মারেফতের জ্ঞানলাভ করে করে তিলে তিলে গড়ে উঠতে শুরু করলেন শাহজালার। যখন পরিণত বয়সে উপনীত হলেন, একরাতে তিনি একটি স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নের ব্যাখ্যায় শায়েখ আহমদ কবির শাহজালালকে ভারতবর্ষে দাওয়াতাভিযান পরিচালনার পরামর্শ দেন। তিনিও তা সাদরে গ্রহণ করে নিয়ে ভারতে আসার প্রস্তুতি শুরু করেন।

বহুল জনশ্রুতি আছে, শাহজালাল যখন ভারতের উদ্দেশে পাড়ি দিতে যাবেন, মামাপীর তাঁর হাতে একমুঠো মাটি তুলে দিয়ে নাকি বলেছিলেন—‘যাও, যেখানে এই মাটির স্বাদ, গন্ধ ও বর্ণের মিল পাবে, সেখানেই তুমি দাওয়াতি অভিযানের আস্তানা গড়ে তুলবে।’ মুর্শিদে কামেল সৈয়দ আহমদ কবির রহমতুল্লাহি আলায়হির দোয়া নিয়ে মক্কা শরিফ থেকে বেরিয়ে পড়েন শাহজালাল।

মক্কা শরিফ থেকে হিন্দুস্তানে আসার পূর্বপর্যন্ত পথিমধ্যে অনেক সহচর তাঁর সাথে মিলিত হন। তাঁদের মধ্যে হাজি ইউসুফ, হাজি খলিল, হাজি দরিয়া, চাশনি পীর, সমরকন্দের সৈয়দ ওমর, রোমের করিমদাদ, বাগদাদের নিজামউদ্দিন, ইরানের জাকারিয়া ও শাহ দাউদ এবং সৈয়দ মুহাম্মদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের নিয়েই তিনি ভারতবর্ষে প্রবেশ করেন। ভারতবর্ষে প্রবেশের পরে আধ্যাত্মিক শক্তির পরিচয় পেয়ে তাঁর সহচরদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে। আজমির শরিফ থেকে মুহাম্মদ শরিফ, মুলতান থেকে আরিফ, গুজরাট থেকে জুনায়েদ, দাক্ষিণাত্য থেকে সৈয়দ কাসিম, মধ্যপ্রদেশ থেকে হেলিমউদ্দিন প্রমুখ এসে তাঁর সাথে মিলিত হন। যখন তিনি দিল্লি পৌঁছলেন, তাঁর শিষ্যদের সংখ্যা দাঁড়াল আনুমানিক ২৪০-এ। দিল্লিতে এসে তিনি বিশ্ববিখ্যাত দরবেশ হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলায়হির সাথেও সাক্ষাৎ করেন। কথিত আছে শায়েখ নিজামুদ্দিন শাহজালালকে দোয়া করার সাথে সাথে ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ একজোড়া সুরমা রঙের কবুতরও উপহার দেন। আরো কথিত আছে যে, আজকের দরগাহে হজরত শাহজালাল ও আশপাশের এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে যেসব কবুতর, এগুলো নাকি তাদেরই বংশধর।

হজরত শাহজালাল তাঁর সাথিদের নিয়ে যখন দিল্লিতে অবস্থান করছিলেন, তখন সিলেটের গাজি বুরহানুদ্দিনও ছিলেন দিল্লিতে। আল্লাহর ইচ্ছা—সেখানেই উভয়ের সাক্ষাৎ ঘটে। তাঁর কাছ থেকেই গৌড়রাজ্য সম্পর্কে অবহিত হন শাহজালাল। কালবিলম্ব না করে ২৪০ জন সহচর নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। গন্তব্য গৌড়রাজ্য।

তখন গৌড়রাজ্যের সিংসাহসনে অধিষ্ঠিত গোবিন্দ। সে ছিল চরম পর্যায়ের অত্যাচারী শাসক। তার শাসনামলে যাদুবিদ্যা ধারণ করেছিল চরম রূপ। নরবলি, কুসংস্কার, অপবিশ্বাস, অন্ধবিশ্বাস—এসব তো ছিল রাজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিক্ষা বলতে যা ছিল, তা একেবারে গৌণ। যাদুবিদ্যা কি কোনো শিক্ষা? সভ্যতা বলতে যা ছিল, তাও অনুল্লেখ্য। বস্তুত মুসলিম বিজয়ের আগপর্যন্ত শিক্ষা-সভ্যতার উল্লেখযোগ্য কোনো নিদর্শন পাওয়া যায়নি গৌড়ে।

টুলটিকর নিবাসী গাজি বুরহানুদ্দিন তাঁর পুত্রসন্তানের আকিকা দিলেন গরু জবাই করে। গোবিন্দের তা সহ্য হলো না। সে গাজি বুরহানুদ্দিনকে ডেকে এনে কাঠগড়ায় দাঁড় করালো। একপর্যায়ে তাঁর শিশুসন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করে ফেলল। পিতা হিসেবে এই নির্মমতা সহ্য হলো না বুরহানুদ্দিনের। তিনি তৎকালীন বাংলার সুলতান ফিরোজ শাহের নিকট গেলেন। খুলে বললেন সব ঘটনা। সুলতান শুনেই চকিতে ফিরে তাকালেন। যেন মনে মনে ভাবলেন—‘এই নির্মমতার খেসারত তোমাকে দিতেই হবে গোবিন্দ।’

সুলতান জরুরি তলব করলেন ভাগ্নে সিকান্দার গাজিকে। জানালেন সব কাহিনি। যেন নির্দেশ দিলেন—‘সেনাদল নিয়ে ছুটে যাও গৌড়ের দিকে, মাটির সাথে মিশিয়ে দাও গোবিন্দের মসনদ।’ নির্দেশ পাওয়া মাত্র ছুটে চলল শাহি সেনাদল।

সিকান্দার গাজির সেনাদল যখন ব্রহ্মপুত্র নদী পার হতে যাবে, তখনই গোবিন্দ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সশরীরে তো সামনে আসার সাহস হয়নি, তাই আশ্রয় নেয় যাদুবিদ্যার। প্রয়োগ করে ভৌতিক শক্তি। মুসলিম সৈন্যদের ওপর নিক্ষেপ করতে লাগল অগ্নিবাণ। যার মোকাবেলা করার মতো কোনো অস্ত্র ছিল না সেনাবাহিনীর কাছে। এখান থেকেই ফিরে আসতে হলো সিকান্দার গাজিকে। ফিরে আসতে হলো মুসলিম মুজাহিদ কাফেলাকে।

এই খবর যখন পৌঁছল দিল্লির সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজির নিকট, তিনি খুব মর্মাহত হলেন। ডাকলেন রাজদরবারের আলেমদের। পরামর্শ করলেন তাঁদেও সঙ্গে। সিদ্ধান্ত হলো, গৌড়গোবিন্দের যাদুকরদের মোকাবেলায় অস্ত্রশক্তির সাথে আধ্যাত্মিক শক্তির সমন্বয় প্রয়োজন। এজন্য প্রয়োজন এমন একজন সেনাপতির, যিনি অস্ত্রশক্তি ও আধ্যাত্মিক শক্তি উভয় দিক দিয়ে বলিয়ান হবেন। খোঁজা শুরু হলো সেই হবু সেনাপতিকে। পাওয়া গেল একটি তাবুতে। সাধারণ সেই সেনা একাগ্রচিত্তে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করছেন। তিনি সৈয়দ নাসিরউদ্দিন রহমতুল্লাহি আলায়হি। সম্রাট তাকে সেনাপতির সনদ প্রদান করে, তার নেতৃত্বে গৌড় অভিমুখে প্রেরণ করলেন জিহাদি কাফেলা।

সাতগাঁও-এর ত্রিবেণী হুগলী নদী। এখানে এসে নাসিরউদ্দিনের অগ্রবর্তী সেনাদল ও শাহজালালের অনুচরদের সাক্ষাৎ হয়। সিপাহসালার সৈয়দ নাসিরউদ্দিন শাহজালালের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ফলে যৌথবাহিনীর আমিরুল মুজাহিদিন হয়ে যান শাহজালাল।

যৌথবাহিনীর আমির হজরত শাহজালাল ও যৌথবাহিনীর সিপাহসালার নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে ত্রিবেণী থেকে কাফেলা এখন বিহারের উদ্দেশে রওয়ানা। যাত্রাপথে হিসামউদ্দিন ও আবু মোজাফফরসহ আরও বেশ কয়েকজন অনুচর যুক্ত হলেন এই কাফেলায়।

বিহার থেকে বিশাল কাফেলা এখন সোনারগাঁয়ের পথে। নাসিরউদ্দিনের আনীত এক হাজার অশ্বারোহী ও তিন হাজার পদাতিক সৈন্যসহ শাহজালাল নিজ সহচরদের নিয়ে সিকান্দার গাজির সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে সোনারগাঁ অভিমুখে রওয়ানা দেন। শাহজালাল সোনারগাঁ আসামাত্র সিকান্দার গাজি তাদের অভ্যর্থনা জানান। তারপর সসম্মানে নিয়ে যান প্রশিক্ষণশিবিরে। সিকান্দার গাজি নিজ হাতেই তাদের যুদ্ধকৌশল রপ্ত করিয়ে দেন। একপর্যায়ে সিকান্দার শাহজালালের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এক-দু’জন করে এভাবে শাহজালালের বিশেষ অনুচরদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬০-এ।

শাহজালালের বিশাল কাফেলা এখন ‘এইম ইন অ্যাডভেঞ্চার’ গৌড়রাজ্যের দিকে। অগ্রসরমান এই কাফেলার আগমন-সংবাদ গোবিন্দ পর্যন্ত আসতে খুব বেশি দেরি হয়নি। নিজস্ব গুপ্তচর দ্বারা সংবাদপ্রাপ্ত হয়েই রাজা নড়েচড়ে বসল। কাফেলাকে গৌড়ে প্রবেশ করতে দেবে না বলে যেন প্রতিজ্ঞা করে নিল। এজন্য ব্রহ্মপুত্র নদীতে নৌ-চলাচল বন্ধ করে দিল। কিন্তু আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত জালালি এই কাফেলাকে থামায় কে? শাহজালাল রহমতুল্লাহি আলায়হি নদীর পানিতে নিজের জায়নামাজ বিছিয়ে দিলেন আর অনায়াসে ভেসে ভেসে পার হয়ে এলেন স্রোতস্বিনী ব্রহ্মপুত্র।

কাফেলাটি ব্রহ্মপুত্র নদী পার হয়ে প্রথমেই সাময়িক অবস্থান নেয় নবিগঞ্জের দিনারপুর পরগণার পাশে স্থাপিত রাজ্যের সীমান্ত-চৌকিতে। সীমান্তরক্ষীরা ভৌতিক শক্তির সাহায্যে অগ্নিবাণ প্রয়োগ করে তাদেরকে প্রতিহতের ব্যর্থ চেষ্টা করে। রাজা গোবিন্দ মুসলিম কাফেলাকে সীমান্তে প্রতিরোধের উপায়ান্তর না পেয়ে বরাক নদীতে নৌ-চলাচল বন্ধের গোষণা করে। কিন্তু অপ্রতিরোধ্য এই কাফেলাটি পূর্বের মতো জায়নামাজের সাহায্যে পার হয়ে আসে। বরাক পাড়ি দিয়ে বাহাদুরপুর হয়ে আধুনিক সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার ফতেহপুর এলাকায় রাত্রিযাপন করে কাফেলা।

শাহজালাল রহমতুল্লাহি আলায়হির রোমাঞ্চকর এই অভিযাত্রাটি সিলেটের মানুষদের মুখেমুখে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। শত শত বছর পর প্রবীণ ব্যক্তিদের মুখে এখনো শোনা যায়—

‘চৌকি নামে ছিল যেই পরগণা দিনারপুর

ছিলটের হর্দ্দ ছিল সাবেক মসুর

সেখানে আসিয়া তিনি পৌঁছিলা যখন

খবর পাইলা রাজা গোবিন্দ তখন

এপারে শাহজালাল তার লস্কর সহিতে

আসিয়া পৌঁছিলা এক নদীর পারেতে

বরাক নামে নদী ছিল যে মসুর

যাহার নিকট গ্রাম নাম বাহাদুরপুর

যখন পৌঁছিলা তিনি নদীর কেনার

নৌকা বিনা সে নদীও হইলেন পার…’

সর্বোচ্চ শক্তির যথেষ্ট প্রয়োগ করেও গোবিন্দ যখন যৌথবাহিনীকে প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়, তখন সর্বশেষ প্রচেষ্টা হিসেবে যাদুমন্ত্রসহ একটি লৌহধনুক শাহজালালের কাছে এই শর্তে প্রেরণ করে যে, মুসলিমদের কেউ একজন যদি এই ধনুকের ‘জ্যা’ ছিন্ন বা ‘শরযোজনা’ করতে পারেন, তাহলে গোবিন্দ তার রাজ্য ছেড়ে চলে যাবে। হজরত শাহজালাল তৎক্ষণাৎ ঘোষণা করলেন—‘আছে কি কেউ এই বাহিনীতে, যার সারাজীবনে কোনোদিনও ফজরের নামাজ কাজা হয়নি বা বাদ পড়েনি?’ পাওয়া গেল একজন। তিনি সিপাহসালার সৈয়দ নাসিরউদ্দিন। আল্লাহর ইচ্ছায় তিনিই প্রকাণ্ড এই ধনুকের ‘জ্যা’ ছিন্ন করতে সক্ষম হন।

এখানেও রাজা গোবিন্দকে পরাজয়ের গ্লানি মাথা পেতে মেনে নিতে হলো। সে এখন বিশ্বাস করছে, স্বাদের এই রাজসিংহাসন এখন ছেড়ে দিতে হবে, এমনকি পূর্বপুরুষদের স্মৃতিবিজড়িত এই রাজ্যটিও। হয়তো-বা মনেমনে তখন ভাবছিল, হায়! কেন এই কাজ করতে গেলাম! কেন বুরহানউদ্দিনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালাম! কেন-বা তার ফুটফুটে শিশুটিকে নির্মমভাবে হত্যা করলাম! হয়তো-বা সে নিজের মাথা পাথরে আছড়াচ্ছিল আর দুইহাতে নিজের চুল ছিঁড়ছিল। কে জানে? ইতিহাস এখানে নীরব।

তবে শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত গ্রন্থে আছে—‘শিশুরা জুজুর ভয়ে স্বভাবত ভীত হইলেও যেমন কোনো কোনো দুরন্ত শিশু জুজু কেমন দেখিতে ইচ্ছা করে, কথিত আছে, পলায়নের পূর্বে তেমনই গোবিন্দের মনে একটা কৌতূহলের উদয় হয়। এবং তিনি সেই কৌতূহল তৃপ্তির জন্য সর্পক্রীড়নকের পেটিকাভ্যন্তরে লুক্কায়িতভাবে থাকিয়া শাহজলালকে দেখিতে গমন করেন। শাহজলাল তাহার এ চাতুর্য ধরিয়া ফেলিলেন, তখন তিনি লজ্জিত হইয়া অবনত মস্তকে শাহজলালের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতঃ রাজ্য ছাড়িয়া যাইতে স্বীকৃত হন। গোবিন্দ বিমর্ষমনে প্রত্যাগমন করিলেন।’

গোবিন্দ নিশ্চিত পরাজয় জেনেও সুরমা নদীতে নৌ-চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। কেন করল? যেহেতু সে ভালো করেই জানে যে, মুসলিমদের এই কাফেলাটি আগেও দু’-দু’ বার জায়নামাজ বিছিয়ে ব্রহ্মপুত্র ও বরাক পেরিয়ে এসেছে, তারপরও নিষিদ্ধ করেছিল এইজন্য যে, পলায়নের সময়টা একটু বেশি পাওয়া যাবে। কারণ, সুরমা পার হলেই গৌড়ের রাজধানী। তাই পলায়নের জন্য খানিকটা সময় হাতে রাখা দরকার। হজরত শাহজালাল সুরমা নদীর তরঙ্গমালায় বিছিয়ে দিলেন পবিত্র জায়নামাজ। আর পূর্বের মতো পেরিয়ে এলেন সাথিদের নিয়ে অনায়াসে।

রাজা গোবিন্দ সখের সাজানো-গোছানো রাজবাড়ি ছেড়ে দিয়ে আত্মগোপন করে। সে পলায়ন করে কোথায় গিয়েছিল, তার ধারাবাহিক ইতিহাস সংরক্ষিত নেই। তবে প্রাথমিক অবস্থায় পেচাগড় পর্বতের গুপ্ত গিরিদুর্গে আশ্রয় নেওয়ার তথ্য আছে। এই দুর্গটি সিকান্দার গাজির গৌড়াভিযানের পরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাতে একটা ধারণা করা যায় যে, ভৌতিক শক্তির সাহায্যে সিকান্দার গাজিকে পরাভূত করলেও গোবিন্দের মনে মুসলিমভীতি রয়েই গিয়েছিল, এজন্য পরিস্থিতির শিকার হলে নিরাপদে পালানোর পথ আগে থেকেই তৈরি করে রেখেছিল। তাই যখন সে পালিয়ে যায়, কোথায় গিয়েছিল, তার খবর কেউ জানে না।

তবে আমার ধারণা হয়, সে পার্শ্ববর্তী রাজ্য জৈন্তিয়ায় আশ্রয় নেয়। কারণ, তখনও জৈন্তিয়ারাজ্য মুসলিমদের দখলে আসেনি। সম্ভবত জৈন্তিয়ায় তখন কৃষক রাজাদের বা পুরোহিত রাজাদের শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই ধারণাটি মোটামুটি মজবুত হয় তখন, যখন দেখি সিলেট শহরের অদূরস্থ মালনিছড়া চা বাগানের পাশের ‘হারং হুরং’ নামের বিকল্প সুড়ঙ্গপথটি। ধ্বংসপ্রাপ্ত এই সুড়ঙ্গপথের আশপাশের বাসিন্দাদের বিশেষ করে কুলিদের (চা-শ্রমিক) ধারণা সুড়ঙ্গপথটির শেষপ্রান্ত রয়েছে জৈন্তায়। কিন্তু জৈন্তার কোথায়, তা কেউ বলতে পারেনি। আমার ধারণা, এই সুড়ঙ্গের শেষপ্রান্ত বর্তমান জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল এলাকায় রয়েছে। কারণ, চিকনাগুল এলাকার পাত্র সম্প্রদায় (যারা মাটির হাড়ি-পাতিল ইত্যাদি তৈরি করে) জোরগলায় দাবি করে যে, তারা নাকি রাজা গোবিন্দের বংশধর। এই সুড়ঙ্গে প্রত্নতত্ত্ব গবেষণা পরিচালিত হলে সত্যটি বেরিয়ে আসবে। সেই পর্যন্ত আমাদের ধারণায় থাক—গৌড়গোবিন্দ রাজবাড়ি পরিত্যাগ করে পেচাগড়ের গুপ্ত গিরিদুর্গ থেকে হারং হুরং সুড়ঙ্গপথ দিয়ে বর্তমান জৈন্তার চিকনাগুল এলাকায় নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করে।

গোবিন্দের আত্মগোপন নিয়ে যেমন প্রামাণ্য কোনো ইতিহাস নেই, তেমনি তার জন্ম নিয়েও ফাঁদা হয়েছে আজগুবি এক কেচ্ছা। শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত পূর্বাংশে শ্রী অচ্যুত চরণ চৌধুরী লিখেন—‘গোবিন্দের পিতার নাম কী ছিল তা জানা যায় না। কিংবদন্তি মতে তিনি সমুদ্রতনয়। কথিত আছে যে, পূর্বকালে ত্রৈপুর রাজবংশের কোনো এক রাজার শতশত মহিষী (স্ত্রী) ছিল। সমুদ্রদেব (বরুণদেব) তন্মধ্যে কোনো এক মহিষীর সহিত মনুষ্যাকারে সম্মিলিত হন। তাহার কৃপাতেই রানী গর্ভধারণ করেন। এই গর্ভের কথা প্রকাশিত হইলে রাজা সেই রানীকে নির্বাসিত করেন। তদাবস্থায় রানী এক সুলক্ষণান্বিত পুত্রসন্তান প্রসব করেন। এ নির্বাসিত রানীর পুত্রই গোবিন্দ।’ অনেকেই মনে করেন, এসব পাগলের প্রলাপ। অচ্যুত চরণ কীভাবে তা বিশ্বাস করলেন?

‘রাজা গৌড়গোবিন্দ স্বভাবত ধর্মভীরু ছিলেন। তিনি মুসলমানদের আগমনে স্বধর্ম রক্ষার জন্য বাড়ি পরিত্যাগ করেন। শাহজালাল রাজবাড়ি ভাঙ্গিয়া তথায় এক মসজিদ নির্মাণ করে।’ শ্রীহট্টের ইতিহাসগ্রন্থে মোহিনী মোহন দাসগুপ্ত এমন আজগুবি ও বিদ্বেষমূলক কথাই বয়ান করেছেন। এভাবেই তারা তাদের অন্তরের মুসলিমবিদ্বেষ প্রকাশ করেছেন। তা আবার মুসলিমদেরই গেলাচ্ছেন কৌশলে।

হজরত শাহজালাল সুরমাপাড়ে তিনদিন অবস্থান করার পর মিনারের টিলায় অবস্থিত গৌড়ের রাজবাড়ি দখল করেন। যৌথবাহিনীর সিপাহসালার সৈয়দ নাসিরউদ্দিনের আজানের মাধ্যমে গৌড়রাজ্যের আনুষ্ঠানিক পতন হয় আর সিলেটে সূচিত হয় নতুন অধ্যায়, প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম শাসনব্যবস্থা। শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত গ্রন্থমতে—‘মিনারের টিলা সাততলা উচ্চ ছিল, শাহজলালের ও তাহার শিষ্য নুরের আজান-ধ্বনির প্রতিঘাতে তাহা ভাঙ্গিয়া পড়িয়া যায়।’

হজরত সিকান্দার গাজিকে রাজ্যের শাসক নিয়োগ দিয়ে তিনি ইসলাম প্রসারের কাজে মশগুল হয়ে যান।

দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি হজরত শাহজালালকে নবাবি প্রদান করে একটি সনদপত্র প্রেরণ করেন। কিন্তু শাহজালাল তা প্রত্যাখ্যান করেন। এক পর্যায়ে আলাউদ্দিন খিলজি তাঁকে সিলেটের জায়গির গ্রহণ করতে অনুরোধ করেন। তাতেও রাজি হননি তিনি। শেষ পর্যায় শাহজালালের প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান ও অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রদর্শনের জন্য সিলেট শহরকে রাজস্বমুক্ত (কসবে) বলে ঘোষণা করা হয়।

হজরত শাহজালাল সিলেটের সরাসরি শাসক না হলেও ‘নেপথ্য শাসক’ ছিলেন নিশ্চয়। কারণ, তিনি জীবিত থাকাবস্থায়ই সিকান্দার গাজি নিহত হন। ‘তোয়ারিখে জালালী’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে—

‘যখনে মরিল সেই গাজি সিকান্দর

বেসরদার হৈল ছিলট নগর

এজন্যে হজরত শাহজালাল এমনী

নিযুক্ত করি দেন সরদার তখনি…’

হজরত সিকান্দার গাজির মৃত্যুর পর শাহজালাল তাঁর আরেক বিশ্বস্ত সহচর হায়দার গাজিকে সিলেটের শাসক নিযুক্ত করেন। এভাবে শাহজালাল একেবারে পাশে থেকে সিলেটের শাসকদের আন্তরিকভাবে পরিচালনা ও নিবিড়ভাবে পরিচর্যা করেছেন আজীবন।

জনশ্রুতি আছে, শাহজালালের সহচর চাষনী পীর ইয়েমেনের মাটির স্বাদ, গন্ধ ও বর্ণের মিল পেয়ে যান সিলেটের মাটিতে, তাই শাহজালাল সিলেটেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন আর ৩৬০ জন সাথিদের ‘দাওয়াহ ইলাল্লাহ’ ও ‘তাবলিগে দীন’-এর জন্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেন চারদিকে। এই তথ্যটি জনশ্রুতি হলেও ইতিহাসবিজ্ঞান ও প্রত্নতত্ত্ববিদ্যার নিক্তিতে মাপলে সঠিক এবং সঠিকই প্রমাণিত হবে আমার বিশ্বাস। কারণ, আরবের মাটির সঙ্গে সিলেটের মাটির মিল প্রমাণের জন্য সিলেটের তেল ও গ্যাসক্ষেত্রকে সামনে নিয়ে আসা যেতে পারে।

শাহজালাল রহমতুল্লাহি আলায়হি সিলেট বিজয় করে মুসলিম বাংলার রাজধানী সভ্যতার নগরী সোনারগাঁয়ের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে সিলেটকেও সভ্যতার নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়াসী হন। বিশ্ববিখ্যাত পর্যটক মরক্কোর ইবনে বতুতা ১৩৩০ সালে আরব সাগর পাড়ি দিয়ে, সিন্ধুর সমুদ্রবন্দরে অবতরণ করে, অনেক দেশ পরিভ্রমণ পরে, ভারত হয়ে চীন যাবার পথে, ১৩৪৬ সালে শাহজালালের সাথে সাক্ষাতের জন্য সোনারগাঁ থেকেই সিলেট এসেছিলেন। তিনি শাহজালাল সম্পর্কে লিখেন—‘তাঁর দেহের গঠন ছিল হালকা-পাতলা। মুখমণ্ডলে ছিল অল্প দাড়ি। তিনি রাতের বেশিরভাগ সময় আল্লাহ তায়ালার ইবাদত-বন্দেগি করতেন। নিষিদ্ধ দিন ছাড়া সারা বছর রোজা রাখতেন। ১০ দিন পরপর রোজা ভাঙতেন। গাভীর দুধ পান করতেন। তাঁর জীবনযাপন ছিল সাদাসিধা। দিলের দরদ ও ভালোবাসা দিয়ে তিনি মানুষের মন জয় করেছেন। তাঁর কাছে দলে দলে লোক ইসলামধর্ম গ্রহণ করেছে। প্রতিদিন ভক্তজনরা তাঁর কাছে নিয়াজ-নজর নিয়ে আসতো। এ সকল নিয়াজ-নজর দ্বারা লঙ্গরখানা (বিনামূল্যে খাবারঘর) পরিচালিত হতো। এভাবেই বহু লোক প্রতিপালিত হতো।’ (ইবনে বতুতার সফরনামা : নাসির আলি)

শাহজালালের সিলেট থেকে ফেরার পথে ইবনে বতুতা যা দেখেছিলেন, আত্মভ্রমণকাহিনি ‘রেহালা’ গ্রন্থে তার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে—‘এটি (সিলেট) একটি সুন্দর শহর। একটি নদী ‘নহরুল আজরক’ (সুরমা নদী) মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে। কামরূয়া (কামরূপ) পর্বত থেকে নদীটি উৎপন্ন হয়েছে। এ নদী দিয়ে লোকজন বাঙ্গালা ও লখনৌতিতে (গৌড়ের অন্যনাম) ব্যবসা-বাণিজ্য করে। নদীর দু’তীরের বাসিন্দারা চড়কি দিয়ে পানি তোলে। ‘হবঙ্কের’ (আজমিরিগঞ্জ বা বানিয়াচং) মজলুম মানুষ এখানকার কাফির পাষাণ জালিমদের হাতে জিম্মি। জালিমরা জোর করে নিরীহ মানুষের ফলানো ফসলের আধা-আধি নিয়ে যায়। এই দুর্বৃত্তরা মানুষকে বেগার খাটায়। গাঙের উভয় তীর গাছ-গাছালিতে ভরা। নৌপথে কাছাকাছি হলে নাকাড়া বাঁজিয়ে হুঁশিয়ারি-ঘণ্টা কিংবা সালামি সংকেত বাঁজানো হয়। বাদশাহ ফখরুদ্দিনের হুকুমে রাহি মুসাফিরদের কাছ থেকে কোনো ধরনের ট্যাক্স নেয়া হয় না। ১৫ দিন পথ চলার পর আমরা সুদাকাবা (সোনারগাঁ) পৌঁছুলাম।” (ইসলাম প্রসঙ্গ : ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ)

ইতিহাসবিদ টি এইচ অনার্ল্ড বলেন—‘ইসলাম এ উপমহাদেশে এসেছিল যুগযুগ ধরে লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, ভাগ্যাহত, মূক জনগণের মুক্তির প্রতিশ্রুতি নিয়ে।’

উপমহাদেশে ইসলামের সূর্য উদিত হওয়ার অনেক পরে হলেও যে সিলেটে তার ঝলমলে আভা ছড়িয়ে পড়েছে শাহজালালের মাধ্যমে, এটা আল্লাহর অনেক বড় অনুগ্রহ। আলহামদুলিল্লাহ। শাহজালালের যৌথবাহিনীর দুর্দান্ত সফরের মধ্য দিয়ে অবিশ্বাসের অন্ধকূপে প্রজ্বলিত হয় বিশ্বাসের আলো। গোবিন্দালয়ে উড্ডীন হয় তওহিদের পতাকা। প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্র। পৃথিবীর বুকে গড়ে ওঠে সভ্যতার আরেকটি নতুন নগরী। আগেই বলা হয়েছে—‘বস্তুত ইসলামের সুবিমল জ্যোতি যেখানেই তার মহিমা নিয়ে ভাস্বর হয়েছে, সেখানেই রচিত হয়েছে নতুন অধ্যায়, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উন্নত সভ্যতা, বিলুপ্ত হয়েছে অন্ধকার, অসভ্যতা আর কুসংস্কার।’

আজ যে শিক্ষা-সংস্কৃতি, শিল্প-সভ্যতা নিয়ে সিলেটের মানুষ গর্ববোধ করেন, তার সূচনা হয়েছিল সেই শাহজালালের আমলে। মুসলিম শাসনের অধীনে গৌড় না এলে, অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি বলতে পারতেন না—‘শ্রীহট্ট হলো পৃথিবীর এক ক্ষুদ্র সংস্করণ।’ পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুও বলতে পারতেন না—‘সিলেট ইজ বেঙ্গল বাট উইথ এ ডিফারেন্স।’ পল্লীকবি জসিমউদ্দীনও যথার্থ বলতে যেতেন না—‘সিলেট একটি কবিত্বময় পরিবেশের আদি নিবাস, এখানে বাস করে কবি না হয়ে পারা যায় না।’ আর পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ সিলেট সফরে এসে আশাবাদ ব্যক্ত করতেন না—‘ইচ্ছে হয় তোমাদের এই সবুজ সুন্দর পরিবেশে আমিও একটি বাড়ি নির্মাণ করি।’ কারণ, ঐতিহাসিক সত্য—শিকড়হীন কোনোকিছু বেশিদিন টিকে থাকে না। আর সবচেয়ে মজবুত শিকড় হচ্ছে ইসলাম। যার শিকড় প্রোথিত মাটির অত্যন্ত গভীরে। কিন্তু এই শিকড়ে আজকের মুসলিমরা বুকের তাজা খুন সিঞ্চন করে না, তাই যথেষ্ট পরিমাণে ফলে না ফসল। বলতে পারেন, পশ্চিমা সভ্যতা তো টিকে আছে আজ বহুদিন। খুঁজে দেখুন, সেই সভ্যতার শিকড়েও আছে মুসলিমদের অবদান, আছে ইসলামের আলো। অন্যভাবে বলা যায়—ইসলামহীন সভ্যতা, সভ্যতাই নয়।

শাহজালালের জালালাবাদ আজ দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী। মসজিদ, মাদরাসা, খানকা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্সটিটিউট, গণগ্রন্থাগার, পাঠাগার, গবেষণাগার, পর্যটন স্পট—এককথায় সভ্যতার নগরী হতে হলে যা যা দরকার মোটামুটি হলেও সবই আছে আধুনিক এই সিলেটে। শাহজালালের আধ্যাত্মিক প্রভাব সমাজের সর্বত্রই করছে ঝলমল। এমনকি সিলেটের লোকজ ঐতিহ্যও ইসলাম-প্রভাবিত। আর যে সমাজের লোককথা, লোককাহিনি, লোকসাহিত্য আর লোকসংস্কৃতিতে ইসলাম প্রভাব সৃষ্টি করতে পেরেছে, সেই সমাজে ইসলামের শক্তি পরিমাপের জন্য মসজিদ, মাদরাসা, খানকা আর আলেম-ওলামার সংখ্যাধিক্য মুখ্য হয় না। কারণ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আর ধর্মীয় পণ্ডিতদের মুখ্য-উদ্দেশ্যই হচ্ছে, লোকজ ঐতিহ্যে ইসলামের প্রভাব বিস্তার করা। এ ক্ষেত্রে শাহজালালের নিকটোত্তরসূরি আলেমসমাজ সফলই বলা যায়। যদিও আজকের আলেম-ওলামা সমাজ থেকে কেন যেন খানিকটা দূরে থাকার চেষ্টা করেন, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

সিলেটের সাবেক সীমা নিয়ে ‘ছিলটী নাগরী’ ভাষায় লেখা একটি বন্দনা থেকে অনুমান করা যায়, সিলেটের লোকসাহিত্যে ইসলাম কতটুকু গভীরে প্রবেশ করেছে। বন্দনাটি এই—

‘পহেলা বন্দনা করি মালিক ছততার

দুছরা বন্দনা করি নবী মছতফার।

পূবেতে বন্দনা করি আসামর পা’ড়

দখখিনে বন্দনা করি জিলা তিরপুরার।

উত্তরে বন্দনা করি হিমালী পর্বত

পছচিমে বন্দনা করি ময়মনসিংয়ের পথ।

তিছরা বন্দনা করি ছিলটী মানুষ

না-কিছের কথাগুলি হুন দিয়া হুঁশ।

কিতার লাগি গম কর আল্লা আছইন লগে

পীর মুরশিদ আউলিয়ার দোয়া আছে সংগে।

কত নিয়ামত দিছইন আল্লায় ছিলটর মাঝ

বাশশাগিরি করা অইল ছিলটির কাজ।

আরব দেশের মাটির লগে মিল ছিলটর

এর লাগি বাস এথা বাবা শাহজলালর।’

মানবজীবন যে অতিসাধারণ ও সামান্যকিছু, তা বোঝাতে সিলেটের মানুষ আওড়ান—

‘আইতে খুশি যাইতে বেজার

মাইজখানো রঙের বাজার।’

সিলেটের প্রবীণ মানুষেরা নতুন প্রজন্মকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন—

‘ইনশাল্লা কইয়া কইরো কাজ

অইবো কাম, না-পাইবায় লাজ।’

যখন ছোট ছিলাম, সঙ্গদোষ বোঝাতে দাদা প্রায়ই বলতেন—

‘আনা চুরে চুরা অয়

চুরার বাড়িত গেলে

মুরিদ অয়না ভালা

পির ভালা না অইলে।

গাই ভালা যার বাছুর ভালা

দুধ ভালা তার ঘি

বাপ ভালা যার পুত ভালা

মাই ভালা যার ঝি।’

আমার ৩ বছরের ছোট্ট ভাতিজিটি প্রায়ই জায়নামাজে দাঁড়িয়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে ছিলটী ভাষায় গায়—

‘সুবহানাল্লা, সুবহানাল্লা, সুবহানাল্লাজি

অন্ধকার কয়বরে যাইতে সংগে নিতাম কী?

সংগে নিতাম ফজরের নামাজ কযা কইরাছি

হায় রে আমার ময়নাপাখি ঘুমাইয়া রইছনি?’

সে আরও অনেককিছুই জানে এমনতর। হাঁটতে-বসতে, খেতে-ঘুমোতে জপে আর জপে। এই মুহূর্তে সেসব মনে পড়ছে না। আমার ভাতিজি ফারজানার মতো কতশত ফারজানা যে তাদের দাদা-দাদি আর বড়োমা-বড়োবাবা’র কাছ থেকে এমন আরও প্রচুর লোকসাহিত্য মুখস্থ করছে, তার কোন ইয়ত্তা নেই। সিলেটিরা এভাবেই তাদের ঐতিহ্যকে লোককথা, লোককাহিনি দিয়ে মুখেমুখে ধরে রেখেছেন।

অনেকেই হয়তো বলবেন যে, লোকসাহিত্য দিয়ে ইসলামের প্রভাব কীভাবে বুঝানো সম্ভব? এই ধারণা মনে আসতেই পারে। কারণ, বিষয়টি কিছু জটিল-জটিল। আমাদের মনে রাখতে হবে, লোকসাহিত্য তৈরি হয় লোকসংস্কৃতি থেকে। আর লোকসংস্কৃতি গড়ে ওঠে সমাজের গভীর থেকে। আর সমাজের গভীরে যে চেতনা কাজ করে, তা-ই সংস্কৃতিতে প্রকাশ পায় আর সাহিত্যে ফুটে ওঠে। গৌড় বিজয়ের সুদীর্ঘ সাতশত বছর পরেও জালালাবাদের পরতে পরতে এখনো শাহজালাল, সিকান্দার গাজি ও নাসিরউদ্দিনের ‘ইসলামিক রাজ্য সিলেট’-এর যথেষ্ট প্রভাব ও অসামান্য অবদান লক্ষ করা যায়।

শিক্ষা, দাওয়াত, আত্মশুদ্ধি ও জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ—নববি এই চার কর্মসূচিকে যথাসময়ে যথাযথ পালন করে করে ১৩৪৭ সালের কোনো এক নীরব ও নিস্তব্ধ দিনের মধ্যভাগে সিলেটের মহাপুরুষ হজরত শাহজালাল মুজাররদে ইয়ামানি রহমতুল্লাহি আলায়হি মাওলার সান্নিধ্যে পাড়ি জমান। তাঁর মাকবারা এতই সুপরিচিত ও সুপ্রসিদ্ধ যে, এর পরিচয় দিয়ে সময় নষ্ট করার মানেই হয় না।

বিশ্ববিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা লিখেন—‘ইন্তেকালের একদিন আগে শায়েখ তাঁর ভক্ত-অনুরাগীদের বলেছিলেন, “আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছায় আমি আগামীকাল তোমাদের ছেড়ে মাবুদের দরবারে চলে যাব। তোমরা রাব্বুল আলামিনের হুকুম মেনে চলবে। তাঁকে ভয় করবে।” পরদিন জোহরের নামাজের শেষ সেজদারত অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। শায়েখের হুজরাখানার পাশে (দক্ষিণে) একটি খনন করা কবর পাওয়া গেল। সেখানে কাফন ও আতর মওজুদ ছিল। ভক্তগণ গোসল দিয়ে জানাজা শেষে লাশ দাফন করলেন।’ (ইবনে বতুতার সফরনামা : নাসির আলী)

হজরত শাহজালালের পুরো নাম শায়েখ শাহজালাল মুজাররাদে ইয়ামানি বিন মুহাম্মদ। চিরকুমার হিসেবে ডাকা হয় মুজাররাদ। জন্মস্থানের দিকে সম্পৃক্ত করে বলা হয় ইয়েমানি। পিতার নামের সাথে মিলিয়ে মুহাম্মদ। শায়েখ তাঁর মৃত্যুর সময় ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি কিছুই রেখে যাননি। তবে যা রেখে গিয়েছিলেন, তা অতি মূল্যবান, হ্যাঁ অতি মূল্যবান—তরবারি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামও মৃত্যুকালে এই তরবারি ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো সম্পদই রেখে যাননি। কারণ, তাঁরই ঘোষণা—‘নিশ্চয় জেনে রাখো! তরবারির ছায়ার নিচে রয়েছে জান্নাত।’

শাহজালালের ব্যবহৃত ঐতিহাসিক তরবারিটি দরগাহর দক্ষিণ দিকে অবস্থিত মুফতি নাজিমুদ্দিন আহমদের বাড়িতে সংরক্ষিত আছে। দর্শনার্থীরা এই তরবারি দেখে আর দেখে, কিন্তু দেখে না তরবারিতে নিহিত সেই রাজ্যজয়ের শক্তি। রাজপথের মিছিলে ‘শাহজালালের তলোয়ার/ গর্জে উঠুক আরেকবার’ বলে গলা ফাটানো হয় ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে এই তরবারির আধুনিক ব্যবহার কেউ জানে না। অথচ ইতিহাস সাক্ষী, মুসলিম উম্মাহর হাত থেকে যেদিন তরবারি খসে পড়েছে বা তারা নিজেরা প্যাকেটিং করে তাকে তুলে রেখেছে, সেদিন থেকেই তাদের পরাজয় শুরু হয়েছে আর গোলামির শেকলে আবদ্ধ রয়েছে শতাব্দীকাল ধরে।

 

লেখক : বিভাগীয় সম্পাদক, সিলেটের দৈনিক শুভ প্রতিদিন

 

ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১