সিরাতচর্চার সূচনা, বিকাশ ও সমৃদ্ধি

সংখ্যা:

 

শুষ্ক মরুপ্রান্তর আর সারিসারি পাহাড়ঘেরা এক অভিনব নগরী মক্কা। মক্কার বুকেপিঠে রোজকার দিনগুজরানো লোকগুলোর হৃদয়ও যেন একেকটি উজান সাহারা; যেখানে পানি নেই, শূন্য শূন্য পেয়ালা। অথবা তাদের হৃদয়গুলো এমন, যেন সময়ে-অসময়ে ছুটে বেড়ায় সাফা থেকে মারওয়া বিবি হাজেরার মতো উদগ্র বাসনা নিয়ে। তারা জানে না কবে, কোত্থেকে একপশলা রহমের বৃষ্টি পবিত্র করবে তাদের দেহমন, মেটাবে আজন্মের পিপাসা। এই ঘনঘোর অনাচারের মত্ততা থেকে ফিরে আসার পথটি পাওয়ার আনন্দও তাদের খুব অচেনা।

অনুভূতিশূন্য এ মানুষগুলোর চারিদিকে বইছে কেবলই পাপাচার। পবিত্র ঘরটি জুড়ে অসংখ্য প্রতিমা দাঁড়িয়ে আছে। যত্রতত্র পড়ে আছে নোংরা যত সব ছবি। অন্যকে শোষণ আর অন্যায় আচরণ তখনকার নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা। নৈতিকভাবে এতটাই অধঃপতিত তারা, নিছক বংশগৌরব ও খাদ্যসংকটের আশঙ্কায় তাদের মেয়েশিশুরা জীবন্ত সমাহিত হচ্ছে। যেন পৃথিবীর পূর্বাপর সমগ্র জাহিলিয়্যাতের এক অভিনব সম্মিলন এ মক্কার দিগি¦দিকে, প্রতিটি প্রান্তে।

এমন এক মক্কার বুকে মক্কার বাতাসের গতিপথ থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখবার মতোই কেউ যেন উদয় হলেন। যিনি জানতেন ভালো-মন্দের পার্থক্য। অরাজকতা, অনাচার, ধোঁকা আর প্রবৃত্তির আবদিয়্যাতের মধ্যে নিজেকে সংবরণ করে রাখবার এক জীবন্ত নমুনা যিনি। বিনয়াবনত সমুজ্জ্বল প্রদীপের আলোয় রাঙা একজন মহান মানুষ। শত বছর পাপাচারে জড়িয়ে অন্তর মরে যাওয়া মক্কার সেই ফাসেক-ফুজ্জার অধিবাসীরাও যেন তাঁর প্রেমের কাছে পরাজিত। পরাজিত তাঁর আকাশস্পর্শী চরিত্রের কাছে। অবশ্যই সে মানুষটি কেবল মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম।

অবিসংবাদিত নেতা হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের এ নামটি জুড়ে যেন সত্যিই রচিত হয়ে গেছে এক পৃথিবীর অবিস্মরণীয় এক মহাবিপ্লব। সূচিত হয়েছে মানবেতিহাসের একটি সম্পূর্ণ নতুন ও অভিনব অধ্যায়। যে অধ্যায়ের প্রতিটি স্কন্ধ-শিরায় খচিত আছে উত্থান-পতন, ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং বিজয়ের সুপ্রশস্ত হাসি-কান্নার অমোঘ মিশেল। ঐশীভাবে পবিত্রতার ছাপ যার প্রতিটি শিরা-উপশিরায়। মহান প্রভুর নিজস্ব ইশারায় ঐশ্বরিক আলোকে রাঙায়িত যেন তাঁর এ ‘মুহাম্মাদি জীবন’।

ভাবলে পুলকিত হতে হয়—ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্র ছাপিয়ে কোন অঙ্গনটি অপূরণীয় রয়ে গেছে এ জীবন থেকে? কখনো শিক্ষকের মসনদে অথবা মাঝেমাঝে রাষ্ট্রপ্রধানের সম্মানে, আবার কখনোসখনো মেষের পাল নিয়ে মক্কার ধূ ধূ প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে। কী অভূতপূর্ব! নিজেকে গোছিয়ে, অপরকে সাজিয়ে আলোয় ভরিয়ে দিয়ে গেছে পুরোটা পৃথিবী। প্রমাণ করেছেন সত্যিই এ এক ‘উসওয়াতুন হাসানাহ’।

অবিশ্বাস্যই বটে, তিনি ইতিহাসের এক বিরলতম শক্তির অধিকারী, যাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মানবের ইতিহাসে হরফে হরফে লিখিত এবং উচ্চারিত। ভেতরগত-বহিরাগত সব কিছুই তো চর্চায় অগ্রগণ্য। এমন দুঃসাহসী হবার বল কি আছে কারও, যাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত লিপিবদ্ধ হবে, হবে চর্চিত? বিন্দুমাত্র দোষের দাগটুকু যে জীবন থেকে মুক্ত, তাঁর ছাড়া কার আছে এত বড় দুঃসাহস?

যেন এক অনস্বীকার্য কৃতিত্ব এটি, নবিজীবনের এই বৈপ্লবিক উপাখ্যান এবং সাফল্যের এই কীর্তি বয়ানে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম একমাত্র ব্যক্তি, যাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে পাখির দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। শুধু যে জীবদ্দশায়, তা নয়, মৃত্যু-পরবর্তী সময়েও মহাসমারোহে বিশ্লেষিত হয়েছে তাঁর সমস্ত জীবন। তাঁর জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনাপঞ্জি, মুখ থেকে বেরিয়ে আসা পবিত্রতম বাক্য এবং তাঁর কার্যকলাপসহ সম্মতি বা ক্ষোভের বিষয়গুলোও লিপিবদ্ধ হয়েছে গ্রন্থে গ্রন্থে। জীবনের এই ভয়াবহ পথে চলার উপপাদ্য প্রতিপাদ্য হিসেবে সম্মুখে রাখা হয়েছে এই পবিত্র জীবন।

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সুরম্য জীবনের এই বয়ান তো সামান্য নয়। বিস্তৃত এবং সুপ্রশস্ত। মহান এবং অবশ্যই আলোচনার সবচেয়ে উপযোগী। তবে আমাদের আজকের আলাপ সেদিকে নয়। তাঁর এই বর্ণাঢ্য জীবনের বর্ণনার গতিধারা কখন কীভাবে কোন মাত্রায় আজ পর্যন্ত পৌঁছুলো, কখন কেমন করে হলো ‘সিরাতচর্চা’ এবং যুগ থেকে যুগান্তরে কীভাবে ছড়িয়ে পড়ল সিরাতচর্চার বৈপ্লবিক গতি-প্রকৃতি, তা নিয়েই আমাদের আজকের সব কথা।

সিরাত শব্দটি সত্তাগতভাবে এমন বিস্তৃত অর্থ ধারণ করে আছে যার মধ্যে জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চলার পথের যে বিশাল সময়টুকু, তার সবটাকেই অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া যায়। যদিও ইসলামের প্রথম যুগে সিরাত কেবল নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ওই সফরগুলোকেই বলা হতো, যা তিনি যুদ্ধের উদ্দেশে সম্পন্ন করতেন। পরবর্তীকালে এ সিরাত শব্দের বিস্তৃতি এতটাই ব্যপ্ত হয়েছে, যুদ্ধাভিযান ছাড়াও তাঁর পূর্ণ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিবরণ, বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি, অভ্যাস, এবং যাবতীয় সব বিবরণ এতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। ফলে ‘সিরাত’-এর আকারও ক্রমান্বয়ে বড় পরিসরে অগ্রসর হয়েছে।

 

সিরাতচর্চার সূচনা

পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভুল যে ব্যক্তিটি, তিনিই তো নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। একজন নবি ও খোদা তাআলা-প্রেরিত রাসুল হিসেবে তাঁর ব্যক্তিসত্তার মৌলিক রূপ কুরআনুল কারিম অধ্যয়ন করার মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু তাঁর জীবনের বিশাল ফিরিস্তি বর্ণনা বা ‘সিরাত’-এর বিশদ বর্ণনার প্রধানতম মারজি’ হলো একমাত্র সাহাবায়ে কেরাম আজমাঈন রাদিয়াল্লাহু আনহুমের আগ্রহের প্রচণ্ডতা। যাঁরা শেষ অস্তিত্বটুকু দিয়ে হলেও তাঁদের মহান নেতা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে থেকেছেন। সংগ্রাম করেছেন। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে তাঁর দীর্ঘ বর্ণনাও তাঁরা দিয়ে গেছেন। এখান থেকেই সূচিত হয়েছে সিরাত চর্চার ঐতিহাসিক অধ্যায়।

হাদিসের গ্রন্থগুলোতে দেখা যায় এ ক্ষেত্রে বর্ণনায় অগ্রবর্তী ভূমিকায় ছিলেন হজরত আলি, হজরত আব্বাস, হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ, হজরত জায়েদ বিন সাবিত, হজরত আবু কাতাদাহ, হজরত আবু মুসা আশআরি, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ সাহাবি। যেমন হুনাইনের যুদ্ধের বর্ণনা পাওয়া যায় হজরত আবু কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনাসুত্রে। হজরত সালামাহ ইবনুল আকওয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে পাওয়া যায় হুদাইবিয়ার সেই ঐতিহাসিক সফরের বর্ণনাগুলো। এমনিভাবে তাঁরই সূত্র ধরে খায়বারের বর্ণনাগুলোও পাওয়া যায়। পাশাপাশি হজরত তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু উহুদ যুদ্ধের বর্ণনা আর হজরত সাহাল ইবনে সা’দ রাদিয়াল্লাহু আনহু খন্দক যুদ্ধের বর্ণনা দিয়েছেন। এমন করেই প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করা সাহাবিগণ বিভিন্ন গাজওয়ার বর্ণনা দিয়ে গেছেন।

এ বর্ণনাকারীদের দ্বিতীয় স্তরে রয়েছেন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, হজরত বারা ইবনে আজেব, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস, হজরত আনাস ইবনে মালেক এবং হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ সাহাবি। এ সাহাবিদের বর্ণনা-অনুসারে পরবর্তীকালে সিরাতের নানাদিকের চর্চা শুরু হয়েছে।

 

প্রথম যুগে সিরাত

সিরাত সম্পর্কিত বর্ণনায় এ যুগে সবচাইতে অগ্রগামী এবং গভীর আগ্রহ লালন করতেন হজরত সাহাল ইবনে আবি হাসামাহ ও হজরত সাঈদ ইবনুস সাদ ইবনে উবাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা। এ দুজন সাহাবি তৎকালে সিরাতের ওপর ছোট্ট সংকলনও তৈরি করেছিলেন।

 

তাবেয়িনে কেরামের হাতে সিরাতচর্চা

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের যুগ অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাবেয়িনে কেরাম সিরাতচর্চার ধারা সমুন্নত রাখেন। বরঞ্চ তাঁরা সিরাতের অগ্রসরমান ধারায় নতুন মাত্রা যোগ করেন। বিভিন্ন গাজওয়া এবং সিয়ার সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরামের বর্ণনাগুলো সংকলন করে রাখেন; যার ফলে সে বর্ণনার সূত্রগুলো আজও প্রশ্নাতীত হয়ে সগৌরবে বলবৎ আছে।

সাইদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রহমতুল্লাহি আলায়হি (মৃত্যু : ৯৪ হিজরি) এ যুগের সিরাত-রচয়িতাদের অন্যতম। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন আবু ফুদালাহ আবদুল্লাহ ইবনে কাব ইবনে মালিক রহমতুল্লাহি আলায়হি (মৃত্যু : ৯৭ হিজরি), আবান ইবনে উসমান ইবনে আফফান রহমতুল্লাহি আলায়হি (মৃত্যু : ১০১ হিজরি), আমির ইবনে শুরাহিল শাবি রহমতুল্লাহি আলায়হি (মৃত্যু : ১০৩ হিজরি), কাসেম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর সিদ্দিক রহমতুল্লাহি আলায়হি, মুসা ইবনে উকবাহ রহমতুল্লাহি আলায়হি (মৃত্যু : ১৪০ হিজরি), ওয়াহহাব ইবনে মুনাব্বাহ রহমতুল্লাহি আলায়হি (মৃত্যু : ১৪৪ হিজরি), আসেম ইবনে উমর ইবনে কাতাদাহ রহমতুল্লাহি আলায়হি, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে মুসলিম কুরাশি রহমতুল্লাহি আলায়হি এবং ইমাম জুহরি রহমতুল্লাহি আলায়হির মতো প্রখ্যাত তাবেয়িনে কেরাম। সিরাতের ওপর এ আলেমদের স্বরচিত গ্রন্থ সিরাতের সঠিক তথ্য সংরক্ষণে অনেক সহায়ক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। অনেক বড় বড় সিরাতগ্রন্থে তাঁদের বর্ণনা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে প্রশ্নাতীতভাবে।

 

পরবর্তীকালে সিরাতের ক্রমবিকাশ

হিজরি প্রথম শতাব্দীর শেষ দিকে এবং দ্বিতীয় শতাব্দীর কিছুকাল পেরিয়ে গেলে সিরাত-সাহিত্য ও এর গতানুগতিক ধারার পরিবর্তন ঘটে। বিস্তৃত আকারে উপস্থাপিত হতে শুরু করে নবিজীবন। কেবল ভ্রমণবিষয়ক আলাপ এবং যুদ্ধাভিযান সম্পর্কিত বর্ণনার ভেতরে সীমাবদ্ধ না থেকে নবিজীবনের পূর্বাপর সময়কাল, এমনকি তৎসংশ্লিষ্ট আলোচনাসহ সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত হতে থাকে। এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন প্রখ্যাত সিরাত-রচয়িতা ইবনে ইসহাক (মৃত্যু : ১৫১ হিজরি)। মা’মার ইবনে রাশিদও (মৃত্যু : ১৫০ হিজরি) তাঁর সমকালীন সীরাত বিশেষজ্ঞ। সিরাতের এ পরিবর্তনীয় ধারায় ইবনে ইসহাকের পাশাপাশি আবু মুহাম্মদ আবদুর রহমান ইবনে আবদুল আজিজ, মুহাম্মদ ইবনে সালেহ ইবনে দিনার, আবদুল্লাহ ইবনে জাফর এবং আবু মা’শার প্রমুখ সিরাত-গবেষকদের কার্যক্রমও উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীকালের সিরাত-গবেষণায় এ কালের সর্বাধিক উচ্চারিত যে বর্ণনাকারীদের নাম উঠে আসে তাঁদের মধ্যে আবু ইসহাক ইবরাহিম ইবনে ফাজারি (মৃত্যু : ১৮৬ হিজরি), ইয়াহইয়া ইবনে সাইদ উমাবি (মৃত্যু : ১৯৪ হিজরি) এবং ওয়ালিদ ইবনে মুসলিম দিমাশকি (মৃত্যু: ১৯৫ হিজরি) অন্যতম। সিরাতের ওপর এ যুগে তাঁদের অনন্য স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচিত ছিল।

 

সিরাতের পুনর্বিন্যাস ও তৃতীয় শতাব্দী

হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর একেবারে শেষে ও তৃতীয় শতাব্দীর শুরুর দিকে সিরাত-সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নতুন মোড় তৈরি হয়। অভিনবত্ব, তথ্যের যাচাই-বাছাই, পরিমার্জন ও বিন্যাসের ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায় নতুন কার্যক্রম। এ কাজটি সূচিত হয় প্রখ্যাত সিরাত-গবেষক আবদুল মালেক ইবনে হিশামের (মৃত্যু : ২১৩ হিজরি) সুচিন্তিত পন্থায়। তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্যের ফলে পরিমার্জিত হয়ে প্রকাশিত হয় ‘সিরাতে ইবনে হিশাম’। যেখানে ইবনে ইসহাকের তথ্যের অপূর্ণতা এবং স্বনির্ভরতার বাছবিচার সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরিমার্জনের এ সময়ে তাঁর সঙ্গে মুহাম্মদ ইবনে সাদের (মৃত্যু : ২৩০ হিজরি) ‘তবাকাতে ইবনে সাদ’-ও বহুল প্রসার ও প্রসিদ্ধি লাভ করে।

সিরাত-গবেষক ও ঐতিহাসিকদের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার পাশাপাশি এ শতাব্দীতে মুহাদ্দিসিনে কেরামের সিরাতচর্চায় অসামান্য অবদান আছে, যাঁরা সুনান গ্রন্থাবলি রচনার পাশাপাশি সিরাতের ওপরও স্বতন্ত্র কিতাবাদি রচনা করে গেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন সাইদ ইবনে মুগিরা (মৃত্যু : ২২০ হিজরি), আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ ওয়াররাক (মৃত্যু : ২২৮ হিজরি), মুহাম্মাদ ইবনে আয়েজ (মৃত্যু : ২৩৪ হিজরি), আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ (মৃত্যু : ২৩৪ হিজরি), ইমাম আবু বকর ইবনে আবি শায়বা (মৃত্যু : ২৩৫ হিজরি), খলিফা ইবনে খাইয়াত (মৃত্যু : ২০৪ হিজরি), ইবরাহিম ইবনে ইসমাইল আম্বারি তুসি (মৃত্যু : ২৯০ হিজরি), ইমাম আবু জুরআহ (মৃত্যু : ২৮৪ হিজরি) ও বিখ্যাত হাদিস বিশারদ আবু মুহাম্মদ আবদুল্লাহ ইবনে মুসলিম ইবনে কুতাইবা দাইনুরির (মৃত্যু : ২৭৬ হিজরি) মতো মুহাদ্দিসিন।

তৃতীয় শতাব্দীর এ বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সময়ে ঐতিহাসিকদের সিরাত-গবেষণাও ছিল ঐতিহাসিক মাত্রায়। যেমন আহমদ ইবনে ইয়াহইয়া বালাজুরি (মৃত্যু : ২৭৯ হিজরি) ও মুহাম্মাদ ইবনে জারির তাবারির (মৃত্যু : ৩১০ হিজরি) মতো ঐতিহাসিকদের হাত ধরে ‘তারিখুল ইমাম ওয়াল মুলুক’ ও ‘ফুতুহুল বুলদান’ নামক রচনায় সিরাত-গবেষণার একটি বড় অংশ পরিলক্ষিত হয়।

 

চতুর্থ শতাব্দীতে সিরাতচর্চা

হিজরি চতুর্থ শতাব্দী সীরাত ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। মরক্কো ও আন্দালুসের একটি বড় অংশ জুড়ে মুহাদ্দিসিনে কেরামের পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হয় এর ব্যাপক কার্যক্রম। তথ্যের সঠিকতা এবং যাচাই-বাছাই করতঃ সারনির্যাস উত্থাপন করে সিরাত সংকলন ছিল এ সময়ের মূল লক্ষ্য। এ সময়কার উল্লেখযোগ্য রচনার শীর্ষে রয়েছে আবু মুহাম্মদ আবদুল্লাহ ইবনে আবি জায়েদের (মৃত্যু : ৩৮৬ হিজরি) ‘কিতাবুল জামি’ এবং ইমাম ইবনে আন্দালুসির (মৃত্যু : ৪৫৬ হিজরি) ‘তাজরিদ ওয়া তালখিস’ গ্রন্থদ্বয়।

 

পঞ্চম শতাব্দীর সিরাতচর্চা

হিজরি পঞ্চম শতাব্দীতে বৈশিষ্ট্যময় যে কাজটি হয়েছে তা হলো ‘দালায়িলুন নুবুওয়াহ’র ওপর যথেষ্ট মনযোগ। বিভিন্ন গ্রন্থাবলি এর ওপর রচিত হয়। আল্লামা আবু নাইম আহমদ ইবনে আবদুল্লাহ (মৃত্যু : ৪৩০ হিজরি) ও ইমাম আবু বকর আহমদ ইবনে হুসাইনের (মৃত্যু : ৪৫০ হিজরি) স্বতন্ত্র গ্রন্থগুলো এখনও বহুল সমৃদ্ধাকারে গবেষকদের আলোচনায় আসে। পরবর্তীকালেও এ শাস্ত্রে ব্যাপক সমৃদ্ধি দেখা গেছে। ওরিয়েন্টালিস্টদের বিতর্কের জবাবে যেগুলো মোক্ষম ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছে।

 

ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীর সিরাতচর্চা

হিজরি ষষ্ঠ শতাব্দীতে সিরাতচর্চার গুরুত্বপূর্ণ দিক অতোটা দৃশ্যমান না হলেও সপ্তম শতাব্দীতে সিরাতে অভূতপূর্ব কাজ হয়। আবদুর রহমান ইবনে আলি ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে জাফর জাওজির (মৃত্যু : ৬৯৭ হিজরি) ‘আল-মুনতাজাম’, প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে আসির আল-জাজারির (মৃত্যু : ৬৩২ হিজরি) ‘আল-কামিল ফিত তারিখ’, ইয়াহইয়া ইবনে হুমাইদার (মৃত্যু : ৬৩০ হিজরি) ‘সিরাতে ইবনে আবি তায়’, ইমাম আবু জাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনে শরফ নববির (মৃত্যু : ৬৭৬ হিজরি) ‘তাহজিবুস সিরাতিন নাবাবিয়্যাহ’ এবং শাফেয়ি ঐতিহাসিক আলি ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে মাহমুদ কাজরুনির ‘আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ’ এ শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলির শীর্ষস্থান দখল করতে পেরেছে।

 

অষ্টম শতাব্দীর সিরাতচর্চা

হিজরি অষ্টম শতাব্দী অভাবনীয় শক্তিমানদের সিরাতচর্চা সমৃদ্ধ একটি যুগ। এ সময়ে রচিত হয় হাফেজ আবদুল মুমিন দিময়াতির (মৃত্যু : ৭০৫ হিজরি) ‘সিরাতে দিময়াতি’ তথা ‘আল-মুখতাসার ফি সিরাতি সাইয়িদিল বাশার’-এর মতো গ্রন্থ। পাশাপাশি আল্লামা আলাউদ্দিন আলি ইবনে মুহাম্মদ ইবনে হাসান খাল্লাতির (মৃত্যু : ৭০৮ হিজরি) ‘সিরাতে খাল্লাতি’ খুবই প্রসিদ্ধি অর্জন করে। এই শতাব্দীর সবচেয়ে বিখ্যাত মুহাদ্দিস হাফেজ শামসুদ্দিন জাহাবির (মৃত্যু : ৭৪৮ হিজরি) হাত ধরেও সিরাতের ওপর উন্নত ও বৃহৎ পর্যায়ের গবেষণাধর্মী কাজ হয়। তবে সবচেয়ে আনন্দ ও গর্বিত বোধ করবার মতো বিষয় হলো এই শতাব্দীতেই হাফেজ ইবনে কাসিরের (মৃত্যু : ৭৭৪ হিজরি) ‘আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া’ রচিত হয়, যা যুগ যুগ ধরে সিরাতের ওপর অবিস্মরণীয় অবদান ধরে রেখেছে।

এরপর প্রশংসা ও অসামান্য প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে যুগ যুগ ধরে চলে আসতে থাকে সিরাতের নানাবিধ কার্যক্রম। পরিসর হতে থাকে আরও বিস্তৃত। ইসলাম ও মুসলমানের ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিটা দৃঢ়তার সঙ্গে গেঁথে যেতে থাকে সমাজে-রাষ্ট্রে এবং ব্যক্তিজীবনে—যা অমুসলিমদের জন্যে ভীষণ পীড়াদায়ক জ্বলনের সৃষ্টি করে। তাদেরকে ভাবিয়ে তোলে এর গতিপ্রক্রিয়া। গতিরোধ করার নানান কৌশল তারা হাতড়ে ফেরে। হিজরি ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বিশেষত সিরাতের এই অপ্রতিরোধ্য গতিকে থামিয়ে দেবার প্রত্যয় নিয়ে ময়দানে নেমে আসে ওরিয়েন্টালিস্ট। তারাও শুরু করে সিরাতচর্চা। সিরাতের এপার-ওপার ঘেটেঘুটে চষে বেড়ায়। তারপর সূক্ষ্মতম কৌশল প্রয়োগ করতঃ ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে জনমনে ত্রাস সৃষ্টি করে। ইসলামি আকিদা ইহুদি ও নাসারাদের চিন্তা থেকে আহরিত এবং কুরআন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের স্বরচিত গ্রন্থ—এরকম অমূলক কথাবার্তা তারা তাদের গবেষণায় ব্যাপকভাবে প্রচার শুরু করে দেয়। যার ফলে শুধু অনৈসলামিক জনগোষ্ঠীই এই ভ্রান্তির শিকার হয় না, বরং মুসলিমদের একটি মেধাবী গোষ্ঠীও এর মুখোমুখি হয়ে খেই হারিয়ে ফেলেন। ভারত উপমহাদেশে এর প্রকোপ অসামান্য আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক সে সময়ই প্রয়োজন দেখা দেয় তাদের এই প্রোপাগাণ্ডার বিরোধিতা করা এবং শুদ্ধ তথ্যসম্বলিত গ্রন্থের প্রসার। তখন এর মোকাবেলা করে আগের চাইতে আরও উদ্যমের সঙ্গে শুরু হয় একের পর এক উৎকৃষ্ট সিরাতগ্রন্থের প্রকাশ। যেখানে সিরাতের প্রকৃত রূপ স্পষ্টকরণ, ছড়িয়ে পড়া সন্দেহ দূরীভূতকরণ এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে যথাযথ মর্যাদাপূর্ণ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর প্রতি লক্ষ রাখা হয়। এ ক্ষেত্রে মাওলানা সালমান মানসুরপুরি রহমতুল্লাহি আলায়হির ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। এরপর ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় রচিত ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ-এর ‘le prophet de l’islam’-ও এ সংকট মোকাবেলায় দুর্দান্ত অবদান রাখে। শোনা যায় এ গ্রন্থটি পাঠ করার ফলে হাজার হাজার খ্রিষ্টান যুবক ইসলামে প্রবেশ করে। এমনই এক বিপ্লবের ধারা যুগ থেকে যুগান্তর অবধি অব্যাহত থাকে। ওরিয়েন্টালিস্টদের অপতৎপরতা ক্রমশ নিভে নিভে আসে।

শুদ্ধতার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত তৎপর থেকে সিরাতচর্চার এ ধারা আজও চলমান আছে। যুগের অবসানে প্রকৃতির রূপ পাল্টে যাবার ফলে সিরাতের ক্ষেত্রেও যোগ হয়েছে আরও নতুন নতুন মাত্রা। পূর্ববর্তী গবেষক, ঐতিহাসিক এবং মুহাদ্দিসিনে কেরামের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাধনার বদৌলতে এখন তার চর্চা হয়ে উঠেছে সহজ থেকে সহজতর। একটি উত্তম জীবন থেকে উৎকৃষ্ট চিন্তা ও কর্মের মহৎ সংগ্রহ মানুষ প্রয়োগ করছে নিজস্ব জীবনের নানাদিকে নানাভাবে; যার ফলে মানুষ স্বপ্ন দেখতে পারছে আরও উচ্চতার, আগে বেড়ে যাওয়ার। অবশ্যই এ সিরাত এর যোগ্য প্রতিপাদ্য। জীবনের বহুমাত্রিক সফলতার জন্যে এ সিরাতই এক অনন্য উপজীব্য বিষয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এর যথাযথ মর্যাদা দেয়ার সুযোগ আমাদের দান করুন। আমিন।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, মাদরাসাতুল কাউসার, ঢাকা

 

ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১