ফিরে আসব

সংখ্যা:

 

তাওহিদ আমার পরিবারের ট্রাজেডিটা জানুক; জানুক, কেন আমি এত দরিদ্র; এসব জেনে আমার প্রতি তার দুর্বলতাটা আরও বেড়ে যাক—আমি কখনোই চাইনি এমনটা। একদিন কী বুঝে ও বলে উঠল, ‘তোদের বাড়ি যাব, নিবি?’ আমিও চট করে বলে বসলাম, ‘নেব না কেন? তুই যাবি? তোর পরিবার এই অজপাড়া গাঁয়ে যেতে দেবে তোকে?’

আমার অমন কথায় ভীষণ কষ্ট পায় ও। শহরের ধনাঢ্য ছেলে হলেও গরিবদের নাক ছিঁটোনির অভ্যেস কিংবা ভেতরে জিলেপির মতো প্যাঁচপাচ একটুও নেই তার। অভিধান যাকে সহজ-সরল বলে—ও তেমনই। আমার কলেজজীবনের নানান সমস্যায় তীব্র তেজি অশ্বের মতো সবসময় ছুটে এসেছে। যেন আমি তার আপন বোন। শহরে থেকে একটা মেয়ের লেখাপড়া করতে যে কী নিদারুণ কষ্ট পোহাতে হয়—ভুক্তভোগীরাই জানে। তার উপর আমি নিম্নমধ্যবিত্ত বরং নিম্নবিত্ত ঘরের মেয়ে। টিউশনির টাকা দিয়ে মেস ও কোচিং কুলিয়ে নিতে হয়। এতসব বাধা উথরে জীবন-নদীতে নৌকো বেয়ে যাচ্ছি বা যেতে হচ্ছে। সত্য কথা বললে, এসবকে কোনা বাধাই মনে হয় না আমার। বরং মনে করি, আমিই, আমার শরীরটাই আমার সবচেয়ে বড় বাধা। এই শরীরের উপর ক্রোধাক্ত হয়ে একটা কবিতায় লিখেছিলাম—

‘বলো, তুমিহীন আমি হলে কী হতো কার?

তবে কেন পথে পথে এত শত ইভটিজার?’

তাওহিদ পাশে থেকে ওই বাধাটা দূর করে দিয়েছে। ও শুধু এটুকুই জানত—গ্রামের একটা গরিব ঘরের মেয়ে আমি। এর চেয়ে বেশিকিছু জানানোর প্রয়োজ পড়েনি কখনো। এই এটুকুতেই গলে গিয়ে টিফিনের টাকার অর্ধেকটা বাঁচিয়ে প্রতি বৃহস্পতিবার চাল-ডালসহ রান্নাবান্নার যাবতীয় খরচ করে দেয়। আমার প্রতি আপাদমস্তক দুর্বল এই তাওহিদকে কখনোই ট্রাজেডিটা জানানোর ইচ্ছে ছিল না। সে আসার আগে একবারও স্মরণ হয়নি; হলে আম্মাকে বলে রাখতাম। আসলে হবার কথাও না। ও আমার বাড়ি আসছে, গ্রাম দেখার তার তুমুল শখ—এই শখটা পূরণ করতে যাচ্ছি—খুশিতে সব ভুলে গিয়েছিলাম আমি। সে বাড়িতে পা রাখার এক মুহূর্ত আগে মনে হলেই সবাইকে বিষয়টা গোপন রাখতে বলতাম।

 

দুই

আমি রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিলাম। নাস্তা দিতে এসে যখন দেখলাম আম্মা তাকে গল্প বলছেন—‘লিনা তোমাকে কিছু বলেনি? সে এক করুণ কাহিনি বাবা! ওর বাবা তখন ঢাকার এক মাদরাসার বাবুর্চি। রাতে দারোয়ানগিরিও করতেন। ছাব্বিশে মার্চের ওই রাতে হাত-পায়ে গুলি খেয়ে পরদিন বাড়ি আসেন। টাকার অভাবে ভালো চিকিৎসা করাতে পারিনি। ফলে ক্ষতগুলো বেড়ে যায়। ভয়ংকরভাবে ফুলে ওঠে আর পুঁজ জমতে থাকে। একটা গরু ছিল আমাদের। চিকিৎসার জন্য একেবারে পানির দামে বিক্রি করে দিই ওটা। তখন তো সবাই তটস্থ, কে এসব কেনে। যাক, শেষমেশ কিছুটা সেরে উঠলেন, টুকটাক কাজ করতে পারেন—এমন। একদিন ধান খেতের কাজ থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি এসে আমার নাম ধরে বলতে লাগলেন, “কুলসুম কই, কই রে।” আমি দৌড়ে বেরোই। বলতেছেন, “শনিদাসের পুরো বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে খিনজিরের বাচ্চা মিলিটারিরা।’’ চরম রাগে কথাগুলো বলতে বলতে ঘরে ঢোকেন তিনি। লিনা তখন ছোট। ওকে জড়িয়ে কয়েকটা চুমো খেয়ে আমাকে বললেন, “আমি গেলাম, লিনার বড় মামাকে বলে যাব তোমাদের এসে নিয়ে যেতে…।”

‘পেছন পেছন আমি ডাকলাম, লিনা কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে গেল রাস্তা অবধি, কিন্তু ফিরেও তাকাননি আর। পরনের লুঙ্গি আর পাঞ্জাবিটাও বদলাননি। একবার ঘাড় ফিরিয়ে কেবল বলেছিলেন, “ফিরে আসব আবার…।”

কিন্তু তিনি কথা রাখেননি, ফিরে আর আসেননি। তবে, বাবা, এই যে একখণ্ড স্বাধীন ভূমি পেয়েছি আমরা, নিঃশ্বাস নিতে পারছি সবাই প্রাণ ভরে, ফিরে না-আসার বিনিময়ে এই ভূখণ্ডের মানুষকে এটাই দিয়ে গেছেন তিনি এবং তাঁর মতো নাম না-জানা অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা।’

 

লেখক : সম্পাদক, মাসিক বিহান, সিলেট

 

মার্চ 2018

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১