সেই সে রত্ন, হারিয়েছি যা আমি; খুঁজে ফিরি প্রতিনিয়ত। পাই না তাকে। ধরা দেয় না আমায়। দূর থেকে শুধু কাঁদায়, আর সে হাসে। তাকে পাবার জন্য অধরায় হাত বাড়াই। যদি কখনও পাই! আশা আমার। আশার জাল ছিন্ন হয় না কখনও। মাঝেমধ্যে কথা বলি; যা ছিল না-বলা। ছিল আমার মনে, শুধু অব্যক্ত হয়ে। সেই অব্যক্ত কথা শোনে না সে। তবু বলে যাই। যদি শোনে—আশায়। ঘুমোবার জন্য রাতে বিছানায় এলিয়ে দিই দেহ। আসে না ঘুম। বসে থাকি ঘুমপাড়ানি সে গান শোনার আশায়। ভালোবাসি তাকে কত যে! বলিনি কখনও। বলার সুযোগ হয়নি কখনও। এর আগে চলে গেল সে। মাঝেমধ্যে অভিমান হয় তার ওপর। সবাই তার বাবাকে ডাকে। আদর পায়। স্নেহে আপ্লুত হয়। কিন্তু আমি পাই না। তুমি করো না আমায় আদর। বলো তো বাবা! তুমি কি মানুষ নাকি অন্য কিছু? বুঝে আসে না আমার। এই শহরে ঘোরাফেরা করি। দেখি হরেক রকম জিনিস। আমার নিতে ইচ্ছে হয়, খেতে ইচ্ছে করে অনেক কিছুই। কিন্তু তুমি দাও না আমায়। এমন কেন তুমি? বলতে পারো।
আমার বন্ধুরা কত সুখী। কত সুখময় ওদের জীবন। বাবাকে ডাকে। তারা খোঁজ নেন ওদের। কিন্তু তুমি আমার খোঁজ রাখো না। এমন করো কেন বাবা! আমায় কি তোমার পছন্দ নয়? আমি কি তোমার ছেলে নই? তুমি তো আমার জন্মদাতা পিতা। আমি তো তোমার আলোকিত পৃথিবী। একটু চেয়ে দেখো, কতো বড় হয়ে গেছি আমি। কত বন্ধু আমার, কত শুভাকাঙ্ক্ষী। আরও কত কি! এসব দেখলে তুমি একদমই…।
এখনও তোমার কি ইচ্ছে হয় না, খোকাকে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিতে? জানি হয়। কিন্তু পারছ না তুমি। কারণ তুমি তো সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে। কিন্তু অনেক অনেক দূরে। আমায় একা ফেলে শুয়ে আছ সুখে। জানি, আমায় মনে পড়ে না তোমার। কিন্তু তোমায় খুব মনে পড়ে বাবা! তোমার বিরহে রাতে চোখের জল ফেলি; কাঁদি একটানা। নীরবে মন খারাপ করে বসে থাকি। কিন্তু তুমি? বোঝো না কিছু। আমার হৃদয়ের আর্তি আমার মাঝেই থাকে; আর তুমি থাকো তোমার মাঝে। অভিমান করলাম আমি। ভালো থেকো বাবা! জানি, তোমারও ইচ্ছে হয় আমায় দেখতে। কিন্তু পারো না। কারণ তুমি তো সাড়ে তিন হাত মাটির তলে। তাও জানি আমি। তবে এসব আর কিচ্ছু নয়, হৃদয়ের আর্তি।
দুই
ঘরের সঙ্গে লাগোয়া বারান্দায় আমি। বাতায়ন খুলে চেয়ে আছি অদূরে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, রিমঝিম তানে। মনের ভেতর বেজে ওঠে অচেনা কোনো এক করুণ সুর—‘আজ শরৎবেলায় কোন সে সুখের আবেশ? এলে সুখের জানান দিতে। কুয়াশায় ভিজে ভিজে রাত পার কামনা; দূরে যেয়ো না।’ কুয়াশাভেজা তোমার ঐ চরণদুটি শিহরিত করে আমায়। কাছে টানে এক মায়াবী পুলকে। ভালোবাসার এক অচিনপুর আছে। আজ তা অন্তহীন। এই কুয়াশাজলে সিক্ত হয়ে পেরিয়েছে নিজ সীমানা। আমি সাঁতার কাটছি এর অথৈ জলে। চারদিকে থৈ থৈ জল। কানায় কানায় ভরপুর এর চতুর্পান্ত। ‘চিক চিক করে বালু, কোথাও নেই কাদা; একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা…।’ বন্দে আলী মিয়ার কবিতা মনে পড়ে। মনে পড়ে সেই ডুবুরির কথা। একদিন তুমি হারিয়ে গেছিলে জলগভীরে। ডুবুরিরা তোমায় উদ্ধার করেছিল। আমিও তোমার মতো হারিয়ে যাই; ধূলিখেলার বন্ধুদের সঙ্গে— ুক-ডুকখেলার সেই স্মৃতিতে। এসব মনে করে কখন যে খেই হারিয়েছি, নিজেও জানি নে।
আমার স্বজনদের কেউ তাদের বাবাকে ‘আব্বু’, কেউ বা ‘বাবা’, আবার কেউ ‘আব্বা’ ডাকে। আমার তোমাকে ‘বাবা’ ডাকতেই ইচ্ছে হয়। তাদের কেউ ডাকে ‘তুমি’, কেউ বা ‘আপনি’; কিন্তু আমার মানহীন সর্বনামটাই বারবার আওড়াতে ইচ্ছে হয়। কারণ এর ভেতর আছে অন্যরকম ভালোবাসা। ‘তুমি’ ভেতর থেকে আসে। রবীন্দ্রের ভাষায়—‘তুমি যে তুমিই ওগো! সেই তব ঋণ/ আমি মোর প্রেম দিয়ে শুধি চিরদিন।’ বেশি বাড়িয়ে বলা ভালো নয়। তাই বলছি না, ‘তুমি’ বলি কবিগুরুর এ চরণকে অনুসরণ করে। বরং এটা ভালোবাসার সূচনা থেকে, জন্মের পর থেকেই। আজ ভালোবাসার পদ্ম ফুটেছে নতুন করে; নতুনরূপে। বৃষ্টির রিনিঝিনি তানে কী এক ছন্দ খুঁজে পাই। এই অবুঝ মনটাও দুটি হাত বাড়িয়ে হাতে হাত মিলিয়ে ভিজতে চায়। আমার কপোল বেয়ে আজ বইছে দুঃখের জলধারা। বলছে তোমায়—‘ওগো তুমি! তুমিই পারো আমার দুঃখ ঘোচাতে; আমায় চির আপন করে নিতে।’
পড়ন্ত বিকেলে চেয়ে থাকি গোধূলিবেলার আকাশের দিকে। দেখি জীবনের এই ঘন-কালো মুহূর্তের প্রতিচ্ছবি। আভাহীন সূর্য হয়তো তখন আমার দিকে চেয়ে হাসে উপহাসের হাসি। দূরপাহাড় আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকে। আমি ভ্রুক্ষেপ করি না কারোর উপহাস; সাড়া দিই না কারোর ডাকেই। শুধু চেয়ে থাকি পৃথিবীর এই আমার চতুর্দিকে। হয়তো তুমি আসবে কোনো দিগন্ত থেকে। আসবে হাত বাড়িয়ে। ধরবে আমায় জড়িয়ে। বুকে নেবে। চুমু খাবে। আদর সোহাগে ভরিয়ে দেবে এ হৃদয়। কথা বলবে চুপটি করে। আমিও তেমনই আচরণ করবো তোমার সঙ্গে। মুচকি হাসি নয়; ভালোবাসার শেষ হাসিটুকু হলেও অন্তত দেখা দেবে আমার এই মুখাবয়বে। কত আশা আর কল্পনা এ বুকে। হৃদয় উজাড় করে দাঁড়িয়ে আছি শ্যামলমাখা কোনো এক মাঠে। যার অবারিত সবুজ আমায় মুগ্ধ করে প্রতিনিয়ত। চারপাশ থেকে ডাকছে পাখপাখালি; আমায় আপন বাসায় নেবে বলে। পাহাড় হাতছানি দিয়ে ডাকে; আমার সঙ্গে আলাপ জুড়ে দেবে বলে। উপহাস করছে অদূরে চেয়ে থাকা সূর্যের রক্তিমাভা। কারোর প্রতিই নেই আমার খেয়াল। আজকাল সব খেয়ালই যেনো হারিয়ে ফেলেছি আমি। শুধু একটাই খেয়াল আমার; আর একটাই স্বপ্ন—তোমার মিলন।
প্রেমের সুরভি দিয়ে কীভাবে ফুলকুঁড়ি গাঁথে—জানি নে। তবে আবেগে হয়তো তোমাকেই তেমন করে ভেবেছি। আমি এখনও দাঁড়িয়ে; সময়ের ঝড়ো হাওয়ায় পা পিছলে সরে যাইনি সে বিস্তর প্রান্ত হতে। খেয়ালি হাওয়ায় ভাসেনি মন। শুধু কল্পনায় বরাবরই সাঁতার কেটেছে। মাঝেমধ্যে মনে হয়েছে, এ জীবনঘুড়ির লাটাই তোমার বিরহী বেদনার হাতে। ইচ্ছে হলেই সে টান দেবে। কিন্তু কই? কই তুমি? এলে না তো! সেই চারপাশের নানাজনের নানান ডাক আর উপহাসের রঙিন জালেই ফেঁসে আছি আমি। বন্দী হয়েছি একঘেয়ে কোনো কারাগারে। যেখান থেকে না বেরোনোর পথ আছে; না আছে সেখানে থাকবার কোনো সুযোগ। বারবার কেবলই ভেতর থেকে কোনো এক অসহনীয় দহন আঁৎকে ওঠে—পীড়া দেয়। যার ঘানি আজও টানছি আমি। বয়ে বেড়াচ্ছি দূর থেকে বহুদূরে। কিন্তু তুমি বোঝোনি তা। বোঝোনি এই ম্লান মুখের ভাষা। অম্লান মুখের হাসি কী ছিলো তোমার চাওয়া? তাহলে দাও না কেন ধরা! আর না-হয় হোক না একবার অধরায় কথা বলা। তুমি হয়তো দেখবে আমায়। কিন্তু আমি দেখবো না তোমায়। শুধু আড়াল থেকে তোমার ধ্বনি বাজবে আমার কানে। বর্ষার এই রিনিঝিনি তান কত তুচ্ছ হবে সেই প্রতিধ্বনির কাছে! ভেসে বেড়াবো অজানা কোনো এক সুখে। চিরসুখী হবে আমার এ মন। থাকবে না আর তার কোনো আর্তি। শুধুই সুখের জোয়ারে ভেসে যাবে অজানা কোনো সুখনগরীতে। নিজেকে হারিয়ে ফেলবে সুখের মাঝে; যার কোনো অন্ত নেই। নেই কোনো অন্তের ভাবনা। কথ্যভাষায় যাকে ‘স্বর্গসুখ’ আখ্যা দেওয়া হয়। সেই প্রতীক্ষায়ই আছি আজও। চাই না আর কোনো দহন সইতে। কারণ এ দহন বড়ই যন্ত্রণার, বড়োই অসহনীয়। তাই চেয়ে আছি—আসবে তুমি; আসবেই একটিবার। এ আর্তির তানই বারবার ভেসে বেড়ায় আমার শরতের রোজকার বেলায়।
তিন
তোমার কবর পাশে দাঁড়িয়ে আমি কত-না কেঁদেছি। তুমি হয়তো দেখেছ; টের পেয়েছও আমার পদধ্বনি। কিন্তু দাওনি সাড়া। অশ্রু টপটপ করে গড়াচ্ছিলই শুধু। তবু তুমি সাড়া দাওনি। অনেক কষ্টে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছি। বাবা! তোমার প্রতি আমার এতো টান কেন বলতে পারো? আমার জীবনের চেয়েও আমি তোমায় অনেক বেশি ভালোবাসি। কত-না নিশিযাপন করেছি তোমায় ভেবে ভেবে। নিজেরও জানা নেই। সেদিন পত্রিকা আপিসে কী একটা কাজে মগ্ন ছিলাম। পাশে কারোর মৃদু হাসিতে আমার একাগ্রতায় বাঁধ সাধলো। ভালো করে তাকাতেই দেখলাম ছোট্টপায়ের অনুরণন। মিষ্টিসুরে বাবাকে ডেকে বলছে—‘আব্বু! আব-বু!’ আমার ভেতরটা তখন হাহাকারে ভরে উঠল। হয়ে গেলাম মরুঅঞ্চলে রোদের তীব্রতায় পিপাসার্ত লোকটির মতো। বুকের ভেতরটা আচমকা দড়ফড়িয়ে উঠল। কী যেন বলতে গিয়েও পারলাম না বলতে। অজান্তেই আটকে গেল মুখ। নীরবকান্নায় বেশ সময় গড়ালাম। সেটাও হয়তো দেখোনি তুমি।
সেদিন শপিংমলের নানান লোকের ভীড়ে নিজেকে মিলিয়ে দিলাম তাদের সঙ্গে। হঠাৎই চোখের সামনে ধরা দেয় এক অযাচিত দৃশ্য। কাণ্ডটি আমায় একেবারে হতবাক করেই ছাড়ল—‘আব্বু এটা নয়, ওটা নেবো।’ ইঁচড়েপাকা শহুরে একটি বাচ্চার ওর বাবার কাছে আবদার। আমার তখন বড়ই একা মনে হলো। ভাবলাম, তুমি যদি থাকতে, তাহলে ওদের মতো আমরাও হয়তো বা দুজনে দুজনার হাত ধরে ঘুরে বেড়াতাম এই আঁকাবাঁকা নগরীর পথঘাট। মজা করতাম শপিংমলের এই কফিহাউসে। তুমি হয়তো আমায় খাইয়ে দিতে। সত্যি! বিনিময় দিতে একটুও কার্পণ্য করতাম না আমিও। কিন্তু সেটা আর হলো না। তোমার কাছে আমিও করতে পারতাম বিভিন্ন জিনিসের বায়না। তোমার সাধ্যমতো দিলেই হতো। এতে আমার কোনো আপত্তি থাকত না বাবা! শুধু একটাই আশা বুকে বেঁধে রাখতাম—বাবা ডেকে আরেকটিবার তোমায় বলবো—‘এটা নয় ওটা বাবা!’ এমন স্নেহমাখা ডাক আর দৃশ্যের চেয়ে বড় কী পৃথিবীর অন্য সবকিছু?
এখনও ঘুম ঘুম রাত আসে যায় রোজ। চুপ কথা চুপ বনে বিছানায় এলিয়ে দিই দেহখানা। গভীর রাতে বেজে ওঠা টেলিফোনে ভাঙে কখনও ঘুম। তবে তোমায় ভেবে আমি আজ আর রাত জাগি না। চোখের নিচে এখন আর কালি পড়ে না। তোমায় নিয়ে আমি আর কবিতা লিখি না। কাব্যরা সব যেন আমায় ছেড়ে চলে গেছে দূর-বহুদূরে। আজ আমি কাউকেই আর তেমন ভালোবাসি না। ভালোবাসার শবদেহ আমার ঘরের পাশেই যেন-বা হাজির। তুমি ছিলে, আছো; তবে থেকেও যেন আজ আমি আর নেই। এমন করে পাড়ি দেবো হয়তো পৃথিবীর কয়েক কদম পথ।
লেখক : শিক্ষক, আল জামিআতুল ইসলামিয়া ইসলামপুর (ভবানিপুর মাদরাসা), গোপালগঞ্জ
মার্চ 2018

