পলান সরকার : বইপ্রেমীদের প্রেরণার বাতিঘর

সংখ্যা:

 

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাউসা গ্রামে তাঁর নিবাস। নাম পলান সরকার। ছেলেবেলা নানা কারণে খুব বেশিদিন তিনি শিক্ষার আলোয় স্নান করতে পারেননি। কিন্তু স্বল্পশিক্ষিত এই মানুষটির রয়েছে শিক্ষানুরাগী একটি কোমল হৃদয়। বই পড়তে ভালোবাসেন তিনি। এই ভালোবাসা-ভালোলাগা কেবল নিজের  মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বাউসাসহ আশপাশের অনেক গ্রামের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দিয়েছেন নিজের বইপ্রীতি ও বইয়ের স্নিগ্ধ আলো। বাড়িতে হাজারো বই সমৃদ্ধ একটি লাইব্রেরি আছে তাঁর। গল্প, উপন্যাস, ইতিহাস, শিশুতোষ সাহিত্যসহ সব ধরনের বই আছে লাইব্রেরিতে। ছোটবেলা থেকেই বই খুব ভালোবাসতেন পলান সরকার। বইয়ের ঘ্রাণ তাঁকে যেমন আকুল করে, তিনি চান এই আকুলতা আর মুগ্ধতা অন্য মানুষের মনেও ছড়িয়ে পড়ুক। প্রতিদিন সকাল কিংবা বিকালে একটি ব্যাগে বই নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। হেঁটে বেড়ান গাঁয়ের পথে পথে। এ পাড়া ও পাড়া হয়ে চলে যান বহুদূর। বাড়িতে বাড়িতে বিলি করেন বই।

মূলত শরিরে ডায়বেটিস বাসা বাঁধবার পরপরই পলান সরকার হাঁটতে শুরু করেন। সেটা বছর সাতেক আগের কথা। একদিন তিনি ভাবলেন পথে পথে যেহেতু হাঁটতেই হবে, সে ফাঁকে একটি ভালো কাজ করলে মন্দ হয় না। এরপর থেকেই শুরু তাঁর বই পড়ানোর কার্যক্রম। শিশু থেকে বুড়ো এমনকি গ্রামের নারীরাও তাঁর কাছ থেকে বই নিয়ে পড়্ন।ে প্রতিদিন ঘরে ঘরে বই পৌঁছে দেন পলান সরকার। আর ফেরেন অনাবিল এক তৃপ্তি নিয়ে। একধারে দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে তিনি বই বিতরণ করে আসছেন। এই বই পড়ার জন্য কোনো প্রকার অর্থ তাঁকে প্রদান করতে হয় না। বইপাঠকরা পলান সরকারের সংগ্রহে থাকা বই থেকে নিজেদের পছন্দমতো তিন-চারটা বই নিতে পারেন। পড়া শেষ হলে তাঁর অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকেন আবার কখন নতুন বই হাতে পাবেন। প্রতি চারদিন পর পর তিনি একেকটি গ্রামে যান। তখন পড়াশেষ বই ফেরত দিয়ে নতুন বই সংগ্রহ করেন বইপ্রেমীরা।

নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিক থেকে তিনি টুকটাক বই সংগ্রহ করে পড়তে শুরু করেন। সাত-আট বছর আগে তাঁর ডায়েবেটিস ধরা পড়ে। তখন ডাক্তার তাঁকে প্রতিদিন ৩/৪ ঘন্টা হাঁটার উপদেশ দেন। কিছুদিন তিনি খালি হাতে হাঁটতে থাকেন। ওই সময় তাঁর মাথায় জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে এই ভিন্ন চিন্তাটা উদিত হয়। বর্তমানে ১২ থেকে ১৪টি গ্রামে তিনি বই প্রদান করে থাকেন। পলান সরকারের কাছে তাঁর পাঠকসংখ্যার কথা জানতে চাইলে বলেন, প্রায় তিন হাজার পাঠক রয়েছে। যা তার একান্ত প্রচেষ্টার ফসল। বই বিলি করার জন্য তাঁকে কোনো কোনো দিন ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার হাঁটতে হয়। এজন্য অনেকে তাঁকে ‘বইয়ের ফেরিওয়ালা’ বা ‘আলোর ফেরিওয়ালা’ নামে ডাকেন।

দৈনিক প্রথম আলোর রাজশাহীর প্রতিনিধি আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ পলান সরকারের সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি তো এখন মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই পৌঁছে দিচ্ছেন। বই পড়ার জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার এই চিন্তাটি আপনার মাথায় এল কীভাবে?’

উত্তরে তিনি বলেন, জ্ঞান দান হচ্ছে সবচেয়ে বড় দান। তাই তিনি এই বড় কাজটি বেছে নিয়েছেন। আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদের তৈরি প্রতিবেদন ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ শুক্রবার প্রথম আলোর সপ্তাহিক ছুটির দিনের প্রচ্ছদ পাতায় প্রকাশ করা হয়। এতে করে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর এই গল্পের কথা। ২০১১ সালে তিনি পান ২১শে পদক। পেয়েছেন সাদা মনের মানুষের স্বীকৃতিসহ আরও অনেক পদক ও সম্মাননা। বর্তমানে ‘পলান’ নামে তাঁর একটি পাঠাগারও রয়েছে। যেখানে সকল ধরনের পাঠক নিয়মিত বই পড়তে ছুটে যান। পলান সরকার তাঁর এলাকায় একজন জনপ্রিয় মানুষ হয়ে উঠেছেন।

পলান সরকারের তিন ছেলে ও এক মেয়ে। এক ছেলে এমএ পাশ, এক ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। বইপ্রেমিক এই মানুষটি নিজে বই পড়ে যতটা আনন্দ পান, মানুষকে বই পড়িয়ে পান তারচেয়ে বেশি তৃপ্তি ও ভালোবাসা।

বই হোক সবার নিত্য সঙ্গী, বইয়ের আলোয় আলোকিত হোক সমাজজীবন—জীবন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এই প্রার্থনাই করেন পালন সরকার। তাঁর জন্য অনিঃশেষ শুভকামনা।

 

লেখক : সার্কুলেশন ব্যবস্থাপক, মাসিক নবধ্বনি

নভেম্বর ২০১৮

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১